আর যেন শুনতে না হয় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ - মতামত - Dainikshiksha

আর যেন শুনতে না হয় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ

ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী |

মানসম্পন্ন শিক্ষার ক্ষেত্রে পরীক্ষা পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এ পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নানা সময়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মনে পড়ে, আশির দশকে যখন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন ‘ক’ ‘খ’ ‘গ’ সেট করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের- প্রাইমারি স্কুলের ক্ষেত্রে ইদানীং দেখা যাচ্ছে, অভিভাবকরা স্বয়ং প্রশ্নপত্র ফাঁসে উৎসাহী। তারা নতুন প্রজন্মকে অসৎ হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছে। কতিপয় অসৎ অভিভাবক আর কতিপয় অসৎ শিক্ষকের জন্য জাতি আজ লজ্জিত। সন্তান বড় হলে অভিভাবকের কষ্ট করতে হয় না- তারা নিজেরাই এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় নানাভাবে প্রতিরোধের ব্যবস্থা করছে- তারপরও দেখা যাচ্ছে, একটি মাফিয়া নেক্সাস এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। আসলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস আটকানো এখন আর সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এ ব্যাধির হাত থেকে মুক্ত হতে হলে অবশ্যই সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। গত ২১ জুলাই মানসম্পন্ন শিক্ষার ওপর আয়োজিত একটি সেমিনারে শিক্ষা সচিব মো. সোহরাব হোসেইন প্রশ্নপত্র ফাঁসের নিন্দা জানান। আসলে এ ধরনের নিন্দনীয় কাজ মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করেন, সবাই যে আসল প্রশ্নপত্র পান, তা নয়। তবে এর ফলে ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের মনে উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে; মেধাবীরাও অনেক সময় না বুঝে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে যা শিখেছিল, তা ভুলে যায়।

আবার একটি দুষ্টু গ্রুপ আছে, যারা পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস না হলেও প্রচার করে পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করেন। অথচ আমরা আমাদের ছাত্রজীবনের প্রথম পাঠ খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলে নিয়েছিলাম- নকল করা ঘৃণার ব্যাপার; এটি খারাপ কাজ। জানি না, আজকাল প্রাইমারি পর্যায়ে এসব শেখানো হয় কিনা! পারিবারিক মূল্যবোধও আজকাল কমে গেছে। কেননা, প্রাইমারি স্কুলে তো আর ছাত্র-ছাত্রী নিজেরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারে ছুটছে না। আমি এখনও মনে করি, পাবলিক পরীক্ষায় এমসিকিউ পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করা মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। এতে শিক্ষার্থীর কোনো লজিক্যাল কিংবা এন্যালাইটিকেল এবিলিটি গড়ে উঠে না। বাপ-মা যেভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কোচিংয়ে ছুটেন, আর কোচিংওয়ালারা যেভাবে অভিভাবকদের পকেট কাটেন, তাতে অবশ্যই অভিভাবকদের সম্মতি থাকে। যেভাবে পারুক তার ছেলে কিংবা মেয়ে যাতে গোল্ডেন জিপিএ পায়।

হায় রে হতভাগা অভিভাবক! নিজের অজান্তেই ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছেন। দেখা যাচ্ছে, গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পেয়েও একজন ছাত্র যা জানে, তার চেয়ে ঢের বেশি জানে ‘এ’ লেভেলে ‘সি’ পাওয়া শিক্ষার্থী। অথচ দেশে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলনের জন্য সরকার কম চেষ্টা করছেন না। যেভাবে বর্তমানে প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা কোচিংওয়ালারা পকেট কাটছে, মনে হয় আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতিতে অ্যাসেসমেন্টের পদ্ধতি ভিন্ন করা দরকার। যদি ১০০-এর মধ্যে নম্বর ভিন্নভাবে এসএসসি, এইচএসসিতে পুনর্বণ্টন করা যায়, তবে ভালো হয়। ক্লাস এটেনডেন্স, ফিল্ড ভিজিটের ভিত্তিতে রিপোর্ট, অ্যাসাইনমেন্ট এবং বাকি পঞ্চাশ নম্বর যদি ওপেন বুক সিস্টেম করা যায়, তবে হয়তো এ ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এ ব্যাপারে শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে বিষয়টি নিয়ে ভাবনা-চিন্তার যথেষ্ট অবকাশ আছে। আর পাঠ্যপুস্তক সহজীকরণের জন্য সরকার ইতিমধ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যদি অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়, তাহলে হয়তো ফাঁকিবাজি কিছুটা কমতে পারে।

