অবনতিশীল ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক - মতামত - Dainikshiksha

অবনতিশীল ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু |

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালীন কোনো এক শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ে কবি কাজী কাদের নেওয়াজ রচিত ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ নামক একটি কবিতা পড়েছিলাম। কবিতাটির বিষয়বস্তু ছিল এরকম : দিল্লির এক মৌলভী (শিক্ষক) বাদশাহ আলমগীরের পুত্রকে পড়াতেন। একদিন প্রভাতে বাদশাহ লক্ষ করলেন, তার পুত্র ওই শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালছেন আর শিক্ষক তার পা নিজেই পরিষ্কার করছেন। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর বাদশাহ দূত মারফত ওই শিক্ষককে কেল্লাতে ডেকে নিয়ে যান। তারপর বাদশাহ ওই শিক্ষককে বলেন, ‘আমার পুত্র আপনার কাছ থেকে সৌজন্য না শিখে বেয়াদবি আর গুরুজনের প্রতি অবহেলা করা শিখেছে। কারণ, সেদিন প্রভাতে দেখলাম, আমার পুত্র শুধু আপনার পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে আর আপনি নিজেই আপনার পা পরিষ্কার করছেন। আমার পুত্র কেন পানি ঢালার পাশাপাশি আপনার পা ধুয়ে দিল না- এ কথা স্মরণ করলে মনে ব্যথা পাই।’ বাদশাহর মুখে এ কথা শোনার পর ওই শিক্ষক অত্যন্ত উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘আজ হতে চির উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির; সত্যিই তুমি মহান, উদার, বাদশাহ্ আলমগীর।’

আগের যুগে সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা যে কত উঁচুমানের ও সম্মানের ছিল, তা ওই কবিতাটির মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিছুকাল আগেও দেশে ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতাটিকে অভিভাবকরা ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের আদর্শ রূপ বলে মনে করতেন। আর এখনকার দিনে শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষকের ওপর হামলা চালানো, তাদের হুমকি প্রদান ও লাঞ্ছনা করার ঘটনা যেন নিত্য-নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার আমাদের সমাজের সব শিক্ষকই যে ধোয়া তুলসি পাতা, তাও নয়। অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধেই অনিয়ম-দুর্নীতি, যৌন হয়রানি, ক্লাসে সঠিকভাবে না পড়িয়ে প্রাইভেট বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকা, নিয়মিতভাবে ক্লাস না নেয়া, সঠিক সময়ে খাতা না দেখা ও রেজাল্ট প্রকাশ না করে শিক্ষার্থীদের সেশনজটে ফেলানো, মাদক গ্রহণ, শিক্ষার্থীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা, রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন বিনাশ করাসহ নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পরস্পরের প্রতি এ ধরনের আচরণ নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক আর এ লজ্জা যে গোটা জাতির, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমাদের দেশে একটা সময় যখন শিক্ষকদের বেতন খুবই কম ছিল, তখন শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা আসত না বললেই চলে। তখন একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিল : ‘যার নাই কোনো গতি, তিনি করেন পণ্ডিতি’। তবে শিক্ষকতা সম্মানিত পেশা হওয়ায় সেবার ব্রত নিয়ে অনেকে এ পেশায় আসতেন, যারা টাকা উপার্জনকে গুরুত্ব না দিয়ে সমাজের মর্যাদাসম্পন্ন পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নিতেন। একটা সময় মহৎ পেশা হিসেবে গর্ব করে বলা হতো, আমি শিক্ষকতা করি। এখনও সবচেয়ে সম্মানের পেশা শিক্ষকতা হলেও এ পেশাটাকে কিছুসংখ্যক সুবিধাভোগী শিক্ষক নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে এ মহৎ পেশার গায়ে কালি লেপন করছেন, যা মোটেই কাম্য নয়।

সদাচরণ, গুরুভক্তি, বড়দের সম্মান করা ইত্যাদি বিষয় একটা সময় আদর্শ ছাত্রের বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু আজ বাস্তবতা ভিন্ন। এ জন্য অবশ্য অনেক শিক্ষকও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী। যখন কোনো শিক্ষক পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের নকল সরবরাহ করেন, তখন ছাত্রছাত্রীদের কাছে ওই শিক্ষকের মর্যাদা থাকে না। আজকাল ইন্টারনেট, ফেসবুক, মাদক, ইভটিজিং ইত্যাদি বিষয় শিক্ষার্থীসহ কিশোর ও যুবসমাজকে কলুষিত করছে। ফলে নীতি-নৈতিকতা যেন ছাত্রজীবন থেকে বিলীন হতে চলেছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেমেয়ের হাতে পিতা-মাতার নির্যাতনের শিকার হওয়া (এমনকি খুন পর্যন্ত হওয়া। যেমন : ঐশী), ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় শিক্ষককে নির্যাতন করা, নানাভাবে নাজেহাল করার মতো ঘটনাও এখন ঘটছে। বর্তমানে সমাজব্যবস্থা এতটাই পাল্টেছে যে, প্রায়ই শিক্ষকদের অপমান করে একশ্রেণীর শিক্ষার্থী (বিশেষ করে যারা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত) নিজেদের হিরো মনে করেন।

