উৎসব বোনাস : প্রসঙ্গ ও অপ্রসঙ্গ - মতামত - Dainikshiksha

উৎসব বোনাস : প্রসঙ্গ ও অপ্রসঙ্গ

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীগণ পবিত্র মাহে রমজানটা কী রকমে অতিবাহিত করেন, সেটা খুব জানতে ইচ্ছে করে । সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর জীবনলিপিটা যদি আলাদা করে জানবার সুযোগ থাকত! জানি, তারা  ভাল নেই । মনের ভেতর অনেক কষ্ট । কষ্ট বুকে নিয়ে আর এগারটি মাসের মত রমজানটাও পার করেন তারা । করুণাময়ের রহমত, মাগফেরাত আর নাজাতের আশায় রমজানের সিয়াম সাধনা করেন । তারা জানেন, পরম করুণাময় আল্লাহ পাক সোবহানাহু ওয়াতা'লা তাদের উত্তম প্রতিদান দিয়ে পুরস্কৃত করবেন । স্রষ্টার অপার ও অফুরন্ত নেয়ামত থেকে তারা কোনদিন বঞ্চিত হবেন না । হতে পারেন না । অসীম দয়াময়, অনন্ত দাতা ও পরম দয়ালু আল্লাহ পাক তাদের আশা-ভরসার শেষ ঠিকানা। তিনি অকৃপণ হস্তে তার বান্দাদের মাঝে সওগাত বিলিয়ে দেন । বিশেষ করে রমজান মাসে তো বটে । 

সরকারি-বেসরকারি বলে আমাদের দেশে শিক্ষকদের মাঝে যে ফারাক, সেটি গোটা শিক্ষাকে তুষের আগুনে পুড়ে ছাই করে দিচ্ছে। এই একটা ফারাক উঠিয়ে দিতে পারলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পানির মত ঝকঝকে ও স্বচ্ছ হয়ে যায় । কোচিং বাণিজ্যের চির অবসান ঘটে । নোট-গাইড উঠে যায় । প্রশ্নফাঁস থাকে না । পড়াশোনার মান নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস কারো থাকে না । শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত হয়ে ওঠে। শিক্ষায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় । এ সহজ ফর্মুলাটা কত করে বুঝিয়ে ও আমাদের কর্তাদের বোঝানো যায় না। এরা যেন সব বুঝে ও না বুঝার ভান করে ঘুমিয়ে আছে । তাদের ঘুম ভাঙ্গাবার সাধ্যি কার? 

দেশটা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে- সে কথাটি অস্বীকার করার জো নেই । একটা সময় সারা দেশে পাকা রাস্তা ক' কিলোমিটার ছিল? আজ গ্রাম-গঞ্জের আনাচে কানাচে পাকা রাস্তা । এক সময় গ্রাম বাংলায় সন্ধ্যে হতেই কেরোসিন ল্যাম্প আর খুপি বাতি জ্বালাবার ধুম পড়ে যেত । সে অবস্থার অবসান ঘটেছে অনেক আগে । এখন সন্ধ্যে হতে না হতে এক টিপে ঘরে ঘরে জ্বলে উঠে বিদ্যুতের আগুন । গাও-গেরামে এখন ওয়াইফাই ও ইন্টারনেট সুবিধা । দশ বছর আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশে যোজন যোজন পার্থক্য । কিন্তু, কপালে কোন পরিবর্তন মেলেনি শুধু এ দেশের পোড়া কপাইল্যা শিক্ষক সমাজের । হায় সেলুকাস !  কী বিচিত্র এ দেশ । যাদের হাত ধরে গোটা দেশ ও জাতির ভাগ্যের নিত্যদিনের পরিবর্তন  কেবল তাদের কোন পরিবর্তন নেই । 

আমাদের নীতি-নির্ধারকগণ কেন বিষয়টি উপলব্ধি করে ওঠতে পারেন না যে , শিক্ষকতা পেশাটি দিনে দিনে মেধাহীনদের দখলে চলে যাচ্ছে । মেধাবীরা এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে । এটি এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ । মেধা ছাড়া কোন মানুষ অন্য যে কোন কাজ করতে পারলে ও তাকে দিয়ে শিক্ষকতার মত মহান পেশা চালানো কঠিন । এর প্রমাণ আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে দিনে দিনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে । এখন কেউ শিক্ষকতাকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিতে চায় না । তারা জেনে ফেলেছে, শিক্ষকের জীবন মানে কষ্টের জীবন । তার জীবনে পাবার কিছু নেই । কেবলই দিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হওয়ার এক কষ্টের জীবন । আজকাল বেশির ভাগের পছন্দ ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া । পাঁচশ'টা পরীক্ষার খাতায় 'জীবনের লক্ষ্য' রচনায় মাত্র দু'জনে শিক্ষক হবার কথা লিখেছে । এর মাঝে একজন লিখেছে সরকারি স্কুলের শিক্ষক হবে আর আরেকজনে লিখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এ দেশে তা হলে একদিন শিক্ষকতা করার মত লোক বুঝি খুঁজে পাওয়া অনেক কষ্টের কাজ হবে । 

