এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পদোন্নতির সোনার হরিণ - মতামত - Dainikshiksha

এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পদোন্নতির সোনার হরিণ

শ্যামল কুমার সরকার |

সবাই সুখ চান। সবাই সমৃদ্ধি চান। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দফতরে বিভিন্ন পদের পদোন্নতির সুযোগ থাকলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পদোন্নতির তেমন কোন সুযোগই নেই। সম্ভবত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সরকার মানব হিসেবে বিবেচনা না করে মহামানব হিসেবেই ভাবছে। কারণ, একমাত্র মহামানবরাই চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে থাকেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরাজমান বিধিবিধান তাই বলে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদির সরকারি অংশ প্রদান এবং জনবল কাঠামো সম্পর্কিত নির্দেশিকা/২০১০ প্রণয়ন করেছে (৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০/২০১৩ সালে সংশোধিত)।

এ নির্দেশিকা মোতাবেক কলেজের একজন এমপিওভুক্ত প্রভাষকের স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে সংশিষ্ট বিষয়ে অনার্স ডিগ্রিসহ ২য় শ্রেণীর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে ৪ বছর মেয়াদি ২য় শ্রেণীর অনার্স ডিগ্রি অথবা ২য় শ্রেণীর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (অন্যান্য স্তরে সমগ্র শিক্ষা জীবনে ১টি ৩য় বিভাগ/শ্রেণী/সমমানের জিপিএ গ্রহণ যোগ্য হবে) থাকলে এবং কুখ্যাত অনুপাত প্রথা ৫:২ (অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের সর্বাপেক্ষা সিনিয়র ৭ জন প্রভাষকের প্রথম ২ জন) এর আওতায় আসলেই তিনি ৮ বছর পরে সহকারী অধ্যাপক হতে পারছেন। অথচ শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রতিটি স্তরে ১ম বিভাগ/শ্রেণী/সমমানের জিপিএ থাকা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, নায়েম, এইচএসটিটিআই এবং ব্যানবেইস) থাকা সত্ত্বেও শুধু কালাকানুন ৫:২ এর মধ্যে না আসাতে একজন মেধাবী প্রভাষক পেশাগত জীবনের প্রায় পুরোটাই প্রভাষক থেকে চরম হতাশায় দিন কাটাবেন।

এমনকি শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রিকেও (বিএড, এমএড) পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়নি। সরকারের সর্বশেষ নীতিমালায় (৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০/২০১৩ সালে সংশোধিত) এমপিওভুক্ত ডিগ্রি কলেজে সহযোগী অধ্যাপকের পদ সৃজন করা হয়েছে। তবে এখনও পদায়ন শুরু হয়নি। দ্রুত পদায়ন আব্যশক। অধ্যাপক পদ সৃষ্টি অতি প্রয়োজনীয়। একটি সূত্রে জানা যায় জুন-২০১৫ এর প্রথম দিকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরে কলেজ শিক্ষকদের পদোন্নতি সংক্রান্ত বৈঠক হয়েছে।

সে বৈঠকে বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির (বাকবিশিস) দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবিকে উপেক্ষা করে অমানবিক অনুপাত প্রথাকে বহাল রেখেই ১৫ বছর চাকরি পূর্তিতে কলেজের সব প্রভাষককে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়। একই বৈঠকে অনুপাত প্রথার ভিত্তিতেই প্রথমবারের মতো সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে শোনা যায়। তবে এখনও প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। দেখা যাক উদ্যোগের বাস্তবায়ন কত দূর গড়ায়। শিক্ষকরা আশায় বুক বেঁধে আছেন। একই শিক্ষাগত যোগ্যতা আর সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ৪ বছরের অভিজ্ঞতাসহ কলেজ পর্যায়ে মোট ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলে এবং নব-প্রবর্তিত কুখ্যাত অনুপাত প্রথা ৩:১ (অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের সর্বাপেক্ষা সিনিয়র ৪ জন সহকারী অধ্যাপকের ১ম জন) এর আওতায় আসলেই একজন সহকারী অধ্যাপক পদোন্নতি পেয়ে সহযোগী অধ্যাপক হতে পারবেন। অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই পদোন্নতি অনুপাত ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। সরকারি কলেজের মতো বিষয়ভিত্তিক নয়। এটিও একটি বড় সমস্যা।

সহকারী অধ্যাপকের মতো সহযোগী অধ্যাপকের ক্ষেত্রেও একাডেমিক উৎকর্ষ ফলাফল, পেশাগত প্রশিক্ষণ (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, নায়েম, এইচএসটিটিআই এবং ব্যানবেইস) এবং শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রিকে (বিএড, এমএড) মর্যাদা দেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়। সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে গবেষণামূলক উচ্চতর ডিগ্রি (এমফিল, পিএইচডি) এবং প্রকাশনা (পুস্তক, জার্নাল) কোন সহায়ক ভূমিকা পালন করবে না। অর্থাৎ বিরাজমান বিধিবিধানে একাডেমিক উৎকর্ষ ফলাফল, পেশাগত প্রশিক্ষণ, শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি, গবেষণামূলক উচ্চতর ডিগ্রি এবং প্রকাশনাকে চরমভাবে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। শিক্ষকতার ক্ষেত্রে কী ভালো একাডেমিক ফলাফল, পেশাগত প্রশিক্ষণ, শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি এবং গবেষণামূলক উচ্চতর ডিগ্রির কোনই প্রয়োজন নেই? এসব অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ/ডিগ্রি থাকা কী অপরাধ? নাকি কষ্টার্জিত এসব প্রশিক্ষণ/ডিগ্রি শিক্ষাদানের মানকে নিম্নমুখী করে? একমাত্র বিবেচ্য সিনিয়রিটি নির্ধারণেও নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। এক সময় চাকরিতে যোগদানের তারিখ হতেই ইফেকটিভ সার্ভিস গণনা করা হতো। এখন এমপিওভুক্তির তারিখ হতে ইফেকটিভ সার্ভিস হিসেব করা হয়। কখনও কখনও পরিচালনা পরিষদও সিনিয়রিটি নির্ধারণে অনিয়মের আশ্রয় নেয়।

