কমছে গ্রামীণ মাদরাসাগুলোর ছাত্রসংখ্যা - মাদরাসা - Dainikshiksha

কমছে গ্রামীণ মাদরাসাগুলোর ছাত্রসংখ্যা

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ অঞ্চলে শিক্ষার সূচনা হয়েছিল এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই। জনগণের সার্বিক সহযোগিতায় পরিচালিত কওমি মাদরাসার পাশাপাশি দ্বিনি শিক্ষা প্রসারে ভূমিকা রাখছে সরকারি মাদরাসাও। দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানে এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। তবে দিন দিন যেন রং হারাচ্ছে গ্রামীণ দ্বিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। কমে যাচ্ছে মান, ছাত্রসংখ্যা ও অভিভাবকদের আগ্রহ। এ ক্ষেত্রে অভিন্ন চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় কওমি ও আলিয়া উভয় ধারার মাদরাসায়। রোববার (৯ জুন) কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন হাম্মাদ রাগিব।

একসময় গ্রামীণ মাদরাসায় লেখাপড়া করেও জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে অনেককে। তবে এখন সে দৃশ্য অনেকটা বিরল। প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ হলো, অন্য সব খাতের মতো শহুরে মাদরাসার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছাত্র-শিক্ষক ও দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখতে পারছে না গ্রামের মাদরাসা। শহুরে মাদরাসার আর্থিক সামর্থ্য, উন্নত আবাসন ব্যবস্থা ও খাবার, খ্যাতিমান শিক্ষকদের কাছে পড়ার সুযোগের বিপরীতে গ্রামীণ মাদরাসাগুলোর অবস্থা অনেক জৌলুসহীন। সেখানে তারা দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ও উন্নত আবাসন ব্যবস্থা থেকে বরাবরই বঞ্চিত। বরং মাদরাসার টিকে থাকার নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের অংশীদার তারা। এমন আরো অনেক কারণে গ্রাম ছাড়ছে শিক্ষার্থীরা। মেধাবী তরুণ আলেমরাও উন্নত জীবনের চিন্তা করে গ্রামমুখী হতে নারাজ। ফলে ক্রমে নেমে যাচ্ছে গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান। এ ছাড়া প্রচারমাধ্যম ও জাতীয় পর্যায়ে ধর্মীয় নেতৃত্বে উপেক্ষিত গ্রামীণ মাদরাসার ছাত্ররা ভোগে কিছুটা হীনম্মন্যতায়।

শুধু গ্রামীণ মাদরাসাগুলোই যে রং হারাচ্ছে, তা নয়, বরং ঔজ্জ্বল্য কমছে মসজিদভিত্তিক গ্রামীণ মক্তবেরও। সকালে স্কুল টাইম, বিভিন্ন এনজিও ও মিশন পরিচালিত শিক্ষালয়ের সুযোগ-সুবিধার কারণে ভিড় কমছে সেখানে। অথচ একসময় এসব মক্তবই ছিল বাঙালি মুসলমানের দ্বিন শেখার প্রধান অবলম্বন। অবশ্য সরকারি মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়নে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। শিক্ষা সিলেবাসের আধুনিকায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষা সংযুক্তি, শিক্ষকদের জবাবদিহির ব্যবস্থাসহ অনেক প্রস্তাব রয়েছে সেখানে; যা বাস্তবায়িত হলে মাদরাসা শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। যেহেতু কওমি মাদরাসা সরকারের এই পরিকল্পনার অধীন নয়, তাই প্রতিবেদনে সেদিকেই বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হলো।

বিখ্যাত-অখ্যাত বেশির ভাগ কওমি মাদরাসা শিক্ষিতের প্রাথমিক শিক্ষা বা পড়াশোনার হাতেখড়ি গ্রামবাংলার এসব প্রতিষ্ঠানেই হয়ে থাকে। গ্রামীণ এসব মাদরাসার কোনোটি প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, কোনোটায় মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকে, আবার কোনোটায় উচ্চ মাধ্যমিকসহ থাকে কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের ক্লাসও।