বলা বাহুল্য, এ দেশে অনেক শিক্ষক হত্যা হওয়াসহ অনেকবার শিক্ষকদের ওপর হামলা চালানো ও তাদেরকে বারবার লাঞ্ছনার শিকার হতে হলেও এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ ঘটনারই বিচার হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বাসে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ককটেল হামলা চালিয়ে ১২ জন শিক্ষককে আহত করার ঘটনা; ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের ‘বহিরাগত’ কর্মীর হামলায় দুই শিক্ষক আহত হওয়ার ঘটনা; এর একদিন পর ১২ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নামধারীরা বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে ফিল্মি-স্টাইলে শিক্ষক লাউঞ্জে ঢুকে ইট-পাটকেল ছুড়ে ২০ জন শিক্ষককে আহত করার ঘটনা ইত্যাদি। শুধু শিক্ষক লাঞ্ছনাই নয়, শিক্ষকদের হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করা হয় না। যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে গত এক যুগে চারজন শিক্ষককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং এসব হত্যাকাণ্ডের বেশ কয়েকটির সঙ্গে ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই কতিপয় শিক্ষার্থীর যোগসাজশ ছিল, যা আদালতের মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে এডুকেশন ওয়াচ ২০১৭-এর রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী এখন আর শিক্ষকদের আদর্শ মনে করে না।’ প্রকাশিত ওই রিপোর্ট থেকে জানা যায়, এখানে মতামত শুধু শিক্ষার্থীরাই দেননি, মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে যুক্ত ছিলেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবক এবং অনেক শিক্ষকও। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক নিয়ে এ ধরনের গবেষণা এবং রিপোর্ট আমাদের দেশের শিক্ষাপদ্ধতি এবং শিক্ষাব্যবস্থা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে আমাদের দেশে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বিষয়ে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। সত্যি বলতে কি, এখনকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীই শিক্ষকদের আদেশ-উপদেশ পূর্ববর্তী সময়ের মতো মেনে চলেন না, মেনে চলতে চান না। যদিও এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। এখনকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বেশি ক্লাস করতে বা বেশি পড়তে আগ্রহী নন। কম ক্লাস নেয়া, কম পড়ানো আর বেশি নম্বর দেয়া শিক্ষকরাই যেন আজ অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে ‘জনপ্রিয়’ শিক্ষক হয়ে উঠেছেন। যেসব শিক্ষক এ অবস্থার বিপরীতে চলেন, তারা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে হয়ে ওঠেন চরম যন্ত্রণাদায়ক এবং চরম অপছন্দের।

শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড। আর শিক্ষকদের বলা হয়, জাতি গঠনের কারিগর। তাহলে উপরোক্ত ঘটনাগুলো নিশ্চয় জাতির মেরুদণ্ড এবং জাতির কারিগরের ওপর চরম আঘাত। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে বিষয়গুলোকে চলতে দেয়া যায় না। এ বিষয়গুলো শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসিসহ সংশ্লিষ্ট সবারই গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। সবার স্মরণ রাখা প্রয়োজন, পৃথিবীতে যারা বিখ্যাত হয়েছেন, প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, যাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে (যেমন: অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস, প্লেটো প্রমুখ) তাদের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং শিক্ষাগুরুর (শিক্ষক) প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। এ কথা সত্য যে, এক প্রজন্ম থেকে আরেকটি প্রজন্মের মধ্যে ফারাক থাকবে এবং কথাবার্তায়, চিন্তাভাবনায়, চলনে-বলনে তার প্রকাশ ঘটবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের দেশে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই প্রজন্মেরই চলমান অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিজেদের সমালোচনার পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। কারণ, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যকার সুসম্পর্কই কেবল সারিয়ে তুলতে পারে আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার অসহনীয় ও অস্বস্তিকর বিষয়গুলোকে। পুরো ব্যবস্থাপনা পাল্টাতে হলে অবশ্যই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এখন থেকেই একসঙ্গে কাজ শুরু করতে হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য।

 

সৌজন্যে: যুগান্তর

প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ির জনবল কাঠামো নীতিমালা - dainik shiksha প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ির জনবল কাঠামো নীতিমালা ৩৩ মডেল মাদরাসা সরকারিকরণের দাবি - dainik shiksha ৩৩ মডেল মাদরাসা সরকারিকরণের দাবি অনার্স ভর্তির মেধা তালিকা প্রকাশ ২৭ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha অনার্স ভর্তির মেধা তালিকা প্রকাশ ২৭ সেপ্টেম্বর বিএড স্কেল পাচ্ছেন ১৪০৯ শিক্ষক - dainik shiksha বিএড স্কেল পাচ্ছেন ১৪০৯ শিক্ষক ফাজিল ডিগ্রিবিহীন ধর্ম শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত - dainik shiksha ফাজিল ডিগ্রিবিহীন ধর্ম শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত দাখিল পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন নবায়নের বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha দাখিল পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন নবায়নের বিজ্ঞপ্তি আলিমের নম্বর বণ্টন প্রকাশ - dainik shiksha আলিমের নম্বর বণ্টন প্রকাশ দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website