আবরার হত্যা : সামাজিক আন্দোলন তৈরি হোক - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

আবরার হত্যা : সামাজিক আন্দোলন তৈরি হোক

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

গত ৬ অক্টোবর বুয়েটে যে বর্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এ হত্যাকাণ্ড আদিম যুগের বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। সভ্যতার এই পর্যায়ে বাংলাদেশ যখন দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দুর্ভাগ্যক্রমে সত্য যে, আমাদের সমাজে এমন কিছু সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, যেগুলোর কারণে আমরা প্রতিদিন নতুন নতুন সামাজিক সমস্যা বা রাজনৈতিক দুর্ঘটনা দেখতে পাচ্ছি। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো না কোনোভাবে এ ধরনের সংস্কৃতি বিরাজ করছে। আবরারকে পিটিয়ে মারার ঘটনায় আমরা খুবই আশ্চর্যান্বিত। এই পিটিয়ে মারাসহ আরও জিঘাংসা চরিতার্থ করার মতো উপাদান এখনও পুরো সমাজে বলবৎ। সে কারণে দ্রুত এসব বিষয় ভালোভাবে মোকাবেলা করা গেলে জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে। শুক্রবার (১১ অক্টোবর) সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে  এ তথ্য জানা যায়।

নিবন্ধে আরও বলা হয়, বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তিনটি দিক থেকে আলোকপাত করা যায়- এক. রাজনীতিতে তোষামোদি ও অশুভ আঁতাত: আবরারের যে ঘটনা ঘটেছে তা আমাদের পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ফলাফল। এখন রাজনীতির নামে যা হচ্ছে তা সামগ্রিকভাবে রাজনীতি নয়। এই প্রক্রিয়ায় রাজনীতি চর্চার ফলে ব্যক্তি তার পছন্দের কর্মীকে যে কোনো জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করছে। সেই কর্মীর কোনো যোগ্যতা না থাকার পরও শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অশুভ আঁতাত ও তোষামোদির কারণে তাকে প্রতিষ্ঠিত করছে। কিন্তু যাকে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে, তিনি হয়তো সেই দলের আদর্শই বিশ্বাস করেন না। তার ব্যাকগ্রাউন্ডও সেই দলের সঙ্গে যায় না। ফলে রাজনীতি তার ছন্দের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিপূজা, ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতার অশুভ ব্যবহারের মাধ্যম হয়েছে। এর ফল আজকের বিরাজমান অস্থিরতা। বিশ্ববিদ্যালয় হলো মননশীলতার জায়গা; মতামত, অনুভূতি প্রকাশের জায়গা। ব্যাপক অর্থে এখানে বিতর্ক থাকবে, ভিন্নমত থাকবে। এর মধ্য দিয়ে নতুন নতুন ধারণা প্রকাশ পাবে। ফলে একটি দেশের স্বকীয়তা বা উচ্চমার্গীয় সংস্কৃতির বিচ্ছুরণ ঘটবে। কিন্তু তোষামোদির কারণে রাজনীতি আজ ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে ত্যাগী নেতারা হেরে যাচ্ছে। ক্যাসিনো ইস্যুতে বিষয়টি আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হয়েছে।