বাঙালি মেধাবী জাতি। মেধা বাঙালির কম নেই। প্রশ্ন হল, আমরা সেই মেধা ইতিবাচক কাজে প্রয়োগ করব, না নেতিবাচক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করব? প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সরকার যত শুভ উদ্যোগ নিক না কেন, আমাদের অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। নচেৎ একদল অভিভাবক-শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কোচিং ব্যবসায়ী আমাদের দেশের ভালো শিক্ষার মানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলছে। তার ওপর আছে আরেক শ্রেণীর বেনিয়া, যারা সার্টিফিকেট বিক্রি করে। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অনেকেই বেঁচে যাচ্ছে। অথচ এ বেনিয়াদের জন্য ছাত্রছাত্রীদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসতে পারে। অজ্ঞাত কারণে সার্টিফিকেট বিক্রির সঙ্গে জড়িত বেনিয়ারা বারবার বেঁচে যায়। অথচ তাদের কারণে কত পরিবারে হাহাকার নেমে এসেছে। পড়ালেখার পর কোনো শিক্ষার্থী যদি সার্টিফিকেট ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে তার জীবন তো অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। সনদ বাণিজ্যে ওস্তাদরা ভয়ংকর এবং অন্যায় করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। সরকার এখন পর্যন্ত দেশে কোনো স্টাডি সেন্টারের পারমিশন দেয়নি। তারপরও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার দাপটে এখনও স্টাডি সেন্টার চালু রেখেছে। কতিপয় বেনিয়ার পাশাপাশি শিক্ষাবিদরাও এখানে রোজগারপাতি ভালোই করছেন। তারা দেশের প্রচলিত আইনকে অমান্য করে চলেছেন।

সরকার যতই মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিক না কেন, যতদিন নকল, প্রশ্ন ফাঁস ও সনদ বাণিজ্য রোধ করা না যাবে, ততদিন মানসম্পন্ন শিক্ষা দেয়া সম্ভব নয়। বস্তুত এটি হবে তৈলাক্ত বাঁশের মতো; পাঁচ হাত উপরে উঠলে ছয় হাত নিচে নামবে। অথচ আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা বিদেশে আইইএলটিএস, টোয়েফেল, স্যাট, জিআরই, জিমেট দিয়ে প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছে। দেশের পুরনো চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি নতুন অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দশ থেকে পনেরোটি বেশ ভালো করছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল প্রতিষ্ঠা করলেই হয় না, বরং কমপক্ষে পাঁচটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয় এবং এ ক্ষেত্রে অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষার্থীদের উপযোগী এবং তাদের কেন্দ্র করে পাঠ ও পঠনের ব্যবস্থা করা, গবেষণা কর্ম সম্পাদন করা, সামাজিক উন্নয়নে সংযুক্ত হওয়া এবং আন্তর্জাতিকীকরণ করা।

