এমপিও নীতিমালার এপিঠ ওপিঠ - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

এমপিও নীতিমালার এপিঠ ওপিঠ

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

শিক্ষায় কত নীতিমালার কথা শুনলাম আর দেখলাম! ঢাকঢোল পিটিয়ে এসব নীতিমালার প্রণয়ন, প্রকাশ ও প্রচারণা হয়। কিন্তু এর সুফল তেমন আজো দেখতে পাই না। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ আমাদের কম আশান্বিত করেনি। কিন্তু এর সিকিভাগও বাস্তবায়ন হলে জাতি অনেক উপকৃত হতো। কিন্তু আমাদের শিক্ষা এখনো সে তিমিরেই। সারা দুনিয়া যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষার ওপর ভর করে বহু দূর এগিয়ে গেছে। আর আমরা? শিক্ষা নিয়ে আমাদের কেবল তামাশা। এ জায়গাটায় যত অনিয়ম। তাই দৈন্যদশার বেড়াজালে আবদ্ধ আজ দেশের টোটাল শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের কর্তাব্যক্তিগণ বেমালুম ভুলে আছেন যে, শিক্ষাই একমাত্র হাতিয়ার যা সারা পৃথিবী বদলে দিতে পারে । 

গত মাসে এমপিও নীতিমালা-২০১৮ প্রকাশিত হয়েছে। ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে পুরো নীতিমালাটি এখনো পড়ে দেখা হয়নি। টুকটাক যেটুকু পড়েছি, তাতে উচ্ছ্বসিত হবার কিছু পাইনি। সোজা সাপ্টা তেমন কিছু নেই। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যা বলা হয়েছে, তাতে আশার আলো একান্ত ক্ষীণ। পুরো নীতিমালা পড়লে হয়তো কিছু আশার আলো খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। 
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল কাঠামো একটু বড় করা হয়েছে। তা নিঃসন্দেহে একটি সুসংবাদ। কিন্তু জানি না, কবে তা বাস্তবের মুখ দেখে। এনটিআরসিএ'র তো এমনিতেই লেজে গোবরে অবস্থা। এরা কতটুকু কী করতে পারে, সে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। নীতিমালায় 'অনুদান'-এর পরিবর্তে 'বেতন ভাতাদির সরকারি অংশ' বলা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে আরেক সুখবর। বহুদিন থেকে 'অনুদান' শব্দটি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মনে পীড়া দিয়ে আসছিল। নিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর করা হয়েছে। কিন্তু কেন? ৩০ বছর হলে ভাল হতো না? সব জায়গায় ৩০ বছর। এখানে এত দয়া মায়া দেখাবার কী আছে? নাকি এ আরেক বৈষম্যের দেয়াল তৈরি করে রাখা? গড় আয়ু বেড়েছে। ৩৫ বছর করা হলে কেবল বেসরকারি শিক্ষকদের জন্যে কেন, সবার জন্যে তাই করা উচিত ।

বদলি নিয়ে কী যেন কী বলা হয়েছে? এটাও কবে এবং কীভাবে কার্যকর হবে, তা আল্লা মাবুদই ভাল জানেন। সরকারি স্কুল-কলেজে যে নিয়মে বদলি হয়, সে নিয়মে কি বদলিটা চালু করা যায় না? আর যদি এ পদ্ধতিটা উত্তম হয়, তাহলে সরকারি স্কুল-কলেজেও বদলির জন্যে এ পদ্ধতিটা চালু করে দেন। বলা হয়েছে, সরকার প্রয়োজন মনে করলে। ধরুন, সরকার প্রয়োজন মনে করল না। তাহলে এ বদলি দিয়ে কী হবে? বেসরকারি শিক্ষকদের জন্যেই যত প্যাঁচাল আর কি! 

কয়েক বছর থেকে শিক্ষক নিয়োগ থমকে আছে। দেশে এমন স্কুল, কলেজ কিংবা মাদরাসা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে দু'-চার জন শিক্ষকের পদ খালি নেই। সবখানে শূন্য পদ পড়ে আছে। এখন আবার কেউ কেউ বলছেন, নিবন্ধন বাতিল করে আগের মত কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হোক। এ কী শুরু হলো? যখন যেমন তখন তেমন। বেসরকারি শিক্ষা ও শিক্ষকদের জন্যে একবার এ কথা তো আরেকবার অন্য কথা।  

