অমর্ত্য সেনের ভাবনায়; উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষার উপকরণ কেন পুনঃবণ্টন জরুরি? - মতামত - Dainikshiksha

অমর্ত্য সেনের ভাবনায়; উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষার উপকরণ কেন পুনঃবণ্টন জরুরি?

মো. নাদিমুদ্দীন |

প্রত্যেক বছর জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়টাতে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ ১২ বছর পড়াশোনা করার পর, এইচএসসি পরীক্ষার স্বীকৃতি জীবনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলকে মূল্য দেয়া হয়। তাই এ নিয়ে আগ্রহ বেশিই থাকে সব ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের মনে। পত্রিকা ও টিভিতে সে সব সফল ছাত্রছাত্রীদের ছবি ও ভিডিও দেখলে মন ভরে উঠে, তেমনি আবার অনেকের দুঃখ দেখে বিষাদে আন্দোলিত হয়ে উঠে বুক। কিন্তু তবুও চলতে থাকে তাদের পথচলা কারণ এই পরীক্ষা তাদের শেষ পরীক্ষা নয়। যারা সফল হয়েছে তারা চেষ্টা করে যাতে এই সফলতার পথ ধরে জীবনের সামনের দিনগুলোতে নিজেকে আরও কীভাবে সমৃদ্ধ করা যায়। আর যারা আশানুরূপ ফলাফল করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা বোধ হয় সামনের দিনগুলোতে ভালোভাবে উতরানোর জন্য প্রয়াস সঞ্চয় করে যাচ্ছে।

প্রত্যেকটা বছরের মতো এবারও মফস্বলের পরীক্ষার্থীদের ফলাফল তুলনামূলক শহরাঞ্চলের চেয়ে খারাপ হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থী যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পায় মফস্বলে সেটা অনেকটা অনুপস্থিত। যেমন, দক্ষ শিক্ষক, শিক্ষার উপকরণ, আইসিটি ল্যাব এবং অন্যসব প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী। বর্তমান বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষার সুষম বণ্টন করা অপরিহার্য। মফস্বলের শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে না পারলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কখনো সম্ভব না। এখন দেখা যাক, কেন মফস্বলেরর শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকটা পাবলিক পরীক্ষা তুলনামূলক খারাপ ফলাফল করে? সেটার খোঁজে আমরা অমর্ত্য সেনের উন্নয়নের মাপকাঠি, সক্ষমতা এবং স্বাধীনতার’র ধারণা থেকে সহায়তা নিতে পারি।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন উন্নয়ন বা ডেভেলপমেন্ট ধারণাটিকে অনেকের চেয়ে আলাদাভাবে সামনে নিয়ে আসলেন। তিনি বললেন, উন্নয়ন শুধু দেশের উৎপাদিত সম্পদেও মূল্য’ দিয়ে পরিমাপ করলে হবে না। অর্থাৎ মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি দিয়ে একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির পরিমাপ করা গেলেও দেশের উন্নয়ন হয়েছে কিনা তা বলা যায় না। উন্নয়নকে বিবেচনা করতে হবে ব্যক্তির নিজস্ব স্বাধীনতা (freedom) এবং চয়নের (choice) জায়গা থেকে; তবে সেটা অবশ্যই সক্ষমতার (capability) ভেতরে থাকতে হবে। অর্থ্যাৎ উন্নয়ন বলতে তিনি এক অর্থে বুঝাচ্ছেন মানুষের বিভিন্ন প্রকার স্বাধীনতাকে সম্প্রসারণ করা। সেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার দিক হচ্ছে সক্ষমতা। মানুষ তার সুপ্ত সম্ভাবনাকে প্রস্ফুটিত করতে পারছে কিনা অর্থ্যাৎ মানুষের কাছে এখন কি আছে সেটা সক্ষমতা নয়, সে আসলে ‘কি’ এবং ‘কী’ হতে চায় সেটাই সক্ষমতা। এই সক্ষমতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা। অর্থাৎ পণ্যেও বা সেবার বেশিষ্ট্যগুলো কেমন তার ওপর ব্যক্তির সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করে। যেমন যদি একজন বিজ্ঞানী হতে চায় তাহলে দেখতে হবে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য আর সুযোগে (opportunity) থাকা পণ্য বা শিক্ষার উপকরণের বৈশিষ্ট্যগুলো কেমন? যদি ভালো বিজ্ঞান শিক্ষক থাকে এবং বিজ্ঞান শিখার জন্য ভালো স্কুল, কলেজ এবং ল্যাব থাকে তাহলে সে ভবিষ্যৎ নামকরা বিজ্ঞানী হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে। আবার ঠিক একইভাবে একটির পণ্য বা সেবা কী ধরনের সক্ষমতা সৃষ্টি করে তা নির্ভর করে ব্যবহারকারী ব্যক্তি ও সমাজের প্রেক্ষিতের উপর। যেমন, নিরক্ষর মানুষের কাছে একটি বই যতটুকু কল্যাণ দিবে তার চাইতে বেশি কল্যাণ পাবে একজন সাক্ষর-জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ।

