অধ্যক্ষ সিরাজের ঘনিষ্ঠরাও এখন ভোল পাল্টেছেন - বিবিধ - Dainikshiksha

অধ্যক্ষ সিরাজের ঘনিষ্ঠরাও এখন ভোল পাল্টেছেন

ফেনী প্রতিনিধি |

নুসরাত জাহান রাফির মৃত্যুতে দেশব্যাপী যে আলোড়ন উঠেছে- তাতে রাতারাতি পাল্টে গেছে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার দৃশ্যপটও! যৌন নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার পক্ষ নিয়ে দু'দিন আগেই যারা নুসরাত হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে আত্মহত্যার চেষ্টা বলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন; তারাও এখন ভোল পাল্টে নুসরাত হত্যার বিচার দাবিতে সোচ্চার। এ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এর আগে একাধিকবার যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পরও কেউ সিরাজের বিপক্ষে মুখ খোলেনি। তখন ব্যবস্থা নিলে নুসরাতকে এভাবে প্রাণ হারাতে হতো না। 

এদিকে, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা ঘিরেও স্থানীয়দের মনে ঘুরছে নানা প্রশ্ন। পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ঘটনার দিন মাদরাসা ক্যাম্পাসে ছিল অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রত্যেক পরীক্ষার্থীকে নিরাপত্তা তল্লাশির পর ভেতরে ঢোকানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মাদরাসার ভেতরে কেরোসিন কীভাবে আনা হলো এবং নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে হামলাকারীরা কীভাবে বাইরে বেরিয়ে গেল তা ভেবে পাচ্ছে না কেউ।

গতকাল শুক্রবার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় গিয়ে প্রথমেই চোখে পড়ল নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে টানানো অসংখ্য ব্যানার। অথচ মাদরাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলার পর নুসরাতের সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেছেন এই মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে নুসরাতের পরিবারের দায়ের করা মামলার বিরোধিতা করে মাদরাসার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ সমাবেশও করেছেন। সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে গতকাল নুসরাতের দুই সহপাঠী নিশাত সুলতানা ও নাসরিন সুলতানা বলেন, ওই ঘটনার পর আমরা দু'জন ছাড়া কেউ নুসরাতের পক্ষ নেয়নি। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কথা বলায় নুসরাতকে তিরস্কার সইতে হয়েছে। মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাকে হুমকিও দেওয়া হয়েছে বার বার। 

নিশাত ও নাসরিন গতকাল দুপুরে মাদরাসায় এসেছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কথা বলতে। এ সময় সঙ্গেও কথা হয় দু'জনের। নিশাতকে ছাদে মারধর করা হচ্ছে- এমন কথা বলে নুসরাতকে ডেকে নিয়ে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। নিশাত জানান, তিনি তখন ছাদে ছিলেন না। মাদরাসার ১০ নম্বর কক্ষে বসে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে অন্যদের মতোও তিনি পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে আসেন। কিন্তু শিক্ষকরা বেশিরভাগ পরীক্ষার্থীকে ঘটনাস্থলে যেতে দেননি। 

হত্যাকারীরা কীভাবে মাদরাসা ক্যাম্পাসে ঢুকে আবার বেরিয়ে গেল সে প্রশ্নের জবাব মেলেনি। গতকাল প্রায় ঘণ্টা তিনেক মাদরাসা ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে নানাজনের সঙ্গে কথা বলেও কোনো কূল-কিনারা মেলেনি।

