কুঁড়েঘরের মোজাফফর যখন বারিধারায় - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

কুঁড়েঘরের মোজাফফর যখন বারিধারায়

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

আমাদের গৌরব ও আদর্শিক রাজনীতির সেই মহাকালের শেষ নক্ষত্র অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রায় শত বছরের দোরগোড়ায় এসে চিরবিদায় নিলেন। ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে কুঁড়েঘরের মোজাফফর বললেই একসময় সবাই চিনতেন। তাঁর দলের প্রতীক ছিল কুঁড়েঘর। একটা সময় এ দেশের রাজনীতিতে ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির অনেক আদর্শিক নেতার যেমন জন্ম দিয়েছিল; তেমনি ন্যাপ নেতাদেরও জন্ম দিয়েছিল। ছাত্র ইউনিয়ন একসময় ন্যাপের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরে কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ন্যাপের ছাত্র সংগঠন ছাত্র সমিতি পরবর্তীতে বেশি সুবিধা করতে পারেনি ছাত্র রাজনীতিতে। রাজনৈতিক সচেতন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির শক্তিশালী একটি অংশ নিয়ে সেই সময়ের জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সহযোগিতায় ন্যাপ একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল। বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানা যায়।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ চীনের পথে হাঁটলে সমাজতন্ত্রের রাজনীতিতে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ মস্কোপন্থি হয়ে উঠেছিল। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের ন্যাপ ভোটের রাজনীতিতে ক্যারিশমা দেখাতে পারেনি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধিকার, স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে তাঁর দল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে নিয়ে গোটা জাতিকে জীবন-যৌবন উৎসর্গ করা আন্দোলন সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধই করেননি; নিজেকে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেন।

’৭০ সালের নির্বাচনে ন্যাপ ভাসানী অংশগ্রহণ না করলেও দক্ষিণপন্থি সব দল ও বামপন্থি মোজাফফরের কুঁড়েঘরকে পরাস্ত করে জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে দলীয় প্রার্থীদের নিজের ইমেজে নৌকায় বিজয়ী করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনিই হয়ে ওঠেন স্বাধীনতার মহান নেতা, মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা। এখানেই বাকি সব কীর্তিমান কিংবদন্তিতুল্য রাজনৈতিক নেতার ক্যারিশমা ধূসর, বিবর্ণ হতে হতে হারিয়ে যায়। এমনকি কালের পরিক্রমায় তাঁদের দলগুলোর অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে রাজনীতিতে আসা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ মানুষের কল্যাণের রাজনীতিতে আপসহীন পথ চলতে চলতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে অনন্যসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশের মুজিবনগর সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন তিনদলীয় ঐক্যজোটে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তিনিও যুক্ত হয়েছিলেন। এমনকি বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করলে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তিনি ও তাঁর দল বিলুপ্ত করে সেটিতে যুক্ত হয়েছিলেন। ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে ও ’৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের স্নেহ-সান্নিধ্য আমার পেশাগত জীবনে নিবিড়ভাবে ঘটেছিল। যেমন আরেক লুঙ্গিপরা সুদর্শন ন্যাপ নেতা রাজনীতির পূতপবিত্র পুরুষ সিলেটের পীর হবিবুর রহমানের স্নেহ-সান্নিধ্য পেয়েছি।