টাইমস্কেলের বিষয়ে অস্পষ্টতা কারো কাম্য ছিল না। তাতে প্রভাষকগণ ভীষণ ক্ষেপেছেন। ক্ষেপারই কথা। আলতু ফালতু যত্ত সব কাজ কারবার! তাদের সহকারী অধ্যাপক হতে অনুপাত প্রথাটি কী বাতিল করা যেত না? অবশ্য দু'টো টাইম স্কেল কিঞ্চিৎ আশার সঞ্চার করেছে। তিনটি কি দেয়া যেত না? তবে টাইমস্কেল দেয়ার জন্য এবার কিছুটা উদারতা দেখিয়ে ইনক্রিমেন্ট খেয়ে ফেলা হলো বলেই আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। ইনক্রিমেন্ট তাদের ন্যায্য পাওনা। নীতিমালায় ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতার বিষয়ে টু শব্দটি নেই। এ নীরবতা সত্যি সত্যি সবার কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।    

দেশের ননএমপিও শিক্ষকগণ এমপিও পাবার জন্যে রোজার মাস থেকে অনাহারে-অর্ধাহারে ঢাকায় পড়ে আছেন। তাদের আর কত ঘোরাবেন?  অনেকে দশ-পনের বছর থেকে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করছেন। সদ্যজারিকৃত এমপিও নীতিমালা তাদের ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় নতুন নীতিমালা তাদের জন্য কোন সুখবর নিয়ে আসতে পারেনি। আসলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো দশ-বারো বছর থেকে চলে আসছে তাদের নিঃশর্তে এমপিওভুক্ত করে সব যোগ্যতা অর্জনের জন্য তিন বছর সময় দেয়া যেতে পারে। নীতিমালার বেড়াজালে তাদের জীবনটা যেন আটকে না যায়। 
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য গ্রেডিং করার যে সুচক দেয়া হয়েছে, তাতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু স্থানীয় এমপিদের পছন্দক্রমে যদি তিনটি করে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়, তাহলে তো নীতিমালা আর গ্রেডিংয়ের কোন মানে থাকে না। নীতিমালা বাইপাস করে এমপি-মন্ত্রীদের ইচ্ছায় এমপিও হলে অনিয়ম যেমন বাড়বে, তেমনি বঞ্চনার ইতিহাস কেবলি দীর্ঘতর হবে। এ কারো কাম্য নয়। জনস্বার্থে গুরুত্ব বিবেচনায় এমপিওভুক্তির যে বিষয়টি নীতিমালায় জুড়ে দেয়া হয়েছে, তাতেই সে আশংকা দেখা দিয়েছে। 

এমপিওভুক্তির জন্যে অনলাইন আবেদন যাতে সামান্য কোনো অজুহাতে ফেরত পাঠানো না হয়, সে জন্যে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে শিক্ষক-কর্মচারী কিংবা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তিতে হয়রানি কেবল বাড়তেই থাকবে। 

আমাদের মাননীয় অর্থ মন্ত্রী প্রায় সময় বলে থাকেন, এমপিও একটি বাজে সিস্টেম। খারাপ কার্যক্রম। তাহলে আবার এমপিও নীতিমালা কেন?  এটা না করে সব স্কুল-কলেজ জাতীয়করণের একটি নীতিমালা করাই তো ভাল ছিল। আর তা হলে সে হতো এক ভালো কার্যক্রম। জেনে শুনে মন্দ কাজটি করার কোন মানে হয় না। আসলে প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষক এমপিওভুক্ত হবার সময় নানা আকাম কুকাম ঘটেই থাকে। ঘাটে ঘাটে সেলামি দেয়া লাগে। কোন কোন সময় রাজনৈতিক নেতা কিংবা এমপি-মন্ত্রীর সুবাদে যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠান এমপিও পেয়ে যায়। আজকাল হয়েছে এমন। এমপি সাহেব বলে না দিলে ডিজিটাল ল্যাব কিংবা একাডেমিক ভবন মেলে না। যাদের এমপি আছেন কিংবা যারা এমপি'র পেছনে ঘোরাঘুরি করতে পারে, তারা এগুলো অনায়াসে পেয়ে যায়। আর যাদের এমপি নেই কিংবা এমপি'র পিছে ঘোরাঘুরি করাটা পছন্দ করেন না, শত যোগ্যতা থাকলেও তাদের পোড়া কপাল। নসিবে কিছুই মেলে না । 

