করোনা লকডাউনে অটিস্টিক শিশু সামলাবেন কিভাবে - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

করোনা লকডাউনে অটিস্টিক শিশু সামলাবেন কিভাবে

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

‘আজ যে শিশু, পৃথিবীর আলোয় এসেছে, আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই। আজ যে শিশু, মায়ের হাসিতে ভেসেছে, আমরা চিরদিন সেই হাসি দেখতে চাই।’ প্রতিটি পরিবারের স্বাভাবিক চাওয়া—আজ যে শিশু জন্ম নিল তাদের গৃহকোণে, সে যেন বয়ে নিয়ে আসে আনন্দের ফোয়ারা। নবজাতকের হাসিমাখা মুখ দেখে প্রত্যেক মা তাঁর মাতৃত্বের অনুপম সুখ অনুভব করেন। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানা যায়। 

নিবন্ধে আরও জানা যায়, কিন্তু এই নাড়িছেঁড়া ধন যদি জন্মের সময় কিংবা জন্মের পর আর দশটি স্বাভাবিক শিশুর মতো শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত কিংবা ইন্দ্রিয়গতভাবে বড় হয়ে না ওঠে, তখন সেই মা ছাড়া এই যন্ত্রণা আর কেউ-ই অনুভব করতে পারে না। যেমনটি পারে না পরিবারের অন্য সদস্য থেকে শুরু করে পরিচিতজন, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র। যা পারে তা হলো অবজ্ঞা, অপবাদ, কখনো বা সান্ত্বনা। শিশুদের এরূপ অবস্থাকে সর্বপ্রথম পল ইউজেন ব্লু লার নামের একজন চিকিৎসক ১৯১২ সালে এই সমস্যার নামকরণ করেন ‘অটিজম’, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘আত্মমগ্ন ব্যক্তি’। সর্বদা নিজেকে নিয়েই মগ্ন থাকা যার পছন্দ এবং খুব কম ক্ষেত্রেই সে অন্যের সঙ্গে ভাববিনিময়ের চেষ্টা করে। অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তির বিকাশ স্বাভাবিক ধারায় হয় না। এ ধরনের আক্রান্ত ব্যক্তিদের (শিশু, নারী কিংবা পুরুষ) তিনটি কমন সমস্যা থাকে।

এক. ভাষাগত সমস্যা; সে কখনো মনের ভাব পুরোমাত্রায় প্রকাশ করতে পারে না। দুই. অপরের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়তে পারে না। স্বাভাবিক শিশুদের যেখানে পরিমিত সময়ে সামাজিক আদব-কেতা, বন্ধুত্ব, সোহাগ ও দুঃখবোধ কাজ করে, তাদের বেলায় তেমনটি দেখা যায় না। তিন. একই কাজ বারবার করার প্রবণতা। যেমন—কেউ রেগে গেলে ক্রমাগত দেয়ালে মাথা ঠুকতে থাকে, কেউ বা একই কাজ প্রতিদিন একই ধারা বজায় রেখে করে, তাদের প্রতিদিন কাজের রুটিনে সামান্যতম পরিবর্তন হলেই অস্থির হয়ে ওঠে এবং সহজভাবে তা গ্রহণ করে না। আবার অটিজমে আক্রান্ত কোনো কোনো শিশু বিশেষ কোনো শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ ও দৃশ্যের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়, যার ফলে তাদের স্বাভাবিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

আজকের এই বিশ্বের না-মানা চরম বাস্তবতা ‘করোনা’ সংক্রমণ প্রতিরোধে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় সব মানুষ আজ বেশির ভাগ ঘরে বন্দি। যাকে আমরা নাম দিয়েছি লকডাউন। করোনায় লকডাউনে যেখানে স্বাভাবিক মানুষের জীবন নিত্যদিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে, সেখানে কোনো পরিবারে যদি অটিজমে আক্রান্ত শিশু থাকে, তাহলে অনেকাংশে তাকে সামলানো আরো কঠিন। তবে করোনায় লকডাউনের এই সুযোগ অটিজমে আক্রান্ত শিশু পরিবারে সমস্যার পাশাপাশি কিছু সুযোগও এনে দিয়েছে; যা তার অটিজমের মাত্রা সহনশীল পর্যায়ে রাখতে পরিবারের সদস্যরা, বিশেষত মা-বাবা কাজে লাগাতে পারেন।