সিলেটের প্রবীণ ন্যাপ নেতা সৈয়দ আবদুল হান্নান আমার মাতুলালয়ের নিকটাত্মীয়। তিনিও এখন শয্যাশায়ী। তিনিও ছিলেন দীর্ঘদেহী এক সুদর্শন পুরুষ। বিশাল সম্পদের মালিক হলেও আজীবন ঢোলা সাদা পায়জামার সঙ্গে খদ্দরের পাঞ্জাবি পরে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের ধর্ম-কর্ম-সমাজতন্ত্রের রাজনীতিতে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের শেষ দিকে পীর হবিবুর রহমান সুনামগঞ্জে জনসভা করতে গেলে সৈয়দ আবদুল হান্নান আমাদের বাসায় সকালের নাশতার আয়োজন করিয়েছিলেন। পীর হবিবুর রহমানের মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ লেখাটিও আমার কাছে ছিল। যেটি পরে যুগান্তরে প্রকাশিত হয়। সেনাশাসক এরশাদ আমলে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সুনামগঞ্জে জনসভা। সেই সময় এসব রাজনীতিবিদের নামের আগে ‘জননেতা’ শব্দটি জুড়ে দিয়ে একবেলা মাইকিং হলেই তাঁদের জনসভায় মানুষের ঢল নামত। সব দলের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীও তাঁদের ভাষণ শুনতে যেতেন। সেই সময় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ঘন ঘন বন্ধ হতো বলে আমরা সেটিকে এরশাদ ভেকেশন বলতাম। এরশাদ ভেকেশনে জল-জোছনার শহর সুনামগঞ্জে এসে আড্ডায় সময় কাটাচ্ছি। মিছিল আন্দোলন, সংগ্রামে সক্রিয় থেকেছি। এমনি এক সকালে সিলেটের ন্যাপ নেতা সৈয়দ আবদুল হান্নান বাসায় এসে মাকে বললেন, ‘দুপুরে একজন মেহমান খাওয়াতে হবে।’ মেহমান হলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। তখন সুনামগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা অঢেল মাছ মিলত। সুনামগঞ্জের মৎস্যভান্ডার এখন আগের মতো নেই। দুপুরবেলা মোজাফফর আহমদ খেতে বসে সিলেট অঞ্চলের একটি আঞ্চলিক খাবার শীতকালে ফলন হওয়া শর্ষের ঝাঁজ নেওয়া ‘লাইপাতা’ দিয়ে টাকি মাছের ভর্তা ও বড় বড় কই মাছ খেয়ে তৃপ্তিবোধ করেছিলেন। লাইপাতা দিয়ে মাছ ভর্তাটি বলেছিলেন, জীবনে প্রথম এই অদ্ভুত খাবার খাওয়া। দুপুরে খেয়ে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কথা ছিল বিকালে সময় হলে তাঁকে জনসভায় আমি নিয়ে যাব। সেদিন দুপুরে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু সিলেটের জাহাঙ্গীর এখন কোথায় আছে জানি না। কিন্তু ছাত্রজীবনে বাণিজ্য অনুষদের জাহাঙ্গীর ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। ঠিকাদারি কাজে সে তখন সুনামগঞ্জে এসেছিল। বারান্দায় বসে বসে এরশাদ শাসনামলের বিভিন্ন মন্ত্রীর গল্প করছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ সম্পর্কে সে যখন গল্প করছিল; তখন বিশ্রামে থাকা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আমাদের আলাপ শুনতে শুনতে রাগে ক্ষোভে লাল চেহারা আরও লাল করে ছোট্ট স্যুটকেস হাতে নিয়ে বের হয়ে এসে বলেন, ‘কিচ্ছু হবে না। যে দেশের তরুণরা এসব আলোচনা করে তাদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না।’ তিনি জনসভায় চলে যাবেন। আমি অনেক অনুনয়-বিনয় করে বললাম, ‘স্যার, জনসভার সময় হলে আমি আপনাকে নিয়ে যাব।’ অবশেষে তিনি শান্ত হলেন। আবার ঘরে বিশ্রামে চলে গেলেন। সেবার জনসভায় তাঁর কৌতুকপ্রিয় হাস্যরসাত্মক, স্বভাবসুলভ চাঁছাছোলা বক্তৃতা করে জনতার করতালি নিয়ে ঢাকায় ফিরে গেলেন।