সুতরাং একজন মানুষ হিসেবে সে কেমন এবং তার সমাজটি তাকে কি সুযোগ দেয় সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তার সুযোগে থাকা পণ্য সমূহের বৈশিষ্ট্য কেমন? আর অমর্ত্য সেন এর নাম দিয়েছেন ‘ফাংশনিং’ বা কার্যকারিতা। আর এই ‘ফাংশনিং’ যত বাড়তে থাকে ব্যক্তির স্বাধীনতা ততই বাড়তে থাকে। অর্থাৎ ব্যক্তি তার জীবন গড়ার জন্য বিকল্প অনেক লক্ষ্য বা সেট তৈরি করবে সেখান থেকে সর্বাপেক্ষা কাম্যটিকে (চয়নের মাধ্যমে ) গ্রহণ করবে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি যত বেশি তার এই স্বাধীনতাকে সম্প্রসারণ করতে পারবে তখন তাকে ‘উন্নয়ন’ বলা যাবে অন্যথায় নয়।

শিক্ষা যেহেতু উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেহেতু আমাদের দেখতে হবে মফস্বলেও শিক্ষার উপকরণের বৈশিষ্ট্য সমূহ কেমন এবং সামাজ ও রাষ্ট্র ছাত্রদের কি ধরনের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে? প্রতি বছরের মতো এবারও খারাপ ফলাফলের কারণ হিসেবে ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞানে ও আইসিটিতে খারাপ ফলাফলকে দায়ী করা হচ্ছে। আটটি শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত ২০১৮ সালের এইচএসসি ফলাফলের উপাত্ত থেকে জানা যায়, মোট ১১.৬৩ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৮.০১ লাখ অর্থাৎ পাস করেছে ৬৬.৮৪ শতাংশ যা গত বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ কম এবং জিপিএ পাঁচ এর সংখ্যা ২০০০ জন হ্রাস পেয়েছে। উপরন্তু শুধু ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে ২.৭১ লাখ পরীক্ষার্থী। মফস্বল এবং শহরের ফলাফলের মধ্যকার পার্থক্য তুলনামূলক অসম। পুরো কুমিল্লা বোর্ডে জিপিএ পাঁচ সংখ্যা যেখানে মাত্র ৬৭৮ জন সেখানে শুধু ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে জিপিএ পাঁচ পেয়েছে ১১২১ জন। এহেন খারাপ ফলাফলের কারণে মফস্ববলের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গ্রামের বিজ্ঞান শিক্ষার অবস্থা দিনদিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। একই তো বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি বর্তমান ছাত্রদের ভয় তার উপরে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব এবং আইসিটি ল্যাব না থাকার কারণে গ্রামের ছাত্ররা ফলাফল খারাপ করছে। তদুপরি একটি উন্নয়নমুখী শিক্ষিত জাতি গড়ে তুলতে হলে সর্বস্তরে শিক্ষার মান সমুন্নত করতে হবে। সেইজন্য প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষার মান উন্নত করনে শিক্ষার উপকরণ এবং সেবার উপর সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের নজর দিতে হবে। কারণ ‘শিক্ষার উন্নয়নের স্বার্থে তার উপকরণের যথাযথ পুনঃবণ্টন করা অবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামের দক্ষতা সম্পন্ন শিক্ষকের পাশাপাশি শিক্ষার উপকরণ যেমন মানসম্মত স্কুল, কলেজ ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে একই সঙ্গে শিক্ষার উপকরণের কাম্য ব্যবহারে নিশ্চয়তাসহ ভাল মানের সেবা প্রয়োজন অনুযায়ী পৌঁছিয়ে দিতে হবে। যেমন শিক্ষার কাঠামো গুলো এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে শিক্ষার ব্যয়ভার তাদের জন্য প্রতিবন্ধক না হতে পারে এবং ক্লাসের মান বাড়াতে হবে যাতে করে কোচিং এর প্রয়োজন না পড়ে। এক্ষেত্রে সরকারের শিক্ষাভাতা, ব্যাংকের মেধাবৃত্তি এবং বিভিন্ন এনজির # ৩৯;র কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। তাহলে ছাত্রদেও সুযোগ বাড়বে এবং স্বাধীনতা বাড়াবে’ যা তাদেরকে এবং দেশকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাবে।