এর আগে সোনাগাজীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গেও এ নিয়ে কথা হয়। তাদের মতে, নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সুপরিকল্পতি। নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পেছনে স্থানীয় রাজনীতি, দলীয় আধিপত্য এবং মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্বও জড়িত বলে মনে করেন অনেকে। সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হোছাইনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এমন অনেক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান। অবশ্য এক পর্যায়ে তিনি অধ্যক্ষের অনৈতিক আচরণ ও কর্মকাণ্ড নিয়েও মুখ খোলেন। বলেন, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এখানে শিক্ষকতা করি। অধ্যক্ষ এর আগেও অনেক মেয়েকে হয়রানি করেছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারিনি। কারণ তিনি সবাইকে ম্যানেজ করতে পারতেন। ঘটনার পর অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তির দাবি করেছেন মো. হোছাইনও। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তখন সবাই অধ্যক্ষের পক্ষে ছিলেন। 

মো. হোছাইনের সঙ্গে আলাপের সময় পাশেই উপস্থিত ছিলেন মাদরাসার নৈশ প্রহরী মোস্তফা। তার হাতে পোড়া ঘা। ঘটনার দিন নুসরাতকে বাঁচাতে গিয়ে মোস্তফা আহত হয়েছেন বলে জানান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। সেদিনের বর্ণনা জানতে চাইলে মোস্তফা বলেন, ঘটনার দিন পরীক্ষা কেন্দ্রের গেটে চার পুলিশ ও দু'জন গার্ড দায়িত্বরত ছিলেন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তল্লাশি করেই হলে ঢোকানো হয়েছে। নুসরাতকে তার ভাই গেটে নিয়ে আসেন। এ সময় নুসরাতের সঙ্গে তার ভাই ঢুকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। নুসরাতের ভাই চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই পরীক্ষা শুরু হয়। তারপর হঠাৎ সাইক্লোন শেল্টারের দোতলা থেকে একটি মেয়ের চিৎকার শোনা যায়। আমরা সবাই সেদিকে ছুটতে গিয়ে দেখি নুসরাত তার শরীরে আগুন নিয়ে নিচে নেমে এসেছে। তার শরীরের সব পোশাক পুড়ে শরীরটাও জ্বলছে। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে হাতের কাছে যা পেয়েছি তা দিয়ে তার আগুন নিভিয়েছি। আগুন নেভাতে গিয়ে আমরা বাঁ হাত পুড়ে গেছে। এ সময় ভবনের ওপর থেকে কেউ নেমেছে কি-না খেয়াল করিনি। ২১ বছর ধরে এই মাদরাসায় নৈশ প্রহরীর চাকরি করা মোস্তফা জানান, এখানে প্রবেশের একটি মাত্র গেট। পরীক্ষার্থী ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখিনি। তবে আগে থেকে মাদরাসার কয়েকটি কক্ষে কিছু পরীক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য রাত যাপন করেছেন বলে জানান মোস্তফা। এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হোছাইন কিছু জানেন না। ঘটনার সময় তিনি মাদরাসায় ছিলেন না বলেও দাবি করেছেন। 

১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় দুটি টিনশেড, তিনটি পাকা ভবন ও দোতলা একটি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। সাইক্লোন শেল্টারের দ্বিতীয় তলায় অধ্যক্ষের কক্ষ। ওই বিল্ডিংয়ে কোনো পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল না। শেল্টারের নিচে টিনশেড ঘরের আট নম্বর কক্ষে বসে নুসরাত পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে গিয়ে দেখা যায় এখনও নুসরাতের জামা-কাপড়ের আগুনে পোড়া অংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ছাদ থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে একেবারে নিচেও পাওয়া গেল ক্ষত চিহ্ন। পুরো ক্যাম্পাসের চারপাশ দেয়ালে ঘেরা। সামনে কলাপসিবল গেট। মূল গেট ব্যতীত অন্য কোনো জায়াগা দিয়ে প্রবেশ কিংবা বের হওয়ার সুযোগ নেই। মাদরাসার প্রবেশপথে ২০ বছর ধরে ব্যবসা করছেন সাইমুন স্টোর অ্যান্ড কুলিং কর্নারের মালিক আবুল কাশেম। তিনি জানান, নুসরাতের আগুনের ঘটনার পর মাদরাসার অধিকাংশ পরীক্ষার্থী রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। পরে শিক্ষকরা আবার তাদের কক্ষে ফিরিয়ে নেন। 

