অরিত্রিকে ক্ষমাও করা যেত - মতামত - Dainikshiksha

অরিত্রিকে ক্ষমাও করা যেত

অলোক আচার্য |

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ছাত্রী অরিত্রি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করায় তাকে এবং তার সামনে তার বাবাকে অপমানজনক কথা বলার জন্য অভিমান করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। মেয়েটি একটি অপরাধ করেছে এটা যেমন ঠিক, তেমনি এই অপরাধের জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের নেয়া সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিপূর্ণ সেটা ভাববার বিষয়। তাছাড়া তাকে প্রথম এরকম একটি ভুলের জন্য ক্ষমা করা যেত। অন্তত লঘু কোন শাস্তি দেয়া যেত। কারণ অরিত্রি শিক্ষকের পা ধরে তার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। এমনকি তার বাবাও ক্ষমা চেয়েছে মেয়ের ভুলের জন্য্য। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষের মন গলেনি। মেয়েটার মানসিক বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে তারা হয়তো রেপুটেশনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অরিত্রির মতো এই ভুল কেউ যাতে আর না করে তা দেখাতে চেয়েছে। শুধু মেয়েটাকেই কেউ বুঝতে চায়নি। তাকে স্কুল থেকে টিসি দেয়ার মত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। স্কুলের ডিসিপ্লিন ভঙ্গ করলে শাস্তি হবে, কিন্তু কোন কাজের জন্য কোন শাস্তি দেয়া উচিত তা প্রয়োগের আগে আরও ভাবতে হবে। কারণ সে শাস্তি কাকে দেয়া হচ্ছে বা সে ভুল সহজেই যদি সংশোধন করা যায়, তাহলে বড় শাস্তির কী দরকার? অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে লঘু কোন দণ্ড দিয়ে আরেকটা সুযোগ দেয়া যেত। এমন হতে পারত মেয়েটি জীবনে নিজেকে শুধরে নিত। কিন্তু এসব বলে আর লাভ নেই। মেয়েটি ভুল শোধরানোর জন্য আমাদের মাঝে নেই। সবার মাথায় প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে যে, একটা মেয়েকে কতটা মানসিক যন্ত্রণা পেলে আত্মহননের মত সিদ্ধান্ত নেয়। স্কুলে যারা ছাত্রজীবন পার করে তারা শিশু, আর শিশুদের সাথে কর্তৃপক্ষের আচরণে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। এই বয়সে তাদের মন অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হয় এবং ছোটখাটো অনেক বিষয়ও প্রতিক্রিয়া করে। তাদের অভিমান বা রাগ বেশি হতে পারে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অরিত্রির মত অনভিপ্রেত সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয় না। [insida-ad]

আমরা বড়রা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি। যেমনটা নিতে পারতেন অরিত্রির শিক্ষকরা। এমন কারণ তো অবশ্য্ই ঘটেছে, যা অরিত্রির মনকে মারাত্বক আঘাত করেছে। কারণ তাদের এই একটা সিদ্ধান্ত বা আচরণ অরিত্রিকে আত্মহত্যার মত সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আমরা যেটুকু জানতে পারি তা হলো, মোবাইল ফোন ব্যাবহার করে পরীক্ষায় নকল করার অপরাধে স্কুল কর্তৃপক্ষ অরিত্রির বাবাকে ডেকে পাঠায় এবং তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করার হুমকিসহ নানা অপমানজনক কথাবার্তা বলে। বিষয়টি অরিত্রি সহ্য করতে পারেনি এবং সে তার বাবার এই অপমানের জন্য নিজেকেই দায়ী মনে করে। যতটুকু বুঝতে পারি, বিষয়টিতে সে আত্মগ্লানিতে ভোগে। সেই আত্মগ্লানি থেকে আত্মহত্যার মত সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত নেয়। এসময় তার এতদিনের পরিচিত শিক্ষকদের সম্পর্কে বহু স্মৃতি মনে আসছিল এবং আমার মনে হয় এক ধরনের অভিমান তার মনে জমা হয়েছিল। কারণ শিক্ষকদের সাথে ছাত্রছাত্রীর অনেক অনেক চমৎকার সময় কাটে। তার ছোট্র এই ভুলের কারণে যে তার বাবাকে অপমানিত হতে হবে বা তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হবে, তা হয়তো সে ভাবতে পারেনি। আবার এটাও হতে পারে, বিষয়টি এতদুর যেতে পারে এ নিয়ে অরিত্রি এতটা গভীরভাবে ভাবেইনি। কারণ অরিত্রির এই বয়সটা ঠিক গভীরতার বয়স না। এই বয়সটা আনন্দ আর উল্লাসের বয়স এবং ভুল করারও বয়স। অভিভাবক হিসেবে এটা আমরা সবাই জানি। এমনকি যারা অরিত্রিকে লেখাপড়া করিয়েছেন, তারাও জানে। অরিত্রি এই ভুল আগে কখনো করেনি এবং এটা ছিল তার প্রথম ভুল। পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করা যেহেতু অপরাধ, তাই অরিত্রিও অপরাধ করেছিল। কিন্তু তার মূল্যটা অনেক বেশি হয়ে গেল। সে তার অপরাধ সংশোধনের সুযোগটাই পেলো না। 


