করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলাই যুক্তিসংগত - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলাই যুক্তিসংগত

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

বাংলাদেশের সরকার করোনা ভাইরাসের মহামারি পরিস্থিতি বিবেচনা করে সারা দেশে বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চলমান ছুটি আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে কওমি মাদ্রাসা ছাড়া সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিজনিত ছুটি ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি রয়েছে। 

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানা যায়।

নিবন্ধে আরও জানা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার এই সরকারি সিদ্ধান্ত যৌক্তিক কারণেই জরুরি ছিল। দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষায়তনগুলো বন্ধ থাকায় দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে যে দুরবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে, সেকথা স্মরণে রেখেও বলতে হয় যে সবার আগে প্রাণ। জান বাঁচলে তবেই শিক্ষাদীক্ষার কথা আসবে। দেশের তথা বিশ্বের বর্তমান অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া মানে হলো নিজ নিজ গৃহের নিরাপত্তাবলয় থেকে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুফাঁদের দিকে ঠেলে দেয়া।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলা হলেও সরকার ইতিমধ্যে অফিস-আদালত এবং সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উন্মুক্ত করে দিয়েছে। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশের অন্য সবকিছুকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার ব্যাপারে স্বভাবতই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। কারণ শিশুদের তথা আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের ভালোমন্দ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। কর্মকর্তারা বলছেন, এ ব্যাপারে সরকার সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভায় মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি বলেছেন, এই মুহূর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার মতো পরিস্থিতি নেই। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ছে।

শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের মন্তব্য অবশ্যই তাত্পর্যপূর্ণ। প্রকৃত অর্থেই এ ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। কারণ উন্নত বিশ্বের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর আবারও সেগুলো বন্ধ করা হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষা করার জন্য। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সকল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যই শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় উল্লেখিত কথাগুলো বলেছেন। তার এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত সর্বজন প্রশংসিত হয়েছে।

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হারও আগের তুলনায় অনেক কমেছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া রিপোর্টে বলা হচ্ছে। জানানো হয়েছে, বর্তমানে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় প্রতি ১০০ জনের নমুনা পরীক্ষায় গড়পড়তা ১০ জনের মধ্যে (১০ শতাংশ) করোনা ভাইরাস শনাক্ত হচ্ছে, যদিও গত জুন-জুলাইয়ের দিকে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশে উঠেছিল। তা সত্ত্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলার পেছনে কর্মকর্তারা বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করছেন বলে জানা যাচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো :সংক্রমণের হার কমলেও এখনো সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি; আসন্ন শীতকালে করোনার দ্বিতীয় দফা সংক্রমণের আশঙ্কা আছে; বিদ্যালয়ে গিয়ে শিশুরা আক্রান্ত হলে দায় কেউ নেবে না; অভিভাবকদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে; যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে কতটা মানা সম্ভব হবে তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না; প্রতিবেশী দেশসহ অনেক দেশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে আবার বন্ধ করে দিতে হয়েছে, অনেক দেশে নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে ইত্যাদি। এর আগে অগাস্টের শেষ দিকে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও বলেছিল, বাংলাদেশে এখনো স্কুল খুলে দেওয়ার মতো অবস্থা আসেনি।

কমিটির এক সভায় স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে স্কুল না খোলার পক্ষে নিচের যুক্তিগুলো তুলে ধরা হয় :Åবাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সামাজিক মেলামেশা থেকে তাদের বিরত রাখা যাবে না। Åপরিবহন ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে কোভিড-১৯ সংক্রমণের হার বাড়বে। Åশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে শিশুদের পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অভিভাবকেরাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকবেন। Åবাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে শিশুদের মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লেমেশন সিনড্রোম বা এমআইএস নামক জটিলতার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা আশঙ্কাজনক ও শিশুমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৃদু সংক্রমণের কারণেও দেহের বিভিন্ন অঙ্গ দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা শিশুদের জন্যও প্রযোজ্য।

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা একটি মাসব্যাপী দীর্ঘ কার্যক্রম, যা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে জড়িত করে। ফলে কোভিড-১৯ সংক্রমণের হার অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

এত লম্বা বন্ধকালীন শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দূরশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেয়। এ নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শিক্ষকদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার অনুরোধ করলে শিক্ষকেরা তাদের সাধ্যমতো বিভিন্ন মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ গুগল ক্লাসরুমে পাঠদান করছেন। কেউ আবার জুম সফটওয়্যার, গুগল মিট, মাইক্রোসফট টিমস ব্যবহার করে ক্লাস নিচ্ছেন। কেউবা অন্যান্য ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে ক্লাস নিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ অফলাইনে ক্লাস রেকর্ডিং করে তা ইউটিউবে আপলোড দিচ্ছেন বা ইউটিউব লাইভ করছেন; তবে বলতে গেলে বেশির ভাগ শিক্ষক ফেসবুক লাইভে এসে ক্লাস নিচ্ছেন।