নুসরাতের মৃত্যুর পর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সিরাজের বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছেন। গতকাল মাদরাসা ক্যাম্পাসে দেখা হয় সোনাগাজী পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম খোকনের সঙ্গে। স্বার্থের কারণে স্থানীয় রাজনীতিকরা সবসময় সিরাজের পক্ষ নিয়েছেন- এ ব্যাপারে মন্তব্য জানতে চাইলে মাদরাসা অধ্যক্ষের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য পৌর মেয়র দায়ী করেন সাংবাদিকদের। তিনি বলেন, সোনাগাজীতে সাংবাদিকদের ছয়টি গ্রুপ আছে। কেউ কেউ অধ্যক্ষের অনিয়মকে সমর্থন দিয়েছেন। এখানে কিছু রাজনীতিবিদ জড়িত। তবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির দায় দল নেবে না। আমরা দলীয়ভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। 

২৭ মার্চ শ্লীলতাহানির ঘটনা শোনার পর তিনিই প্রথম থানায় গিয়েছেন বলে দাবি করেন মেয়র খোকন। এ ব্যাপারে তিনি ফেনীর সংসদ সদস্য নিজাম হাজারী ও পুলিশ সুপারকে অবহিত করার পর সিরাজ গ্রেফতার হয়েছেন বলেও জানান মেয়র। 

মাদরাসা সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বরে আরও এক ছাত্রী অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। তখন স্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু নেতা এবং প্রশাসনের সহায়তায় ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়। ওই ছাত্রী মাদরাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পি কে এনামুল করিমের কাছে অভিযোগ দিলে তিনিও কোনো ব্যবস্থা নেননি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল আহমেদের কাছে অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার পাননি ওই ছাত্রী। তবে নুসরাতের ঘটনার পর সেই ছাত্রীটি আবার জবানবন্দি দিয়েছেন পুলিশের কাছে।

ছেলেধরা গুজব রোধে পুলিশের সব ইউনিটকে সতর্ক থাকার নির্দেশ - dainik shiksha ছেলেধরা গুজব রোধে পুলিশের সব ইউনিটকে সতর্ক থাকার নির্দেশ এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ নিয়ে যা বললেন মাদরাসার ডিজি (ভিডিও) - dainik shiksha এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ নিয়ে যা বললেন মাদরাসার ডিজি (ভিডিও) ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকার দুই সিটির প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট নয় হাইকোর্ট, দুই প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে তলব - dainik shiksha ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকার দুই সিটির প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট নয় হাইকোর্ট, দুই প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে তলব এমপিওভুক্ত হচ্ছেন ৫ হাজার ২০৬ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন ৫ হাজার ২০৬ শিক্ষক স্কুলের জমি বেচে দিলেন সভাপতি - dainik shiksha স্কুলের জমি বেচে দিলেন সভাপতি ভিকারুননিসার ১৪ শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল হচ্ছে - dainik shiksha ভিকারুননিসার ১৪ শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল হচ্ছে ‘শিক্ষিত’ পরিচালনা পর্ষদ চায় শিক্ষা বোর্ড - dainik shiksha ‘শিক্ষিত’ পরিচালনা পর্ষদ চায় শিক্ষা বোর্ড বিএড স্কেল পাচ্ছেন ২৩৬ শিক্ষক - dainik shiksha বিএড স্কেল পাচ্ছেন ২৩৬ শিক্ষক ভর্তি কোচিং নিয়ে যা বললেন শিক্ষামন্ত্রী (ভিডিও) - dainik shiksha ভর্তি কোচিং নিয়ে যা বললেন শিক্ষামন্ত্রী (ভিডিও) ১৬তম শিক্ষক নিবন্ধনের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতি - dainik shiksha ১৬তম শিক্ষক নিবন্ধনের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতি শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website