please click here to view dainikshiksha website

কাঠগড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন!

নিজস্ব প্রতিবেদক | আগস্ট ১৫, ২০১৭ - ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

পূর্ব প্রকাশের পর

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সিনেট অধিবেশন কি সুন্দর পরিবেশ! কি জবাবদিহিতা, কি স্বচ্ছতা! মনে হলো একেই বলে মিনি পার্লামেন্ট! মতিন স্যার যথারীতি ভিসি প্যানেলে ১নং সদস্য মনোনীত হলেন। ছাত্র শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট সমন্বয়ে উচ্চশিক্ষা বিস্তার, প্রসার ও মানোন্নয়নে একটু উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে পেরে নিজেকে সমাজের একজন প্রয়োজনীয় মানুষ বলে মনে হয়েছে।

কিন্তু আজ একি হলো? এটা কি সেই বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে আমি, আমরা পড়েছি? ডাকসু ও হল থেকে ভবিষ্যৎ ছাত্রনেতা নির্বাচত হতো। আজ ২০/২৫ বছর ডাকসু নেই, দেশের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নেই, ছাত্ররাজনীতি নেই। আছে প্রত্যেক দিন কোনো না কোনো শিক্ষক নির্বাচন। সিনেট, সিন্ডিকেট, ডীন, প্রভোস্ট, শিক্ষক সমিতি, ক্লাব ইত্যাদি নির্বাচনের হিড়িক।

ছাত্র রাজনীতি না থাকলেও শিক্ষক রাজনীতি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য বিষয়। যেখানে নির্বাচন আছে, আছে দলাদলিও । তাও নিম্নমানের। আর অন্তর্দলীয় কোন্দন তো রাজনৈতিক দলের চেয়েও বেশি।

১৯৯৯-এর পার্লামেন্টে কেন জানি আমাকে শিক্ষা সংক্রান্ত কমিটির সদস্য করা হয়েছিলো। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার তখন শিক্ষামন্ত্রী ও সভাপতি। আমি সেখানে ১১ দফা আন্দোলনে সূত্র ধরে প্রস্তাব করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসন কায়েমের বিষয়টি। আমি বিশ্বাস করতে শিখেছি এর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার প্রসার হবে। মেধাবীরা গবেষণার সুযোগ পাবে। ছাত্র-শিক্ষক জনগণের প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় চলবে। কিন্তু আজ দেখি ছাত্র রাজনীতি তীরহিত। শিক্ষক রাজনীতি জাতীয় রাজনীতির চেয়ে সক্রিয়। তৎকালীন আমলারা বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন অর্ডিন্যান্সের ব্যাপারে একমত হননি। আমি আজ স্বীকার করছি যারা বিরোধিতা করেছিলেন তারা সঠিক। আমরা ১১ দফার আবেগে বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স কায়েম করিয়ে এখন উচ্চ শিক্ষাকে সংকটে ফেলে দিলাম কিনা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

এরপর এ নিয়ে আর কোনোদিন চিন্তা করিনি। নিজের মেয়ে যখন ম্যানেজমেন্টের ডিপার্টমেন্টে অনার্স ও মাস্টার্সে গোল্ড মেডেল ও প্রথম হওয়ার পরও শিক্ষক হিসেবে যোগদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করতে হলো। তখন বুঝলাম একেই বলে বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন। কারণ আমরা অভ্যস্ত ছিলাম মাস্টার্সের রেজাল্ট বের হওয়ার পরের দিন ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট বা সেকেন্ড যারা হতেন তারাই শিক্ষকতায় যোগদান করতেন।

মনে পড়ে, কেমেস্ট্রিতে পড়ার সময় আকমল ভাই, সচিব রাকিব ভাই (পরবর্তীতে সিইসি) মাহবুব ভাই একদিনের ভাই থেকে স্যার হয়ে গেলেন। ১৯৬৭ সালে ফিজিক্সের আমিনুর রশীদ ভাই ফজলুল হক হল ছাত্রলীগ মনোনীত ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন আমি হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। সংসদের মেয়াদকালীন সময়ে তিনি শিক্ষক নিযুক্ত হন। নিযুক্ত হয়ে একদিনেই স্যার হয়ে গেলেন। কি গুরুগম্ভীর তার কণ্ঠ। কিন্তু এই আমায়িক মানুষটির আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত হইনি।

