করোনার ভয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন না ডেঙ্গু রোগীরা - করোনা আপডেট - দৈনিকশিক্ষা

করোনার ভয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন না ডেঙ্গু রোগীরা

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

প্রাণঘাতী করোনার মধ্যে অনেকটা বাধাহীনভাবেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশার দাপট। সিটি কর্পোরেশনের পরিদর্শনে পাওয়া মশার মারত্মক উপস্থিতি ভাবিয়ে তুলছে মেয়রসহ অন্য কর্মকর্তাদেরও। বছরের প্রথম তিন মাসে ইতিহাসের যে কোন সময়ের তুলনায় হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী কয়েকগুণ বেশি হলেও করোনার কারণে গত তিন মাসে হঠাৎই ডেঙ্গু শূন্য হয়ে গেছে হাসপাতাল! করোনার ভয়ে হাসপাতালে যাচ্ছে না রোগীরা। চিকিৎসাও করাতে পারছেন না সকলে। কারণ একটাই, করোনা। পাওয়া যাচ্ছে না রক্তও। এদিকে বৃষ্টি বাড়াতে এডিস মশার উপদ্রব কয়েকগুণ বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে চার দফা সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের সুপারিশ করেছেন দেশের কীটতত্ত্ববিদরা। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত  এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন বিভাষ বাড়ৈ।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, কীটতত্ত্ববিদরা সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি রাজধানীর বাসিন্দাদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা আবারও সতর্ক করে বলেছেন, এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে বহুগুণ। আবার হাসপাতালেও ঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছে না রোগীরা। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও আসছে না কোন তথ্য। করোনার কারণে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমও স্থবির। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশে ৩২০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তদের সবচেয়ে বেশি ২৪৪ জনই রাজধানীর। অধিদফতরের কর্মকর্তারাই বলছেন, করোনাভাইরাস সঙ্কটের মধ্যে চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে সকল রোগীদের জন্যই।

ফলে যে হিসেব হাসপাতাল থেকে অধিদফতরে আসছে তার বাইরে কতজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন তার কোন তথ্য সরকারের কাছে নেই। কারণ অধিদফতর যে তথ্য পায় তা কেবল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রোগীদের ওপর ভিত্তিতেই। ফলে করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে ভয় ও চিকিৎসা না পাওয়ায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও হাসপাতালে যাচ্ছেন না অধিকাংশই। অবস্থা এমন যে, গত বছরের এই সময়ে যেখানে ২০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তির তথ্য অধিদফতরে আসত এবার সেখানে অধিকাংশ দিনই সংখ্যা হয় শূন্য। কোন কোন দিন একজন, আবার কোনদিন হচ্ছে দুজন।

চিকিৎসকরা হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য উল্লেখ করে বলেছেন, করোনার এই সঙ্কটের কারণে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ ডেঙ্গু চিকিৎসায় রক্ত অত্যন্ত জরুরী। কারণ, বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ডেঙ্গু হলে প্লাটিলেট কমতে শুরু করে। রক্ত দিয়ে প্লাটিলেটের অভাব পূরণ করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসেব বলছে, গত ৬ জুন থেকে শুরু করা অভিযানে এখন পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এক হাজার ৬১১টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৩৪১টি বাড়িতে এইডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে ২১ দশমিক ১৭ শতাংশ বাড়ি।

এ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা ডাঃ আফসানা আলমগীর খান বলেন, জরিপে প্রতি এক শ’ বাড়ির মধ্যে পাঁচ বা পাঁচের বেশি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা বা পিউপা পাওয়া গেলে হাউজ ইনডেক্সে তা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বিবেচনা করা হয়। আর ব্রুটো ইনডেক্স বের করা হয় মশার প্রজনন উৎস হিসাব করে। প্রতি এক শ’ প্রজনন উৎসের মধ্যে ২০টি বা তার বেশিতে যদি এইডিস মশার লার্ভা বা পিউপা পাওয়া যায়, তাহলে সেটাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি’ বলা যায়।

