এ কেমন নৃশংসতা - মতামত - Dainikshiksha

এ কেমন নৃশংসতা

ড. নিয়াজ আহম্মেদ |

সাইদুর রহমান পায়েল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। নিজ বাসা চট্টগ্রাম থেকে হানিফ পরিবহনে ঢাকায় ফেরার পথে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গভীর রাতে বাস থেকে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার ভবের চরে নামে। কাজ সেরে আবার বাসে ওঠার সময় ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলে মুখে আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হয়। গাড়িচালক, সুপারভাইজার আর হেলপার ছেলেটিকে গাড়িতে তোলার পর মনে করে সে মারা গেছে। তাই তারা পায়েলকে নদীতে ফেলে দেয়। কী ভয়ংকর নৃশংস ঘটনা আমরা লক্ষ করি। মৃত ভেবে নদীতে ফেলে দেওয়া। ভবের চর থেকে ঢাকার দূরত্ব বেশি নয়। এমনকি ঢাকার কাছাকাছি রাস্তার আশপাশে কোনো না কোনো ক্লিনিক ছিল। তাদের উচিত ছিল দ্রুত গাড়ি চালিয়ে ঢাকায় এসে পায়েলকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করা। তাদের আরো উচিত ছিল বাসের অন্যান্য যাত্রী, বিশেষ করে তার তিন বন্ধু, যারা বাসে ছিল তাদের ডেকে তোলা। তাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া। প্রচণ্ড ধাক্কায় হয়তো ছেলেটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু তারা কোনোটাই করল না। মৃত্যু হয়েছে ভেবে এবং এর জন্য তাদের দায় নিতে হবে এমন ধারণায় তাকে নদীতে ফেলে দেয়। তাদের ছেলেটির আহত হওয়া এরং এর জন্য যদি তার মৃত্যুও হতো, তাহলে সরাসরি দোষারোপ করা যেত না যদি তারা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিত। ন্যূনতম মানবিকতার পরিবর্তে তারা নৃশংস হয়ে ওঠে এবং ছেলেটিকে হত্যা করে। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা অপরাধীদের দ্রুত বিচার আইনে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।

নাগরিক জীবনের নৃশংস আচরণ আমাদের চরমভাবে আহত করছে। অতীতে এমন আচরণের মাত্রা ও ধরন অনেক কম ছিল। সম্প্রতি এমন আচরণ আমরা এত বেশি পরিমাণে লক্ষ করে আসছি, যার মাত্রা ও ধরন ভিন্ন এবং কারণগুলো বহুমাত্রিক। অপরাধের বহুমাত্রিকতা, এর ধরন, প্রকৃতি ও কারণগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়ন ও কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় থাকতে সমস্যা তৈরি করছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে এক সোনা ব্যবসায়ীকে তাঁর এক বন্ধু নিজ বাসায় ডেকে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ টুকরা টুকরা করে ফেলে দেয়। মানুষ কত নৃশংস হলে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে এমনভাবে হত্যা করতে পারে। খোদ পুলিশের একজন উপপরিদর্শককেও ঢাকার বনানীতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এখানেও তাঁর এক বন্ধু একটি অনুষ্ঠানের নাম করে ডেকে নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আরো অনেকে মিলে তাঁকে হত্যা করে। লাশ যাতে শনাক্ত করা না যায় সে জন্য পেট্রল দিয়ে মুখ ঝলসে দেওয়া হয় এবং গাজীপুরে গভীর জঙ্গলে লাশ ফেলে রাখা হয়। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং লাশ ফেলে দেওয়ার কাজের সঙ্গে তাঁর বন্ধু সরাসরি জড়িত। অথচ তাঁর উচিত ছিল বন্ধুকে বাঁচানো কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো। এখন অতি কাছের এবং পরিচিত মানুষদের দ্বারা এমন সব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। পারিবারিক ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। বিশ্বাসের জায়গায় চির ধরেছে। আপনার সন্তানটিকে তার কোনো বন্ধুর বাসায় বেড়াতে যাওয়ার অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে এখন আপনার ভয় লাগা অস্বাভাবিক নয়। কেননা বন্ধুটি কোনো না কোনো কারণে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।

