এমপিওভুক্তির বিষয় আবার আলোচনায় - মতামত - Dainikshiksha

এমপিওভুক্তির বিষয় আবার আলোচনায়

মাছুম বিল্লাহ |

নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা নিয়ে আলোচনা, আন্দোলন, আশ্বাস বহু বছর ধরেই চলছে; কিন্তু কোনো কার্যকর, রাজনীতিমুক্ত ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা আজও গড়ে ওঠেনি। যখন যেখানে সুবিধা হয়েছে, সেখানে এমপিও দেওয়া হয়েছে কিংবা জাতীয়করণ হয়েছে। সঠিক কোনো নিয়ম মেনে বিষয়গুলো করা হয়নি বলেই থেকে থেকে বিভিন্ন শিক্ষক-কর্মচারী সংগঠনের নেতারা রাজপথে আন্দোলনে নেমেছেন। তাই এখনো চলছে তাঁদের আন্দোলন। আর সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার জারি করেছে এমপিও নীতিমালা ২০১৮। সদ্য জারি হওয়া এমপিও নীতিমালা ২০১৮ অনুযায়ী এমপিও পেতে কোনো বিদ্যালয়কে প্রথমে আবেদন করতে হবে। এরপর তথ্য যাচাই-বাছাই করে এমপিও দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে আবেদনের শর্ত হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সময় শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও উত্তীর্ণের সংখ্যাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে। এসব শর্ত মানতে হলে এক শর বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওর জন্য আবেদন করার যোগ্যতা থাকার কথা নয় বলে জানিয়েছেন শিক্ষক নেতারা।

আগামী অর্থবছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ আছে কি নেই, তা নিয়ে একেক সময় একেক কথা শোনা যাচ্ছে। ফলে শিক্ষকদের আন্দোলন আরো জোরদার করা হয়েছে। শিক্ষকরা আন্দোলনে নামলে গত ১৪ জুন ঈদের আগের শেষ কর্মদিবসে জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারি করা হয়। এ অবস্থায় নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানকে এমপিও পেতে হলে এই নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। শিক্ষাসচিব বলেছেন, বাজেটে সব বিষয় উল্লেখ থাকে না। আবার একসঙ্গে সব প্রতিষ্ঠান এমপিও করাও সম্ভব নয়। এ জন্যই শর্ত সাপেক্ষে এমপিও দিতে এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারি করা হয়েছে। এমপিও নিয়ে খোদ সরকারের মধ্যেই কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, আরো এক হাজার নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে। এ জন্য বাজেটে বরাদ্দও রাখা হয়েছে। তবে যেসব স্কুল এমপিওভুক্ত নয় এমন স্কুলের উপকরণ, ভবনসহ বিভিন্ন খাতেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এমপিও একটি নিরর্থক কর্মসূচি। এটি শিক্ষকদের খুশি করার জন্য করা হয়। এতে স্কুলের কোনো উপকার হয় না। আবার নন-এমপিও শিক্ষকরা আন্দোলনে নামার পর ঈদের আগে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। এ নিয়ে শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রয়োজন নেই।

এমপিও নীতিমালা ২০১৮ অনুযায়ী একটি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তি পেতে হলে চারটি প্রধান শর্ত মানতে হবে। এগুলোর জন্য রাখা হয়েছে ১০০ নম্বর। এতে একাডেমিক স্বীকৃতির তারিখের জন্য রাখা হয়েছে ২৫ নম্বর। প্রতি দুই বছরের জন্য ৫ নম্বর এবং ১০ বা এর চেয়ে বেশি বছর হলে পাবে ২৫ নম্বর। শিক্ষার্থী সংখ্যার জন্য ২৫ নম্বর। আর শিক্ষার্থীর কাম্য সংখ্যা থাকলে ওই প্রতিষ্ঠান পাবে ১৫ নম্বর এবং পরবর্তী ১০ শতাংশ বৃদ্ধির জন্য পাবে ৫ নম্বর। পরীক্ষার্থী ও উত্তীর্ণের সংখ্যায়ও শিক্ষার্থী সংখ্যার মতো একইভাবে নম্বর বণ্টন করা হয়েছে। এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি থাকবে, যারা বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করবে। এরপর ওই কমিটি সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। সরকার এমপিওভুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আদেশ দেবে। কাম্য যোগ্যতা পূরণ করতে নীতিমালা অনুযায়ী সহশিক্ষা ও বালক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শহরে ২০০ ও মফস্বলে ১৫০ শিক্ষার্থী থাকতে হবে। মাধ্যমিকে শহরে ৩০০ ও মফস্বলে ২০০ শিক্ষার্থী থাকতে হবে। স্কুল অ্যান্ড কলেজে শহরে ৪৫০ ও মফস্বলে ৩২০ শিক্ষার্থী থাকতে হবে। উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে শহরে ২০০ ও মফস্বলে ১৫০ শিক্ষার্থী থাকতে হবে। স্নাতক পাস কলেজে শহরে ২৫০ ও মফস্বলে ২০০ শিক্ষার্থী থাকতে হবে। আর প্রতিটি শ্রেণির পরীক্ষায় শহরে ৬০ ও মফস্বলে ৪০ শিক্ষার্থীর অংশ নিতে হবে এবং তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ হতে হবে। একটি বেসরকারি নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার জন্য সর্বক্ষেত্রে এবং সব সময় উপরোক্ত নিয়মগুলো সঠিকভাবে পালন করা হলে সমস্যা হয়তো এত দূর গড়াত না। কিন্তু অন্য অনেক অলিখিত বিষয় বিবেচনায় নেওয়ায় এ ক্ষেত্রে অনেক দুর্নীতি হয়েছে, যা মাননীয় অর্থমন্ত্রী মাঝেমধ্যে উল্লেখ করে থাকেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ইএমআইএস) সেলের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী জানা যায় যে দেশে বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। বর্তমানে সরকার স্বীকৃত নন-এমপিও স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা পাঁচ হাজার ২৪২। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৮০ হাজারেরও বেশি শিক্ষক-কর্মচারী কাজ করছেন। সরকার ২০১০ সালে এক হাজার ৬২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করে। এর পর থেকে এমপিওভুক্তি বন্ধ রয়েছে।

