এক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বিব্রতকর অভিজ্ঞতা - মতামত - Dainikshiksha

এক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বিব্রতকর অভিজ্ঞতা

ড. এমএলআর সরকার |

আমার বাবা মরহুম আজিজার রহমান সরকার ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে গাইবান্ধা অঞ্চলের অন্যতম সংগঠক। গাইবান্ধা ও দেশের অনেক অঞ্চলে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একই মঞ্চে পশ্চিম পাকিস্তানের অপশাসনের বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের কথা আমার চেয়ে গাইবান্ধার মানুষ এবং বর্তমান মন্ত্রিপরিষদের অন্তত দু’জন সদস্য, মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রী এবং মাননীয় ডেপুটি স্পিকার খুব ভালো করেই জানেন। আমি এবং আমার পরিবারের সবাই তার জন্য গর্ববোধ করি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে আমরা যেসব প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি তাতে আমরা সত্যিই বিব্রত।

আমার পরিবারের কেউই আজ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পায়নি। এই কোটায় কিভাবে চাকরি হচ্ছে তা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেন; কিন্তু সেসব কথা আজ এখানে উল্লেখ করা অনাবশ্যক। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। কোটা নিয়ে যখন ছাত্ররা আন্দোলন করে, তখন স্ব^াভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এই আন্দোলনের সময় বেশ কয়েকদিন আমি ক্লাসে গিয়েছি। কোনোদিন ছাত্রদের সঙ্গে শুধু কোটা নিয়ে আলোচনা করেই ক্লাস শেষ করেছি। কোনোদিন আন্দোলনের সময়েও ক্লাস নিয়েছি। ক্লাসে ছাত্ররা প্রশ্ন করছে, স্যার ৫৬ শতাংশ কোটা থাকলে আমাদের ক্লাস করে কী লাভ হবে? আমরা কোথায় এবং কিভাবে চাকরি পাব? আমি ছাত্রদের এসব প্রশ্নের কোনো যুক্তিসঙ্গত উত্তর দিতে পারছি না, কারণ আমি নিজেও মনে করি ৫৬ শতাংশ কোটা কোনোভাবেই সমার্থনযোগ্য নয়।

আমি অসহায় হয়ে পড়ি এবং খুবই বিব্রতবোধ করি, যখন ছাত্রছাত্রীরা আমকে প্রশ্ন করে, স্যার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটার কি আসলেই কোনো প্রয়োজন আছে? এর উত্তরে আমি কী বলব! আমি হ্যাঁ বা না কিছুই বলতে পারছি না। আমার ছাত্রছাত্রীরা জানে না আমি এক প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমিও আজ আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছে মাথা উঁচু করে বলতে পারছি না আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। কারণ আন্দোলনরত এই ছাত্রছাত্রীদের দৃষ্টিতে আমি এবং আমার পরিবার এক সুবিধাভোগী শ্রেণীর মানুষ। আমি তাদের প্রশ্নে বিব্রত। কিন্তু কোনোভাবেই বলতে পারছি না আমার এই ছাত্রছাত্রীরা স্বাধীনতাবিরোধীদের সন্তান।

মানুষ এই মুক্তিযোদ্ধা কোটার পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথাই লিখছে এবং বলছে। কিন্তু সরকারের প্রশাসনযন্ত্র বলছে এই কোটা পূরণ হয় না এবং এগুলো মেধাতালিকা থেকেই পূরণ করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই কোটা যদি পূরণ না-ই হয়, তাহলে এই কোটার কারণে কেন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের আজ এরকম বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে? কেন তাদেরকে সমাজে এক ঈর্ষণীয় অথবা সুবিধাভোগী শ্রেণী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে? কেন সরকার বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে এটিকে একটি সহনীয় পর্যায়ে আনছে না?

সরকারের কারও কারও দাবি এই আন্দোলন করছে স্বাধীনতাবিরোধীদের সন্তান এবং বিরোধী দল। সরকারের এই দাবির পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি আছে এবং এটি সত্য যে কিছু স্বাধীনতাবিরোধী মানুষ এর পেছনে ইন্ধন দিচ্ছে। কিন্তু এটি কোনোভাবেই অস্বীকার কারার উপায় নেই যে, সরকারের প্রশাসনযন্ত্রের দূরদর্শিতার অভাবেই এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশাল এক সাধারণ তরুণ-সমাজ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু আত্মীয়-স্বজন। কেন তারা এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে তা ব্যাখার জন্য আমি দুটি অবস্থার কথা বলতে চাই।


প্রথমত, আমার বাবা-চাচারা ছিলেন ৭ ভাইবোন এবং তারা কেউ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছিলেন না। আমার বাবা এবং বড়ভাই যখন যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাড়ি ছাড়লেন, তখন বাবার আত্মীয়স্বজনরা তাদের বাড়িতে আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল। আমার বাবাকেও তারা বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছিল। আমার বাবা এবং বড় ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট আছে। কিন্তু আমার বাবার আত্মীয়স্বজনদের মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নেই, কারণ তারা মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি। বর্তমানে আমাদের (বাবার) পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৩০। কিন্তু বাবার ভাইবোনদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা ২০০। এই ২০০ জনের ভেতর যারা চাকরিপ্রত্যাশী, তাদের চোখে আমাদের পরিবারে যে ক’জন চাকরিপ্রার্থী তারা ঈর্ষণীয় ও সুবিধাভোগী এবং তারা সুবিধাবঞ্চিত, যদিও আগেই বলেছি আমরা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কোনো চাকরি পাইনি।