দুই. বিচারহীনতার সংস্কৃতি :ন্যায়বিচারের মূল কথাই হলো অপরাধীকে শাস্তি প্রদান। কেউ অন্যায় করলে শাস্তি পাবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে কোনো বিচার হয় না। হয়তো একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়; কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। ন্যায়বিচার হলে শুধু অপরাধীকেই শাস্তি দেওয়া হয় না; বরং তার আশপাশে যারা থাকে তারাও একটা বার্তা পায়। তারা আর এসব কাজের সাহস পায় না। কিন্তু আমাদের দেশে এই ব্যবস্থাটি প্রতিষ্ঠিত না থাকায় এ রকম ঘটনা ঘটার সুযোগ তৈরি হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে সেভেন মার্ডার সংঘটিত হয়েছিল। সেখানে শফিউল আলম প্রধান অভিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনিসহ যারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, সবারই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। যদিও তাদের বয়স বিবেচনায় সাজার পরিমাণ ১৪ বছর করা হয়েছিল। তারপরও স্বাধীনতার পর এটি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান তার পার্টি সমৃদ্ধ করতে বিভিন্ন জায়গা থেকে নেতা হায়ার করা শুরু করলেন। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শফিউল আলম প্রধানকে মুক্ত করা হলো। তিনি পরে জাগপা গঠন করেছিলেন। এর পর আর এ ধরনের দৃষ্টান্ত আমরা লক্ষ্য করিনি। আমরা বিচার প্রক্রিয়াকে নষ্ট করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করেছি। ফলে যিনি অন্যায় করছেন, তিনি বারবার করছেন। আর যারা আশপাশে আছেন, তারাও এ অন্যায় থেকে আশকারা পেয়ে এ ধরনের কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। একদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা, তাদের লেজুড়বৃত্তি এবং অশুভ আঁতাতের মাধ্যমে রাজনীতির স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি থেকে সরে যাওয়া এবং দ্বিতীয় হচ্ছে বিচারহীনতা। এর ফলে আবরারের মতো এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করছি।

তিন. অতি রাজনীতিকীকরণ :আমাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। গোটা দেশ খুবই ভয়ঙ্কর রকমে রাজনীতিকীকরণে চলে গেছে। ১৯৭৭ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের পিপিআরের উত্থান হয়েছে বিভিন্ন ফোরামকে এই পার্টির অঙ্গ সংগঠন হিসেবে পরিগণিত করে। এ প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে সব প্রতিষ্ঠান কোনো কোনোভাবে দলকেন্দ্রিক বা দলের লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে ছাত্র সংগঠনসহ সব পেশাজীবী সংগঠন কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক মোড়কে আবদ্ধ। এর ফলে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান তার স্বকীয়তা নষ্ট করে ফেলেছে। এতে কেউ অন্যায় করলে রাজনৈতিকভাবে তা বিবেচনা করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বকীয়তা ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জরুরি ছিল। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলই এ কাজটি করেনি। ১৯৯০ সালের পর যে দলই ক্ষমতায় আসছে, তার ছাত্র সংগঠন সব আবাসিক হল দখল করে নিচ্ছে। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হয়ে গেছে যে, যারা ক্ষমতায় আসবে তাদের ছাত্র সংগঠন হল দখলে নেবে। আর যারা ক্ষমতায় থাকবে না, তারা রাতের অন্ধকারে হল ছেড়ে চলে যাবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রতিরোধ লক্ষ্য করা যায় না। বুয়েটের ঘটনায় আমরা দেখলাম, পুলিশ সেখানে এসে আবরারকে উদ্ধার না করেই একজন ছাত্রনেতার কথায় সেখান থেকে চলে গেল। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। সেখানেই আমাদের প্রশ্ন- আমরা যে '৯৯৯' তৈরি করলাম, এর কার্যকারিতা কী? আমেরিকায় ৯১১-এ কল করলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ চলে এসে পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করে। সেখানে এই পরিবেশ একদিনে তৈরি হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে বলেই সে দেশের নাগরিকরা তাদের অধিকার পায়। কিন্তু আমাদের দেশের নাগরিকরা বিদ্যমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছে না।