পেশার তারে জড়ানো জীবনে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে একদিন তাঁর কাকরাইলের বাসভবনে গেলাম। তিনি গৎবাঁধা সাক্ষাৎকার কখনো দিতেন না। স্বভাবসুলভ রসিকতার মধ্য দিয়ে গল্প করে যেতেন। অনেক কঠিন কঠিন কথাও বলতেন সহজ-সরল ভাষায়। সেখান থেকে লিখে নিতে হতো। সেদিন নানা গল্প করতে করতে তিন ঘণ্টা চলে গেছে। আমার একটা অভ্যাস ছিল, সুযোগ পেলেই প্রবীণ রাজনীতিবিদদের বাড়িতে হানা দেওয়ার, মুখোমুখি কথা বলার। সেদিন তাঁর সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা আড্ডায় এক দফা চা পান শেষ হয়ে গেছে। তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই মিয়া, তুমি ছাত্র রাজনীতিতে কোনো সংগঠন করেছ?’ আমি যখন বললাম, স্কুলজীবন থেকে ছাত্রলীগ করেছি। তখন তিনি বলে উঠলেন, ‘যাও মিয়া, তোমার সঙ্গে আলাপ করে আমার তিনটা ঘণ্টাই পানিতে গেল। তুমি ছাত্রলীগ করতা, তুমি হবা মাস্তান, না হয় ঠিকাদার অথবা ব্যবসায়ী। সাংবাদিক, সিএসপি অফিসার এসব হবে আমার ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা।’

নির্লোভ, সাদামাঠা, নিরাবরণ সৎ রাজনীতির পথ হাঁটলেও প্রখর আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর। একটা আত্ম-অহংকারও ছিল তাঁর। তাঁর কথায় আমারও অহমে লাগল। আমিও বলে উঠলাম, সেদিন পাল্টে গেছে। এজন্য আপনাদের বামেরা শেষ হতে হতে আজ নিঃশেষ। তিনিও বলে উঠলেন, কোথায় বাম রাজনীতি শেষ হয়েছে? সেদিন নারায়ণগঞ্জে জনসভায় গেলাম, হাজার হাজার মানুষ বক্তৃতা শুনেছে। যশোরের দড়াটানা মোড়ে রাত ৯টা পর্যন্ত আমার জনসভায় মানুষ আর মানুষ। আমি বললাম, ‘স্যার, তারা আপনার দল করতে যায়নি। আপনার বক্তৃতা শুনতে গেছে। আপনার বক্তৃতায় রসবোধ আছে। খানিকটা বিনোদনও। তাই তারা শুনতে যায়। আপনার দল করতে যায় না।’

তিনি একটু থেমে বললেন, ‘শাবাশ, সাহস করে মুখের ওপর সত্য কথা বলেছ। আরেক কাপ চা তুমি পাইতে পারো।’ আরেক কাপ চা পান করে সেদিনের মতো চলে এলেও মাঝেমধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে তবে দীর্ঘ সময় নয়। যতবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে তিনি তাঁর লেখা বই বা বুকলেট ধরিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রথম দফা যোগদানের পর একদিন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে দেখি, তিনি এখন বারিধারায় থাকেন। সেখানে ফটোসাংবাদিক ও রিপোর্টার নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে গেলে তিনি রেগে যান। বলেন, ‘তোমাকে আমি গল্প করতে আসতে বলেছি, সাক্ষাৎকার দিতে নয়। আমি কি চিপ, আমি কি সস্তা যে আসবে আর সাক্ষাৎকার দিয়ে দিব।’ ধীরে ধীরে কথায় কথায় তাঁকে শান্ত করি। গল্পগুজবে নিয়ে আসি। জানতে পারি, কাকরাইলের বাড়ি হাতছাড়া হয়েছে। একমাত্র মেয়ের বাড়িতে তিনি বারিধারায় বাস করছেন। তাঁর মেয়ের জামাতা যখন পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন তখন তিনি বলছেন, ‘এখানে আমি মেয়ের বাড়িতে থাকি। তোমাদের আমি চা খাওয়াতে পারব, সে গ্যারান্টি দিতে পারব না। যাদের বাড়িতে থাকি তারা যদি কিছু দেয়, তাহলে খেতে পাবা।’ বুঝতে পারি মেয়ের জামাইকে শুনিয়ে শুনিয়েই আমাদের কথাগুলো বলছেন।