১ জুলাই নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক  ও সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে এমপিওভুক্তির বিষয়ে কিছু লিখিত প্রস্তাব দেয়। তারা বলেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকলেও সব নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান এমপিওর আওতায় এনে আংশিক বেতন চালু করতে হবে। পরবর্তী অর্থবছরে বেতন সমন্বয় করতে হবে। দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর এমপিওভুক্ত না হওয়ায় অনেক নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাই করার জন্য এমপিওভুক্তির পর তিন বছর সময় প্রদান করতে হবে। এই সময়ে সক্ষমতা অর্জনে ব্যর্থ হলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এই প্রস্তাবের আলোকে সারা দেশের সব নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একযোগে এমপিওভুক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে। এটি যুক্তিযুক্ত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হলে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও এগিয়ে নেওয়া যাবে। অর্থের অভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারে না, আবার ভালো বেতন না পেলে মানসম্মত শিক্ষক এ পেশায় আসবে না।

কোন এলাকায় কী পরিমাণ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা প্রয়োজন, কলেজ স্থাপন করা প্রয়োজন, জনসংখ্যা অনুপাতে কোন এলাকায় কী ধরনের এবং কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন সেগুলো নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্র সে দায়িত্ব কখনোই ভালোভাবে পালন করেনি। তাই ব্যক্তি ও কমিউনিটির উদ্যোগে যত্রতত্র বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেখানে প্রাথমিক স্কুল দরকার তিনটি, সেখানে হয়তো আছে একটি, আবার যেখানে দরকার দুটি, সেখানে হয়তো চারটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের উদাসীনতা কিংবা রাজনীতি এ জন্য দায়ী। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশাল এক মন্ত্রণালয়। এটি আবার দুই ভাগে বিভক্ত। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এত বিশাল বহর জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলে অথচ রাষ্ট্রের মাধ্যমিক পর্যায়ে এখনো ৯৭ শতাংশ বিদ্যালয় পরিচালিত হয় বেসরকারি পর্যায়ে। যেনতেন প্রকারে চলছে শিক্ষাদান পদ্ধতি, মানের প্রশ্ন এখন সুদূরপরাহত। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় যেখানে রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত হওয়ার কথা, এই দুই পর্যায়ের শিক্ষা যেখানে জাতীয় করা প্রয়োজন, সেখানে আমরা সরকারি অনুদানকেও যদি বলি যে এর দ্বারা শিক্ষার কোনো উপকার হয় না, তাহলে বিষয়টি খুব ভালো দেখায় না। শিক্ষকদের যদি রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে কোনো অর্থ দেওয়া না হয়, তাহলে শিক্ষা চলবে কিভাবে, কারা শিক্ষা দান করবেন? এ পর্যন্ত শিক্ষকদের ২৮ বার আন্দোলনে নামতে হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষকরা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ২০ টাকা অনুদান নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছেন। তাঁদের হাতেই তৈরি হয়েছে বড় বড় শিক্ষক, বিজ্ঞানী, আমলা, মন্ত্রী। আমরা এখনো  যদি শিক্ষকদের রাষ্ট্র থেকে কোনো বরাদ্দ দিতে না চাই, সেটি হবে দুঃখজনক।

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত, সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার আদেশ জারি - dainik shiksha পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার আদেশ জারি প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এমসিকিউ  বাতিল - dainik shiksha প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এমসিকিউ বাতিল এইচএসসির টেস্ট পরীক্ষার ফল ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকাশের নির্দেশ - dainik shiksha এইচএসসির টেস্ট পরীক্ষার ফল ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকাশের নির্দেশ স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী - dainik shiksha স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী ২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বিক্রি করতেন তারা - dainik shiksha ২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বিক্রি করতেন তারা অকৃতকার্য ছাত্রীকে ফের পরীক্ষায় বসতে দেয়ার নির্দেশ - dainik shiksha অকৃতকার্য ছাত্রীকে ফের পরীক্ষায় বসতে দেয়ার নির্দেশ আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি ফরম বিতরণ শুরু - dainik shiksha আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি ফরম বিতরণ শুরু নির্বাচনের সঙ্গে পেছাল সরকারি স্কুলের ভর্তি - dainik shiksha নির্বাচনের সঙ্গে পেছাল সরকারি স্কুলের ভর্তি দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website