এমপিও নীতিমালার সংশোধন চাই, মুজিববর্ষে সিকি বোনাসের অবসান চাই - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

এমপিও নীতিমালার সংশোধন চাই, মুজিববর্ষে সিকি বোনাসের অবসান চাই

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

শিক্ষকদের দাবি দাওয়া নিয়ে কিছু লেখতে গেলে এক শ্রেণির মানুষের গাত্রদাহ শুরু হয়ে যায়। এরা শিক্ষক সমাজকে কী মনে করে থাকে, সেটি ভেবে পাই না। শিক্ষকেরা অন্য গ্রহ থেকে আসা অদ্ভূত কোনো বিশেষ জাতি বা শ্রেণি নয়। তারা পৃথিবী নামের গ্রহে পেট-পিঠ ও উদর সংযুক্ত মানুষ। মানুষের যত চাহিদা থাকে, তাদের সবই আছে। তারা জিন, দৈত্য কিংবা ফেরেশতা নন যে, তাদের জৈবিক কোনো প্রয়োজন নেই। দুঃখজনক সত্য এই যে, অনেকে শিক্ষকদের তাই মনে করে থাকে। শিক্ষা বিষয়ক দেশের একমাত্র পত্রিকা দৈনিক শিক্ষায় শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া সংক্রান্ত কলামগুলোর মন্তব্য অপশনে কারো কারো মন্তব্য পড়ে এদের জন্য সত্যি করুণা হয়। বেশ কয়েক বছর আগে দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘মানুষ মুহম্মদ (স.)’ প্রবন্ধে হযরতের জবানিতে পড়েছিলাম- ‘এদের জ্ঞান দাও প্রভু, এদের ক্ষমা করো’। মক্কার নিপীড়ক ইহুদিদের উদ্দেশ করে রাসুল (স.)’র আশির্বাদটি (!) শিক্ষক বিদ্বেষী মানুষগুলোর জন্য উৎসর্গ (!) করে দিতে কেন জানি খুব ইচ্ছে করে।

আজ ৯ জুলাই জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ সংশোধনী কমিটির শেষ ও চূড়ান্ত সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে দৈনিক শিক্ষার লাইভে জেনেছি। উক্ত কমিটি সমীপে দু’ চারটি কথা বলে মূল বিষয়ে ফিরে যেতে চাই। লম্বা চওড়া কিছু বলতে চাই না। সংক্ষেপে বলি। এসব বিষয়ে অনেকবার লিখেছি। শেষবারের মতো সংশোধনী কমিটিকে আরেকটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। তাদের সুপারিশের আলোকে যেহেতু জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা চূড়ান্ত হবে, সেহেতু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো ভেবে দেখার সবিনয় অনুরোধ জানাই।

কলেজের প্রভাষকদের জন্য অনুপাত প্রথা নামের যে একটি অমানবিক বিষয় আছে, সেটি  একেবারে উঠিয়ে দেয়া দরকার। অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষকদের দ্রুত এমপিওভুক্ত করা প্রয়োজন। উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এমপিওভুক্তি থেকে নয়, যোগদান থেকে অভিজ্ঞতা হিসেব করা উচিত। প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধানরা উচ্চতর স্কেল থেকে বঞ্চিত হবেন কেন? যেহেতু টাইমস্কেলের জায়গায় উচ্চতর স্কেল এসেছে, সেহেতু একই স্কেলে ১০ বছর পূর্তিতে প্রথম উচ্চতর গ্রেড এবং আরও ৬ বছর পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া দরকার। সরকারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকদের সমান স্কেলটি বেসরকারি হাইস্কুলগুলোর প্রধান শিক্ষকদের দিয়ে দেয়া উচিত। একই চেয়ারে একজন ৩৫০০০ টাকা স্কেলে বেতন পাবেন, আর অন্যজন ২৯০০০ টাকা স্কেলে- সেটি কেমন কথা হলো? বদলি, পদোন্নতি, সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা-এসব বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের পুরনো দাবি। এগুলো মেনে নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি অধিদপ্তরকে দু’কলম লিখে দেবার  আবদারটুকু জানিয়ে রাখি।