এসব নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানেই মামলা-মোকদ্দমা চলে। চলে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি। ফলে প্রতিষ্ঠানের পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ডও ঠিকমতো রক্ষিত হয় না। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, বৈষম্যহীন শিক্ষা এসব কথা শুধু সংবিধানের পাতায় না রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। এ ব্যাপারে সরকারের সংশিষ্ট বিভাগের বোধোদয় যত দ্রুত হবে ততই মঙ্গল। ১৯৮২ সালের চাকরি বিধি অনুযায়ী একজন প্রভাষক শিক্ষা জীবনের তিনটি তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণী নিয়ে শুধু মাস্টার্স ডিগ্রিতে ২য় শ্রেণী থাকাতেই সহকারী অধ্যাপক হতে পেরেছেন। পাশাপাশি ১৯৯৫ সালের নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষা জীবনের চারটি প্রথম বিভাগ/শ্রেণী নিয়েও অনেক প্রভাষক সারা জীবন প্রভাষকই থেকে গেছেন। হায়রে সিনিয়রিটির মূল্য! মেধাবীদের গলাটিপে মারার সরকারি নীতিমালা।

অধিকাংশ প্রভাষকের ভাগ্য মন্দের ভালো। কারণ তারা সবাই সহকারী অধ্যাপক হতে না পারলেও ৮ বছর পূর্তিতে একধাপ নিচের সিলেকশন গ্রেড পান। অন্যদিকে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী প্রদর্শকরা জীবনভর প্রদর্শকই থেকে যান। এদের পদোন্নতির কোন সুযোগই নেই। এটি একটি ব্লক পোস্ট। অথচ সরকারি কলেজে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী প্রদর্শকরা পদোন্নতি পেয়ে প্রভাষক/সহকারী অধ্যাপক হচ্ছেন। একই দেশের একই শিক্ষা বিভাগে কত রকমের নিয়ম। এমপিওভুক্ত কলেজের মাষ্টার্স ডিগ্রিধারী প্রদর্শকেরা হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে প্রদর্শক সমিতি নামের একটি সংগঠনের সৃষ্টি হয়েছে এবং পদোন্নতির জন্য তারা বিভিন্ন দফতরে স্মারকলিপি দিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। ৮ বছর পূর্তিতে টাইম স্কেলপ্রাপ্ত প্রদর্শক আর নবীন প্রভাষকের বেতন স্কেল একই। প্রদর্শকদের প্রভাষক পদে পদোন্নতি দিলে সরকারের কোন ব্যয় বাড়বে না। বরং পদোন্নতিপ্রাপ্তরা মানসিক প্রশান্তি নিয়ে কাজ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য নতুন জনবলের প্রয়োজন হবে না। যেমনটি ডিগ্রি পর্যায়ে আছে। এ বিষয়টির দ্রুত সুরাহা হওয়া দরকার।

ভালো একাডেমিক ফলাফল, পেশাগত প্রশিক্ষণ, শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি এবং গবেষণামূলক উচ্চতর ডিগ্রিকে বিশ্বের কোন দেশে অসম্মান করা হয় না। শুধু সিনিয়রিটির ভিত্তিতে এবং অনুপাত প্রথার মাধ্যমে কলেজ শিক্ষকদের পদোন্নতি দেয়ার ঘটনা কোথাও ঘটে না। উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের এভাবে অবমূল্যায়ন করা চরম অপমানজনক। শিক্ষার মানের সঙ্গে উল্লিখিত অমূল্যায়িত বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। অন্যদিকে মাধ্যমিক পর্যায়ে পদোন্নতির সুযোগ নেই বললেই চলে। এ পর্যায়ে সহকারী শিক্ষক হতে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক হওয়া যায়। কতজন শিক্ষকের পক্ষে সেসব পদে যাওয়া সম্ভব হয়? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও মানবসম্পদ তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন। তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে সেই অ্যানালগ ধ্যান-ধারণা কেন? অ্যানালগ শিক্ষাভাবনা নিয়ে কাক্সিক্ষত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে কী? দেশের ৯০ ভাগ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে নিয়োজিত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সিংহভাগকে পদোন্নতি বঞ্চিত ও হতাশ রেখে মানসম্মত শিক্ষাদান নিশ্চিত সম্ভব কী? সম্ভব হবে কী ভিশন- ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়ন করা ? মেধাবীরা এ পেশায় আকৃষ্ট হবেন কী? প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী এ ব্যাপারে কী বলবেন? এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা আপনাদের বাণীর অপেক্ষায় রইলেন।

[লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, ঝিট্কা খাজা রহমত আলী ডিগ্রি কলেজ, মানিকগঞ্জ]

সৌজন্যে: দৈনিক সংবাদ

সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর - dainik shiksha সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু - dainik shiksha অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে - dainik shiksha ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ - dainik shiksha দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website