তিনি আরও বলেন, ইনডেক্স বের করলে ডিএনসিসি এলাকায় মশার উপস্থিতির প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে। তবে এখন যে পরিমাণ মশা পাওয়া যাচ্ছে তা শঙ্কা জাগাচ্ছে। এটা মানুষকে বোঝাতে হবে। যে মশা পাওয়া যাচ্ছে তা এলার্মিং। কারণ ২৩০টি বাড়ি পরিদর্শন করে যদি ৪৬টি বাড়িতে মশা পাওয়া যায় সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব জায়গায় আমরা মশার লার্ভা পেয়েছি, সেগুলো বেশিরভাগই বাড়ির ভেতরে। মিটারের গর্তে, কার্নিশে, মিষ্টির প্যাকেট ফেলে রেখেছে সেখানে জমে থাকা পানিতে মশা ডিম দিচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার সরকারের ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। সরকারের সঙ্গেও একই ইস্যুতে কাজ করা এ বিশেষজ্ঞও সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিস বাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচীর পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য ঢাকায় এডিস মশার উচ্চমাত্রার উপস্থিতি নির্দেশ করে। বর্ষার যেভাবে বাড়ছে তাতে পদক্ষেপ না নিলে সঙ্কট মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। মার্চে করোনার কারণে হাসপাতালে জটিলতায় আতঙ্কে ডেঙ্গু হলেও আসলে কারও খবর জানা যাচ্ছে না। মার্চ-এপ্রিল, মে জুন তাই হিসেব মিলবে না। করোনার কারণে ভয়ে মানুষ হাসপাতালে যেতে পারছে না। ফলে দেখা গেছে, কোন ডেঙ্গু রোগীই নেই!

পরিবেশে এডিসের ঘনত্ব চিন্তার বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত বছর এই সময়ে মাসে ঢাকায় এডিস মশার ঘনত্ব যা ছিল এবার একই সময়ে তা অনেক বেশি। ঘনত্ব বাড়লে ঝুঁকিও বাড়বে। এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও আমরা পেয়েছি। তাছাড়া বৃষ্টিও হয়েছে। তাই এই সমস্যা আরও বাড়বে যদি পদক্ষেপ না নেয়া হয়। আশঙ্কা করছি এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে এবার বর্ষার মৌসুমে জুন-জুলাই মাসে গতবারের চেয়ে ডেঙ্গু রোগী অনেক বেশি হবে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে চার দফা সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছেন দেশের কীটতত্ত্ববিদরা। অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেছেন, আমার সুপারিশ হলো, করোনা একটি শত্রু। ওই শত্রুকে মোবাবেলা করতে হবে একই সঙ্গে অন্য শত্রু যেন আক্রমণ করতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। একটি শত্রুর মোবাবেলা করতে গিয়ে যেন ঘরের আরেকটি দরজা আমরা খুলে না রাখি। তাহলে সেই দরজা দিয়ে দ্বিতীয় শত্রু প্রবেশ করবেই। দুটি দরজাতেই পাহারা বসাতে হবে। অন্যথায় বিপদ মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে।

তিনি বলেন, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই চার মাস ডেঙ্গুর মৌসুম। কারণ, এই সময়ে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার ঘনত্ব বেড়ে যায়। বাংলাদেশে ১২৩ প্রজাতির মশার রেকর্ড রয়েছে। তার মধ্যে বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ১৪ প্রজাতির মশা পাওয়া যায়। মশার প্রতিটি প্রজাতির প্রজনন, আচরণ ও রোগ বিস্তার ক্ষমতা ভিন্ন। এদের সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে মশার প্রজাতি ও আচরণভেদে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আলাদা আলাদাভাবে নিতে হবে। মশাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা করতেই হবে।

