অরিত্রীদের বাঁচাতে একযোগে স্কুল-কলেজ সরকারি করতে হবে - মতামত - Dainikshiksha

অরিত্রীদের বাঁচাতে একযোগে স্কুল-কলেজ সরকারি করতে হবে

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

ডাকনাম অরিত্রী। পুরো নাম অরিত্রী অধিকারী। ঢাকার নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির হতভাগ্য এক কিশোরী শিক্ষার্থী। আত্মহত্যা করার পর এ মুহূর্তে নামটি সারা দেশে বহুল আলোচিত। তাকে নিয়ে বাবা-মা'র অনেক উচ্চাশা ও স্বপ্ন ছিল। এ লেখাটি যখন লিখতে বসেছি, তখন তাদের মনের অবস্থা কী রকম তা বলা সম্ভব হবে না। কেননা একমাত্র যারা অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নিজের সন্তান হারিয়েছেন, তারাই সন্তানহারা বাবা-মা'র মানসিক অবস্থা উপলব্ধি করতে পারেন। নিজেরা জীবিত থাকতে সন্তান হারানোর মত কষ্ট বাবা-মা'র কাছে পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। এটি বাবা-মা'র দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় কষ্ট। বলা হয়ে থাকে, বাবার কাঁধে মৃত সন্তানের লাশ পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জিনিস। অরিত্রীর পরিবারের অন্য সদস্যদের মনের অবস্থাই বা এখন কেমন? নিকটাত্মীয় ও পাড়া-প্রতিবেশীর মনের দুঃখটা কী রকম? সতীর্থ ও সহপাঠীদের প্রতিক্রিয়া মিডিয়ার সুবাদে জেনেছি ও দেখেছি। কেবল তারা কাঁদেনি, যারা তাদের চোখের পানি দেখেছে সকলেই অঝোরে কেঁদেছে। অরিত্রীর জন্য কারো মন ভাল থাকার কথা নয়। মিডিয়ার সুবাদে পৃথিবীর যে যেখান থেকে দেখেছে, সে সেখান থেকেই চোখের জল ফেলেছে। তার জন্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষই মনে বড় চোট্ পেয়েছে। আসলে মানুষের মনের প্রকৃত অবস্থা জানার, বোঝার কিংবা পরিমাপের কোন বাটখারা মনোবিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারেননি। 

 অরিত্রী অধিকারীকে নিয়ে লিখতে বসে তার বাবা-মা'র মত শিক্ষকদের কথা কেন জানি বেশি মনে পড়ছে। সব দোষ এখন তার শিক্ষকদের কাঁধে।  আজকাল এমন হয়েছে যে, আমরা সব বিষয়ে 'উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে' দিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত করে নেবার প্রয়াস পেয়ে থাকি। আরেকটা জিনিস হলো এই, শিক্ষায় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিছু ঘটলেই সর্বাগ্রে আমরা শিক্ষকদের দায়ী করি। আমি শিক্ষকদের সাফাই গাইতে চাই না। অরিত্রীর শিক্ষকরা যে নির্দোষ সে কথা আমি বলি না। মোবাইলে সামান্য টুকিটাকি লেখার জন্য বড়জোর তার কাছ থেকে মোবাইলটি নিয়ে জব্দ করা যেত। অভিভাবক ডেকে এনে সব কিছু বলে কয়ে মোবাইলটি ফেরত দেয়া যেত। তাকে সতর্ক করা যেত। বহিষ্কার করা অপরিহার্য ছিল না। বাবা-মা এসে ক্ষমা চাওয়ার পর আর কিছু থাকে না। আদর-সোহাগের স্বরে অরিত্রীকে দু' একটা ধমক দিয়ে সতর্ক করে পরীক্ষার হলে ফিরিয়ে দেয়া যেত। এ ক্ষেত্রে তার শিক্ষকরা মানবিকতা ও উদারতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

নিজের লজ্জা ও বাবা-মা'র অপমানের ক্ষোভে সে হয়ত আত্মহত্যা করেছে। আমাদের শিক্ষায় এটি নতুন কিছু নয়। স্কুল থেকে ফিরে কত অরিত্রী এভাবে কত জায়গায় আত্মহত্যা করছে, তার সব খবর কী আমরা পাই? তবে অরিত্রী নামের কিশোরী শিক্ষার্থীটির আত্মহত্যা বা অকাল মৃত্যুর জন্য কেবল শিক্ষকরাই দায়ী-এ কথাটি  মেনে নিতে পারি না। এ মৃত্যুর দায় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা-কেউ এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই। আমি তার শিক্ষকদের দায়মুক্তি দেই না কিংবা তাদের একমাত্র দায়ীও করি না। আমাদের যেন হয়েছে এই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা শিক্ষায় কিছু ঘটলেই সব দোষ শিক্ষকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা ভিজে বিড়াল সেজে যাই। শিক্ষক দায়ভার নেবেন ঠিকই। কিন্তু পুরোটা কেন? শিক্ষায় কেবল শিক্ষক একমাত্র নিয়ামক কিংবা মুখ্য নিয়ামক নন। অরিত্রীর আত্মহননের জন্য আমি সর্বপ্রথম আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ি করতে চাই। 

