please click here to view dainikshiksha website

আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্রিক লেখাপড়া : মাছুম বিল্লাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক | জানুয়ারি ৩, ২০১৬ - ৯:২৫ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

২০১৫ সালের শেষদিন একইসাথে প্রকাশিত হলো পিএসসি , জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষাগুলোর ফল।ছোটদের পরীক্ষার এ দুটো বিষয় ছিল অন্যান্য বছরের চেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা।

আমাদের এ ছোট্ট সোনামনিরা ক্রমাগত ভালোর দিকেই আগাচেছ, আর এটিই স্বাভাবিক।পৃথিবী আগাচেছ, আমাদেরও তো আগাতে হবে। পরীক্ষার ফল শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিদ্যালয়, অভিভাবক সবার জন্য বিরাট এক আনন্দ নিয়ে আসে।আর এ আনন্দও আমাদের  এক ধরনের বার্তা দিচেছ শুধুমাত্র পরীক্ষাতেই ভাল করতে হবে।

শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করলে জানা যায় যে, যে কোন বয়সের শিক্ষার্থীরা এখন আর বাইরের, আনন্দের, গল্পের , দেশ-বিদেশ সম্পর্কে জানার বইপুস্তক পড়ছে না।

পরীক্ষা, পরীক্ষায় ভাল করা, পরীক্ষার প্রস্তুতি ইত্যাদি বিষয়গুলো তাদের অন্য বই পড়তে দিচেছনা।অভিভাবকগনও চাচেছন না বাইরের বই পড়ে তাদের ছেলেমেয়েরা সময় নস্ট করুক।

আসলে কি তাই যে বাইরের বই পড়লে বাচচাদের সময় নষ্ট হয়? আমাদের শিক্ষা নীতিতে পাবলিক পরীক্ষা ছিল দুটো, সেটি না মেনে আমরা চারটি পরীক্ষা চালু করেছি।ফলে শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্টরা প্রকৃত জানা, মুল্যায়ন থেকে দুরে সড়ে গিয়ে শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভাল করার অর্থাৎ ফল প্রদশর্ণীর খেলায় মেতেছে।

এ পরীক্ষাগুলোতে আর একটি মাতামাতি ছিল ’ সেরা বিদ্যালয় নির্বাচন’ । দেশের , জেলার, বিভাগের সেরা প্রতিষ্ঠান নির্ণয়’ ইত্যাদি  সরকার গতবার থেকে সরকার বিষয়টি বাদ দিয়েছে। বাদ দেওয়া থেকেই প্রমানিত হয় যে, আমাদের পরীক্ষাগুলো আমাদের পরীক্ষানির্ভর লেখাপড়ার কথাই বলছে আর এ প্রদর্শণীতে কে এগিয়ে আছে তা বিভিন্ন মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করবে আর ঐসব প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের সবাই বাহবা দিতে থাকবে।

সমাপনীতে সাতটি বিভাগের মধ্যে পসের হারের দিক থেকে এগিয়ে আছে রাজশাহী বিভাগ। পাসের হার ৯৯শতাংশ। সবচেয়ে কম পাসের হার সিলেট বিভাগে, এটি ৯৬.৭৯শতাংশ।অপর পাঁচটি বিভাগে ৯৮শতাংশের কম-বেশি।

জেলা হিসেবে সবচেয়ে ভাল করেছে মুন্সিগঞ্জ। এই জেলার সব শিক্ষার্থীই পাস করেছে আর সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বরগুণা।ধরণ অনুযায়ী সরকারী উচচ বিদ্যালয় যেগুলোতে প্রাথমিক শাখা আছে সেগুলোর ফল সবচেয়ে বেশি ভাল হয়েছে ।

এটি একটি গবেষণার বিষয়, সম্ভবত উচচমানের শিক্ষক সেখানে আছেন বলে।এসব বিদ্যালয়ে গড়ে পাসের হার ৯৯.৯৭শতাংশ। এতদিন প্রাথমিক শিক্ষা ইনস্টিউট সংলগ্ন ( পিটিআই) পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে পাসের হার বেশি হতো। এবার তার দ্বিতীয় অবস্থানে আছে।
অন্যান্য বিদ্যালয়ে গড় পাসের হার ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশের মধ্যে।

এই বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেই মানসম্মত গবেষণা দরকার, যার ফল দেশবাসীকে ে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিদের ভালভাবে অবহিত করা দরকার।

কেন এক এক বছর এক এক এলাকার শিক্ষার্থীরা হঠাৎ করে বেশি ভাল করে আবার বেশি খারাপ করে যা ছোট্ট এই দেশটির অন্যান্য এলাকা থেকে আলাদ হয়?

