করোনাকালীন প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ক কিছু কথা - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

করোনাকালীন প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ক কিছু কথা

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এগুলো তো গ্রামবাংলার বাতিঘর। আর এই বাতিঘরগুলোই এখন করোনার আঘাতে অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায়। দেশে সাধারণত গ্রামে কিংবা শহরে দরিদ্র পরিবারের সন্তানরাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে থাকে। দরিদ্র হলেও এদের অভিভাবকদের একটা না একটা পেশা বা অর্থনৈতিক কর্মকা- ছিল। কিন্তু প্রাণঘাতী করোনায় তাদের সেসব কর্মকা- অনেকটাই স্থবির হয়ে আছে। তারা এখন পরিবারের আশ্রয় এবং ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতেই হিমশিম খাচ্ছে। সন্তানদের পড়ালেখার বিষয়টি কীভাবে প্রাধান্য দেবে? শহরে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার গ্রামে ফিরে এসেছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়তে এ তথ্য জানা যায়।

উপসম্পাদকীয়তে আরও জানা যায়, এমতাবস্থায় শিশুকে শিশুশ্রমে নিয়োজিত করা আর কন্যা শিশুকে অকালে পাত্রস্থ করার বিষয়েও তারা ভাবতে পারে। অর্থাৎ দরিদ্র পরিবারের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। পাশাপাশি যাদের কিছুটা সঙ্গতি আছে অথচ অভিভাবক অক্ষরজ্ঞানহীন তারাও যে ভালো আছে বলা যাবে না। স্কুলে পড়ালেখা বন্ধ। বাড়িতেও দেখিয়ে দেয়ার কেউ নেই। তাই বিদ্যালয়ে শিশুরা যতটুকু শিখেছিল চর্চার অভাবে তা ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। কাজেই যত দ্রুত সম্ভব এদের রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। যা হোক বর্তমানে সংসদ-টেলিভিশনের মাধ্যমে ‘ঘরে বসে শিখি’ নামক প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ যে ক্লাস নিচ্ছেন তা সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ জেলাভিত্তিক Online School নামক Facebook live প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণী কাজের video প্রচার করছেন যা প্রশংসনীয়। এসব কার্যক্রম শুধু যেসব শিক্ষার্থীদের ঘরে টিভি আছে বা একাধিক স্মার্টফোন আছে তাদের জন্যই কার্যকরী। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকবৃন্দও প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে সুযোগটি কাজে লাগাতে পারছেন। তবে এ কথা না বললেই নয় যে বেশিরভাগ ভার্চুয়াল পাঠদান প্রক্রিয়া শিক্ষকের নিজের মতো করে পরিচালিত হচ্ছে। ছাত্রদের কতখানি কাজে আসতে পারে বা তারা বুঝতে পারল কি না তা নিয়ে খুব একটা ভাবনা-চিন্তা করার সুযোগ কম।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। গাজীপুরে JICA (Japan International Cooperation Agency) আয়োজিত এক সেমিনারে যোগদানের সুযোগ হয়েছিল। বক্তা ছিলেন জাপানি ভদ্রমহিলা। তিনি বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা ছিল সেখানে। তার ভাষায় বাংলাদেশ ঠিক পথেই আছে। তবে চলার গতি বেশ ধীর। সত্যিকারের উন্নয়নের জন্য বিশে^র অগ্রগামী দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে। তিনি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি নিয়েই এ কথা বলেছিলেন। যা হোক সাম্প্রতিককালে প্রাথমিক শিক্ষায় আমাদের অর্জন একেবারে কম নয়। তবে গুণগত মানোন্নয়নের ধারায় আমাদের পালে যখন জোর হাওয়া তখনই যেন দমকা বাতাসের মতো কোভিড-১৯ এর আবির্ভাব। শুধু প্রাথমিক শিক্ষা নয়, সমস্ত ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা বাণিজ্য, পর্যটন, শিল্প কারখানাসহ সব খাত এ অপঘাতের শিকার। এখনই সময় সব ক্ষতি পোষাতে ঘুরে দাঁড়ানোর। স্রোতে গা ভাসিয়ে বিশেষ কোন খাতের অব্যবস্থাপনা কিংবা সমন্বয়হীনতা বিশ্লেষণে আমাদের কাজ নেই। আর কোভিড-১৯ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। কারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী পর্যন্ত সবাই স্বাস্থ্য-বিষয়ে কম-বেশি প্রশিক্ষিত। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সবাই কৃতজ্ঞ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসমূহও খোলা আছে। প্রয়োজনে সেখানে যোগাযোগ করা যায়।