স্বাভাবিকবাভেই অরিত্রির মৃত্যুও ঘটনাটি তার সহপাঠীরা মেনে নিতে পারেনি। তারা এই ঘটনায় দোষীদের বিচার চেয়ে আন্দোলনে করেছে। এই ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে হাইকোর্ট থেকে শিক্ষামন্ত্রণালয়ে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অরিত্রির মৃত্যুর ঘটনাটি যদি আমরা একটু খতিয়ে দেখি, তাহলে বুঝতে পারব সেখানে তাকে লঘু অন্যায়ে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে। অরিত্রির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দেশের একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেখানে শৃঙ্খলা রক্ষায় আইন একটু কঠিন। কিন্তু ছোটখাটো ভুলের জন্য অরিত্রির মত কাউকে চূড়ান্ত শাস্তি দেয়াটা ঠিক শাস্তি দেয়ার মধ্যে পরে না। অরিত্রির ভুলটা ছিল এই বয়সী একটি শিশুর ভুল। স্বাভাবিকভাবেই মেয়েটিকে সতর্ক করা যেত অথবা তাকে নকল করার ক্ষতিকর দিক নিয়ে বোঝানো যেত। তাকে সে পরীক্ষা থেকে বাদ দিয়ে শাস্তি দেয়া যেত। সাধারণত এটাই অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটে। কিন্তু দেখা গেল মেয়েটির বাবাকে ডেকে আনা হয়েছে এবং মেয়েটির সামনেই বাবাকে অপমানসূচক কথা বলা হয়েছে। এটা নিশ্চয়ই মেয়েটির প্রাপ্য ছিল না। তার অপরাধের জন্য তারা বাবাকে কথা শুনতে হবে এটাই মেয়েটি মেনে নিতে পারেনি। এর সাথে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত। সব মিলিয়ে অরিত্রির মনের ওপর পাহাড়সম চাপ পড়েছিল, যা সহ্য করার ক্ষমতা তার ছিল না। অরিত্রির এ সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না। কিন্তু সময় ও পরিস্থিতি তার অনুকুলে ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই তার এ পরিণতিতে তার সহপাঠীরা অত্যন্ত মর্মাহত এবং ক্ষুব্ধ। আমি বিশ্বাস করি অরিত্রির মৃত্যুর জন্য তার শিক্ষকরাও অত্যন্ত মর্মাহত। কারণ শিক্ষক আর মা বাবা তো একই। তাই সম্পর্কটাও সেরকম হওয়া বাঞ্চনীয়। এই মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। এর পেছনে দোষী শিক্ষিকাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ। 


এ ঘটনাটি এখানেই হয়তো শেষ হয়ে যাবে। অরিত্রিকেও ভুলে যাবে সবাই। কিন্তু শিক্ষকদের দায়িত্ব এবং ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আচরণ আরো নমনীয় করতে হবে। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মাঝে যে ব্যবধান তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষক একজন সত্যিকারের জাদুকর যাদের থাকে সহজেই আকৃষ্ট করার ক্ষমতা। আবার একদিক থেকে শিক্ষকরা খুব সাধারণ একজন মানুষ যারা তৈরি করেন অসাধারণ সব মানুষ। শিক্ষা কোন পেশা নয় বরং একটি সেবা। সমাজে অনেক সেবামূলক কাজ রয়েছে। এর মধ্য শিক্ষা অন্যতম। শিক্ষা হচ্ছে একটি ব্রত। যে ব্রত দিয়ে তিনি তার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটান। শিক্ষকের এই কাজটির সফলতা ও ব্যর্থতার মধ্যে রয়েছে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। তবে বর্তমানে গুটিকয়েক শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে প্রায়ই এ পেশা সমালোচিত হয়। কিন্তু গুটি কয়েক উদাহরণ থেকে সার্বিক মূল্যায়ন করাটা বোকামি। শুধু পেশায় নিয়োজিত হলেই শিক্ষক হওয়া যায় না। শিক্ষক হতে হলে তার সম্পর্কিত গুণাবলিও অর্জন করতে হবে। শুধু পোশাকে বা পেশায় শিক্ষক হয়ে কী লাভ? বাবা মা যেমন সন্তানের বুকের ভেতর বেঁচে থাকে ঠিক তেমনি করেই শিক্ষক বেঁচে থাকেন তার শিক্ষার্থীর মধ্যে। আমার অনেক শিক্ষক যেমন আজও বেঁচে আছেন আমার মধ্যে। একজন শিক্ষার্থী শিক্ষক সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করার সুযোগই পাওয়া উচিত না।  অরিত্রির চলে যাওয়ার পর আমরা আমাদের ভুলগুলো বুঝতে পারছি। কিন্তু অরিত্রিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু অরিত্রির মত আর কাউকে যেন অভিমান করতে না হয়, সে বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।

 
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক,  পাবনা।
 

আগামী বছর সব স্কুলে একযোগে প্রাক প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ - dainik shiksha আগামী বছর সব স্কুলে একযোগে প্রাক প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ এক নজরে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার নম্বর বিভাজন - dainik shiksha এক নজরে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার নম্বর বিভাজন ভিকারুননিসার অডিট রিপোর্ট, শাখা খোলার কাগজপত্র চেয়েছে ঢাকা বোর্ড - dainik shiksha ভিকারুননিসার অডিট রিপোর্ট, শাখা খোলার কাগজপত্র চেয়েছে ঢাকা বোর্ড কে এই নাজনীন ফেরদৌস? - dainik shiksha কে এই নাজনীন ফেরদৌস? জাল সনদ বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ - dainik shiksha জাল সনদ বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষার ফল ২৪ ডিসেম্বর - dainik shiksha প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষার ফল ২৪ ডিসেম্বর নবসৃষ্ট পদে নিয়োগে ও ব্যয়ের তথ্য চেয়েছে মন্ত্রণালয় - dainik shiksha নবসৃষ্ট পদে নিয়োগে ও ব্যয়ের তথ্য চেয়েছে মন্ত্রণালয় বিজয় দিবসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মসূচি পালনে নির্দেশনা - dainik shiksha বিজয় দিবসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মসূচি পালনে নির্দেশনা স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ - dainik shiksha স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website