ফি বছর বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা জুন মাসের বেতন সময় মতো পান না। কোনো কোনো বছর জুলাই মাসের ২০-২৫ তারিখ পার হয়ে যায়। এ সময় তাদের দুর্গতির শেষ থাকে না। এ বছর এমনিতে করোনাকাল। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ গত হয়ে গেলেও জুন মাসের বেতনের কোনো খবর নেই। তাই বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের এবার দুর্গতি বেশি বেড়েছে। আরেকটি বিষয়ে বহুবার লিখেছি। আজ আবার লিখছি। প্রত্যেক মাসের বেতন বিলের সাথে শিক্ষক-কর্মচারীদের অঙ্গীকারনামা দেয়া লাগে। ফি বছর জুলাই মাসে স্ট্যাম্পে শিক্ষক-কর্মচারী ও কমিটির সদস্যদের পৃথক অঙ্গীকারনামা ব্যাংকে জমা দিতে হয়। এটি কেন?  শিক্ষকেরা কী এতই খারাপ মানুষ যে, প্রতিমাসে অঙ্গীকারনামার বিনিময়ে ব্যাংক থেকে বেতন উঠাতে হবে? এর ওপর জুলাই মাসে স্ট্যাম্পে আন্ডারটেকেন? ছিঃ ছিঃ শিক্ষকদের সাথে এমন আচরণ তো দুনিয়ার আর কোথাও কেউ করে বলে শুনি নাই। দয়া করে মুজিববর্ষেই এই অপমানকর রেওয়াজটি বাতিল করা হউক।

এসব এ পর্যন্তই থাক। আজ যে বিষয়টি নিয়ে লিখতে বসেছি, এবার সে কথায় আসি।

ঈদুল আজহা, মানে মুসলিম উম্মাহের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবটি সমাগত প্রায়। এক মাসও বাকি নেই। ঈদ তথা যে কোনো ধর্মীয় উৎসব সেই ধর্মের প্রতিটি মানুষের জীবনে আনন্দময় মুহূর্তগুলোর সমষ্টি বৈ কিছু নয়। কিন্তু, আমাদের দেশে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য সেই আনন্দের মুহূর্তগুলো ব্যথা বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত তাদের কোনো বোনাস ছিল না। দৈনিক শিক্ষার বর্তমান উপদেষ্টা সম্পাদক ও তৎকালীন তুখোড় শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান, প্রয়াত অধ্যক্ষ শরীফুল ইসলামসহ কয়েকজনের প্রাণপন চেষ্টায় ২০০৪ বোনাস দিতে রাজী হয় সরকার। তবে, সেটি একটি পীড়িত বোনাস। কথা ছিলো এটা দিয়ে শুরু করি পরে বৃদ্ধি হবে। ১৬ বছরেরও কোনা পরিবর্তন নেই। এর নড়চড় নেই কেন? যে বা যারা এটিকে এক জায়গায় আটকিয়ে রেখেছে, তারা কেমন মানুষ? ঈদ কিংবা অন্য যে কোনো উৎসবকে যারা কৌশলে খণ্ডিত করে, তারা কী নরাধম নয়? যারা খণ্ডিত উৎসব জিইয়ে রাখে, তারা কেমন মানুষ?
   
মুজিববর্ষকে ঘিরে গোটা জাতির অনেক আশা, আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাশা। একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে বাঙালি জাতি যেমন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ স্বাধীনতার স্বপ্নটি দেখেছিল, তেমনি মুজিববর্ষকে ঘিরে জাতির প্রত্যাশার কোনো শেষ নেই। একজন মুজিব কন্যার হাত ধরে দেশ যেভাবে তর্ তর্ করে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকীতে স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে রাখা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়। এসব প্রত্যাশার মাঝে জাতি তার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানের সান্নিধ্যে যাবার স্বপ্ন দেখেছে। সপরিবারে তাঁকে হত্যার প্রতিশোধ নেবার পথ খুঁজেছে। তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশটির প্রতিচ্ছবি দিব্য চোখে দেখতে চেয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা মুজিববর্ষে তাদের জনমের সব দুঃখ-কষ্ট ঘুচে যাবার এক অবারিত দ্বার উন্মোচনের সমূহ সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন। চিন্তা-চেতনা ও বাস্তবতার নিরীখে তারা সরকারিকরণ তথা জাতীয়করণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা শোনার অপেক্ষা।