আবরার হত্যাকাণ্ডের পর সব মহল থেকে বলা হচ্ছে, ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ হলে এ ধরনের সহিংসতা কমে যাবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আশির দশকের শেষদিকে ক্ষমতায় না থেকেও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোকে দখলে নেয়। বন্দুকযুদ্ধে তাদের অসংখ্য নেতাকর্মী আত্মাহুতি দিয়েছে। আজকের ক্রসফায়ার আমরা আশির দশকে লক্ষ্য করেছি। অসংখ্য নেতাকে মেরে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ওই সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দৌরাত্ম্য দেখেছি। একদিনে কিন্তু পরিস্থিতি এমন হয়নি। তাই শুধু রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেই এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে, তা মনে করি না। রাজনীতি বিষয়টি ব্যাপক। যদি রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি পরিহার করে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে এবং সর্বজনীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও নেতৃত্ব তৈরি করা যায়, তাহলে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ মিলতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগেও রাজনীতির অশুভ আঁতাত প্রবেশ করেছে। সরকারের তরফ থেকে সার্চ করে একজন যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার পরিবর্তে নানা প্রক্রিয়া ও তদবিরের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অযোগ্যদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে যারা ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের বড় অংশই কিন্তু অনুপ্রবেশকারী। তাদের মধ্যেই অতিভক্তি, তোষামোদি বা অশুভ আঁতাতের বিষয়টি প্রকট। ফলে তারা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় যোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের স্বকীয়তা হারাচ্ছে। বুয়েটের ঘটনার পর আমরা সেই হলের প্রভোস্ট বা ভিসিকে সেখানে আসতে দেখলাম না। ৩৬ ঘণ্টা পর ভিসি সেখানে গেলেন। এটি খুবই লজ্জাজনক। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি জাতির কাছে খুবই লজ্জিত এ কারণে, আমার একজন সন্তান মারা গেছে কিন্তু আমি সেখানে আসতে পারলাম না। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, পৃথিবীর সর্বজনীন প্রক্রিয়ার বাইরে যদি অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় যাই, তাহলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় আমরা দেখি, সবখানে ছাত্র ইউনিয়ন আছে। তারা ছাত্রসংশ্নিষ্ট ইস্যুসহ সামাজিক ও পরিবেশগত ইস্যু নিয়ে কাজ করছে, যা মানবতার জন্য কল্যাণকর। তাহলে আমরা কেন ছাত্র রাজনীতি রাখব না? আমরা যদি ডাকসু, চাকসু, রাকসুসহ অন্যান্য ছাত্র সংসদকে কার্যকর জায়গায় নিয়ে আসতে পারি, দলনিরপেক্ষ করতে পারি, তাহলে তা কল্যাণকর হবে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে দলীয় আনুগত্যে থেকে ছাত্র সংগঠনগুলো ভালো কিছু উপহার দিতে পারবে না।

আমি খুবই আশাবাদী, এত দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে পুরো সমাজ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে। এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। সামাজিক আন্দোলন তৈরির ক্ষেত্র এটি। রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে সরকার যদি বিষয়টি অনুধাবন করে ইতিবাচক রাজনীতিকে উৎসাহিত করে এবং দুর্বৃত্তায়ন, অতি রাজনীতিকীকরণ রোধ করে, তাহলে বাংলাদেশ ইতিবাচক অবস্থানে যাবে। গত কয়েক দিন ধরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অনেক নেতা সাধারণ মানুষের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আবরার হত্যার ঘটনার প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানিয়েছেন। এটি সমাজকে বিকশিত করার একটি বড় ইঙ্গিত। এ ধরনের প্রত্যয় নিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে পারি।

জিয়া রহমান : অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজবিজ্ঞানী।

প্যানেলে শিক্ষক নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি - dainik shiksha প্যানেলে শিক্ষক নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংসদ টিভিতে ডিপ্লোমা-ভোকেশনাল ক্লাসের রুটিন - dainik shiksha ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংসদ টিভিতে ডিপ্লোমা-ভোকেশনাল ক্লাসের রুটিন মৃত শিক্ষককেও বদলি করল মন্ত্রণালয় - dainik shiksha মৃত শিক্ষককেও বদলি করল মন্ত্রণালয় এনটিআরসিএ কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রধান শিক্ষকদের কাছে চাঁদা দাবি - dainik shiksha এনটিআরসিএ কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রধান শিক্ষকদের কাছে চাঁদা দাবি যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল : যেদিন প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন সেদিনই নিয়োগ - dainik shiksha যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল : যেদিন প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন সেদিনই নিয়োগ চাকরি সরকারি অবসর বেসরকারি: সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকদের বোবাকান্না - dainik shiksha চাকরি সরকারি অবসর বেসরকারি: সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকদের বোবাকান্না হাটহাজারী মাদরাসা পরিচালনায় সিনিয়র ৩ শিক্ষক - dainik shiksha হাটহাজারী মাদরাসা পরিচালনায় সিনিয়র ৩ শিক্ষক please click here to view dainikshiksha website