বাংলাদেশের গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে যাওয়া এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান ও ছাত্রসংখ্যা তুলনার বিচারে দিন দিন যেন কমতির দিকে পতিত হচ্ছে। কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডগুলোর কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফলাফলের দিকে নজর দিলে পড়ালেখার মানের দিকটা সহজে অনুমান করা যায়। শহর ও রাজধানীর মাদরাসাগুলোতে যেখানে প্রায় প্রতিটি ক্লাসে মেধাতালিকায় স্থান পাওয়াসহ ‘মুমতাজ’ কিংবা ‘জায়্যিদ জিদ্দানে’ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রচুর, সেখানে গ্রামীণ মাদরাসাগুলোর বেশির ভাগেই ‘জায়্যিদ’ কিংবা ‘মকবুল’ ছাত্রের ছড়াছড়ি থাকে, থাকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীও।

আর ছাত্রসংখ্যা কমতির ব্যাপারটি ধরা যায় প্রাইভেট ও বিশেষায়িত মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথবা শহরাঞ্চলের মানসম্মত মাদরাসাগুলোর দিকে অভিভাবকদের আগ্রহ ও ঝোঁক দেখে।

কেন কমছে গ্রামীণ মাদরাসাগুলোর মান ও ছাত্রসংখ্যা—এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম হবিগঞ্জের গ্রামীণ একটি মাদরাসার অভিজ্ঞ শিক্ষক ও তরুণ আলেম চিন্তক মাওলানা সাবের চৌধুরীর সঙ্গে।

মাওলানা সাবের চৌধুরী মনে করেন, গ্রামীণ মাদরাসাগুলোয় পড়াশোনার মানবিষয়ক যে সমস্যা, তা নতুন নয়, অনেক পুরনো। বর্তমানে সমস্যাটি বরং কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে অনেক গ্রামীণ মাদরাসা।

মাওলানা সাবের বলেন, ‘মফস্বলের মাদরাসাগুলোর পড়াশোনার মান কমছে বলে আমার মনে হয় না। অতীতের তুলনায় দিন দিন বরং উন্নতি হচ্ছে। অনেক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, যেগুলো বেশ ভালো করছে। মফস্বলে অনেক নুরানি ও হিফজখানা আছে, যেগুলোর মান বেশ ভালো। পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও নতুন উদ্যমে জেগে ওঠার একটা প্রবণতা আমি দেখি। বিশেষ করে নিচের দিকে, অর্থাৎ কাফিয়া পর্যন্ত মফস্বলে অনেক মাদরাসা আছে, যেখানে বেশ ভালো পড়াশোনা হয়। আবার নামমাত্র পড়াশোনা হচ্ছে—এমন মাদরাসার সংখ্যাও অনেক। গড়পড়তা এমন মাদরাসার সংখ্যাই হয়তো বেশি। এ জন্য একাট্টা মন্তব্য করা আসলে মুশকিল।’

তবে কাফিয়ার ওপরে যে মাদরাসাগুলো আছে মফস্বলে, সেগুলোর প্রশ্নবিদ্ধ মানের ব্যাপারে মোটামুটি ঢালাওভাবে একমত মাওলানা সাবের। তিনি বলেন, ‘ওপরের দিকে, বিশেষ করে শরহে বেকায়া থেকে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত জামাতগুলোতে পড়াশোনার মান কম। ছাত্রসংখ্যার ব্যাপারটিও এর সঙ্গে জড়িত। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, কাফিয়া জামাত পর্যন্ত মফস্বলের মাদরাসাগুলোতে ছাত্রসংকট নেই। এমনিভাবে নুরানি ও হিফজ বিভাগেও ছাত্রসংখ্যা অনেক। সমস্যাটি হচ্ছে কাফিয়ার পর থেকে। এ সময় ছাত্ররা বড় মাদরাসাগুলোতে চলে যেতে চায়। বিশেষ করে ঢাকার দিকে তাদের নজর থাকে বেশি।’ এমনটি কেন হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মোটা দাগে এখানে দুটি প্রবণতা কাজ করে। এক. বড় মাদরাসাগুলোর প্রতি ছাত্রদের মনে এক ধরনের প্রবল কৌতূহল ও আগ্রহ কাজ করে। বিশেষ করে ঢাকার প্রতি মফস্বলের ছাত্রদের মনে আকর্ষণ প্রবলতর। ঢাকা তাদের কাছে ভিন্ন একটি জগতের মতো। এটি একটি বিষয়।