বিকল্প মাধ্যমে ঘরে বসে এই লেখাপড়া দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমের পাশাপাশি কোচিং-প্রাইভেট-টিউশনও চলছে অনলাইনে। পরিস্থিতি এমনই যে সনাতনী ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও দিনে দিনে যুক্ত হচ্ছে এই প্রক্রিয়ায়। বেতারেও পাঠদান চালুর কাজ চলছে।

করোনা মহামারি অব্যাহত থাকায় তার মধ্যেই যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে হয়, তবে তার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। এই প্রস্তুতির জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি সুসমন্বিত পরিকল্পনা। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ই এ প্রস্তুতির যে খসড়া তৈরি করেছে, তা বোধ হয় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। চলমান করোনা দুর্যোগে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, সামাজিক অবস্থা ও শিক্ষা—এই চারটি দিকে লক্ষ রেখে সমন্বিত পরিকল্পনা করা দরকার। এটা মাথায় রেখেই মন্ত্রণালয়দ্বয় ইতিমধ্যে শিক্ষা খাতের জন্য একটি ‘রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি প্ল্যান’ বা ‘সাড়া ও পুনরুদ্ধার প্রস্তুতি পরিকল্পনা’ তৈরি করেছে।

এ ব্যাপারে সবার আস্থা অর্জনের জন্য অভিভাবক, শিক্ষাবিদ, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে চাইলে সরকার সংলাপও ডাকতে পারে, যাতে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার একটি গ্রহণযোগ্য পরিবেশ তৈরি হতে পারে। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলা ও সংক্রমণ রোধে প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও প্রাথমিক অধিদপ্তর থেকে পাঠানো সব নির্দেশনা ও পরামর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ করার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পক্ষেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও তথ্যভিজ্ঞ মহলের অনেকেই মত প্রকাশ করছেন প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পরিসরে হলেও।

বাংলাদেশে আজ কেবল সর্বক্ষেত্রে যে শুধু উন্নয়নের জোয়ার বইছে তা-ই নয়, কোভিড-১৯ মোকাবিলায়ও শেখ হাসিনার পরিকল্পিত দূরদর্শী ভূমিকা অপরিসীম। সে কারণেই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী কোভিড মহামারির মধ্যেও অবিরাম শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস চালু রেখেছেন, যা এ রকম দুরবস্থার মধ্যেও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ও পরীক্ষার বিষয়ে খুব শিগিগর মঙ্গলজনক একটি সমাধান পাওয়া যাবে।

লেখক : অধ্যাপক ড. মো. শাহিনুর রহমান, উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

১ নভেম্বর থেকে ইবতেদায়ি ও দাখিলের সিলেবাস বাস্তবায়ন শুরু - dainik shiksha ১ নভেম্বর থেকে ইবতেদায়ি ও দাখিলের সিলেবাস বাস্তবায়ন শুরু সরকার ভাবমূর্তি নষ্ট করে ফেসবুকে পোস্ট দিলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা - dainik shiksha সরকার ভাবমূর্তি নষ্ট করে ফেসবুকে পোস্ট দিলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের সরকারি ছুটির তালিকা চূড়ান্ত - dainik shiksha ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের সরকারি ছুটির তালিকা চূড়ান্ত আলিম পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনের তথ্য সংশোধন শুরু - dainik shiksha আলিম পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনের তথ্য সংশোধন শুরু রিফাত হত্যা মামলায় অপ্রাপ্তবয়স্ক ১১ আসামির কারাদণ্ড, খালাস ৩ - dainik shiksha রিফাত হত্যা মামলায় অপ্রাপ্তবয়স্ক ১১ আসামির কারাদণ্ড, খালাস ৩ দশ স্কুল স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক হওয়ার তদবিরে শিক্ষা ভবনের বিতর্কিতরাই! - dainik shiksha দশ স্কুল স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক হওয়ার তদবিরে শিক্ষা ভবনের বিতর্কিতরাই! প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের আবেদন করবেন যেভাবে উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করে শিক্ষকদের হয়রানির অভিযোগ - dainik shiksha উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করে শিক্ষকদের হয়রানির অভিযোগ পাবলিক পরীক্ষায় অটোপাস: সাত সমস্যা বনাম তিন সমাধান - dainik shiksha পাবলিক পরীক্ষায় অটোপাস: সাত সমস্যা বনাম তিন সমাধান please click here to view dainikshiksha website