করোনা ভাইরাস ও ফিকে চায়ের গুজব - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

করোনা ভাইরাস ও ফিকে চায়ের গুজব

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

আজ ক’দিন থেকে বলতে গেলে পুরো পৃথিবীই লকডাউন হয়ে গেছে। করোনা ভাইরাস পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ার পর কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, লকডাউন- শব্দগুলো এখন সাধারণ লোকজনেও বুঝে থাকে। সারা দুনিয়ার মানুষের মাঝে এক অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। করোনা ভাইরাস মহামারি আকারে দেখা দেয়ায় পৃথিবীতে আজ মানব সভ্যতা এমনকি মানব জাতির অস্তিত্ব পর্যন্ত মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। পৃথিবী নামের গ্রহটি ইতোপূর্বে দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে। সে দুটি বিশ্বযুদ্ধকালীন মানব জাতির অস্তিত্ব নিয়ে এমন শঙ্কা দেখা দেয়নি। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে গোটা পৃথিবী জুড়ে যে লড়াই শুরু হয়েছে, সেটিকে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ আখ্যা দিলে অত্যুক্তি হয় না।

এই যুদ্ধে কে কার প্রতিপক্ষ? সে প্রশ্নটি আজ অনেকের মনে জাগ্রত হয়েছে। করোনা ভাইরাসটি প্রকৃতপক্ষে অন্যান্য রোগের ভাইরাসের মতো নিছক একটি ভাইরাস, নাকি সেটি মানুষের তৈরি কোনো জীবাণু অস্ত্র? সে রকম একটি প্রশ্ন আস্তে আস্তে সারা দুনিয়া জুড়ে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। এটি সাম্রাজ্যবাদ বা পুঁজিবাদের অনুকূলে মানবসৃষ্ট কোনো দুর্যোগ কি না? সেটিও ভেবে দেখার এখনই সময়।

করোনাই সম্ভবত এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়ানক ভাইরাস, যা দ্রুত মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। দ্রুত গাণিতিক হার ছাড়িয়ে জ্যামিতিক হারে মানুষের শরীরে এর সংক্রমণ ঘটে। এটি এমন এক বর্ণচোরা রোগ যে, সাধারণ সর্দি-জ্বরের সাথে এর দৃশ্যত তেমন কোনো পার্থক্য নেই। এর সামাজিক সংক্রমণের কারণে ‘মানুষ সামাজিক জীব’ কথাটি হয়ত আস্তে আস্তে এক সময় আমাদের ভুলে যেতে হবে। পরস্পর পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা-এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ। বিশেষ করে আমরা বাঙালি জাতি আজন্ম মিলেমিশে বসবাস করতে অভ্যস্ত। গলায় গলায় ভাব রেখে হাতে হাত মিলিয়ে আমাদের চৌদ্দ গোষ্ঠী দিনাতিপাত করেছে। শুধু আমাদের কথা বলি কেন, সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য আজ একা একা ঘরে বসে থাকা এক কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ জাতির বৈশিষ্ট্য এমন যে, দশদিন না খেয়ে অনাহারে বেঁচে থাকতে পারে। মাত্র একদিন একা একা বাস করা তার জন্য অনেক কঠিন । আজ করোনার বিরুদ্ধে গোটা পৃথিবীর মানুষকে সে কঠিন কাজটি করতে হচ্ছে। কাজটি আর কতদিন করতে হবে-সেও কেউ জানে না। নিজে বাঁচতে আর অন্যকে বাঁচাতে এর বিকল্প এখন অন্য কিছু নেই। উন্নত-অনুন্নত সব দেশে ঘরের ভেতর একা একা থাকার প্র্যাকটিস শুরু হয়েছে। এভাবে মানব সভ্যতা ও মানব জাতি কতদিন এই গ্রহে টিকে থাকতে পারবে, সে কেবল পরম দয়ালু সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না।

আমাদের দেশে এমন এক সময়ে ভাইরাসটির সংক্রমণ ধরা পড়ে, যখন পুরো জাতি তার জনকের জন্মশত বার্ষিকী পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মুজিববর্ষ উদযাপনের ঐতিহাসিক ক্ষণটি আসতে না আসতে করোনার দুসংবাদে সবকিছু তছনছ হয়ে যায়। সংক্ষিপ্ত পরিসরে মুজিববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। পিতার জন্মশত বার্ষিকীর সকল জাঁকজমক পরিহার করে দেশের জনগণকে আগলে ধরে রাখার প্রত্যয় ঘোষণা করে শেখ হাসিনা আবার বুঝিয়ে দেন- ‘সবার উপরে মানুষ সত্য/ তাহার উপরে নাই’। কঠিন দুর্যোগ ও দুঃসময়ে মানুষ ও মানবতার জন্য তাঁর মন কেঁদে উঠে বলেই তিনি ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ নামে পরিচিত। আন্দোলন সংগ্রাম ব্যতিরেকে কেবল মানবিক কারণে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও মুক্তি দিয়ে মানবতার আরেক দৃষ্টান্ত স্থাপন ইতিহাসে তাঁকে অন্য আরেক আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

‘মুজিববর্ষের আবেদন, স্কুল-কলেজ সরকারিকরণ’ এমন একটি স্বপ্ন বেসরকারি শিক্ষকদের আশান্বিত করে তুলেছিল। করোনা ভাইরাসের কারণে মুজিববর্ষের সকল প্রত্যাশা আপাতত ঝিমিয়ে আছে। এরপরও আপামর বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী বিশ্বাস করেন যে, শীঘ্রই দেশ করোনামুক্ত হয়ে মুজিববর্ষটি যথাযথ উৎসাহ ও উদ্দীপনায় পালিত হবে। দেশের এ দুঃসময়ে বেসরকারি শিক্ষক সমাজ সরকারি নির্দেশনার আলোকে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

করোনা ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক টীকা আজ পর্যন্ত কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি। দুনিয়ার উন্নত দেশ বলতে যে কেউ ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোকে মনে করে থাকে। সেই ইউরোপ-আমেরিকা তছনছ করে দিচ্ছে এই ভাইরাসটি। পুরো ইউরোপ-আমেরিকা লকডাউন হয়ে আছে। ব্যবসা-পাতি, কল-কারখানা, ব্যাংক-বীমা, অফিস-আদালত সবই বন্ধ। একদিন ইনশাল্লাহ করোনা ভাইরাস মানুষের কাছে পরাজিত হবে। কেননা, স্বয়ং স্রষ্টা মানুষকে ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ বলছেন। কিন্তু করোনার কারণে দুনিয়া জুড়ে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে, তার খেসারত পৃথিবীর মানুষ কতদিন দিয়ে যাবে, তা কেউ বলতে পারে না।

ইউরোপ আমেরিকার মানুষ দেশের আইন-কানুন মেনে চলতে সর্বদা অভ্যস্ত। লকডাউন ঘোষণার সাথে সাথে সবাই হোম কোয়ারেন্টাইনে চলে গেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা অন্য রকম। আইন কানুন অমান্য করতে আমাদের জুড়ি নেই। পুলিশ জোর করে আমাদের ঘরে রাখতে পারছে না। জমায়েত হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারছে না। পুলিশের সাথে মারামারি শুরু করে দেই। আইনের প্রতি কোনোদিন আমরা অপরাপর দেশের ন্যায় শ্রদ্ধাশীল হবো-সে কেবল আল্লাহই জানেন।

গত বছর রমজানের শেষে সৌদি আরবের জেদ্দা শহরে একদিন আমার এক পুরনো ছাত্র তার নিজের গাড়িতে করে আমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একটা জায়গায় সে গাড়ি বেশ কিছুক্ষণ থামিয়ে রাখে। আমি তখন গাড়িতে বসে ফেসবুক দেখছিলাম। বাইরে খেয়াল নেই। আমার মনে হয়েছিল জ্যাম পড়েছে বোধ হয়। ফেসবুক থেকে চোখ সরিয়ে দেখি সামনে কোনো যানবাহন নেই। কেবল রাস্তার পাশের পোস্টে একটি বাতি জ্বলে আছে। গাড়ি থামানোর সংকেত। সামনে কোনো যানবাহন কিংবা ট্রাফিক পুলিশ কিছুই নেই। কেবল আইন মেনে দশ মিনিট থেমে থাকা। সাথে সাথে প্রিয় স্বদেশের কথা মনে পড়ে গেলো। আমাদের দেশে আমরা কোনোদিন আইনের প্রতি এমন শ্রদ্ধাশীল হবো-সেই চিন্তাটি পুরো জেদ্দা শহর তিনদিন ঘুরে দেখার সময় বার বার কেবল মনে উঁকি দিয়েছে।

গতদিন আমার নিজের এলাকার একটি বাজারে পুলিশের উপর জনতার হামলায় মন খুব খারাপ হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশেরা করোনা সংক্রমণ থেকে লোকজনকে বাঁচানোর জন্য দোকানপাট বন্ধ করতে বলায়, সঙ্গ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়ায় তাদের উপর চটে গিয়ে হামলা করেছে। আমরা কত যে অমানবিক হতে পারি!  আইনকে আমরা থোড়াই কেয়ার করি। আমাদের পুলিশ ও সেনাবাহিনী আবারো দেশপ্রেমের পরিচয় দিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা পরিস্থিতে মাঠে নেমেছে। দেশের যে কোনো দুর্যোগ ও দুঃসময়ে তারা অতন্ত্র প্রহরী হিসেবে কাজ করে। বর্তমান সময়ে দেশের আইন ও নির্দেশনা মেনে আমাদের সকলের তাদের সহযোগিতা করা উচিত।

আইনের চেয়ে গুজবে আমল দিতে আমাদের জুড়ি নেই। আমরা নানা কুসংস্কারে এখনো নিমজ্জিত। গতরাতের একটি গুজবের কথা  বলার কৌতুহল কিছুতে নিবৃত্ত করতে পারছি না। সন্ধ্যার পর অনেক জায়গায় এরকম একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, একটি শিশু জন্মের পর পরই ‘চিনি ছাড়া লাল চা পান করলে করোনা ভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হবে না’ বলতে বলতে পাঁচ মিনিট সময়ের মধ্যেই মারা যায়। এই গুজবটি পাগলা ঘোড়ায় চড়ে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। চিনি ছাড়া লাল চা পানের হিড়িক পড়ে যায়। কোনো কোনো জায়গায় গুজবটি পৌঁছতে রাত বারটা-একটা বেজে যায়। বাড়ির লোকজনকে ঘুম থেকে ডেকে জাগিয়ে চিনি ছাড়া লাল চা পান করানো হয়। ‘হুজুগে বাঙালি’ বলে আমাদের দুর্ণামটি যে একেবারে অমূলক নয়- সেটি গত রাতে আমরা আরেকবার প্রমাণ করেছি।

আজ দৈনিক শিক্ষায় আরেকটি সংবাদ দেখলাম। দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় গতকাল গভীর রাতে এক সাথে বিভিন্ন মসজিদের মাইকে আজান দেয়া হয়। আমাদের এলাকায় আজানের ঘটনাটি ঘটেনি। চিনি ছাড়া লাল চা পানের ঘটনা অনেক বাড়িতে সমানে ঘটেছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে দুধ ও চিনি চা তেমন পছন্দ করি না। ডায়াবেটিস থাকায় আজ চার-পাঁচ বছর থেকে চিনি ছাড়া লাল চা পানে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। এটি স্বাস্থ্যর জন্য খুব উপকারি। চায়ের প্রথম প্রচলন চীন দেশে। ঔষধ হিসেবে সর্বপ্রথম এর ব্যবহার শুরু হয়। চায়ের সাথে দুধ ও চিনি মেশালে তার ঔষধি গুণ হারিয়ে যায়। চিনি ছাড়া লাল চা অনেক উপকারি। এ ছাড়া শতকরা ৯৫ জন মুসলমানের দেশে আজান দেয়া অনেক সওয়াবের কাজ। কিন্তু গুজবে বিশ্বাস করে চিনি ছাড়া লাল চা পান কিংবা আজান দেয়া কোনো ভালো কাজ বলে গণ্য হতে পারে না।

প্রতিদিন ৩-৪ কাপ চিনি ছাড়া লাল চা পান করলে তা করোনা ও ক্যানসারসহ নানা রোগের পথ্য হিসেবে কাজ করে-এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। যে কোনো আজাবে গজবে আল্লাহকে স্মরণ করা বা আজান দেয়া ইসলাম ধর্মের পরিপন্থি কোনো কাজ নয়। ছোটবেলা দেখেছি, কলেরা রোগে যখন গ্রামে লোকজন মরতে শুরু করতো, তখন গ্রামের মুরুব্বি ও যুবকেরা এশার নামাজ পড়ে সারা গ্রামে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ জিকির পড়তেন এবং গ্রামের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে উচ্চ স্বরে আজান দিতেন। তখন আজকালের মতো মানুষের এত শিক্ষা দীক্ষা ছিল না। নানা কুসংস্কার ছিল বটে। তবে গুজবে তখন কেউ কান দিত না।

গুজব আর হুজুগ ছেড়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী তথা সরকারের নির্দেশনা মেনে না চললে করোনা ভাইরাস আমাদের দেশে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করে ফেলবে। মানুষ জাতি সৃষ্টির পর থেকে রোগ, ব্যাধি ও মহামারি মানুষের পিছে লেগে আছে। এ সব মানুষের শত্রু। করোনা ভাইরাস এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় শত্রু। শত্রুর ভয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনভাবে মোকাবেলা করা বুদ্ধিমানের কাজ। 
‘মোকাবেলা’ মানে লড়াই বা সংগ্রাম নয়। বেঁচে থাকার পথ খুঁজে বের করা। এ শব্দটি নিয়েও আমাদের অপব্যাখ্যার শেষ নেই। পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা করোনাসহ সকল রোগ-মহামারি ও দুর্যোগ থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমাদের দেশকে বাঁচান। বিশ্ববাসীকে হেফাজত করুন। গুজব ও কুসংস্কার আর যেন কোনোদিন আমাদের দৌঁড়াতে না পারে। সকলে দিনে ৩-৪ কাপ চিনি ছাড়া লাল চা পান করুন। মুসলমান হলে দুর্যোগ মহামারি থেকে বাঁচার জন্য আজান দিতেই পারেন।

লেখক : অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট এবং দৈনিক শিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক।

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ মে - dainik shiksha এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ মে দাখিলের ফল পেতে প্রি-রেজিস্ট্রেশন যেভাবে - dainik shiksha দাখিলের ফল পেতে প্রি-রেজিস্ট্রেশন যেভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website