সুতরাং নিজেকে সুরক্ষিত রেখে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পারিবারিক অবস্থা, পরিবারে শিশুটি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কিনা, তাকে বাল্য বিবাহ দেওয়া হচ্ছে কিনা, পরিবারের আয় বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম চলছে কিনা, অভিভাবকের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক আছে কিনা, কোন শিশু মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে কিনা ইত্যাদি সবকিছুর দেখভাল করা প্রয়োজন। আমাদের realize করতে হবে যে একটু সহানুভূতি, একটু পাশে দাঁড়ানো এবং একটু পরামর্শ বাঁচিয়ে দিতে পারে শিক্ষার্থীসহ পুরো পরিবারকে, পুরো ক্যাচমেন্ট-এরিয়াকে তথা সমগ্র বাংলাদেশকে। কারণ একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেমন কয়েকটি ক্যাচমেন্ট-এরিয়ার সমষ্টি তেমনি আমাদের এই বাংলাদেশটি এক দৃষ্টিতে কতকগুলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকার সমষ্টি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে অগ্রসর হলেই হলো। ... আমাদের লক্ষ্য শিশুর শিক্ষা। আর এ কাজে সফল হতে গেলে ঊর্ধ্বতন নিম্নপদস্থ সবাইকেই হতে হবে প্রথমত শিক্ষক তারপরে অন্যকিছু। পদমর্যাদায় যত বড়ই হোন না কেন তিনি যেন শিক্ষার্থীর নিকটে গিয়ে বলতে পারেন ‘তোমার স্বপন স্যারের মতো আমিও তোমার একজন স্যার।’ শুরুটা এভাবে হওয়া চাই। হ্যাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ব্যক্তিগত সুরক্ষা মেনে আমাদেরকেই হাজির হতে হবে। আমরা জানি অভিভাবকদের স্মার্টফোন নেই, টেলিভিশন নেই, বাড়িতে পড়ার টেবিল নেই এবং একটা ঘরে গাদাগাদি করে পরিবারের সবাইকে বসবাস করতে হয়। যেহেতু সবার টার্গেট শিশু-শিক্ষার্থী কাজেই তাদের চোখে চোখে রাখতে হবে। সেটা কীভাবে সম্ভব? এ মুহূর্তে সব অভিভাবককে স্মার্টফোন প্রদান করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। অভিভাবকরা যে স্মার্ট ফোন কিনবেন সে সামর্থ্যও তাদের নেই। আবার এই স্মার্টফোন এদেশে প্রতিনিয়ত চুরিও হয়। ইতোমধ্যে অনেক বিদ্যালয়ের ল্যাপটপ চুরি হয়ে গিয়েছে। বিষয়টি লজ্জাকর হলেও সত্য। বিদ্যালয় খুলে দেয়া যাচ্ছে না। কারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদে-শিক্ষার্থীরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক পরিধান করা, ঘন ঘন সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া; এ সবের কোনটাই Maintain করতে পারবে না। কাজেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ বিদ্যালয় পুনরায় খোলার আগ পর্যন্ত কীভাবে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা যায় সেটাই এখনকার মুখ্য বিষয়। এ কাজে যত বিলম্ব হবে আমাদের দেশ ততটাই পিছিয়ে যেতে থাকবে।

বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত কৃষি, খনিজ সম্পদ, শক্তির উৎস, শিল্প বাণিজ্য এসবকে সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু বর্তমানে এই একুশ শতকের সম্পদ হচ্ছে জ্ঞান। আর শুধু মানুষই জ্ঞান অন্বেষণ করতে পারে, জ্ঞান ধারণ করতে পারে এবং জ্ঞান ব্যবহার করতে পারে। তাই এখন পৃথিবীর সম্পদ হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এ মানুষকে এক সময় বেঁচে থাকার জন্য পুরোপুরি প্রকৃতির অনুকম্পার ওপর নির্ভর করতে হতো। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে মানুষের চেতনাকে গ্রাস করে ছিল অবৈজ্ঞানিকতা, অসমর্থতা এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস। ক্রমে মানুষ বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কার করে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনেছে। অষ্টাদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দীতে শিল্পবিপ্লবের পর পৃথিবীর যে সব জাতি শিল্পবিপ্লবে অংশ নিয়েছিল, এক সময় তারাই যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। একুশ শতকে যখন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির অবতারণা হয়েছে তখন ওই একই ব্যাপার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরি করার বিপ্লবে যারা অংশ নেবে তারাই পৃথিবীর চালিকাশক্তি হিসেবে থাকবে। নতুন এই বিপ্লবে অংশগ্রহণের জন্য চাই পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব, যোগাযোগ দক্ষতা, সুনাগরিকত্ব, সমস্যা সমাধানে পারদর্শিতা, বিশ্লেষণী চিত্তন দক্ষতা (Critical thinking), সৃজনশীলতা এবং সর্বোপরি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে পারদর্শিতা। অতএব সবারই উচিত একুশ শতাকের এই জ্ঞানভিত্তিক সমাজের একজন হিসেবে এদেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে নিজেকে নিয়োজিত করা। কোনভাবেই যেন দেশ পিছিয়ে না থাকে। এই হোক সবার প্রত্যাশা।

আমাদের দেশে ১১ (এগারো) ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। সেগুলো হলো : (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (২) নন রেজি: বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (৩) পরীক্ষণ বিদ্যালয় (৪) কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় (৫) রস্ক-সেন্টার আনন্দ স্কুল (৬) শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় (৭) এবতেদায়ী মাদরাসা (৮) হাই সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় (৯) হাই মাদরাসা সংযুক্ত এবতেদায়ী মাদরাসা (১০) কিন্ডারগার্টেন স্কুল (১১) এনজিও পরিচালিত স্কুল।

এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কিন্ডারগার্টেনের মধ্যকার ব্যবধানটা অত্যন্ত স্পষ্ট। সুবিধাভোগী শ্রেণীর ক্ষুদ্র একটি অংশ কিন্ডারগার্টেনে দৃশ্যত উঁচু মানের শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেখানে শিক্ষকদের যোগ্যতার ঘাটতি আছে। বিদ্যালয়ের সময় ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত সংখ্যক বই পড়ানো, লেখানো ও সাধারণ জ্ঞানের বই পড়ানো, ব্যাকরণ পড়ানো ইত্যাদি মিলিয়ে ব্যতীক্রমধর্মী বলা চলে। তাই সুবিধাভোগী শ্রেণীর দৃষ্টি সেইদিকেই। অন্যদিকে জনসাধারণের বিপুল অংশের ছেলেমেয়েরা অধ্যয়নরত আছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। যেখানে শিক্ষকদের যোগ্যতা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও নানা ঘাটতি থেকে গেছে। এই যে সুবিধাভোগী এবং সুবিধাবঞ্চিত তথা অন্যদের মধ্যে শিক্ষার মানের যে বিভাজন রেখা তা যেন বজায় না থাকে সেজন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সব শিক্ষার্থীর বাড়ি তথা ঘরকে এক-একটি স্কুলে রূপান্তর করতে হবে। হ্যাঁ এমন সেøাগানই ছিল ২০১৫ সালের জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের। আর তা হলো-