এবার দেখা যাক সমাজ ও রাষ্ট্র ছাত্রদের জন্য তৈরি কৃত শিক্ষার উপকরণ কেমন কাজে লাগছে। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষা শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আজকের পৃথিবীতে যে রাষ্ট্রগুলো উন্নয়নের চরম শিখরে পৌঁছেছে তারা সবক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তি দেখিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানের প্রচুর ঘাটতি। এবার তত্ত্ব রেখে উপাত্তে ফিরে আসি। দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে সম্প্রতি বিআইডিএসের একটি সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। অর্থনীতির তিন খাতের মধ্যে শ্রমশক্তির ৪২ ভাগের অধিক কৃষি খাতে কর্মরত, অথচ জিডিপিতে এই খাতের অবদান দিনকে দিন কমছে। কৃষির মধ্যে আবার প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে সবচেয়ে বেশি দক্ষতার অভাব রয়েছে। জিডিপিতে শিল্প খাতের মোট অবদানের প্রায় ২৫

শতাংশ আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে, এই পোশাক খাতেই দক্ষতার অভাবের সূচকে দ্বিতীয়। মোটের ওপর আমাদের দেশের শ্রমশক্তির মধ্যে মারাত্মক রকমের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে এগিয়ে থাকা অন্যান্য খাত হলো কেমিক্যাল, রাবার ও প্লাস্টিক (সম্মিলিত), খনিজ শিল্প, চামড়া ও চামড়াজাত শিল্প (সম্মিলিত)। এখন প্রশ্ন হলো, আমার শিক্ষা কি উক্ত খাতগুলোর জন্য দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ করতে পারছে কিংবা তরুণদের পছন্দের তালিকায় কি উক্ত খাতগুলো আছে? তরুণদের পছন্দের তালিকায় আছে অর্থনীতির ৩ শতাংশ দখল করে রাখা জনপ্রশাসন ও সামরিক খাত। এছাড়া মফস্বল শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে যেমন তথ্য ও স্বাধীনতা কম সে ক্ষেত্র তারা কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে আরো পিছিয়ে আছে। যার ফলশ্রুতিতে এ বছর এইচএসসিতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার কমার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীরা কারিগরি জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। অর্থাৎ শহরাঞ্চলে শিক্ষার কারিগরি উপকরণ থাকা সত্ত্বেও ছাত্রছাত্রীরা প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞান গ্রহণ করছে না যেটা এক অর্থে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। সেক্ষেত্রে মফস্বলে শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারলে এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মফস্বলে গড়ে তুলতে পারলে এটি দেশের উন্নয়নের জন্য ভাল ফলাফল বয়ে আনতে পারবে।

সর্বোপরি একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের উন্নয়নের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রযুক্তির জ্ঞান সমৃদ্ধ কিছু মানুষ তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে সকল স্তরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে যেমন শিক্ষার উপকরণের যথাযথ পুনঃবণ্টন করতে হবে এবং কারিগরি শিক্ষার প্রতি আরো আগ্রহী করে তুলতে হবে। কাজেই মানুষের সক্ষমতা বাড়বে এবং ব্যক্তি, সমাজ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্র উপকৃত হবে।

[লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]

সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর - dainik shiksha সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু - dainik shiksha অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে - dainik shiksha ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ - dainik shiksha দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website