বিএ-এমএ পাস করে অনেকে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে নৈশ প্রহরীর চাকরি খোঁজে । তবু বেসরকারি স্কুল-কলেজ কিংবা মাদ্রাসায় শিক্ষকতায় যেতে চায় না । চাইবে কেন ?  ওখানে কী আছে?  লক্ষ কণ্ঠে চিৎকার করলেও যেখানে এক পয়সা ইনক্রিমেন্ট মেলে না । রাজপথে দিনরাত গড়াগড়ি দিয়ে আর্তনাদ করলেও বৈশাখী ভাতার নামে পাঁচটি পয়সা জোটে না । যেখানে চোখ বুজে ইনক্রিমেন্ট ও টাইমস্কেল কেড়ে নেয়া হয়, সেখানে কোন দুঃখে কে-ই বা যেতে চাইবে? 

এখন বাজেটের মাস । বাজেটকে ঘিরে কত জনের কত প্রত্যাশা । সেই ছোটবেলা থেকে বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেবার কথা শুনে আসছি । আসলেই কি আমাদের দেশে বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয় ? আমার তো এ রকম মনে হয় না। আমার মনে হয় এ কেবলি বাগাড়ম্বর। দেশবাসী ও শিক্ষক সমাজকে ধোকা দেয়া ছাড়া কিছু নয় । 

এবারের বাজেটে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাণের দাবি ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট, বোশেখি ভাতা, পুর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা এবং সর্বোপরি জাতীয়করণের ইস্যুটির দফারফা হওয়া চাই । তা না হলে সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী ও তাদের পরিবার পরিজন চরম মনোঃকষ্টের শিকার হবেন । বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের টাইম স্কেলের কী হলো? কৌশল করে তো অনেককেই টাইমস্কেল দেয়া হচ্ছে । তাহলে তাদের নয় কেন ? 
সিকি আনা ঈদ বোনাসের ধারণাটি কে আবিস্কার করেছিল জানি না । তবে যে-ই করে থাকুক না কেন মনে হয় সে কোনদিন কোন শিক্ষকের ধারে কাছে যায়নি । শিক্ষকের মর্যাদা সে যদি বুঝতে পারত, তবে তো এ হবার কথা ছিল না। তার চৌদ্দ পুরুষে ও মনে হয় কোন শিক্ষক নেই । 

মাহে রমজান অর্ধেকটা শেষ হয়ে গেছে । ঈদুল ফেতর সমাগত। আনন্দের ঈদ কষ্টের ঈদ হয়ে বরাবরের মত এসে হাজির বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর দোরগোড়ায় । সিকি আনা বোনাস দিয়ে তারা কী করবেন ? এরচে' তো না দেয়াটাই ভাল ছিল । শিক্ষকদের বেলা এত অনুদার হওয়া অশোভনীয় । তাদের জন্য এত কৃপণ হবার কোন মানে হয় না । শিক্ষক সিকি আনা আর কর্মচারী আট আনা বোনাসের টাকা দিয়ে কী করবেন ? তারপরও কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষকের চেয়ে কর্মচারী বেশি বোনাস পান । এও তো বেখাপ্পা দেখায়। নিয়ম-নীতি মেনে সকলকে পুরো একটা বোনাস দিলে কী এমন ক্ষতি হয়ে যায় ?  

বর্তমান সরকারের এটি শেষ বাজেট । নিশ্চয় অনেক বড় একটি মেগা বাজেট হবে । বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য পারলে শেষমেষ একটা কিছু করুন । এ সরকারের কাছ থেকেই তারা সকল স্কুল-কলেজ এক সাথে জাতীয়করণের বহু কাঙ্ক্ষিত ঘোষণাটি শুনতে চান । এ সুযোগটা অন্য কারো জন্য ফেলে রেখে যাওয়া আদৌ ঠিক হবে না ।

লেখক  :  অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট ও দৈনিক শিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক। 

প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ির জনবল কাঠামো নীতিমালা - dainik shiksha প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ির জনবল কাঠামো নীতিমালা ৩৩ মডেল মাদরাসা সরকারিকরণের দাবি - dainik shiksha ৩৩ মডেল মাদরাসা সরকারিকরণের দাবি অনার্স ভর্তির মেধা তালিকা প্রকাশ ২৭ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha অনার্স ভর্তির মেধা তালিকা প্রকাশ ২৭ সেপ্টেম্বর বিএড স্কেল পাচ্ছেন ১৪০৯ শিক্ষক - dainik shiksha বিএড স্কেল পাচ্ছেন ১৪০৯ শিক্ষক ফাজিল ডিগ্রিবিহীন ধর্ম শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত - dainik shiksha ফাজিল ডিগ্রিবিহীন ধর্ম শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত দাখিল পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন নবায়নের বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha দাখিল পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন নবায়নের বিজ্ঞপ্তি আলিমের নম্বর বণ্টন প্রকাশ - dainik shiksha আলিমের নম্বর বণ্টন প্রকাশ দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website