অভিন্ন নীতিমালা ও উচ্চশিক্ষা কমিশন - মতামত - Dainikshiksha

অভিন্ন নীতিমালা ও উচ্চশিক্ষা কমিশন

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান |

ইউজিসি বদলে হচ্ছে 'উচ্চশিক্ষা কমিশন'- এ শিরোনামে ২৬ আগস্ট প্রথম পাতায় খবর দিয়েছে সমকাল। দেরিতে হলেও উচ্চশিক্ষার জন্য এটি শুভ সংবাদ। কারণ উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, প্রচলিত একাডেমিক ব্যবস্থার উৎকর্ষ সাধন, গবেষণার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার আবহ আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃতির লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তরের বড় বেশি প্রয়োজন এখন। দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে গতিশীল, সময়োপযোগী, বিদ্যমান আইন পরিবর্তন-পরিবর্ধন, মানসম্মত একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত করার জন্য উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের অপরিহার্যতা এখন সময়ের দাবি। 

দুই. বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদোন্নয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নীতিমালা প্রচলিত রয়েছে। 'জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫' বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একটি যুগোপযোগী অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে সুপারিশ দিতে কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোলল্গাকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ১৪৮তম সভায় সুপারিশকৃত নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। উলেল্গখ্য, ১৯৯৩, ২০০২, ২০০৪ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে ২০০৭ সালে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশে পরম সৌভাগ্য যে, পিএইচডি ছাড়াই অনায়াসে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারি, যা বিশ্বের অধিকাংশ দেশে কল্পনার বাইরে। 

তিন. মসজিদের ইমাম, মন্দির, গির্জা কিংবা প্যাগোডার পুরোহিত হতে গেলে যেমন বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে হয়, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে গেলে অবশ্যই বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মেধাবী মানুষ দরকার, যারা শিক্ষা নিয়ে খেলতে পারে, খেলাতে পারে এবং মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাঠদানকে মোহনীয় করে রাখতে পারে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা যাচাইয়ের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরীক্ষা প্রাথমিক বিদ্যালয় (লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ), মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি কলেজগুলোতে (নিবন্ধন-শিক্ষার্থীর এমসিকিউ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ) এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি কলেজগুলোতে (বিসিএসের মাধ্যমে) থাকলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (শুধু মৌখিক পরীক্ষা) নেই। বর্তমানে শুধু মৌখিক পরীক্ষা মেধা যাচাইয়ের জন্য যথেষ্ট কিনা, তা গভীরভাবে ভাবতে হবে। জ্ঞানের আকাশে উন্মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়তে শিখছেন না শিক্ষার্থীরা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিক্ষা দেওয়া ও নেওয়ার সেই কালজয়ী শিক্ষক যেমন তৈরি হওয়ার সুযোগ নষ্ট হচ্ছে, তেমনি একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা অনায়াসে পথভ্রষ্ট ও বঞ্চিত হচ্ছে। সততা, মানবতা, নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন, ভ্রাতৃত্ববোধ, সামাজিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ, দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের যে ঘাটতি নিয়ে বর্তমান প্রজন্ম বড় হচ্ছে এবং যেভাবে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণগুলো বিকশিত না হয়ে চরম বিপর্যস্ত হচ্ছে, তার দায় যেমন পরিবারের, শিক্ষা ব্যবস্থার, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সে দায় এড়াতে পারে না। 

চার. বর্তমানে ঢাকা, জগন্নাথ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত যে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা রয়েছে, তা সময়ের প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য বলা যায়। উলেল্গখ্য, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সব পর্যায়ের ফলে বাধ্যতামূলক একটি সুনির্দিষ্ট বিভাগ-সিজিপিএ-শ্রেণি থাকা লাগে। না থাকলে আবেদন করা যায় না। মজার ব্যাপার হলো, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা আবেদন করতে পারেন না, তারা সহজেই অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আইন প্রণয়ন, সংবিধান সংশোধন কিংবা সরকারের সব ধরনের কর্মকাণ্ডের আলোচনা-সমালোচনার জন্য জাতীয় সংসদ; সংবিধান রক্ষা, ব্যাখ্যা ও বিচারের জন্য সুপ্রিম কোর্ট থাকলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের গতিবিধি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও পরিশীলনের জন্য প্রকৃত প্রস্তাবে তেমন কোনো কাঠামো নেই। আইনগতভাবে সমস্যা থাকায় ইউজিসি শুধু অনুরোধ, সুপারিশ করতে পারে। এর বেশি কিছু করতে পারে না। করতে গেলে স্বায়ত্তশাসনের অজুহাত ওঠে। তাহলে স্বায়ত্তশাসন পরিশীলনের কোনো চাবিকাঠি কি কারও কাছেই থাকবে না? আর তাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিচালনা ও সহযোগিতার জন্য যুগোপযোগী আইন সংবলিত মেধাবী, দক্ষ, গবেষক এবং সুশিক্ষিত জনবল দ্বারা আমলাতন্ত্রের প্রভাবমুক্ত ইউজিসিকে 'উচ্চশিক্ষা কমিশনে' রূপান্তরের বিকল্প নেই। 