সাম্প্রতিককালের কথা। একদিন বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ের আমাকে ডাকেন। গিয়ে দেখি বেশ কয়েকজন সিনিয়র অধ্যাপক বসা। শুধু ইউসুফ হায়দার সাহেবকে চিনি। ম্যাডাম বললেন আপনাকে গ্র্যাজুয়েট নির্বাচনে শিক্ষকদের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হলো।

আমি বললাম ম্যাডাম, আমি এরশাদের দল করেছি। আপনারা বলেন স্বৈরাচার। সেই সময়ের আগে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তা আর ক্রস করিনি। আর আমার জীবনে রাজনৈতিক পাপ যদি করে থাকি সেটা হলো বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স বাস্তবায়নে ক্যাটালিস্ট এর মতো ভূমিকা রাখা। বললাম আল্লাহ্‌ যদি আমাকে কোনো  সুযোগ দেন তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় অর্র্ডিন্যান্স বাতিলের প্রস্তাব করবো। কারণ, সিনেটের অন্যতম চালিকাশক্তি ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কারো আগ্রই নেই। তাই অর্ধেক অর্ডিন্যান্স বাস্তবায়নের অর্থ হয় না।

এরপর দেখলাম রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট নির্বাচন ছাড়াই ভিসি প্যানেল হয়ে গেছে। আইনের আশ্রয় নেয়া হলো। ফলাফল শূন্য। বেশ কিছুদিন পরে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন হলো- বেশ কয়েকজন আমাদের প্যানেল থেকেও জিতেছিলেন। কিন্তু কোনো ভূমিকা তারা রাখতে পেরেছেন বলে শুনি নাই।

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসনে চিন্তার মূল চালিকা শক্তি ছিলো প্রাক্তন ছাত্র, ডাকসু, শিক্ষক ও সরকারের প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষা গবেষণা, শিক্ষার মান বৃদ্ধি নিশ্চিত করা। আজ শুধু বিবেকের কাছে প্রশ্ন করি ড. ওসমান গনির বিরুদ্ধে বাজে বাজে স্ল্লোগান দিয়ে কি অপরাধ-ই না করেছি! বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স কায়েম না হলে রক্ত রঞ্জিত ১১ দফার সঙ্গে মুনাফেকী করা হবে ! কি কল্পনার সাগরে-ই না ভেসে বেড়িয়েছি। এখন শিক্ষক নিয়োগ, স্থগিত সবকিছুই আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ৩রা আগস্ট প্রধান বিচারপতি এস.কে সিনহার নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত এক রায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেওয়াজের বিষয়টি এটর্নি জেনারেলকে স্মরণ করিয়ে দর্শন বিভাগের শিক্ষক তোফায়েল আহমেদের নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করেন।

এ প্রসঙ্গে শুধু বলতে চাই, আমাদের প্রাণের আকুতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগের জায়গায় নেই। ধারে কাছেও নেই। ব্যক্তিগতভাবে বিপদে আছি আমার মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার জড়ানোর কারণে। আমার মেয়েটি যখন কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে বার্মিহাম ইউর্ভাসিটিতে পিএইচডি করেছিলো, তখন তার এক্সট্রানাল অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অধ্যাপক তাকে বাংলাদেশের প্রাপ্ত বেতনের বহুগুণে সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের প্রস্তাব করেছিলেন।

এ প্রস্তাব শুনে আমি চমকে উঠি। বললাম তোমার এক বোন। ইন্টারনাল মেডিসিনে আমেরিকায় ডিগ্রি নিয়েছে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই এমডি করে ওখানে স্থায়ী বসতি করার চূড়ান্ত পর্যায়। আরেকটাও অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে স্বামীর সাথে সিঙ্গাপুরে। ছোটজনও বিদেশে ছাড়া মাস্টার্স ডিগ্রি করবে না। তুমিও যদি বিদেশে চলে যাও আমি নিঃসঙ্গ হয়ে যাবো।

এই মেয়েটি বিবিএতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে গোল্ড মেডেল পাওয়ার পর ২০০১ সালে গ্রামীণফোন ১ লাখ টাকার কাছাকাছি বেতনে চাকরির প্রস্তাব দিয়েছিলো। শুধুমাত্র বাবার অনুভূতি ও পরিবারের ভাবমূর্তির কথা স্মরণ রেখে ১৪ হাজার টাকা বেতনে অধ্যাপনায় যোগদান করে। এই মেয়ে যখন প্রত্যেকদিন বাসায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অপরাজনীতি নিয়ে আমার কাছে অভিযোগ করে, জবাব পাই না।