মানুষের স্বাভাবিক সুকোমল বৃত্তিগুলো পরস্ফুিট হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ও সুস্থ পরিবেশ প্রয়োজন। স্বাভাবিক আচরণের প্রকাশভঙ্গি আর অস্বাভাবিক আচরণের প্রকাশভঙ্গি কোনোভাবেই এক নয়। অনেকের বেড়ে ওঠাটা স্বাভাবিক ও সুস্থ নয় বিধায় দ্রুত অপরাধ আচরণ রপ্ত করা সহজ হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারো সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটালে স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক আচরণের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। তবে অনেক সময় তা কঠিনও হতে পারে। কিন্তু স্বল্প সময়ে এমন ভিন্নতা জানা কঠিন। এর ওপর রয়েছে তাত্ক্ষণিক পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে হলে অস্বাভাবিক আচরণ করতে প্রলুব্ধ হওয়া। নিজের ভয় থেকে কখনো কখনো কোনো অপরাধ আচরণ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য অস্বাভাবিক আচরণ করার আগের অভিজ্ঞতা না থাকলেও উচ্ছৃঙ্খল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তখন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়। নিজের মধ্যে ভয় কাজ করে যদি উল্টো বিপদ আসে। পায়েলের ক্ষেত্রে চালক ও হেলপারের চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় পাওয়া যায়। পাশাপাশি তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ভয় কাজ করেছিল। কেননা ছেলেটি মারা গেলে তাদের যদি দোষারোপ করা হতো, যা নিতান্তই অবান্তর। আমরা এখনো নিশ্চিত নই তারা নিজেরা ছেলেটিকে মেরে নদীতে ফেলে দিয়েছে কি না। তদন্তে হয়তো আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে।

আমাদের ভোগবাদী চিন্তা-চেতনা এত বেশি মাত্রায় কাজ করে যে ওই ঘটনায় ছেলেটিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজনবোধ তারা হারিয়ে ফেলেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতায় বেড়ে ওঠা আমরা মানুষ সহযোগিতা ও সহমর্মিতার পরিবর্তে ভোগবাদিতার মধ্যে বড় হচ্ছি। দায় নেওয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে কমে আসছে। নিজের আচরণকে নিয়ন্ত্রণের ভার আমরা নিতে পারি না। যাবতীয় দায়দায়িত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে চাই। নিজেকে বাঁচাতে চাই। এমন মানসিকতাসম্পন্ন মনুষ্য সমাজ বেশি মাত্রায় বিরাজ করলে সমাজ আরো খারাপের দিকে যেতে বাধ্য। যিনি বা যারা দায় থেকে মুক্ত থাকার জন্য এমন আচরণ করছে, যা আইনের দৃষ্টিতে চরম অপরাধ। অপরাধের শাস্তি হবে কি হবে না, তা ভাবার বিষয়; কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই একটি পরিবারের যে ক্ষতি, তা পুষিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ কখনো তৈরি হওয়ার নয়। সমাজে ঘটে যাওয়া এমন অপরাধের কোনোটিতে দ্রুত শাস্তি আমরা লক্ষ করি; কিন্তু তাতেও এমন সব নৃশংস অপরাধের সংখ্যা কমছে না। তথ্য-প্রযুক্তির যুগে আমরা দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারছি; কিন্তু সবাইকে আইনের আওতায় আনা কঠিন হচ্ছে। ফলে উৎসাহ পাচ্ছে অপরাধীরা। এমন অবস্থা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বাইরের কর্মকাণ্ডে এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ওঠাবসার ক্ষেত্রে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দারুণ ঘাটতি দেখা দিতে পারে। নাগরিক জীবনের অন্য অনেক সমস্যার মধ্যে এমন সব নৃশংস আচরণ আমাদের মধ্যে দারুণ আতঙ্ক তৈরি করছে। স্বল্পমাত্রার মানসিক সমস্যা এবং রোগও আমাদের পেয়ে বসতে পারে। সমাধান আমাদেরই বের করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

নভেম্বরের এমপিওর সাথেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেয়া হতে পারে - dainik shiksha নভেম্বরের এমপিওর সাথেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেয়া হতে পারে এমপিও বাতিল হচ্ছে ১২ শিক্ষক-কর্মচারীর - dainik shiksha এমপিও বাতিল হচ্ছে ১২ শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওভুক্ত হচ্ছেন কারিগরির ২২৮ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন কারিগরির ২২৮ শিক্ষক বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ - dainik shiksha বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী - dainik shiksha স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website