পাঁচ. এটি ধ্রুব সত্য যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে না পারায় এবং রাজনৈতিক চাপে প্রায়ই নিরপেক্ষতা ও মেধা উপেক্ষিত হয়েছে। একজন শিক্ষকের বিষয়গত জ্ঞান, পারদর্শিতা, দক্ষতা; প্রশ্নোত্তর, যুক্তি প্রদান ও খণ্ডনে সক্ষমতা; ভাষাগত দক্ষতা, উপস্থাপনা ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো পরীক্ষণ-নিরীক্ষণের এবং যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। লিখিত পরীক্ষা প্রসঙ্গে যারা অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলেন, তাদের মনে রাখা উচিত, ওই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চয় আমাদের মতো নয় এবং পিএইচডি ছাড়া কল্পনা করা যায় কি? স্বায়ত্তশাসনের অজুহাতে রাষ্ট্র যাকে-তাকে শিক্ষক হিসেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষে প্রবেশাধিকার দিতে পারে না। 

ছয়. সমাজের 'এত পড়ালেখা করে মাস্টার হয়েছ?' এ ধারণা পরিবর্তন করতে পারেনি রাষ্ট্র। উদারতার অভাব পরিলক্ষিত হওয়ায়, শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষাঙ্গনকে আকর্ষণীয় করতে না পারায় সত্যিকারের মেধাবীরা আজ শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট হচ্ছেন না। পরিবর্তিত অবস্থার মধ্যে আকর্ষণ বা প্রণোদনা না থাকলে, বিদ্যমান অবস্থার চেয়ে উন্নত অবস্থায় উত্তরণের সুযোগ না থাকলে কেউই তার বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন চায় না। শিক্ষকদের চাওয়া-পাওয়া আকাশ ছোঁয়া নয়। অল্পতে পরিতৃপ্ত ও সন্তুষ্ট শিক্ষক সমাজের ন্যায্য, মানবিক ও কাঙ্ক্ষিত অধিকারগুলোর প্রাপ্তির ব্যবস্থা রেখেই অতিদ্রুত নীতিমালা বাস্তবায়ন করুন। কেননা, নিয়োগের জন্য একজন ভুল শিক্ষক নির্বাচনের অর্থ হলো, কমপক্ষে ৩৫-৪০ বছরের জন্য হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেওয়া। তবে লক্ষ্য রাখা দরকার, প্রণয়নের জন্য প্রস্তুতকৃত অভিন্ন নীতিমালার নেতিবাচক কোনো প্রভাব কোনোভাবেই যেন শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষার্থী এবং সর্বোপরি কায়ক্লেশে জীবনযাপন করা অবহেলিত শিক্ষক সমাজের ওপর না পড়ে। 

সাত. সার্বিক উন্নয়নের জন্য কিছু সুপারিশ বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন- ক. অভিন্ন নীতিমালা এবং 'উচ্চশিক্ষা কমিশন বিল' সংসদের মাধ্যমে পাস করিয়ে আইনে রূপান্তর করে নেওয়া যেতে পারে; খ. সব পর্যায়ের (এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর) ফলে বাধ্যতামূলক একটি সুনির্দিষ্ট বিভাগ-সিজিপিএ-শ্রেণি, সংশ্লিষ্ট পঠিত বিষয়ের উলেল্গখসহ কোনোভাবেই মেধাক্রমের শর্ত প্রথম থেকে সপ্তম যেন উঠিয়ে না দেওয়া হয়; গ. শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন, অসদাচরণ এবং মানোন্নয়ন পরীক্ষার মাধ্যমে ফলাফল অর্জিত কিনা এ বিষয়গুলো গুরুত্ব ও সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন; ঘ. এমফিল, পিএইচডি এবং পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের জন্য প্রথম শ্রেণি বা অন্য কোনো শর্ত শিথিলযোগ্য যেন না হয়; ঙ. সংরক্ষিত কোটার ব্যাপারে নীতিমালায় স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতা থাকা দরকার। বিশেষ করে প্রথম থেকে সপ্তম মেধাক্রমের মধ্যে থাকবে, নাকি আবেদন করার যোগ্যতা থাকলেই হবে; চ. মানসম্মত গবেষণায় অধিক জোর এবং স্বীকৃত জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বাধ্যবাধকতা করা দরকার। অনুষদ অনুযায়ী স্বীকৃত জার্নাল বলতে কোনগুলোকে বোঝাবে, তার একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। গবেষণা প্রবন্ধ, একাডেমিক পুস্তক প্রকাশের সঙ্গে রেয়াত ও আর্থিক প্রণোদনার বিষয়টির সংযোগ থাকা মানবীয় ও বিজ্ঞানসম্মত হবে; ছ. পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের সময়কাল অবশ্যই সক্রিয় চাকরির (অবৈতনিক) অভিজ্ঞতা হিসেবে গণ্য করা প্রয়োজন এবং জ্যৈষ্ঠতা লঙ্ঘনের সম্ভাবনার কোনো ক্ষেত্র যেন তৈরি না হয়; জ. পদোন্নতির সঙ্গে শূন্য পদ থাকা না থাকা মানদণ্ড অমানবিক; ঝ. পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় করার জন্য বিশেষ প্রণোদনাসহ শিক্ষা খাতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি, স্বতন্ত্র বেতন স্কেল, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, আবাসন ও পরিবহন ব্যবস্থার সংকট দূর করা, সহজ শর্তে বাড়ি-গাড়ি ঋণ সুবিধা, কল্যাণ তহবিলের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, সেশন বেনিফিট পুনরায় চালু করা যেতে পারে। 

লেখক: পিএইচডি গবেষক, জেঝিয়াং ইউনিভার্সিটি চীন এবং শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

সূত্র: সমকাল

সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর - dainik shiksha সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু - dainik shiksha অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে - dainik shiksha ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ - dainik shiksha দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website