এর আগে অরিত্রীর শিক্ষকদের জন্য আলাদা করে সমবেদনা জানাই এ জন্যে যে, আজ তারা তাদের মনের ক্যাম্পাসে মেয়েটির শূন্যতা নিশ্চয় অনুভব করে চলেছেন। তাদের হৃদয় মন নিশ্চয় বার বার অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠছে। নিজের বিবেকের কাছে ক্ষণে ক্ষণে হেরে যাচ্ছেন। বিবেক তাদের হয়ত বার বার দণ্ডই দিয়ে চলেছে। কেননা, বিবেক মানুষের সর্বোচ্চ আদালত। ভিকারুননিসার ক্যাম্পাসে হয়ত অরিত্রীর হাসিমাখা মুখটি তাদের চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছে। তার মাথার চুলে ফুল গোঁজা ছবি দেখে তার মুখটি অসংখ্য মানুষের মত আমার হৃদয়েও গেঁথে আছে। ছবির মুখটি যে কোন হৃদয়বান মানুষের চোখে বার বার ভেসে উঠবেই। তার শিক্ষকেরা তাকে তো অনেক দিন, মাস ও বছর খুব কাছে থেকে দেখেছেন। নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে চুলে ফুল গোঁজা অরিত্রীকে তারা খুব কাছে পেয়েছেন। শ্রেণিকক্ষে একান্ত পাশে থেকে দেখেছেন। আজ তার সে প্রিয় মুখটি নিশ্চয় শিক্ষকদের সামনে বার বার ছুটে আসছে। আমাদের শিক্ষার ক্ষতগুলো তার স্যারদের চুপি চুপি বলে দিচ্ছে। আমার মনে হয় তার শিক্ষকদের মনের দুঃখটা এখন তার বাবা-মা'র চেয়ে কোন অংশে কম নয়। ক্ষেত্র বিশেষে হয়ত বেশিই হবে।

আমাদের শিক্ষায় এখন জ্ঞানার্জনের চেয়ে পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়াটাই জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিপিএ ফাইভ পাওয়া তারচে' বেশি জরুরি। মরো কিংবা বাঁচো, পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ নিয়ে কৃতকার্য হতেই হবে। কী শেখা হলো বা হলো না-সে কথা বড় নয়। সন্তানের কাছে বাবা-মা'র এ প্রত্যাশাটি খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৈতিক বা অনৈতিক যে পথে গিয়ে হউক জিপিএ ফাইভ পাওয়া চাই। শিক্ষায় আজ কেবল এটি একা কারো চাওয়া নয়। পরিবার, স্কুল, সমাজ-সকলের। এর জন্য পরিবার থেকেই শিশুর ওপর চাপাচাপি শুরু হয়ে যায়। স্কুলও কম যায় না। ভিকারুননিসার মত নামী প্রতিষ্ঠানগুলো এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা বাণিজ্যে লেগে পড়ে। পরিবারের চেয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ বাণিজ্যে একা শিক্ষকরাই নন। পরিচালনার সাথে যারা জড়িত তারাও জড়িয়ে পড়েন। কোথাও কোথাও এদের অনুপ্রেরণা ও সাহসের কারণে শিক্ষকরা শিক্ষা বাণিজ্য করেন।

ভিকারুননিসার মতো দেশের সেরা সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এভাবেই শিক্ষা বাণিজ্যের পথ প্রসারিত হয়েছে।  এসব তো এখন ওপেন সিক্রেট বিষয়। ভিকারুননিসার মত প্রতিষ্ঠানগুলোর মাসিক কিংবা বার্ষিক আয় কত কোটি টাকা-সে আজ জানার আগ্রহ অনেক মানুষের। কে জানে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ কত টাকা বেতন ভাতা পেয়ে থাকেন? বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের পথে এসব প্রতিষ্ঠান ও তাদের শিক্ষকরাই মূল বাধা। কেননা, সরকারির চেয়ে তারা কয়েকগুণ বেশি বেতন ভাতা নিয়ে থাকেন। সুযোগ-সুবিধাও বেশি পেয়ে থাকেন। পিভি, পিএফ, উৎসব ভাতা, বাড়ি ভাড়া, ইনক্রিমেন্ট, বৈশাখী ভাতা সবই তাদের আগে থেকেই আছে। স্কুল-কলেজ সরকারি হলে তাদের বেতন কমে যায়। কোটি কোটি টাকার তহবিল সরকারি কোষাগারে চলে যায়। তাই সরকারিকরণের আন্দোলনে তারা নীরব দর্শক।