সেদিন তিনি আরও বলেছিলেন, মানুষ হয় ঘরজামাই; আমি হইছি ঘরশ্বশুর। কিছুক্ষণ পর গরম শিঙ্গাড়াসহ নানা ফলমূল ও চা পরিবেশন করা হলো। খেতে খেতে গল্পও শুরু হলো। ধর্মকে বাদ দিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়- তাঁর এ প্রস্তাব তৎকালীন সোভিয়েত নেতারাও সমর্থন করেছিলেন; সেই তত্ত্ব দেখালেন। বললেন, মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হবে- নেহরুর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভ ভাই প্যাটেল কি জানতেন না? ভারতের আরেক স্বাধীনতা সংগ্রামী কংগ্রেস সভাপতি মওলানা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ ও আলোচনার খানিকটা বললেন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের জনপ্রিয়তা থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্য, মওলানা ভাসানীর আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং তাঁর দেশপ্রেম ও মানুষের কল্যাণের চিন্তা নিয়ে পরিষ্কার ধ্যান-ধারণা তুলে ধরলেন। মাঝেমধ্যেই লেখা পড়ে তিনি আমাকে টেলিফোন করতেন। একদিন অফিসে কাজের মধ্যে ডুবে আছি। এমন সময় তিনি টেলিফোন করলেন। আমি কথা শেষ করার জন্য তাঁকে বললাম, স্যার, আপনার বাসায় আসব। তিনি বললেন, ‘ওই মিয়া, তুমি আসবা না এটা বলছ কেন? এটা হলো ভদ্রতা। আমার ভাতিজি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও টেলিফোন করলে বলে, ‘আমি আপনাকে দেখতে আসব। এইগুলো হলো ভদ্রতা। ভাতিজি প্রধানমন্ত্রী দেখতে চাইলে, চাচাই যেতে পারি। তাঁর আসতে হলে অনেক প্রটোকল ঝামেলা আছে। তুমি যেটা করলা এটা হলো ভদ্রতা। তোমার ভদ্র কথা শোনার জন্য ফোন করিনি।’