ছুটির এই সময়ে মা-বাবা বা পরিবারের অন্য সদস্যরা তাদের জন্য নিয়মিত তিনটি কাজ করতে পারেন, যা বিজ্ঞানসম্মত, বহুল পরীক্ষিত এবং সহজসাধ্য। এক. অটিজমে আক্রান্ত শিশুর আচরণ পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ; যা কিছু চিরায়ত অগ্রহণযোগ্য বৈশিষ্ট্য তার পরিবর্তন করতে পারবেন। আপনি কিংবা আপনার পরিবারের শত কাজের ভিড়ে হয়তো এত দিন কাজের মানুষ, ডাক্তার, অটিজমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ, ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসা করানোই ছিল রুটিন কাজ। হয়তো কখনো ফুরসত পাননি সন্তানের জন্য একান্তে সময় দিতে। এ সুযোগে তা করে ফেলতে পারেন। প্রথমে তার আচরণ নিবিড়ভাবে এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করুন। যেমন—সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আপনার অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে বললেন, তুমি এখন নাশতা খাবে। সে কী করল, ঘরের কোণে গিয়ে বসে থাকল বা মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি দিতে শুরু করল।

তখন আপনি তাকে বললেন, তোমার এখন খাওয়ার দরকার নেই। চলো আমরা ঘরের দোলনায় দোল খাব। আপনি লক্ষ করে দেখলেন, সে চঞ্চল হয়ে দোলনায় গিয়ে একাই দোল খাওয়া শুরু করে দিল এবং দোল খাওয়ার একপর্যায়ে যখন বললেন খাবার খেতে, তখন ঠিকই সে বিনা বাধায় খেয়ে নিল। দ্বিতীয় দিন দুপুরবেলা তাকে বললেন, ঘুমাতে যাও। সে আবার ঘরের কোণে অথবা মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে। আপনি যেই বললেন, দোলনায় দোল খাবে? অমনি সে প্রাণবন্তভাবে দোল খেতে শুরু করল এবং কিছুক্ষণ পর যখন বলবেন তখন ঠিকই আপনার সঙ্গে ঘুমোতে চলে গেল। তৃতীয় দিন রাতে তাকে বললেন গায়ে জামা পরতে। সে আবার ঘরের কোণে বা মাটিতে গড়াগড়ি করছে। যেই বললেন, দোল খাবে চলো। সে চঞ্চল হয়ে দৌড়ে চলে গেল দোলনার কাছে। আপন মনে দোল খেতে শুরু করল এবং কিছুক্ষণ পর সে তার কাছে রাখা জামা নিজেই গায়ে দিল। এই তিন দিনের পর্যবেক্ষণে আপনার কাছে তার একটি কমন বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছে। আপনি তাকে পরিচালনার একটি শক্তিশালী বলবর্ধক (Enforcement) পেয়ে গেলেন।

এখন আপনি তাকে ইচ্ছা করলেই দোলনায় দোল খাওয়ার কথা বলে যেকোনো ধরনের কাজ করাতে পারবেন। অটিজম বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন এবিসি থেরাপি। এখানে এ হলো পূর্বগামী কারণ। অর্থাৎ মাটিতে গড়াগড়ি বা ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকছে কেন? এর পূর্ববর্তী কারণ ছিল, আপনি তাকে খাবারের কথা বলছিলেন। এটি হলো ‘এ’। খাবারের কথা বলার কারণে তার প্রকাশিত আচরণ হলো, ঘরের কোণে বা মাটিতে গড়াগড়ি দেওয়া। এর নাম হলো ‘বি’। দোলনায় চড়তে দিলে ফিরে এসে সে জামা পরে, ভাত খায় এবং ঘুমাতে যায়। এটি হলো বলবর্ধক বা ফল। এর নাম ‘সি’। সুতরাং পূর্বগামী কারণ, ফলস্বরূপ প্রকাশিত আচরণ এবং ফলাফল। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর আচরণ পরিবর্তনের এই তিন ধাপকে বলে এবিসি বা  Antecedent, Behavior, Consequence. সাধারণত যেসব অটিস্টিক শিশুর কিছু আচরণ গ্রহণযোগ্য নয় যেমন—হাত দোলানো, পায়ের ওপর ঘোরা, কিছু হলেই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা, একই কাজ বারবার করা—সেগুলো নির্মূল করার জন্য এবিসি থেরাপি করোনায় গৃহরুদ্ধ সময়ে টেস্ট করে দেখতে পারেন।