 সরকারিকরণ প্রসঙ্গটি এখানে এ কারণে টানলাম যে, আজ পর্যন্ত সব স্কুল-কলেজ সরকারিকরণের আওতায় না আসার কারণে দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে ফ্রি স্টাইল শিক্ষা বাণিজ্য চলছে। এটি একটি লাভজনক ও সহজ বাণিজ্য। তাতে মূলধন কিংবা ঝুঁকি-দু'টোর কোনটিই খুব একটা লাগে না। সে বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে শত ভাগ পাসের হার আর বেশি বেশি জিপিএ ফাইভ দরকার। টাকাই সব। টাকার কারণে যত আকাম-কুকাম। শিক্ষা বাণিজ্যের কারণে নোট-গাইড ও কোচিং ব্যবসার এত রমরমা অবস্থা। প্রশ্নফাঁসের দুর্নামে পৃথিবী জুড়ে আমাদের বদনাম। আর সে অপপ্রয়াসের বলি হয় অরিত্রীর মতো নির্মল ও নিষ্পাপ কতো শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী। শুধু কী তাই? পরিমলের মত শিক্ষক নামের কুলাঙ্গারের উত্থান ঘটে, যারা কেবল শিক্ষার নয় কোমলমতি শিক্ষার্থীর জীবনেও সর্বনাশ ডেকে আনতে দ্বিধা বোধ করেনা।

শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ফেল করলে শিক্ষা বাণিজ্যে ভাটা পড়ে। তাই ফেল ঠেকাতে যে কোন অনৈতিক কাজের আশ্রয় নিতে দুনিয়ায় আমাদের জুড়ি নেই। এরপরও সন্তান ফেল করে বসলে সে দায় কেবল সন্তানের। অভিভাবক তো নয়ই। শিক্ষকও ফেলের দায় নিতে নারাজ। এ প্রসঙ্গে জাপানের কোনো এক নকলে ধরা খাওয়া ছাত্রের কাছে তার শিক্ষকের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। পরীক্ষায় হাতেনাতে নকলে ধরা খাওয়া ছাত্রটির কাছে গিয়ে তার শিক্ষক বলেন, "আমায় ক্ষমা করো, আমি তোমাকে সঠিকভাবে শিখাইনি বলে। তোমার কোন অপরাধ নেই।" 

এ হলো জাপানের শিক্ষার সাথে আমাদের শিক্ষার পার্থক্য। জাপানি শিক্ষকের মানবিকতা ও আমাদের শিক্ষকের মানবিকতার তফাত। জাপানি শিক্ষকের উদারতা ও আমাদের উদারতার পার্থক্য। আমাদের দেশে প্রশ্নফাঁস, ভর্তি বাণিজ্য তথা শিক্ষা বাণিজ্য যেখানে কোন অন্যায় কিংবা অপরাধ নয় সেখানে ক্লাস পরীক্ষার সময় মোবাইল সঙ্গে করে নিয়ে আসার অপরাধে ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও কলেজের মত নামকরা একটি প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী অরিত্রীকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়। শিক্ষককে নিয়ে এমনি এমনি মানুষের মনে হীন চিন্তা জন্মেনি। এক দু'জনের কারণে পুরো শিক্ষক সমাজের অবস্থান আজ প্রশ্নবিদ্ধ। শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন প্রায়শই যথার্থ হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে ইতালির কোন এক পরীক্ষায় ফেল করা জনৈক ছাত্রের লেখা 'আপনাকে বলছি, স্যার' (বাংলায় বইটির নাম এরকম হয়) বইয়ের একটি উদ্ধৃতি এমন-"আমরা কেউ গণিতে, কেউ ল্যাটিনে, কেউ ব্যাকরণে ফেল করায় স্কুল থেকে আমাদের তাড়িয়েছেন।