পাসের হার ও জিপিএ-৫গতবারের চেয়ে বেড়েছে। তবে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট ও ইবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষার ফল গতবারের চেয়ে খারাপ হয়েছে।

এই বোর্ডে পাসের হার ৯৮.৫২ শতাংশ ছিল গতবার , এবার তা হচেছ  ৯৭.৯২শতাংশ।জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ লাখ ৭৫হাজার ৯৮০ জন। মোট পরীক্ষার ৯.৮৭শতাংশ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।গতবার পেয়েছিল ২ লাখ ২৪ হাজার ৪১১ জন। গতবার (২০১৪) প্রাথমিকে শতকার একশত ভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৭২০৫৭ টি, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৯১২২৭টি। শূন্যভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা এবারও ১৫৩টি ।

এত কিছুর পরেও এখনও পাসের হার শূণ্য থাকা বিদ্যালয় রয়েছে যা আমাদের অনেক কিছু অপারগতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী অবশ্য বলেছেন যে, এসব বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

জিপিএ-৫পাওয়ার সংখ্যা কমে যাওয়ায় গতবার জেএসসি পরীক্ষার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছিল।এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই বেড়েছে।পাসের হার ২.৫শতাংশ আর জিপিএ-৫ গতবারের  ৫০হাজার ৫৫৭জন থেকে  বেড়ে দাড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭হজার ৫০২ জন।৮টি সাধারন শিক্ষাবোর্ডের ১৯লাখ ২৯ হাজার ৯৯ জন পরীক্ষাথীর মধ্যে পস করেছে ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৭৭০ জন। এবার গণিতে শিক্ষার্থীরা গতবারের চেয়ে ভাল করেছে।

জেএসসিতে সেরা রাজশাহী (৯৭.৪৭), সবচেয়ে পিছিয়ে চট্টগ্রাম বোর্ড (৮৫.৪৮শতাংশ)মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, ’ এবার প্রথমবারের মতো চালু হওয়া বাংলা, ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, শারীরিক শিক্ষা/কর্মমুখী ও জীবনমুখী শিক্ষা বিষয়ের প্রতিটিতে পূর্ণমান ৫০-এর মধ্যে আলাদা করে ৪০ নম্বর না পেলে জিপিএ-৫ ধরা হয়নি, ফলে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা এবার কমেছে।

২০১৫ সালের প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময়  কোন রাজনৈতিক বৈরি পরিবেশ ছিলনা। গতবার শিক্ষার্থীরা অনেক আতঙ্কের মধ্যে পরীক্ষা দিয়েছে।

এবার তারা নিরুদ্বেগে ও শান্তিপূর্ন পরিবেশে পরীক্ষা দিয়েছে। গণিতে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ায় গতবার পাসের হার কম ছিল। এ বিষয়ে সরকার প্রশিক্ষণের সংখ্যা ও আওতা  বাড়িয়েছিল, শিক্ষকগন ও শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি আয়ত্ব করার সময় পেয়েছে তাই গণিতে এবার ভালই করেছে যা পুরো ফলকে প্রভাবিত করেছে।

ব্যাপকভাবে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল গতবারের পরীক্ষার সময় যা শিক্ষার্থীরদের প্রস্তুুতিতে অনেক ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল, এবারকার  পরীক্ষা এটি থেকে মুক্ত ছিল বলে শিক্ষার্থীরা অনেকটা মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা দিতে পেরেছিল।রাজনৈতিক গন্ডগোল না থাকা ও প্রশ্নপ্রত ফাঁস না হওয়া আমাদরে আনন্দের বার্তার কথা বলছে।

ভাল ফলের মানদন্ড নির্বাচণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দশটি সূচক নির্ধারণ করেছে। এগুলো হচেছ(১) অংশগ্রহনকারী শিক্ষার্থী (২) পাস করা শিক্ষার্থী (৩) ফেল করা শিক্ষার্থী (৪) পাসের হার (৫) জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী (৬) শতাভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান (৭)শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠান (৮) বহিস্কৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা (৯) কেন্দ্র সংখ্যা (১০) প্রতিষ্ঠান সংখ্যা ।