মুজিববর্ষেই সরকারি নিয়মে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও উৎসব বোনাস পেয়ে যাবার এক দুর্বার আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত বেসরকারি শিক্ষক সমাজ। এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে মুজিববর্ষ উদযাপনের জন্য জাতি যখন উন্মুখ, ঠিক তখন সহস্রাব্দের ভয়াবহ মহামারি করোনা বিপর্যয় গোটা পৃথিবীকে থমকে দেয়। স্তব্ধ হয়ে যায় মানুষের জীবন যাত্রা। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো পর্যন্ত তাদের স্বাভাবিক কাজ কাম চালিয়ে যেতে গলদঘর্ম হয়ে পড়ে। আচমকা এই  বৈশ্বিক বিপর্যয়ে তবু থেমে নেই বাংলাদেশ। বিপর্যয় কাটিয়ে জাতির জনকের স্বপ্ন পূরণে অদম্য মনোবল নিয়ে এগিয়ে চলেছে জনবান্ধব সরকার। একজন শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও সময়োপযোগী উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশ করোনায় ততটা ভেঙ্গে পড়েনি, যতটা অন্যেরা বলেছিল। ভাগ্যিস, এই মহাদুর্যোগে জাতির জনকের তনয়া শেখ হাসিনা না হয়ে অন্য কেউ ক্ষমতায় থাকলে আজ আমাদের কী হতো? ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের জেলে থেকেও শেখ মুজিব আমাদের যেমন সাহস জুগিয়েছেন, তেমনি তাঁর কন্যা এই কঠিন দুঃসময়ে জাতির আশা আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

বিগত চার দলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের কপালে অভিনব এক সিকি বোনাস জুটেছিল। এরপর চতুর্থবারের মতো টানা তৃতীয়বার জাতির জনকের কন্যা আজ ক্ষমতার মসনদে। তাঁর সময়েই বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ঐতিহাসিক মুহূর্তটি পেয়ে সত্যি এদেশ ও জাতি সৌভাগ্যবান। আজ রাষ্ট্র ক্ষমতায় শেখ হাসিনা না থাকলে আমরা মুজিববর্ষ মুখে উচ্চারণ করতে পারতাম কি না, কে জানে? বেসরকারি শিক্ষকদের অভিনব সিকি বোনাসটি মুজিববর্ষের গায়ে কলঙ্ক তিলকের ন্যায় প্রতিভাত হয়। ঐতিহাসিক মুজিববর্ষকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে এবং বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মন ভরে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপনের সুযোগ করে দিতে আসন্ন ঈদুল আজহা থেকে শতভাগ বোনাস চালু করার জোর দাবি জানাই।

এবারের ঈদুল আজহার ঈদটি মুজিববর্ষের শেষ ঈদ। মুজিববর্ষে সিকি বোনাস একান্ত বেমানান। ঐতিহাসিক এই বর্ষটির সৌজন্যে সিকি বোনাসের অবসান চাই। ঐতিহাসিক মুজিববর্ষের পরেও সিকি বোনাস অব্যাহত থাকলে সেটি মুজিববর্ষের গায়ে কলঙ্ক তিলকের মতো মুজিববর্ষকে ম্লান করে দেবে। প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখবে। চার দলীয় জোট সরকারের অভিনব সিকি বোনাসের বদনাম ও দায়ভার স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি কেন বছরের পর বছর ঘাড়ে করে বহন করবে-সে প্রশ্নটি আজ বড় হয়ে উঠেছে। মানবতার জননী শেখ হাসিনার হাতে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের কলঙ্কের সিকি বোনাসটি মুজিববর্ষে শতভাগে উন্নীত হবে-সেই প্রত্যাশায় আজকের লেখাটির এখানেই ইতি টানতে চাই।    

লেখক : অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী, অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট এবং দৈনিক শিক্ষার সংবাদ বিশ্লেষক।

জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের - dainik shiksha জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি - dainik shiksha জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website