তাহলে কি সেই চার দফা সমন্বিত ব্যবস্থাপনা? অধ্যাপক কবিরুল বাশার জানিয়েছেন, সমন্বিত ব্যবস্থাপনার চারটি অংশ রয়েছে। এক, পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ। পরিবেশের বিভিন্ন সমস্যার কারণে মশার জন্ম হয়। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মশার প্রজননস্থল কমানো এবং ধ্বংস করে মশাকে সহজভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ জলাধার পরিষ্কার এবং বিভিন্ন পানির পাত্র পরিষ্কার রাখা। দুই, জীবজ নিয়ন্ত্রণ। উপকারী প্রাণীর মাধ্যমে মশাকে নিয়ন্ত্রণ করার বিভিন্ন পদ্ধতি পৃথিবীতে প্রচলিত আছে। উদাহরণস্বরূপ গাপ্পি মাছের কথা আমরা জানি, যার মাধ্যমে পরিবেশগতভাবে অল্প খরচে টেকসই মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গাপ্পি মাছ এবং একধরনের ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহারও পৃথিবীতে হয়ে আসছে। এ জাতীয় জীব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

তিন, রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ। মশা নিয়ন্ত্রণে লার্ভিসাইড এবং এডাল্টিসাইড ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রতিটি কীটনাশকের একটি নির্দিষ্ট ডোজ রয়েছে এবং কত দিন পরপর কোন মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে, তারও একটি নির্দেশনা রয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে কীটনাশকের ব্যবহার করলে অবশ্যই মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। চতুর্থ হচ্ছে, মশা নিয়ন্ত্রণে জনগণের অংশগ্রহণ। জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়া দুষ্কর। তাই এ প্রক্রিয়ায় জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক সংগঠনগুলোকে উদ্বুদ্ধ করে এ কাজ করানো যেতে পারে।

এই সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডকে আট থেকে দশটি ব্লকে ভাগ করে কার্যক্রম চালাতে হবে। প্রতিটি ব্লকে নির্ধারিত জনবল থাকতে পারে। থাকতে হবে এন্টোমোলজি টেকনিশিয়ান, স্প্রেম্যান, ক্লিনার। এ কাজগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য আধুনিক এবং সময়োপযোগী গাইডলাইন অভিজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদ দিয়ে তৈরি করে নিতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণের আধুনিক সরঞ্জামাদি এবং আধুনিক কীটনাশক নির্দেশিকা এই গাইডলাইনে থাকবে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সারাদেশের মশা এবং অন্যান্য বাহক নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্বতন্ত্র সেন্টার তৈরি করতে পারে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই সেন্টারের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশের মশা এবং অন্যান্য বাহক নিয়ন্ত্রণ হতে পারে। এই সেন্টারে বছরব্যাপী মশা, অন্যান্য বাহক ও কীটনাশক নিয়ে গবেষণা হবে এবং তারাই নির্দেশনা দেবে কখন কোন কীটনাশক কোন বাহকের জন্য ব্যবহৃত হবে। যেহেতু সিটি কর্পোরেশনগুলোয় কীটতত্ত্ববিদের পদ রয়েছে, তাই অতিসত্তর অভিজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদদের দিয়ে পদগুলো পূরণ করা প্রয়োজন। মশা নিয়ন্ত্রণ যেহেতু একটি চ্যালেঞ্জ, তাই এটিকে সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আলাদা করে স্বতন্ত্র মশা নিয়ন্ত্রণ বিভাগ করা যেতে পারে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি জোনে একজন করে কীটতত্ত্ববিদের পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

প্রতি জেলায় জেলা কীটতত্ত্ববিদের একটি পদ রয়েছে। কোন কোন জেলায় এ পদে কর্মকর্তা রয়েছে। যেসব জেলায় পদগুলো ফাঁকা রয়েছে, সেখানে এ পদগুলো পূরণ করে এই কীটতত্ত্ববিদ দিয়ে জেলার মশা নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা প্রয়োজন।

Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram - dainik shiksha Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website