‘শিক্ষিত মা এক সুরভিত ফুল, প্রতিটি ঘর হবে এক একটি স্কুল’

শিক্ষার্থীদের বাড়িতে তার জন্য একটি পড়ালেখা করার স্থান থাকবে। সেখানে একটি টেবিল এবং দুটি চেয়ার থাকলে ভালো। এই স্থানটি হবে ওই ঘরের বা বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। মা পড়ালেখা জানুক আর নাই জানুক তিনি শিক্ষার্থীর পাশে পড়ার সময় বসে থাকবেন যতক্ষণ পারেন। বিষয়টি নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারেন শ্রেণী শিক্ষকগণ।

পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সেবাদানকারী মাঠকর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দান করে থাকেন। একই ভাবে আমাদের শিক্ষকগণও প্রস্তুতকৃত শিডিউল মোতাবেক শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে পারেন। এজন্য আগে থেকেই একটি শিডিউল তৈরি করে নিতে হবে। অতঃপর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে ক্যাচমেন্ট-এরিয়াভিত্তিক শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করে শিক্ষকদের তাদের দায়িত্ব ভাগ করে দিতে হবে। ফলে শিক্ষকবৃন্দ ছকমাফিক শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের পড়া বুঝিয়ে দিতে পারবেন। অভিভাবকদের এ বিষয়ে আগে থেকেই জানিয়ে রাখা ভালো। করোনা-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি মানা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ সবাইকে মাস্ক এবং হ্যান্ডগ্লোবস পরতে হবে। পাঠদানের সময় অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব (৩-৪ ফুট) বজায় রাখতে হবে।

এবারে নিজের কিছু অভিজ্ঞতা সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চাই। বিগত ২১/০৭/২০২০ তারিখে সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার বারাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম মা তথা অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছেন। মায়েদের যখন এভাবে শিক্ষকগণ কর্তৃক শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ালেখায় সহযোগিতার বিষয়ে জানানো হলো তখন তো তারা মহাখুশি। অনতিবিলম্বে ক্যাচমেন্ট-এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের বিষয়ে কার্যক্রমটি শুরু করবেন উক্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল মোমিন। পর্যায়ক্রমে উপজেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ধরনের পাঠ-কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। যেহেতেু সবার স্মার্টফোন নেই। দু’একজনের বাড়িতে স্মার্টফোন থাকলেও ডেটা ক্রয়ের সামর্থ্য নেই। বাড়ির মোবাইল ফোনটিও শিক্ষার্থীর অভিভাবক নিয়ে অন্যত্র কাজে চলে যান। শুধু আমাদের দেশেই নয়; অপেক্ষাকৃত অনেক উন্নত দেশেও স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং ইন্টারনেটের সরাসরি সুবিধা এখনও সবার ঘরে ঘরে পৌঁছানো যায়নি। সম্প্রতি ইউনিসেপের একটি প্রতিবেদনে জর্জিয়ার (রাশিয়ার সাবেক উপনিবেশ) একজন ভুক্তভোগী মায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথা জানানো হয়েছে। কাজেই Without any device-এ এটাই সর্বোত্তম উপায় বলে আমার মনে হয়েছে। বিগত ২৩ জুলাই ২০২০ উপজেলা পরিষদ আয়োজিত মাসিক সমন্বয় সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করেও সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্মার্টফোন তথা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যেমন আমরা Zoom apps ব্যবহার করে Virtual মিটিং করে চলেছি। করোনাকালে করণীয় বিষয়ে সময়ে সময়ে Virtual মিটিংগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে কীভাবে অগ্রসর হওয়া যায় তার দিক নির্দেশনা পাচ্ছি।

বারাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মায়েদের সঙ্গে আলোচনাকালে আমার সঙ্গে ছিলেন জয়েন-বড়ধুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. শাহ্জামাল। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা এবং রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে থাকেন। আমরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অধিক সংখ্যক শিফটের মাধ্যমে বিদ্যালয়েই কীভাবে পড়ানোর ব্যবস্থা করা যায় তা নিয়েও আলাপ করেছিলাম। ...২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৮ ফুট প্রস্থ সম্বলিত একটি শ্রেণীকক্ষে বেঞ্চ রয়েছে ২০ জোড়া। এখানে প্রতি বেঞ্চে একজন করে শিক্ষার্থী বসালে ৩৬০ বর্গফুটের একটি শ্রেণীকক্ষে সামাজিক দূরত্ব (৩ ফুট) বজায় রেখে ২০ জন শিক্ষার্থী বসতে পারবে। অবশ্যই তাদের মাস্ক পরিহিত থাকতে হবে। বিদ্যালয়ে Wash block এ Hand wash-এর পর্যাপ্ত সুবিধা রাখতে হবে। শিফ্ট সংখ্যা হবে শিক্ষার্থী এবং বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ অনুপাতে। শিফটের স্থায়ীত্বকাল নির্ধারণ করা হবে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে। তবে এ ব্যবস্থায় ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের পক্ষে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা একটি চ্যালেঞ্জ বটে।

এখানে একটি কথা বলা আবশ্যক। শুধু শিক্ষকবৃন্দই নয় স্থানীয় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ ও এ মুহূর্তে গ্রামে অবস্থানকারী কলেজ বা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের এ ব্যাপারে বিশেষ দায়িত্ব আছে বলে মনে করি। তারা পাশের বাড়ির প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাহায্য করতে পারেন। প্রত্যেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রয়েছে ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি, মাদার্স ক্লাব এবং এলাকাবাসী। তারা সবাই মিলে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সহযোগিতা করতে পারেন। এ মুহূর্তে আমরা যে সব Online ভিত্তিক Virtual মিটিং দেখছি তা বিদ্যালয় পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। অর্থাৎ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন Stake holder দের নিয়ে করণীয় বিষয়ক মিটিং করে কর্মসূচি হাতে নিতে পারেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমরা যারা মাঠকর্মী রয়েছি তাদের উদ্দেশ্যে বলছি ... আমরা অনেক ভাগ্যবান। করোনার এই মহামারীর মধ্যেও আমরা নিয়মিত বেতন ভাতাদি পেয়ে ধন্য।

তাই আসুন দেশ-মাতৃকার প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ যে যার কাজে মনোনিবেশ করি। এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের করোনাকালীন পাঠের ক্ষতি পূরণ করার চেষ্টা করি।

[লেখক : সন্ধ্যা রানী সাহা, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ]

ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী - dainik shiksha ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে আসছেন শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha সংবাদ সম্মেলনে আসছেন শিক্ষামন্ত্রী করোনা: দেশে আরও ৩২ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ১ হাজার ৪০৭ - dainik shiksha করোনা: দেশে আরও ৩২ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ১ হাজার ৪০৭ অস্ত্র মামলায় সাহেদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড - dainik shiksha অস্ত্র মামলায় সাহেদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মতিঝিল মডেল কলেজের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ২ জনের কারাদণ্ড - dainik shiksha মতিঝিল মডেল কলেজের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ২ জনের কারাদণ্ড বন্যার শুরুতেই আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ার নির্দেশ - dainik shiksha বন্যার শুরুতেই আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ার নির্দেশ এক কলেজেই জাল সনদধারী আট শিক্ষকের চাকরি! - dainik shiksha এক কলেজেই জাল সনদধারী আট শিক্ষকের চাকরি! শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর - dainik shiksha শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর প্রশ্নফাঁস করে কোটিপতি রংপুর মেডিকেল কলেজের পিয়ন - dainik shiksha প্রশ্নফাঁস করে কোটিপতি রংপুর মেডিকেল কলেজের পিয়ন please click here to view dainikshiksha website