প্রশ্ন ফাঁস আসলে পরীক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি স্নায়ুবিক চাপ সৃষ্টি করে থাকে। পাবলিক পরীক্ষার পাশাপাশি ভর্তি পরীক্ষায়ও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। এমনকি বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায়ও প্রশ্ন ফাঁসের গুজব রটে। এর ফলে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়। এক সময় ভালো নোট বই ছিল, ফলে ছাত্রছাত্রীদের কোচিংয়ে যাওয়ার দরকার হতো না। কিন্তু বর্তমানে কোচিং বাণিজ্য এমন প্রসার লাভ করেছে, স্কুল-কলেজে খুব কমই পড়ালেখা হয়। মেধাবী ও পরিশ্রমী কোনো শিক্ষার্থী যদি সততার সঙ্গে পরীক্ষা দেয়, অবশ্যই ভালো ফল করবে- এ ধারণা সবার মধ্যে জোরদার করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নামকরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, যারা ছাত্রছাত্রীদের সুপ্ত প্রতিভার স্ফূরণ না ঘটিয়ে বরং কিভাবে অধিক নম্বর পাওয়া যায়, প্রতিষ্ঠানের আরও সুখ্যাতি ঘটে, সেদিকে ছুটছে। নকলের কারণে মেধার উৎকর্ষ যেমন বিনষ্ট হয়, তেমনি সৃজনশীলতার অপমৃত্যু ঘটে। উদ্ভাবনী শক্তিবিহীন হয়ে পড়ে পরীক্ষার্থী। তোতাপাখির মতো মুখস্থ বিদ্যা আর নকল করার মন-মানসিকতা ছাত্রছাত্রীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে, অথচ সবাই এ অপকর্মের জন্য দায়ী নয়। ঘৃণ্য এ কাজের বিরুদ্ধে যথাযথ ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধও তৈরি করতে হবে। আসুন, সবাই নকল ও প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধ করি।

ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী : প্রফেসর ও অর্থনীতিবিদ

ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা প্রকাশ - dainik shiksha ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা প্রকাশ ঢাবিতে ভর্তি আবেদনের সময় বাড়ল - dainik shiksha ঢাবিতে ভর্তি আবেদনের সময় বাড়ল ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দাবিতে শিক্ষকদের মানববন্ধন ৫ সেপ্টেম্বর (ভিডিও) - dainik shiksha ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দাবিতে শিক্ষকদের মানববন্ধন ৫ সেপ্টেম্বর (ভিডিও) মেডিকেল ভর্তি কোচিং সেন্টার ১ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধের নির্দেশ - dainik shiksha মেডিকেল ভর্তি কোচিং সেন্টার ১ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধের নির্দেশ মাস্টার্স শেষপর্ব পরীক্ষার ফল প্রকাশ প্রকাশ - dainik shiksha মাস্টার্স শেষপর্ব পরীক্ষার ফল প্রকাশ প্রকাশ টিটিসির সেই ৯২ শিক্ষকের চাকরি স্থায়ীকরণ অবৈধ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট - dainik shiksha টিটিসির সেই ৯২ শিক্ষকের চাকরি স্থায়ীকরণ অবৈধ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট কোটা উঠিয়ে দেয়ার সুপারিশ করব: মন্ত্রিপরিষদ সচিব - dainik shiksha কোটা উঠিয়ে দেয়ার সুপারিশ করব: মন্ত্রিপরিষদ সচিব কওমি সনদের স্বীকৃতিতে আইনের খসড়া অনুমোদন - dainik shiksha কওমি সনদের স্বীকৃতিতে আইনের খসড়া অনুমোদন ২৭১ কলেজ সরকারিকরণের প্রজ্ঞাপন জারি - dainik shiksha ২৭১ কলেজ সরকারিকরণের প্রজ্ঞাপন জারি প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা আর থাকছে না - dainik shiksha প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা আর থাকছে না উপসচিব হতে চান সরকারি কলেজের দুই শতাধিক শিক্ষক - dainik shiksha উপসচিব হতে চান সরকারি কলেজের দুই শতাধিক শিক্ষক জেএসসি পরীক্ষার সূচি - dainik shiksha জেএসসি পরীক্ষার সূচি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতার চেক ব্যাংকে - dainik shiksha এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতার চেক ব্যাংকে কারিগরি শিক্ষকদের উৎসব ভাতার চেক ব্যাংকে - dainik shiksha কারিগরি শিক্ষকদের উৎসব ভাতার চেক ব্যাংকে জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা শুরু ১ নভেম্বর - dainik shiksha জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা শুরু ১ নভেম্বর জেডিসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ - dainik shiksha জেডিসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি অবসর সুবিধার আবেদন শুধুই অনলাইনে, দালাল ধরবেন না(ভিডিও) - dainik shiksha অবসর সুবিধার আবেদন শুধুই অনলাইনে, দালাল ধরবেন না(ভিডিও) দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website