ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব হবে - বিশ্ববিদ্যালয় - Dainikshiksha

প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশন আইনইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব হবে

মুসতাক আহমদ |

প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা আইনটি বাস্তবায়ন করা হলে খর্ব হবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন। দেড় শতাধিক সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য ক্ষমতা বাড়াতে আট বছর আগে ইউজিসি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

কিন্তু দীর্ঘ টানাহেঁচড়া শেষে প্রণীত খসড়া আইনে যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানটি অনেকটাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি অধিদফতরে পরিণত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, আগে যেসব বিষয়ে ইউজিসি সিদ্ধান্ত দিত- খসড়া অনুযায়ী, সেগুলোর ক্ষেত্রে এখন প্রাক-অনুমোদন দেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংস্থাটির প্রধানের পদেও অশিক্ষক বা সরকারি আমলা পদায়নের রাস্তা খুলে রাখা হয়েছে। সচিব পদ নিয়ে যাওয়া হয়েছে কমিশনের বাইরে।

এ ছাড়া বেশ কয়েকটি বিধানে অস্পষ্ট ও স্ববিরোধী নির্দেশনা আছে। তবে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে এতে কয়েকটি কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।

গত ২৬ আগস্ট প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন আইন, ২০১৮’ অনুমোদন দেয়া হয়। অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ আইনের খসড়া তৈরি করে। প্রক্রিয়া অনুযায়ী এটি এখন মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। এরপর পাসের জন্য যাবে সংসদে।

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান এ প্রসঙ্গে বলেন, ১৯৭৩ সালে মাত্র ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ইউজিসির যাত্রা শুরু হয়। দেশে বর্তমানে ৪৮টি সরকারি এবং ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এগুলোর অ্যাপেক্সবডি হিসেবে যে আইনি ক্ষমতা থাকার দরকার ছিল, তা বিদ্যমান অধ্যাদেশে অনুপস্থিত।

এ কারণে নতুন আইনের অধীনে উচ্চশিক্ষা কমিশন (হেক) গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু চিন্তা করেছিলেন স্বায়ত্তশাসন না থাকলে উচ্চশিক্ষা থাকে না। তাই তিনি ১৯৭৩ সালেই ইউজিসিকে স্বায়ত্তশাসন দেন ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানরূপে এটিকে গঠন করেন।

শুধু তাই নয়, ওই সময়ে যে কটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন তৈরি হয়েছে, সব কটিকে তিনি (বঙ্গবন্ধু) স্বায়ত্তশাসন দিয়েছেন। কিন্তু আমি বিস্মিত যে বঙ্গবন্ধুর হাতে তৈরি প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন খর্ব করার প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের হাত একটুও কাঁপল না। তবে আমার বিশ্বাস- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাচেতনা পরিপন্থী কিছু হবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশন আইনে ‘নামকাওয়াস্তে’ স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ সৃষ্টি, বিষয়/বিভাগ/ইন্সটিটিউট খোলা, অর্থ বরাদ্দসহ বিভিন্ন কাজ ইউজিসি করে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুমোদন, বিভাগ-বিষয় খোলা বা স্থগিত/বাতিল ইত্যাদি করে ইউজিসি। কিন্তু প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন লাগবে। ইউজিসি নিজস্ব পদ সৃষ্টি, যোগ্যতা নির্ধারণ ও নিয়োগের বিষয়েও পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

বর্তমানে এসব বিষয়ে ইউজিসিই সিদ্ধান্ত নেয়। উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম কমিশন সরাসরি নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবই চ্যান্সেলরের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

আবার প্রস্তাবিত কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে, কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারবে না। এটা নেবে মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, মন্ত্রণালয় কমিশনের সুপারিশ মানতে বাধ্য নয়। পরিদর্শন ও তদন্ত বিষয়ে সরকার যেমন মনে করবে, তেমন ব্যবস্থা নিতে পারবে। অথচ আইনে কমিশনকে সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু ইউজিসিই নয়, প্রস্তাবিত আইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন খর্ব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শর্তাবলি কমিশন নির্ধারণ করবে। অথচ বর্তমানে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় এটা নির্ধারণ করে।

বিদ্যমান বিধান বহাল রেখে প্রস্তাবিত আইনেও সংস্থার চেয়ারম্যান এবং ৫ জন পূর্ণকালীন সদস্য রাখা হয়েছে। এতে প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩ জন খণ্ডকালীন সদস্য রাখার কথা বলা হয়েছে। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনজন সচিব খণ্ডকালীন সদস্য থাকবেন। এ ছাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩ জন ভিসি এবং ৩ জন ডিন সদস্য নিয়োগ পাবেন। চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।

বর্তমানে শুধু শিক্ষাবিদরাই কমিশনের চেয়ারম্যান হতে পারেন। প্রস্তাবিত আইনে আমলা নিয়োগের পথ খোলা রেখে বলা হয়েছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষক, গবেষক বা প্রশাসক হিসেবে শিক্ষা ক্ষেত্রে খ্যাতিমান ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বরা চেয়ারম্যান হতে পারবেন।

চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা রাষ্ট্রপতি নির্ধারণ করবেন। তবে ইউজিসি থেকে পাঠানো সব খসড়ায় চেয়ারম্যান একজন পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা পাবেন বলে প্রস্তাব করা হয়েছিল। এ ছাড়া স্থায়ী ৫ সদস্য প্রতিমন্ত্রীর এবং কমিশনের সচিব সরকারের সচিবের মর্যাদা পাবেন বলে প্রস্তাব ছিল।

সচিব কমিটির বৈঠকে ওইসব প্রস্তাব কাটছাঁট করা হয় বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। তবে চেয়ারম্যান অপসারণে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি অপসারণের পদ্ধতি ও কারণ অনুসৃত হবে। আর পূর্ণকালীন সদস্যরা রাষ্ট্রপতির সন্তোষ অনুযায়ী স্বপদে বহাল থাকবেন।

বর্তমানে ইউজিসির পরিচালকদের মধ্য থেকে একজনকে ইউজিসির সচিব করা হয়। এটাও আমলাদের দখলে নেয়ার প্রস্তাব করে বলা হয়েছে, কমিশনের সচিব সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন।

এমন সব প্রস্তাবিত বিধানের কারণে ইউজিসি কর্মকর্তারা বলছেন, এত চেষ্টার পর যেই সংস্থা হতে যাচ্ছে, তা আগের মতোই ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ হবে। নাম পরিবর্তন ছাড়া আর কিছুই হবে না। বর্তমানে ইউজিসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হলেও স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা ভোগ করছে। কিন্তু হেক গঠিত হলেও সেটাও থাকবে না।

আইনে কয়েকটি অস্পষ্টতা আছে। খণ্ডকালীন সদস্য নিয়োগে কোন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় বিবেচিত হবে, তা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। ফলে আইন না মানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়োগ পাবে কিনা, সেটা স্পষ্ট নয়। খসড়ার ১৪ নম্বর ধারায় পরামর্শক/উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান আছে। কিন্তু কোথায় এরা নিয়োগ পাবেন, তা পরিষ্কার নয়।

খসড়ায় কিছু কঠোর বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে কমিশনের সুপারিশ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অনুসরণ ও প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে (কমিশন) প্রোগ্রাম/বিভাগের অনুমোদন বাতিল, শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারবে।

উল্লেখ্য, একের পর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে ইউজিসি অধ্যাদেশ সংশোধন করে সংস্থাটিকে আরও ক্ষমতায়িত করার প্রস্তাব আসে। এরপর ২০১০ সাল থেকে একাধিক খসড়া আইন তৈরি হয়। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, উৎকর্ষ সাধন এবং বিস্তৃতির লক্ষ্যে ইউজিসিকে উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তরের ঘোষণা দেন।

এরপর ২০১৩ সালের ১০ জুলাই আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক সভায় আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। পরে নীতিগত অনুমোদনের জন্য ওই খসড়া মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপিত হলে তা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ফের পাঠানো হয়। সেটিই এখন মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য সচিব কমিটি অনুমোদন দিল।

 

 

সৌজন্যে: যুগান্তর

সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর - dainik shiksha সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু - dainik shiksha অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে - dainik shiksha ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ - dainik shiksha দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website