পরে আমি যখন তাঁর কাছে গেলাম তখন তিনি বললেন, আমাকে অনেকে বলে তুমি বামপন্থি-বিরোধী। কিন্তু আমি বলি তুমি তো বামপন্থি। বামপন্থিরা মানুষের কথা বলে। তুমি মানুষের কথা লিখ। তুমি যাদের আদর্শচ্যুত নষ্ট বাম বল, সেটি তো সত্যই বল। তারা নষ্ট বা আদর্শচ্যুত না হলে আমার সঙ্গেই থাকত। ক্ষমতার ভাগের জন্য আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে যেত না। আবার তিনি নানা সময় আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে থাকা বামপন্থিদের প্রশংসা করতেও কার্পণ্য করেননি। যেমন একবার বলেছিলেন, মান্নান ভূঁইয়া বামপন্থি ছিল বলেই বিএনপিতে গিয়েও সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা বলে। মতিয়া চৌধুরী আওয়ামী লীগে গিয়েও সততার সঙ্গে মানুষের জন্য কাজ করে।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সঙ্গে শেষ দেখা যখন হয় তখন তিনি বাসভবনে রাখা হাসপাতালের বেডেই শয্যাশায়ী। আমাকে ডেকে নিয়েছিলেন। আমার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলেন। কারও পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেলেই তিনি আমাকে ধমক দেন। বলেন, ‘তুমি আমাকে বিরক্ত করতে আসছ কেন? চিকিৎসকরা বলেছে, কোনো দর্শনার্থী আসতে মানা।’ পরে ইশারা করে বলেন, ‘কাছে বেগম সাহেবা আছে। আমি আনন্দ পাই।’ একজন নির্লোভ, ত্যাগী, গণমানুষের রাজনীতির কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। তিনি হঠাৎ একটি সাদা কাগজ বের করে নিচে সই করে দিয়ে বললেন, ‘তোমার মনের কথাই আমার কথা। আমার নামে লিখে দিও।’ মওলানা ভাসানী কোনো বিবৃতি দিতে হলে আমাকে সই করে দিয়ে বলতেন, স্বাক্ষরের জন্য আসা-যাওয়া সময় ক্ষেপণ। তোমার মনের কথাই আমার কথা। তাই আমিও এই সুযোগটা বিশ্বাস নিয়ে তোমাকে দিয়ে দিলাম। তাঁর সই করা সাদা কাগজটি আমি গভীর যত্নে, গভীর মমতায় পরম প্রাপ্তি বলে আবেগ নিয়ে রেখে দিয়েছি। এই দেশে অনেকে যখন ক্ষমতায় থেকে বা কমিটিতে থাকার সুবাদে রাষ্ট্রীয় পদক লাভ করেন; ইতিহাসে বড় ধরনের ভূমিকা না রেখেই অনেক বড় বড় স্বাধীনতা সংগ্রামীকে, বীর যোদ্ধাকে বাদ দিয়ে নিতে লজ্জাও পান না, এমনকি কেউ কেউ ভিখেরির মতো পদক চেয়ে নেন, অথবা সেদিনের রাজনৈতিক দর্শন ভুলে গিয়ে সুবিধাবাদীদের খাতায় নাম লিখিয়ে চাটুকারিতার পথে বেহায়ার মতো, কৃষককে কলা গাছ চরিয়ে স্বাধীনতা পদকও বাগিয়ে নেন; তখন এ দেশের রাজনীতির বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মুজিবনগর সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ স্বাধীনতা পদক ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, কোনো প্রাপ্তির জন্য মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করিনি; তখন মনে হয় ইতিহাসে অমরত্ব পাওয়া এক কিংবদন্তি নেতা, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আলোর পথ দেখিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের রাজনীতির জননেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ নির্লোভ, সততা ও মানবকল্যাণের রাজনীতির আলোর পথ দেখিয়ে গেছেন। মনে পড়ে, তাঁকে নিয়ে একটি কলাম যখন লিখেছিলাম, ‘কুঁড়েঘরের মোজাফফর এখন বারিধারায়’ তখন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদ আমাকে স্নেহসুলভ বলেছিলেন, হেডিংটা মনে হয় নেতিবাচক হয়েছে। আর মোজাফফর আহমদ টেলিফোন করে স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বলেছিলেন, হেডিংয়ে সাংবাদিকতার আকর্ষণ দেখালেও, লেখাটি তোমার চমৎকার হয়েছে। অসংখ্য টেলিফোন আমাকে রিসিভ করতে হয়েছে। মনে হয়, সে সময় রাজনীতি করতে এসে রাজনীতিবিদরা রিক্ত নিঃস্ব হতেন। এ কালে রাজনীতিতে এসেই পথের কর্মী থেকে সুবিধাবাদী পেশাজীবীরাও রাজনীতির সুবাদে বিত্তবৈভব গড়েন। সততার রাজনীতির পবিত্র পুরুষ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা জান্নাতবাসী করুন। জনগণের ভালোবাসা নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন, মানুষের ভালোবাসা-শ্রদ্ধা নিয়ে বিচরণ করেছেন, রাষ্ট্রীয় সম্মান ও মানুষের ভালোবাসায় চিরনিদ্রা নিয়েছেন। ইতিহাস তার আপন মহিমায় এই মহান নেতাকে বুকে ধারণ করে রাখবে।

পীর হাবিবুর রহমান : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

শিক্ষা আইন যেন শুধু শিক্ষকদের শাসন করার জন্য না হয় - dainik shiksha শিক্ষা আইন যেন শুধু শিক্ষকদের শাসন করার জন্য না হয় হঠাৎ রাজধানীর ৩ স্কুলে প্রতিমন্ত্রী, ৫ শিক্ষককে শোকজ - dainik shiksha হঠাৎ রাজধানীর ৩ স্কুলে প্রতিমন্ত্রী, ৫ শিক্ষককে শোকজ ১৩ অক্টোবরের মধ্যে দাবি আদায় না হলে কর্মবিরতির হুমকি প্রাথমিক শিক্ষকদের - dainik shiksha ১৩ অক্টোবরের মধ্যে দাবি আদায় না হলে কর্মবিরতির হুমকি প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী নিয়োগের নীতিমালা প্রকাশ - dainik shiksha প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী নিয়োগের নীতিমালা প্রকাশ এইচএসসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ - dainik shiksha এইচএসসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website