সর্বশেষ সম্প্রতি সিন্ডিকেট নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্র-শিক্ষকদের ধস্তাধস্তি, মারামারির ঘটনায় আমি উৎকণ্ঠিত ও লজ্জিত। ছাত্ররা শিক্ষকের গায়ে হাতে তুলবে এটা কি কল্পনা করা যায়? যদি আমার মেয়ে কখনও ছাত্রদের দ্বারা এভাবে আক্রান্ত হন কি জবাব দিবো তাকে? না জানি কখন মেয়েটি এনিয়ে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমাকে প্রশ্ন করে বসে, কি জবাব দিবো? এ আতঙ্ক সব সময় আমার মাঝে বিরাজ করে। আমার বিশ্বাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন সকল ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক সবার মাঝেই এখন এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

প্রসঙ্গক্রমে আজ মনে পড়ে, আমাদের সময়ে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে মতভেদের দু’টি ঘটনা । ১৯৬৮ সালের শেষের দিকে ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি  ৩-৪শ’ কর্মী নিয়ে ভিসি’র বাসা ঘেরাও করতে গেলাম। কি বাজে বাজে স্লোগান-ই না হচ্ছিল। যেই মাত্র ড. গনি তার বাসার চেম্বার থেকে বেরিয়ে ধমক দিয়ে বললেন কি চাও তোমরা? আমরা কে কোনো দিকে পালালাম বলতেও পারবো না। স্যার আমাদের দু’/একজনকে ডেকে সমস্যার কথা জানলেন। পরবর্তীতে দাবি মেনেও নিয়েছিলেন।

১৯৬৮ সালের ৭ই জুন এফএইচ হল সংসদের প্রাক্তন ডিজিএস আবদুল কুদ্দুস মাখন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় খণ্ডকালীন চাকরি শেষে রাতে ফেরার পথে হল গেটে গ্রেপ্তার হন। আমি তখন হল সংসদের ডিজিএস। হল সংসদে ভিপি মাহাবুব ভাই ও জিএস আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তাদের কেউ হলে থাকতেন না।  খবর পাওয়ার পর হল সংসদের পক্ষ থেকে আমি এক ঘোষণা দিলাম- যতক্ষণ প্রভোস্ট মাখনের গ্রেপ্তারের সঠিক জবাব না দিবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কেউ ক্যান্টিনে যাবো না। কোনো দলের পক্ষ থেকে কেউ এর প্রতিবাদ করেনি। হলের মূল ফটক বন্ধ করা হলো। মুসলীম লীগ পন্থি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সাইক্লোজির চেয়ারম্যান তৎকালীন এফএইচ হলের প্রভোস্ট মীর ফখরুজ্জামান আমাদের অনুমতি নিয়ে হলের ভিতর প্রবেশ করলেন। লনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন- তোমরা নাস্তা খাওনি? আমিও খাইনি! তোমরা নাস্তা কর, আমি কথা দিচ্ছি কী কারণে পুলিশ হলে প্রবেশ করে আমাদের আবাসিক ছাত্র মাখনকে গ্রেপ্তার করলো বিকাল ৫টার মধ্যে। ভিসি’র মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে জবাব নিতে না পারলে আমি পদত্যাগ করবো।

কিন্তু এখন আর কেউ পদত্যাগ, গদিত্যাগ করতে রাজি নন। যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতেই হবে। এর সাথে এখন যোগ হয়েছে চাটুকারিতা, শিক্ষকদের নোংরা রাজনীতি, ডাকসুসহ ছাত্র সংসদগুলো তালাবদ্ধ। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে চলছে অরাজকতা। এ নিয়ে মনে অনেক যন্ত্রণা ও ক্ষোভ সবার মাঝে।

কিন্তু র্দুভাগ্য, আমাদের কাছে সমাধান নেই। সমাধান দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, ভূমিকা রাখতে পারেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দেশের বৃহৎ দু’টি রাজনৈতিক দলের নীতি-নির্ধারক হিসেবে শিক্ষাঙ্গনের সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করণের তাদের বিকল্প নেই। আমি বিশ্বাস করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে, দেশও বাঁচবে।

লেখক: জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ

বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন:


পাঠকের মন্তব্যঃ ১টি

আপনার মন্তব্য দিন