আবার এমপিও বাবদ প্রতি বছর চল্লিশ-পঞ্চাশ কোটি টাকা নষ্ট হয়। সাবেক শিক্ষা সচিব এনআই খান তো এরকম বলেছিলেন বলে মনে পড়ে । এ অপচয় রোধে এমপিও সিস্টেম বাদ দিয়ে জাতীয়করণের পথে এগোনোই উত্তম। 
আমাদের অর্থমন্ত্রণালয় ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ের মধ্যে দুরত্ব মনে হয় অনেক বেশি। এ দু' মন্ত্রণালয়ের কাছাকাছি অবস্থান থাকলে দেশের শিক্ষক সমাজ বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ অনেক উপকৃত হতে পারতেন। শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় শিক্ষকদের 'এই দেবেন' 'সেই দেবেন' বলে বলে কিচ্ছু দিতে পারেননি। এখন আর কিছু দেবার কথা বলেন না। তার আন্তরিকতা ও ক্ষমতা দু'টো নিয়েই এখন শিক্ষকদের নানা প্রশ্ন। 

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) এর জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ এর আরো অধিকতর সংশোধনী প্রয়োজন । হয়তো সেটির সংশোধিত রূপ শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে। সে সংশোধিত নীতিমালায় বেসরকারি শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতার বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা যেন থাকে। প্রস্তাবিত প্যাটার্ন অনুযায়ী আগামী এক বছরে সকল শূন্য ও সৃষ্ট পদে নিয়োগদানের সুপারিশ থাকা চাই। দেশে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষক-কর্মচারী বদলির স্পষ্ট নীতিমালা অপরিহার্য। প্রভাষকদের জন্য অনুপাত প্রথা রহিত করে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি ও উচ্চতর স্কেল অবারিত করা দরকার। 

লেখক: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট,  সিলেট ও দৈনিক শিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়াল ঘেঁষে তৈরি করা মার্কেট অপসারণের নির্দেশ - dainik shiksha শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়াল ঘেঁষে তৈরি করা মার্কেট অপসারণের নির্দেশ নীতিমালা সংশোধন কমিটির দ্বিতীয় সভায় এমপিওভুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা - dainik shiksha নীতিমালা সংশোধন কমিটির দ্বিতীয় সভায় এমপিওভুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা এমপিও পুনর্বিবেচনা কমিটির সভা ১৫ ডিসেম্বর - dainik shiksha এমপিও পুনর্বিবেচনা কমিটির সভা ১৫ ডিসেম্বর সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের দায়ে ৩ শিক্ষক বরখাস্ত - dainik shiksha সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের দায়ে ৩ শিক্ষক বরখাস্ত ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে খোঁজ রাখেন’ - dainik shiksha ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে খোঁজ রাখেন’ এইচএসসি-আলিমের ফরম পূরণ শুরু - dainik shiksha এইচএসসি-আলিমের ফরম পূরণ শুরু জেএসসি-জেডিসির ফল ৩১ ডিসেম্বর - dainik shiksha জেএসসি-জেডিসির ফল ৩১ ডিসেম্বর লিফলেট ছড়িয়ে সরকারি স্কুল শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য, ভর্তির গ্যারান্টি! - dainik shiksha লিফলেট ছড়িয়ে সরকারি স্কুল শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য, ভর্তির গ্যারান্টি! এমপিওভুক্তিতে কর্তৃত্ব কমলো ডিডিদের, বাড়লো শিক্ষা ক্যাডারের - dainik shiksha এমপিওভুক্তিতে কর্তৃত্ব কমলো ডিডিদের, বাড়লো শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষামন্ত্রীকে লেখা এমপিদের চিঠিতে এমপিও কেলেঙ্কারি - dainik shiksha শিক্ষামন্ত্রীকে লেখা এমপিদের চিঠিতে এমপিও কেলেঙ্কারি ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা প্রাথমিক-ইবতেদায়ি সমাপনীর ফল বছরের শেষ দিনে - dainik shiksha প্রাথমিক-ইবতেদায়ি সমাপনীর ফল বছরের শেষ দিনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া দৈনিকশিক্ষার ফেসবুক লাইভ দেখতে আমাদের সাথে থাকুন প্রতিদিন রাত সাড়ে ৮ টায় - dainik shiksha দৈনিকশিক্ষার ফেসবুক লাইভ দেখতে আমাদের সাথে থাকুন প্রতিদিন রাত সাড়ে ৮ টায় শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন দৈনিক শিক্ষার আসল ফেসবুক পেজে লাইক দিন - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষার আসল ফেসবুক পেজে লাইক দিন please click here to view dainikshiksha website