দ্বিতীয়ত, এবার আসুন বাবার পাড়া-প্রতিবেশী বা গ্রামের লোকের কথায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় কয়েকশ’। আমার জানামতে, তারা কেউই স্বাধীনতাবিরোধী ছিল না। তারা আমার বাবাকে নানাভাবে সাহায্য করেছে, ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছে। কিন্তু তাদের কয়েকজন ছাড়া কারও কাছেই মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নেই। বর্তমানে আমাদের গ্রামের লোক সংখ্যা প্রায় কয়েক হাজার এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে অনেকেই চাকরিপ্রত্যাশী। এই ৩০ শতাংশ কোটার জন্য তাদের চোখেও আমরা সুবিধাভোগী। আমি বাড়ি গেলে অনেকেই অনুরোধ করে একটা চাকরি জোগাড় করে দেয়ার জন্য।

এবারও প্রশ্ন হচ্ছে, বেকারত্বের কারণে আমার প্রতিবেশী যুবকরা এবং আত্মীয়স্বজনদের মধ্য থেকে কেউ যদি এই কোটা আন্দোলনে যুক্ত হয়, তাহলে আমি কি বলব এরা সবাই স্বাধীনতাবিরোধী, এরা রাজাকারের সন্তান? এ কথা বলে আমি আমার প্রয়াত বাবাকে অশ্রদ্ধা করতে পারি না, কারণ এই যুবকদের অধিকাংশই তো আমার বাবার আত্মীয় এবং প্রতিবেশী। এখন আপনারাই বলুন তাদের আমি বা আমরা কী বলে এই কোটা আন্দোলন থেকে বিরত রাখব?

আসলে আমাদের প্রয়োজন ছিল স্বাধীনতাবিরোধীদের চিহ্নিত করে তাদের সুবিধাবঞ্চিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা তা করতে পারিনি। কিছু সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে অনেকের মতো আমার মনেও প্রশ্ন রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এটিকে আর বিতর্কিত না করে বাস্তবতার ভিত্তিতে এই কোটা যদি ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয় তবে সেটিই হবে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য সম্মানজনক। আর এই কোটা যাতে যথাযথভাবে পূরণ হয়, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই উপকৃত হবে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা। বিনা কারণে আমাদের এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা (যা পূরণই হয় না) রাখার প্রয়োজন নেই।

মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছাড়াও সর্বমোট ৫৬ শতাংশ কোটা সম্পর্কে ছাত্রছাত্রীদের মতামত হচ্ছে- এটি তাদের জন্য একটি বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। সমাজের বেশিরভাগ মানুষের কাছেও এটি গ্রহণযোগ্য নয়। একজন চাকরিপ্রার্থী যখন জানে ১০০টি পদের মধ্যে ৫৬টিই সংরক্ষিত, তখন তাদের মনোবল সত্যিই ভেঙে যায়। সরকার বলছে, এই কোটাগুলো তো তাদের জন্যই। কিন্তু এই কোমলমতি চাকরিপ্রার্থীদের এটি বোঝার মতো বয়স, ধৈর্য এবং অবস্থা কোনোটিই নেই। ছাত্রছাত্রীদের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে এই কোটা অবশ্যই একটি সহনীয় পর্যায়ে আনা প্রয়োজন। সম্ভব হলে মোট কোটা ২০ থেকে ২৫ শতাংশের ভেতর সীমাবদ্ধ রাখাই শ্রেয়।

প্রধানমন্ত্রী, আপনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে কোটা বিষয়ে যে কথা বলেছিলেন, তা আমি টেলিভিশনে দেখেছি। আমার এটুকু মনে হয়েছে, আপনি অনেকটা বিরক্ত হয়েই ওই কথাগুলো বলেছিলেন। আপনি দেশের অভিভাবক। আপনি যদি বিরাগভাজন হয়ে এরকম একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তবে এতে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অনুগ্রহপূর্বক বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোটা একটি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনুন। দেশকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা থেকে পরিত্রাণের ব্যবস্থা করুন। স্বাধীনতাবিরোধীদের সন্তানদের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার পথ বন্ধ করুন। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদের এই বিব্রতকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণের ব্যবস্থা করুন। কোটা সহনীয় পর্যায়ে আনার পরও যদি কেউ এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তবে তা কঠোর হস্তে দমন করুন। এক্ষেত্রে দেশের মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবার আপনার পাশেই থাকবে।

লেখক: প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর - dainik shiksha সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু - dainik shiksha অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে - dainik shiksha ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ - dainik shiksha দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website