আর সবাই চায় পড়াশোনা যেমনই হোক, সমাপ্তিটা যেন বড় একটা মাদরাসা থেকে হয়। সামাজিকভাবে এর একটি ভ্যালু আছে। এটি সঠিক, না বেঠিক যা-ই হোক, আছে। দ্বিতীয়ত, মফস্বলের অনেক মাদরাসায় ছাত্ররা নিজেদের মেধা ও চাহিদা অনুযায়ী খোরাক পায় না। মানে, তুলনামূলক বড় মাদরাসাগুলোর তুলনায় আর কি। অন্যথায় ভরপুর খোরাক পায়—এমন মাদরাসার সংখ্যাও তো আসলে বেশি না। এখানে নানা সীমাবদ্ধতা আছে। লম্বা আলোচনার বিষয়। আমাদের শিক্ষা বোর্ডগুলো যদি শুধু পরীক্ষাসর্বস্ব না হয়ে কার্যত সুচারু ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রক শক্তি হয়ে উঠতে পারে, তাহলে এ সংকট কাটানো সম্ভব। সেদিকে না গিয়ে আমি বরং ছোট একটি সংকটের কথা বলি। মফস্বলের অনেক ছেলে, যারা অন্যদের চেয়ে ভালো, বিশেষ করে ঢাকার দিকে যেতে চায়; কিন্তু মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাদের যেভাবেই হোক আটকাতে চায়। একসময় সেটি উস্তাদ-ছাত্রের সম্পর্কের টানাপড়েনের দিকে চলে যায়। আর যারা শেষ পর্যন্ত থেকে যায় তারাও ঠিক স্বস্তি পায় না। আমার মনে হয় এ জায়গাটিতে আমাদের উদার থাকা উচিত। এই উদারতাটুকু আমরা নিতে পারলে মাদরাসাগুলো স্বেচ্ছায় একটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আর চ্যালেঞ্জিং সব সময়ই ভালো ফল বয়ে আনে। এর একটি ভালো ফল এটিও হতে পারে, মফস্বলে বিপুলসংখ্যক দাওরায়ে হাদিস মাদরাসা না থাকা। একটি জেলায় দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত একটি কি দুটি মাদরাসাই যথেষ্ট। অন্যগুলো মাধ্যমিক পর্যায়ে থাকুক। বর্তমানে আমাদের লোকবল বাড়ছে। যোগ্য লোকও বাড়ছে। ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে থেকে এই চ্যালেঞ্জে জেতার মতো একটি সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে।’

 

লেখক : তরুণ আলেম ও সাংবাদিক

তিন শর্তে অস্থায়ী এমপিও পাচ্ছে ১৭৬৩ প্রতিষ্ঠান, আলাদা পরিপত্র - dainik shiksha তিন শর্তে অস্থায়ী এমপিও পাচ্ছে ১৭৬৩ প্রতিষ্ঠান, আলাদা পরিপত্র প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি করতে হবে চর এলাকায়, আসছে চর ভাতা - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি করতে হবে চর এলাকায়, আসছে চর ভাতা ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত ২২ আগস্ট - dainik shiksha ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত ২২ আগস্ট বিএড ৩য়-৫ম সেমিস্টারের ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৫ আগস্ট থেকে - dainik shiksha বিএড ৩য়-৫ম সেমিস্টারের ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৫ আগস্ট থেকে সাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তির আবেদন শুরু ১০ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha সাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তির আবেদন শুরু ১০ সেপ্টেম্বর এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর - dainik shiksha এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website