এগুলোর মধ্যে একটি সূচক ছাড়া বাকীগুলো ইতিবাচক। তবে, আর একটি সূচক এখানে যোগ করা যেত। সেটি হচেছ একটি প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করার পর কতজন শিক্ষার্থী পরবর্তী ভাল কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পেরেছ। কেবল বহিস্কৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা গতবারের চেয়ে এবার (২০১৫ এর ফল) সাতজন বেশি।

এবার চট্টগ্রাম, বরিশাল ও দিনাজপুর বোর্ডের শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে গতবারের চেয়ে খারাপ করেছে, তা না হলে ফল আরও ভাল হতো বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক।

এবার আর একটি পজিটিভ সূচক হচেছ মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে পাসের দিক থেকে এগিয়ে আছে। আমাদের ক্ষুদে শিক্ষার্থী তথা ভবিষ্যত যোদ্ধাদের অভিনন্দন জানাই তাদের এই সাফল্যের জন্য।

সাথে সাথে শিক্ষকমন্ডলী এবং অভিভাবক যারা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তাদেরকেও অভিভন্দন জানাচিছ। সিস্টেম যেহেতু পরীক্ষার, পড়াশুনা যেহেতু পরীক্ষা নির্ভর শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সেটি তো মানতেই হবে।

তারপরেও দু’ একটি কথা না বললেই নয় । পরীক্ষায় পাস বা ভাল গ্রেড পাওয়াই প্রকৃত মূল্যায়ন এবং প্রকৃতি শিক্ষা অজন বুঝায় না যা আমাদের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের বুঝতে হবে। হাঁ পরীক্ষায় অবশ্যই ভাল করতে হবে।

ভাল করার জন্য শুধুমাত্র পরীক্ষানির্ভর পড়া যেন আমরা না পড়ি বা না পড়াই। শিক্ষার কাঙ্খিত উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আগাতে হবে। তার মাঝে আসবে পরীক্ষা, প্রচলিত পদ্ধতিতে মূল্যায়ন সেখানেও ভাল করতে হবে।

আমরা যেন বিস্মৃত  না হই যে পর পর কয়েকটি পাবলিক পরীক্ষায় অনেক ভাল করেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় আমাদের শিক্ষার্থীদের কি হয়েছিল।এই অবস্থাটি আমাদের বার্তা দিচেছ যে, শুধুমাত্র পাবলিক পরীক্ষায় ভাল করাই আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। সৃজনশীল প্রশ্নপত্র চালু করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু কোচিং ও গাইডের ব্যবহার কি কমেছে? বরং বেড়েছে।

তাহলে কেমন সৃজনশীল প্রশ্ন চালূ করা হলো? প্রশ্নপত্র প্রণয়নে আমরা তো এখনও ট্রাডিশন থেকে বেড়িয়ে আসতে পারিনি। বইয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ন অংশ বেছে বেছে পড়লেই তো ফল ভাল করা যায়, তাহলে পুরো বই শিক্ষার্থীরা কেন পড়বে আর কর্মাশিয়াল শিক্ষকগনও তার বাইরে যাবেন কেন? গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন যদি এক বোর্ডে সেট করা হয় তো দেখা যায় বছরের পর বছর ওই একই প্রশ্ন বিভিন্ন বোর্ডে চলতে থাকে।

দেখার যেন কেউ নেই। কিছদিন আগে বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ডের বেশ ক’জন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হলে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অতটা অবগত নন এবং কেউ কেউ বললেন যে, প্রশ্ন তো তারা করেননা, শিক্ষকগনই করেন অতএব এ দায় দাযিত্ব তাদের নয়।

আমার প্রশ্ন বিষয়টি কি তারা এড়িয়ে যেতে পারেন? শিক্ষার্থী মূল্যায়নের মূল কাজটিই শিক্ষাবোর্ডগুলো করে থাকে, সেখানে প্রকৃত স্বচছতা ও যর্থার্থতা থাকতেই হবে।

লেখক: মাছুম বিল্লাহ, লেখক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত।

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন