উনিশের ভাগ্যবান বড়ভাইয়ের ফেরা - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

উনিশের ভাগ্যবান বড়ভাইয়ের ফেরা

আহসান কবির |

চতুর্থ জুলাইকে খুঁজছিলাম বহু বছর পর। কভিক আর কোভিদ প্রায় কাছাকাছি নাম। রন কোভিক জন্মেছিলেন ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা জুলাই। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মেরিন সেনা সার্জেন্ট রন কোভিক আহত হন, প্যারালাইসিস হয়ে যায় তার! এরপরে জীবন আর বেঁচে থাকার যুদ্ধটা তার কাছে অন্যরকম হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে অ্যাকাডেমি আওয়ার্ড জেতা মুভি- বর্ন অন দ্য ফোর্থ অব জুলাই চাইলে কেউ দেখে নিতে পারেন। টম ক্রুজের প্রথমদিকের খুব আলোচিত ছবি এটা।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে করোনাজয়ের খুশীতে কবির ভাইয়ের সাথে সেলফিতে সিদ্দিকুর রহমান খান  মুরাদ মজুমদার ও রাজু ভাই। 

এই ছবিটা খুঁজে ফেরার কারণ শুধু চার জুলাই নয় আসল কারণ করোনা। ২৯শে জুন পরীক্ষা করতে দেয়ার পর ২রা জুলাই রাতে জানতে পারি আমার করোনা পজেটিভ। এটা আমার হ্যাটট্রিক চান্স! ২০১৩-তে হয়েছিল ডেঙ্গু আর ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে  চিকুনগুনিয়া। নতুন কোনো রোগ আসবে আর আমার হরে না এটা হতেই পারে না। চলতি বছরের জুলাইতে এসে জানলাম আমার করোনা পজেটিভ! বীরের মতো বাসাতেই ছিলাম ৫ই জুলাই পর্যন্ত! বর্ন অন দ্য ফোর্থ অব জুলাই দেখেছিলাম জুলাইয়ের চারে কিন্তু সবকিছু বদলে গেল পরদিন সন্ধ্যায়।

২রা জুলাই অবশ্য চার লাইন লিখে পেইজে দিয়েছিলাম-
করোনা তোমাকে নেগেটিভ রেখে আমাকে করেছে পজেটিভ তোমারও দুয়ারে জমা রেখে এসেছি সবগুলো মঙ্গলদীপ..
 যদি পারো একটু রেখো গানের রাখাল সুর
আর হলো না শেষ দেখাটা দুঃখী জামালপুর ...

কবিতার কথা কেউ বুঝলো কেউ বুঝলো না! কিন্তু ৫ই জুলাই সন্ধ্যার পর একসাথে চলে এলো মাইক টাইসন, জো ফ্রেজিয়ার আর মোহাম্মদ আলী। বুকে পিঠে চেপে বসল যেন এই তিন হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। আমি শ্বাস নিতে পারছিলাম না। বুঝতে পারলাম না এখন কি করা উচিত?

ভয় নাকি পাওয়া যাবে না, মনোবল হারানো যাবে না, সাহস রাখতে হবে, গরম জলে গলা পরিষ্কার, গার্গল করা, পুষ্টিকর খাবার আর ভিটামিন-সি খাওয়াসহ আরো কতকিছু যে মুহূর্তেই ‘নাই’ হয়ে গেল শ্বাসকষ্টের কাছে! বিটিভির জনপ্রিয় সিরিয়াল সংশপ্তক নাটকের গানটা মনে পড়লো হঠাৎ- দমে জীবন দমে মরণ/ যবর দমের খেলা/ জগতের এই জেল হাজতে কেনে ফাটক দিলা? ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গানটাও মনে পড়ে গেল কিন্তু বুকে বালিশ দিয়ে শুয়ে, দাঁড়িয়ে, হেঁটে বা বসে থেকে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হলো না কিছুতেই!

মোহাম্মদ আলী, জো ফ্রেজিয়ার আর মাইক টাইসনের মতো হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নরা কিছুতেই নামলো না বুক আর পিঠ থেকে। এভাবেই তাহলে শ্বাস বন্ধ হয়ে শেষ যাত্রায় শামিল হতে হবে? ২রা জুলাই একটা সেভ আওয়ার সোল বা এসওএস মার্কা একটা ছোট্ট এসএমএস রেডি করে রেখেছিলাম। জানি না শ্বাসকষ্টের সেই জীবন মরণ দুঃসময়ে কাকে কাকে এই মেসেজটা পাঠিয়েছি! এসএমএসটা ছিল এমন- শ্বাস নিতে পারছি না, মরে যাচ্ছি!

আমেরিকায় সাদা পুলিশের হাঁটু চাপায় নিহত জর্জ ফ্লয়েডের কথাটাও মনে পড়লো! মৃত্যুর আগে জর্জ বলেছিল- আমি শ্বাস নিতে পারছি না! তখন এটাও ভাবনায় এসেছিল যে- 

করোনা

বিধাতার মতো তুমিও কি সাদা?
আমি কালো! চারিদিকে কেন এতো নিয়তির বাধা?

শ্বাস প্রশ্বাস তবু ঠিক হলো না দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো! কতক্ষণ এরপর বাসায় ছিলাম স্মৃতিতে নেই! মনে আছে ছয় তলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিলাম। হাতে ব্যাগ সেখানে রাতে পড়ার পোশাক আছে কিন্তু মোবাইলের চার্জার হয়তো নেই! পকেটে মানিব্যাগ আছে কিন্তু মাত্র ১৮ হাজারের বেশি টাকা হয়তো নেই! কোথায় যাব, কোনো হাসপাতালে ভর্তি হব তখনও জানি না! আমি চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুতেই স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে পারছিলাম না। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে দেখি আমার গাড়ি সঙ্গী রাজু ভাই দাঁড়ানো। সে আমাকে দেখে জানতে চাইলো- ভাইয়া আপনার চোখ এতো লাল কেন? কি হয়েছে? শ্বাসকষ্টের এই সময়টাতেও মনে পড়লো নির্মলেন্দু গুণের কবিতা- বাইরে থেকে দরোজা খুলতে খুলতে আমি ক্লান্ত! আমি চাই কেউ ভেতর থেকে দরোজা খুলে দেয়ার পর বলুক- তোমার চোখ এতো লাল কেন?

লাল চোখ নিয়ে কি বসে পড়লাম খোলা রাস্তার এক বিদ্যুতের খুঁটির নিচে? ইচ্ছে করেই খাম্বা শব্দটি ব্যবহার করলাম না! জল আর পানির নাকি আলাদা ধর্ম আছে! খুঁটি আর খাম্বারও নাকি আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় আছে। সে যাই হোক নায়ক রাজ রাজ্জাকের রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন্সের সেই বিখ্যাত ছবিটার কথা কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো। এঁকে দিয়েছিলেন সম্ভবত অভিনেতা ও বিখ্যাত পরিচালক সুভাষ দত্ত। দম বন্ধ হয়ে আসছে। এসএমএস পাঠানোর কারণে মোবাইলে রিং আসছে অনবরত। আমি রিসিভ করছি কিন্তু কোন কথা বলতে পারছি না। দম বন্ধ কথা বন্ধ তারপর? অনিশ্চিত শেষ যাত্রার পর মানুষ কোথায় যায়? পাখিরা কোথায় যায়? এত ফুল কোথায় হারায়?

হাসপাতল থেকে নেমেই কবির ভাই বললেন, ‘বাসায় ওঠার আগে তিনভাই কফি খাবো। বাসার গলিতে কফি হাতে দাঁড়িয়ে। ছবি: মুরাদ মজুমদার। 

মোবাইল রিসিভ করা শুরু করলাম! কিন্তু কথা বলতে পারছি না, উত্তর দিতে পারছি না! কেউ একজন বলল- তার নাম সাদেক! আমাকে যেতে হবে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ধীরাজ আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। আমি কথা বলতে পারছি না তবুও রিং বাজছে। রিসিভ করি কেউ একজন বলে তার নাম হামিম। ইমপালস হাসপাতালে যেতে বলেছে সে আমায়।

নাট্য পরিচালক ও অভিনেতা সাজ্জাদ হোসেন দোদুল জানায় তার সাজেশন ঢাকা মেডিকেল। বৈশাখী টেলিভিশন থেকে সাইফুল ভাইয়ের সাজেশন হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে যাওয়ার। একজন বলে আমি যেন কোনও দ্বিধা না করে রিজেন্ট হাসপাতালে ভর্তি হই। এই একজনের নামও আমার মনে ছিল, এখন আর না বলি। কোথায় যাব তা নিজেও জানতাম না। পাখি কখনো বলতে পারে না সূর্যোদয়ের ঠিক কতক্ষণ পর সে খাবারের সন্ধান পাবে। আবারো ফোন এলো। তখন আমি রিসিভ করতেও পারছি না, কথা তো আগেই বন্ধ ছিল। ল্যাম্পপোস্টের নিচে এক হাঁটুর উপর মাথা রেখে বসে আছি। হঠাৎ একটা মোটরসাইকেল এসে থামল! মোটরসাইকেল থেকে নেমে আমার হাত থেকে ছেলেটা সরাসরি আমার মোবাইলটা নিয়ে কলটা রিসিভ করলো!

আমাকে একটা সিএনজিতে তুললো এই ছেলেটাই। সে আমার ভাই। আপনের চেয়েও আপন। নাম তার মুরাদ মজুমদার। সে আমাকে জানালো দৈনিক শিক্ষার সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান খান তাকে পাঠিয়েছেন। মুরাদের ভাষ্যমতে- মোবাইলে কলটা করেছেন বিআইডব্লিউটি-এর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক। তার নির্দেশে সে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে...

আমি কোনমতে সিএনজির ভেতরে গিয়ে বসলাম। কীভাবে বসলাম সেটা এখন আর মনে নেই। আমি সম্ভবত চেতন আর অবচেতনের মাঝের যে ঘোর সেই ঘোরের রাজ্যে ঢুকে পড়েছিলাম। কথা বলতে পারছিলাম না শ্বাস নিতে পারছিলাম না বেশ খানিকক্ষণ আগে থেকেই। মনে হচ্ছিল হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নরা তখনও চেপে বসে আছে আমার বুক আর পিঠে।

এরপর কোথায় যে চলে গেলাম! কতক্ষণ আমার স্মৃতি ছিল না? ততক্ষণ আমি কোথায় ছিলাম? বেঁচে থাকা আর না থাকার মাঝের জগৎটাকে কি বলে? ঘোর? অবচেতন বা অজ্ঞান? কি বলে সেটাকে? আমি কি সেই অজানা জগতে চলে গিয়েছিলাম? যখন ফিরে এলাম চেনা জগতে তখন রাত প্রায় একটা! ৬ই জুলাই হয়ে গেছে ঘড়ির কাঁটায়। ডাক্তার নার্স ওয়ার্ডবয় ক্লিনার সব যেন আমার রুমে ভেঙে পড়েছে! মাঝের সময়টাতে কোথায় ছিলাম জানি না! খানিক বুঝতে পারার পর দেখলাম আমাকে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে, আমি বেঁচে আছি। তুই একবার এসে দেখে যা নিখিলেশ কী রকমভাবে বেঁচে আছি আমি!

ডাক্তার নার্সদের ভিড়ের মাঝেই মুরাদ আর রাজু ভাই ইশারায় বিদায় নিয়ে চলে গেল। যাবার আগে মুরাদ জানিয়ে গেল-কমোডর সাদেক সাহেব সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন! আগামীকাল থেকে আপনার হাসপাতাল ত্যাগ পর্যন্ত সময়টাতে আপনার দেখভাল করবেন ধীরাজ চাকমা। তিনি সম্ভবত আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল এ জব করেন।

আমি বেঁচে আছি বলে বেঁচে থাকার স্বাদটা অনুভব করার চেষ্টা করলাম। খানিক পরে নার্স এসে জানালো আমার কেবিন নম্বর ৬৩০। একেবারে করিডোরের শেষ কোনার কেবিন। সাদা পিপিই পরা নার্স বললো- “অনেকগুলো ওষুধ খেতে হবে তার আগে রাতের খাবার! নাটকে আপনাকে যতোটা হাসির মানুষ মনে হয় বাস্তবে মনে হচ্ছে আপনি পুরো উল্টো! কথা বললে ভিলেনের মতো বুকে বেঁধে, আমার ভয় লাগে! আমি তাকে বুঝতে দিলাম না যে জীবন নিয়ে নিজেই ভয়ে আছি! বাঁচার জন্য আমাকে অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। মাঝখানের সময়টাতে কোথায় ছিলাম কেমন ছিলাম জানতে চাইলাম নার্সের কাছে। সরাসরি সে কিছু না বলেই চলে গেল রাতের খাবার আনতে।

রাত তখন প্রায় দুটো। এরপর রাতের খাবার আর অগণিত ওষুধ খাওয়া। সেই সাথে হাতে ক্যানোলা ফিট করে ইনজেকশন নেয়া। মজার ব্যাপার হচ্ছে নাভির কাছেও ইনজেকশন দেয়া হলো! আমি বুঝতে পারলাম না কুকুরে কামড়ানোর সাথে কি করোনার কোন সম্পর্ক আছে? শুনেছিলাম কুকুরে কামড়ালে নাকি নাভির গোড়ায় ইনজেকশন দেয়া হতো! এখন দেখছি করোনা হলেও নাভির গোড়ায় ইনজেকশন দিতে হয়! ওষুধ ইনজেকশন এর পরে কেউ থাকলো না কেবিনে। কেবিন ভর্তি যেন অক্সিজেনের গন্ধ, শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ! বাঁচা মরার মাঝের একটা পরিবেশ। গানে থাকা সেই প্রশ্নটা জাগলো- জগতেরই জেলহাজতে কেনে ফাটক দিলা? মুরাদের চলে যাওয়ার মতো ঘুম যেন কোথায় চলে গেল! হাসপাতালের বেডে অক্সিজেন আক্রান্ত হয়েই রাত কাটালো আমার। ঘুমের অপেক্ষা করা ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না! মাঝে মাঝে নার্স ও ওয়ার্ডবয়দের কথাবার্তা কানে আসতো, শোনারও চেষ্টা করতাম। তাদের আলোচনা থেকে জানা যেতো আইসিইউ-সিসিইউ আর এইচডিইউতে কতজন মারা গেছেন! প্রতিদিন এভাবেই জেনে যেতাম নীরবে! কখনো হিসাব মেলাতে চাইনি প্রতিদিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে ব্রিফিং করে, সেখানে যে মৃত্যুর সংখ্যা জানানো হয় সেখানে এই হাসপাতলে মৃতদের সংখ্যা যোগ হয় কিনা! ভাবলাম মরে গেলে আমিও কি নিছক একটা সংখ্যা হয়ে যাব?

৫ই জুলাই এর মত ৬ই জুলাই পেরিয়ে রাত বারোটা। মোবাইলে তখন ৭ই জুলাই! আমাদের সাত ভাই বোনের ভেতরে কারো প্রথম বাচ্চা অর্থাৎ পরের প্রজন্ম, আমার মেজ বোনের ছেলে প্রথম পৃথিবীতে এসেছিল। গালিব আদনান সিয়ামকে যখন জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর চেষ্টা করছি মোবাইলে, তখন পিপিই পরা নার্স আসলো, প্রেসার ডায়াবেটিস মাপা হলো। খুব নীরব নীরব একটা মিউজিক ভেসে আসছিল। মনে হলো গানটা খুব পরিচিত- আমার সারা দেহ খেওগো মাটি শুধু চোখ দুটি মাটি খেয়ো না আমি মরে গেলেও তারে দেখার সাধ মিটবে না গো মিটবে না... আমার তাকানো দেখে নার্স হয়তো বুঝতে পারলো। বললো- এন্ড্রু কিশোরের বিখ্যাত গান! উনি আজ মারা গেছেন! আমার পৃথিবী কেমন যেন হয়ে গেল! ক্লাস এইট নাইন থেকে এই মানুষটার গান শুনতে শুনতে বড় হয়েছি ! মানুষটা পাখি হয়ে আজ উড়ে গেল... ভেঙ্গেছে পিঞ্জর/ মেলেছে ডানা /উড়েছে পাখি /পথ অচেনা /নীড়েরই ঠিকানা পাবে কিনা/ পাখি তা নিজেই জানে না..

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে। ছবি: মুরাদ মজুমদার 

কত গান যে মনে পড়লো! এন্ড্রু কিশোর দা জানলেন না সে রাতে আমার ঘুম আসলো না... তাঁকে নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম হাসপাতালে থাকতেই। হাসপাতাল থেকে চলে আসার পরে লেখাটা শেষ হয়েছিল! কখনো মোবাইলে, কখনো সাদা কাগজে, কখনো প্রেসক্রিপশনের উল্টোদিকে তাঁর স্মৃতি লিখে রাখতাম। কম্পিউটার এর বাইরে বহু বছর পরে এভাবেই লিখলাম এন্ড্রুদাকে নিয়ে...ভাবলাম জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প... এটা কি আমার জীবনের জন্যও?

৮ই জুলাই সকালে মনে হলো অক্সিজেন ছাড়াই কি বেঁচে থাকা সম্ভব? অন্তত একটু চেষ্টা তো করা যায় যেভাবে এতদিন ছিলাম! ডাক্তার আর নার্সের সাথে কথা বলে অক্সিজেন খুলে রাখলাম! আমি বিছানা থেকে নেমে হাঁটা শুরু করতেই পৃথিবী দুলে উঠলো। মনে মনে ভাবলাম আপাতত বিছানাই ঠিকানা আমার। একবার মনে হয় কষ্ট হচ্ছে অক্সিজেন লাগবে আরেকবার মনে হতে থাকল অক্সিজেন ছাড়াই অভ্যাস করি না কেন আগের মতো? ভয় নাকি সব সময় মানুষকে পেছনে ঠেলে দেয় আমি দেয়াল ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। এরপরে একবার দেয়ালের কাছে যাই একবার বিছানার কাছে আসি। ট্রেনিংয়ের সময় যেমন করে বলা হতো ‘টাচ অ্যান্ড ব্যাক’! খুব অল্প জায়গা কেবিন এর দেয়াল আর বিছানার মাঝে। খুব অল্প সময় হাঁটার ফলাফল হল সুন্দর। তিনদিনের জমিয়ে রাখা ঘুম চলে এলো। অক্সিজেন ছাড়া ঘুম কেবিন নিঝুম! হয়তো খানিক পরে ডাক্তার আর নার্সের আগমনে ঘুম ভাঙলো। ৮ই জুলাই সিদ্ধান্ত নিলাম কেবিন ছেড়ে বের হতে হবে, হাঁটতে হবে কিন্তু যদি পড়ে যাই? এক ওয়ার্ডবয়কে বললাম। সে আমার সাথে হাঁটতে রাজি হলো। বেদনার শুরু অনেকটা সেখান থেকেই।

করিডোরে হাঁটি। কেবিনে কেবিনে শ্বাসকষ্টের মানুষ দেখি! আমার কেবিন থেকে একটু দূরেই আইসিইউ-সিসিইউ এবং এইচডিইউ। সেখানেও লাইফ সাপোর্টে মানুষ। হাঁটতে হাঁটতেই দেখি একজন মারা গিয়েছেন। তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া হচ্ছে। মনে হয় মানুষটার কপালে হাত রাখি। হয়তো শেষ যাত্রায় আত্মীয়-স্বজন তেমন থাকবে না কেউ। পিপিই পরা কয়েকজন অচেনা কিন্তু মানবিক মানুষ হয়তো তার শেষ যাত্রায় অংশ নেবে। শ্বাসকষ্ট আবারও যেন অনুভব করলাম বুকের ভেতর। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম হাসপাতালের একেবারে সামনের দিকে। ছয় তলার উপর থেকে মূল রাস্তাটা খুব ভালো লাগলো। বৃষ্টি হচ্ছে। অগণিত ট্রাক, মাইক্রো, বাস মিনিবাস, মোটরসাইকেল, সিএনজি চলছে রাস্তায়। উপর থেকে রাস্তা, বৃষ্টি আর যানবাহন চলাচল করে অপার্থিব মনে হলো। কোনো একটা রুম থেকে গান ভেসে আসছে। যে রুমে বিশ্রাম নেয় নার্সরা হয়তো সেখান থেকেই। আমি বুঝতে পারি এই গান অনেক পরিচিত আমার। এন্ড্রু কিশোরের- জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প... মানুষ যায় মানুষ আসে গল্প শেষ হয় না কিংবা মানুষ নিজেই গল্প হয়ে যায়।

৮ই জুলাই রাতেও ঘুম এলো ঠিকঠাক। ৯ই জুলাই শুরু হল অন্য রকম ভাবে! এই হাসপাতালে এসে একটা ছেলে যে কিনা বয়সে আমার চেয়ে ছোট তার সাথে পরিচয় হয়েছিল। কথায় কথায় সে বলেছিল ক্যাডেট কলেজ ক্লাবটা তার অনেক ভালো লাগে। সেরে উঠলে আমার সাথে সে ক্যাডেট কলেজ ক্লাবে যাবে! ৯ই জুলাই ঘুম থেকে জেগে জানলাম সেই ছেলেটার ঘুম ভাঙেনি! সে ঘুমের ভেতর চলে গেছে অন্য কোথাও, অন্য কোনো খানে! সময়ের ভুল ট্রেন নিয়ে যায় প্রিয়মুখ আমরা পরে থাকি পেছনে!

করোনার সময় হাসপাতাল, ডাক্তার আর নার্সদের নিয়ে ভিন্ন ধারণা পোষণ করতাম। ভাবতাম হাসপাতালের ডাক্তার বা নার্স, ওয়ার্ডবয়রা করোনা রোগীর ঠিকমতো দেখভাল করে না। হয়তোবা ভয়ে কিংবা এই রোগের প্রকোপ থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে। একই সাথে তারা হয়তো চাকরিটাও টিকিয়ে রাখতে চায়। অবশ্য প্রথম দিন আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তির পর এই আশঙ্কা কেটে গিয়েছিল। এখানকার ডাক্তার, নার্স ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষরা নিয়ম করে ঘড়ির সময় ধরে ধরে দায়িত্ব পালন করতেন।

মনে পড়লো অভিনেতা ডা. এজাজ আহমেদের কথা। হুমায়ূন আহমেদের অনেকগুলো নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি।তার মতে- “যতো টাকা ততো সেবা।” সরকারি হাসপাতালের সেবা তখনই পাওয়া যায় যখন কারো ক্ষমতা থাকে!

আমি এই প্রথম হাসপাতালের বিল নিয়ে ভাবা শুরু করলাম। প্রতিদিন কত টাকা বিল জমা হয়? ২৫ না ৩০ হাজার? কতো লাখের বিনিময়ে এখান থেকে বেঁচে ফেরা যাবে? তখনই মনে হল আমার মানিব্যাগ আছে কিন্তু সম্ভবত মানিব্যাগে আর কোন টাকা নেই!
মনের ভেতরে যখন বিল নিয়ে এমন ভাবনা তখন ৯ জুলাই। আবারো ঠিক সেই টেলিফোন পেলাম- ‘বড় ভাই আমি কমোডর গোলাম সাদেক! বড় ভাই এখন কেমন আছিস? আমি হার্টবিট মিস করি, বিলের কথা খুব বেশি মনে হয়! সাদেক বলে- ‘বড় ভাই ধরে নে তুই যেদিন ভর্তি হয়েছিস সেদিন তোর বিল পে করা হয়ে গেছে! এরপর বিয়ে করতে চাইলেও সেই দায় দায়িত্ব আমাদের! শুধু টেনশন করিস না প্লিজ!’

এরপর হয়তো টেনশন কমানোর কাজ শুরু হলো। আমি বুঝতে পারলাম না কেন ক্রমাগত এত টেলিফোন আসতে থাকলো! এক সময় বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কিছুদিন চাকরি করেছিলাম। পরিচিতদের মধ্যে কমোডর জাকির, আজিম ক্যাপ্টেন কামাল নাসের মোহাম্মদ আলী এবং আরশাদ কবীর টেলিফোন করতো নিয়ম করে। অলিউল্লাহ স্বপন কিংবা আমার ভাই কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) নাসের ও কথা বলতো নিয়মিত! আমার সাথে কথা বলার যে রেকর্ড ক্যাপ্টেন কামাল নাসের করেছে সেটা মনে হয় কেউ ভাঙতে পারবে না!
যে মানুষগুলোর সাথে আমার বহু বহুদিন কোন যোগাযোগ ছিল না সেই মানুষরাই ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার জন্য! হাসপাতালের দিনগুলোতে তখন আর এই মানুষগুলোকে মানুষ মনে হতো না! মনে হতো আমার জন্য পৃথিবীতে কিছু ফেরেশতা নেমে এসেছে!
৯, ১০, ১১ এবং ১২ই জুলাই মানুষরূপী ফেরেশতাদের ভালোবাসা নেমে আসতে থাকলো ক্রমাগত! করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ে আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধু ফখরুল, কাসেম, মাহবুব, আর মইন, ক্যাডেট কলেজ ক্লাবের জেনারেল সেক্রেটারি জসিম আল আমিন, কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের প্রথম ব্যাচের আশরাফ, বরিশাল ক্যাডেট কলেজের হাসিবুর রহমান শাহিন, ঢাকার সিভিল সার্জন ডা. মাইনুল হোসেন বাপ্পি এবং ডা. হাসান শাহরিয়ার কল্লোলসহ আরো অগণিত ভালোবাসার মানুষ, আমার পাঁচ বোন ও তাদের ছেলে মেয়েরা আমার খোঁজখবর রেখেছেন। বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক টিপু আলম মিলন, বার্তা প্রধান অশোক চৌধুরী, সাইফুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান পলাশ, জাহাঙ্গীর অরুন, লিটু সোলায়মান, মামুন লাচ্চু, রাসেলসহ অনেকেই আমার খোঁজখবর রেখেছেন। অভিনয় ও গানের জগতের অনেক মানুষ আমার জন্য প্রার্থনা করেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব থেকেছেন। সাংবাদিকতা করতেন এখন সরকারি চাকরি করেন ইকবাল ভাই, দৈনিক শিক্ষার সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান খান প্রতিদিন আমার খোঁজখবর নিয়েছেন, ওষুধ-খাবার পাঠিয়েছেন। আমি শুধু এইসব মানুষের ভালোবাসার কাছে ঋণী।

এই ভালোবাসার ঋণ আমি আজীবন বয়ে বেড়াবো। কমোডর সাদেক এর কথামতো (ভালোবাসার ঠিক সময়োপযোগী নির্দেশ) ভর্তি হয়েছিলাম আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। পুরোটা সময় আমার দেখভাল করেছে ধীরাজ চাকমা। কামাল নাসেরের মতো কতবার যে জানতে চেয়েছে আমি কেমন আছি! ১২ই জুলাই রাতে হাসপাতাল ছাড়ার সময় আমাকে নিতে এসেছিলেন দৈনিক শিক্ষার সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান খান। মুরাদ এসেছিল হাসপাতালে ভর্তি এবং হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার সময়েও! মানি ব্যাগে কোনো টাকা ছিল না, হাসপাতালের বিলও আমাকে দিতে হয়নি!

হাসপাতাল থেকে বেঁচে ফেরার স্মৃতি আজীবন বয়ে বেড়াবো আমি! মনে হয় ভূপেন হাজারিকার গানটাই সত্য। মানুষ মানুষের জন্য/জীবন জীবনের জন্য! একটু সহানুভূতি মানুষ কী পেতে পারে না? মনে হয় কবিতাটা সত্য। দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে!

দ্বিধাহীনভাবে বলতে চাই- সবার কপাল আমার মত বড় নয়! আমার সারা মাথা কপাল! আমি মহান সৃষ্টিকর্তার ইশারায় শুধু বন্ধুদের জন্য জীবিত ফিরতে পেরেছি। বরিশাল ক্যাডেট কলেজ থেকে বেরিয়ে ১৪তম লং কোর্সের সাথে আমার জয়েন করার কথা ছিল। আমার সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ১৬তম লং কোর্সের সাথে নৌবাহিনীতে যোগদানের সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু বিধি বাম! সেখানেও ঠাঁই হয়নি হাত ভাঙ্গার কারণে! দীর্ঘদিন বাইরে থাকতে হয়েছিল আমাকে। পরে কম্বাইন্ড মিলিটারি ট্রেনিং শেষ করেছিলাম ১৯তম বিএমএ লং কোর্সের সাথে। এরপর নৌবাহিনীতে ফিরলেও পরস্পরের সাথে চেনা জানা বা পুরোপুরি পরিচিত হওয়ার আগেই সাড়ে চার বছর পর ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে জুলাই (ভয়াবহ জলোচ্ছসের কিছুদিন পর) আমি নৌ বাহিনী থেকে চাকরি হারাই। প্রায় ২৯ বছর পরের আরেক জুলাই এ কোভিড-১৯ আমাকে ১৯তম বিএমএ লং কোর্সের বন্ধুদের সামনে আরেকবার দাঁড় করিয়ে দিলো!

আমি এই বন্ধুত্বের কল্যাণে যেন জীবন ফিরে পেলাম! হোক সেটা ব্রিগেডিয়ার খলিল, হোক সেটা মইন, হোক সেটা শাম্মি ফিরোজ, হোক সেটা রহমত, এলাহী, উমর মবিন কিংবা এজাজ, এরকম অগণিত বন্ধুদের কথা আমি বলতে পারবো যাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই আমাকে জীবনে ফিরিয়ে এনেছে!

আগেই বলেছি আমার মতো এরকম কপাল কারো নেই। এ কারণে সবাই ফেরে না, আমার মতো কেউ কেউ ফিরতে পারে জীবনে!
বন্ধুদের এই ভালোবাসা নিয়েই বাকিটা জীবন বাঁচতে চাই। ভালো থেকো বন্ধুরা। আমি ভালো আছি উনিশের সবচেয়ে ভাগ্যবান বড়ভাই হয়ে...।

লেখক: আহসান কবির, সাংবাদিক, অভিনেতা, রম্যলেখক। 

জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের - dainik shiksha জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি - dainik shiksha জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website