তাহলে ব্যাপারটা হলো আপনারা এমন একটি হাসপাতাল চালাচ্ছেন, যেখান থেকে রোগীদের তাড়িয়ে আপনারা সুস্থ মানুষদের সেবা দিচ্ছেন।" আমাদের স্কুল-কলেজগুলো ও ঠিক যেন সেরকম হয়ে উঠেছে। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা সেই কবে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে সরকারিকরণ করা হয়। সেই থেকে এ শিক্ষাস্তরটি মোটামুটি সুশৃঙ্খল। এ স্তরে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে শুরু করেছেন। কোচিং বাণিজ্য কিংবা নোট-গাইডের ছড়াছড়ি তুলনামূলক কম। পিইসি পরীক্ষাটা উঠিয়ে দিলে প্রশ্নফাঁসের অপবাদ থেকে শিক্ষার এ স্তরটি বেঁচে যায়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অবকাশ বিদ্যমান। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও মাধ্যমিক শিক্ষা আজ পর্যন্ত জাতীয়করণ করা হয়নি। এ স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনেক কম। ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি 'অল ইন অল'।

তারা দিনকে রাত আর রাতকে দিন করতে পারে। এ স্তরে দু'টো পাবলিক পরীক্ষা। জেএসসি ও এসএসসি। নোট-গাইড ও কোচিং বাণিজ্যে এ স্তরটি সয়লাব। ভর্তি নিয়ে বাণিজ্য হয়। রেজাল্ট নিয়ে অনিয়ম হয়। ফরম পূরণে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ ওঠে। দুদক মাঠে নেমেও কন্ট্রোল করতে পারে না। অনেক জায়গায় শিক্ষকের হাতে কিশোর শিক্ষার্থী পর্যন্ত যৌন পীড়নের শিকার হয়। কয়েক বছর আগে এই ভিকারুননিসায় না কোথায় যেন বিমল না পরিমল কি নামের একটা কূলাঙ্গার শিক্ষকের হাতে এরকম একজন শিক্ষার্থী যৌন লালসার শিকার হয়েছিল। 

সারা দেশে হৈচৈ পড়েছিল। নিশ্চয় ঐ শিক্ষকের ফাঁসি জাতীয় কিছু হয়নি। কিন্তু যে শিক্ষার্থীটিকে পীড়ন করা হয়েছিল তার শারীরিক মৃত্যু না হলেও সেদিনই তার মানসিক মৃত্যু হয়েছে। সে মৃত মনটি নিয়ে মেয়েটি হয়ত আজও বেঁচে আছে। তার সে বেঁচে থাকায় কোন সার্থকতা নেই। আমাদের দেশে শারীরিকভাবে কাউকে হত্যা করলে হত্যাকারীর জেল, জরিমানা ও ফাঁসি হয়। কিন্তু, মানসিক হত্যার কোন বিচার হয় না। আসলে  বেসরকারি স্কুল-কলেজ যতদিন না সরকারিকরণের আওতায় আসবে, ততদিন এরকম নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি চলতে থাকবে। এখানে কোন সার্ভিস রোল নেই। প্রমোশন-ডিমোশন নেই। তদারকি নেই। সুপারভিশন নেই। যার যার তার তার মত করে চলা। ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি বেশিরভাগ জায়গায় অথর্ব। শুধু টাকা মারা জানে। প্যাঁচ লাগাতে পারে। কাজের কাজ কিচ্ছু জানে না। এ সুবাদে কোচিং বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্নফাঁস, নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ে। একটা অনিয়ম দশটা অনিয়মের জন্ম দেয়। সে অনিয়মের ফাঁকে ফোকরে অরিত্রীরা বলির শিকার হয়। এরকম নানা অনিয়মে ভিকারুননিসার মত নামী প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের সাথে যারা জড়িত তারা দিনে দিনে স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের কেউকেটা মনে করে। শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। অভিভাবককে ন্যূনতম সম্মান দিতে জানেন না। তাদের কাছে টাকাই সব। টাকা তাদের অন্ধ করে রেখেছে। 

আমাদের অভিভাবকদেরও দুধে ধোয়া তুলসি পাতা মনে করি না। তারাও কেন জানি ভিকারুননিসার মত নামী স্কুল-কলেজে সন্তান ভর্তি করাবার জন্য পাগল হয়ে ওঠেন। যে করে হউক সন্তানকে ভর্তি করানো চাই-ই চাই। অনৈতিক পথে গিয়ে হলেও। অরিত্রী আত্মহত্যার পর ভিকারুননিসার শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমেছে। প্রতিবাদ করেছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অনিয়ম ধরতে পেরেছে। তাদের ধন্যবাদ দিতেই হয়। তারা ধন্যবাদার্হ। অরিত্রী তার জীবন দিয়ে অনিয়ম দেখিয়ে দিয়ে গেছে। আমাদের কান ধরে চোখে আঙ্গুল দিয়ে।  