দুই. মিউজিক থেরাপি। মিউজিক থেরাপি একটি সংবেদনশীল ও অভিজ্ঞতানির্ভর প্রশিক্ষণকৌশল, যা অটিজমে আক্রান্ত শিশুর আচরণ ও পেশাগত দক্ষতায় পরিবর্তন আনতে পারে। বাড়িতে কিছুদিন সংগীত উদ্দীপক হিসেবে কাজ করালে আপনি একদিন লক্ষ করবেন, আপনার শিশু বহুসংখ্যক ছড়া ও গান মুখস্থ করে ফেলেছে। কিংবা লক্ষ করবেন, আপনার সন্তান অনেক গানের সুর আয়ত্ত করে তা বিভিন্ন স্থানে প্রয়োগ করে গানের সুর সংযোজন করতে পারবে। তিন. আর্ট থেরাপি। অটিজম নিরাময়ে চিত্রাঙ্কন একটি বিশেষ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আসলে চিত্র অঙ্কনের একটি শিক্ষামূলক ও মনোচিকিৎসামূলক ধর্ম রয়েছে; যা এ বৈশিষ্ট্যকেই এখানে কাজে লাগানো যায়। আর্টের দিকে আপনার সন্তানের ঝোঁক সৃষ্টি করতে পারলে তার যেই দিকগুলোর উন্নতি হবে তা হলো—হাতের দোলানোটা কমে যাবে, আত্মনিয়ন্ত্রণক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, দৃষ্টিসংযোগ বাড়বে এবং স্কুলের একাডেমিক কাজের গুণগত একটি পরিবর্তন সাধিত হবে। অটিস্টিক শিশুর ভেতর লুকিয়ে থাকা অপার সম্ভাবনাগুলো খুঁজে বের করা এবং সেগুলো বিকাশে সহযোগিতা প্রদানে মা-বাবার সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

অটিস্টিক শিশুরা অপরিচিত ও বাইরের পরিবেশে এলে অনেক সময় অস্থিরতা ও অপ্রত্যাশিত আচরণ করে থাকে। এ জন্য আগে থেকে আচরণের ন্যূনতম প্রত্যাশিত মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে যেন সে কোনো ক্ষতিকর অচরণ থেকে বিরত থাকে। পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হিসেবে জায়গার মানচিত্র, ছবি বা ভিডিওচিত্র প্রদর্শন অনেকাংশে ফলপ্রসূ হতে পারে। করোনায় লকডাউনে অটিজমে আক্রান্ত প্রতিটি শিশু বেড়ে উঠুক পরম মমতায়।

লেখক : ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া, প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক লেখক, গবেষক ও উপব্যবস্থাপক, পিকেএএসএফ

ডিপিএড শিক্ষকদের বেতন জটিলতার সমাধান শিগগিরই - dainik shiksha ডিপিএড শিক্ষকদের বেতন জটিলতার সমাধান শিগগিরই স্কুলছাত্রী নীলা হত্যার প্রধান আসামী মিজান গ্রেফতার - dainik shiksha স্কুলছাত্রী নীলা হত্যার প্রধান আসামী মিজান গ্রেফতার উচ্চতর গ্রেড পাওয়া এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কমবে না - dainik shiksha উচ্চতর গ্রেড পাওয়া এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কমবে না ১ অক্টোবর পর্যন্ত সংসদ টিভিতে মাধ্যমিকের ক্লাস রুটিন - dainik shiksha ১ অক্টোবর পর্যন্ত সংসদ টিভিতে মাধ্যমিকের ক্লাস রুটিন এমফিল-পিএইচডি জালিয়াতিতে এগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা - dainik shiksha এমফিল-পিএইচডি জালিয়াতিতে এগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ফাজিল ও কামিল মাদরাসার গভর্নিং বডির মেয়াদ বৃদ্ধি - dainik shiksha ফাজিল ও কামিল মাদরাসার গভর্নিং বডির মেয়াদ বৃদ্ধি অফিস সময়ে কর্মকর্তাদের বাইরে ঘোরাঘুরিতে বিরক্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় - dainik shiksha অফিস সময়ে কর্মকর্তাদের বাইরে ঘোরাঘুরিতে বিরক্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় please click here to view dainikshiksha website