 ভিকারুননিসার তিনজন শিক্ষককের এমপিও বাতিল করা হয়েছে। একজনকে জেল হাজতে নেয়া হয়েছে। এত দ্রুত অ্যাকশন! শিক্ষকরা খুব নিরীহ আর ভদ্র বলে তাদের শাস্তি দিতে চিন্তা-ভাবনা করা লাগে না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির তো কারো কিছু হলো না। মোবাইল নিয়ে এলে বহিষ্কার করার নিয়ম তো পরিচালনা কমিটিই করে দিয়েছে। অরিত্রীর বাবা-মা'র সাথে যে অসৌজন্যতা দেখানো হয়েছে, সে তো তাদেরই জোরে। এরাই তো ভিকারুননিসায় চারটি শাখা খুলেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের মত কাজ কারবার। লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেন। এদের লাগাম টেনে ধরার কেউ নেই। শিক্ষকরা আজকাল খুব শান্ত, নিরীহ আর ভদ্র বলে যত দোষ সবই তাদের। সামান্য কিছু হলেই শিক্ষকদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা খুব সহজ। আর কারো কিছু করতে হলে সময় লাগে। তদন্ত করতে করতে দোষী পগার পার হয়ে যায়। হবে না কেন? আমাদের সমাজটাই এখন শক্তের ভক্ত নরমের যম। বিচারের বাণী তাই বরাবর নীরবে নিভৃতে কেঁদে মরে।

অরিত্রী অধিকারী মরেনি। মরতে পারে না। শিক্ষাঙ্গনে প্রচলিত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আত্মহনন তার এক অন্য রকম প্রতিবাদ। এ রকম প্রতিবাদীরা মানুষের হৃদয়ে ভালবাসায় সিক্ত হয়ে যুগ যুগ বেঁচে থাকে। অরিত্রী, তুমিও বেঁচে থাকবে মানুষের ভালবাসায়। তোমার জন্য পরকালের অনিমেষ শুভ কামনা আমার।   
                       
পরিশেষে বলি, কেবল শিক্ষকদের শাস্তি হবে কেন? তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট সকলকে শাস্তির আওতায় আনা হোক। আগত দিনের অরিত্রীদের বাঁচাতে বেসরকারি সব স্কুল-কলেজ একত্রে সরকারিকরণ করা সময়ের শ্রেষ্ঠ দাবি আজ। তা না হলে শিক্ষায় কেবল নৈরাজ্য বাড়তে থাকবে। সে নৈরাজ্য ও অনিয়মে কত অরিত্রীকে জীবন দিতে হবে কে জানে ? শিক্ষা ব্যবসায়ীদের এখনই রুখতে হবে। এরা দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এদের গতি রোধ করতে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগী হতে হবে। দেশ ও জাতি কোনভাবে এর দায় এড়াতে পারে না। 

লেখক: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট ও দৈনিক শিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক।

৪২ শতাংশই অন্য চাকরি না পেয়ে শিক্ষকতায় এসেছেন - dainik shiksha ৪২ শতাংশই অন্য চাকরি না পেয়ে শিক্ষকতায় এসেছেন র‌্যাগিং রোধে বিশেষ সেলের কথা বললেন শিক্ষামন্ত্রী, ইউজিসি দিল নির্দেশনা - dainik shiksha র‌্যাগিং রোধে বিশেষ সেলের কথা বললেন শিক্ষামন্ত্রী, ইউজিসি দিল নির্দেশনা ২৫ অক্টোবর থেকে কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার নির্দেশ - dainik shiksha ২৫ অক্টোবর থেকে কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার নির্দেশ শিক্ষার্থীদের অন্দোলনের মুখে ভিসি নাসিরের ভাতিজার পদত্যাগ - dainik shiksha শিক্ষার্থীদের অন্দোলনের মুখে ভিসি নাসিরের ভাতিজার পদত্যাগ ঢাবি ‘খ’ ইউনিটের ফল প্রকাশ - dainik shiksha ঢাবি ‘খ’ ইউনিটের ফল প্রকাশ ‘প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া’ বলে তোপের মুখে পালালেন অধ্যক্ষ - dainik shiksha ‘প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া’ বলে তোপের মুখে পালালেন অধ্যক্ষ এমপিওভুক্ত হচ্ছেন আরও শতাধিক শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন আরও শতাধিক শিক্ষক ডিগ্রি ১ম বর্ষ পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত - dainik shiksha ডিগ্রি ১ম বর্ষ পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website