কেক ও মুখোশ : নাহিদ বনাম দীপু মনি - কলেজ - দৈনিকশিক্ষা

কেক ও মুখোশ : নাহিদ বনাম দীপু মনি

সিদ্দিকুর রহমান খান |

২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের অডিটরিয়াম। আইডিয়াটা জামাত-বিএনপিপন্থী শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের। শিক্ষামন্ত্রীর সুনজরে থাকা আর চমকে দেয়াই ছিল তাদের লক্ষ্য। টেবিলের ওপর রাখা ৪৬ কেজি ওজনের এক কেক। ৪৬তম বিজয় দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে কাটা হবে কেকটি। ৪৬টি মোমবাতিও প্রস্তুত। কেকের টেবিলের চারপাশে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকসহ কয়েকডজন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা অপেক্ষা করছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের জন্য। মন্ত্রী আসলেন। ৪৬ কেজি ওজনের কেকের বাক্স খোলা হলো। কিন্তু কেক কাটার চাকু নিয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকলেন মন্ত্রী। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মন্ত্রী বললেন “আমি বাংলাদেশী। আমি রাজনীতিবিদ। আমি মন্ত্রী। আমাকে দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার ওপর ছুরি চালানোর এই কুপরিকল্পনা কার? আমাদের জাতীয় পতাকা আমি কাটবো? এ তো আমার বাংলাদেশ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া লাল-সবুজ পতাকা।” মন্ত্রীর চারপাশে দাঁড়ানো সবাই প্রজাতন্ত্রের প্রথম শ্রেণির কর্মচারী! প্রতিযোগিতামূলক বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ক্যাডার। নিজেরাই দাবি করেন দেশে শুধু তারাই ‘মেধাবী’। তাদের অনেকের দাবি, শুধু তারাই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েছেন।

কিন্তু মন্ত্রী তো রাজনীতিবিদ। তার প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, বৈষয়িক জ্ঞান ইত্যাদির কাছে প্রজাতন্ত্রের মেধাবী কর্মকর্তারা সবাই ধরাশায়ী। শুরু হলো দোষারোপ। কে বানিয়েছে কেক? কোন কর্মকর্তার আইডিয়া? অর্ডার দিয়েছে কে? ইত্যাদি। ক্ষুব্ধ শিক্ষামন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

যাহোক, ১৮ ডিসেম্বর রাতেই দৈনিক শিক্ষায় প্রতিবেদন প্রকাশ হলো। পরদিন কয়েকটি পত্রিকায় প্রতিবেদন। তদন্ত কমিটি হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। জাতীয় পতাকার আদলে কেক বানিয়ে সেটা মন্ত্রীকে দিয়ে কাটানোর মতো ধৃষ্টতা আর  কতিপয় কমনসেন্সবিহীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। তারা সবাই বহাল তবিয়তেই আছেন শিক্ষা অধিদপ্তরসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও কলেজে। সেদিন যদি ওই কেকটি কাটতেন শিক্ষামন্ত্রী! কমিউনিস্ট পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া নাহিদের পরিণতি কি হতে পারতো একটু ভেবে দেখুন।  

পাঠক, ২৬ মাস আগের ঘটনা উল্লেখ করার কারণ বুঝেছেন সবাই। তখন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। বিজয় দিবস উদযাপনের সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী।

এবার ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। স্থান: বগুড়ার পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকও তিনি। শিক্ষামন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতির মুখোশ পড়ে শত শত শিক্ষার্থীকে দাঁড় করানোর দায়ে কাউকে তিরস্কার করতে শুনলাম না। এমন বিকৃত ও অযৌক্তিক অভ্যর্থনা ও শুভেচ্ছা গ্রহণ থেকে কেন বিরত থাকতে পারলেন না সাবেক পররাষ্ট্র ও বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি? পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখোশ পরে অভ্যর্থনা জানানোর ঘটনায় দেশব্যাপী সমালোচনার মুখে পড়তে হলো তাঁকে। এমনকি সেই সমালোচনা শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও গড়ালো। একটু সতর্ক হলে হয়তো তাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরক্তির কারণ হতে হতো না।

পাঠক, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েই তিনি নাহিদের আমলে ‘দুর্নীতিবাজ’ ও ‘বাড়ৈ সিন্ডিকেটভুক্ত’ হিসেবে চিহ্নিত শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদেরই বেছে বেছে শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে সমালোচনার জন্ম দেন। এমপিওর তালিকায় দেখা যায় কয়েকডজন যুদ্ধাপরাধী ও জামাতীদের প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা প্রশাসনে হঠাৎ নাজিল হয় বেসরকারি কলেজ অধ্যক্ষ রতনকে। শিক্ষা প্রশাসনের বড় পদগুলোতে বদলিসহ শিক্ষা ক্যাডারকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টারত রতন। অথচ রতনের বেসরকারি কলেজে এমপিওবাবদ আড়াই লাখ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে অতিরিক্ত নিয়েছে। সরকারি অডিটে ধরা পড়েছে। আপত্তির পর টাকা ফেরত দেয়ার চিঠি দেয়া হয়েছে অধিদপ্তর থেকে। কিন্তু যারা টাকা আদায় করবেন সেই শিক্ষা ক্যাডারের মেধাবী পরিচালকরাই রতনের বাড়ীতে ঘন ঘন যাতায়ত করেন। ক্যডার মর্যাদা লুকিয়ে রেখে!

বদলি, কারিকুলামসহ শিক্ষা প্রশাসনের সবকিছুতে মাদবরি করেন এই রতন। উপরিমহল থেকে বারবার বলা হয়েছে শিক্ষা প্রশাসনে রতনের ব্যবহার বন্ধ করতে। বেসরকারি শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা ক্যাডার নিয়ন্ত্রণ করানো যাবে না। কবে আবার কেবিনেটে সমালোচনা হবে বেসরকারি রতনকে নিয়ে। তার আগেই শিক্ষা প্রশাসন থেকে রতনদের তাড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে আজকের এ লেখাটা শেষ করছি।  

লেখক: সিদ্দিকুর রহমান খান, সম্পাদক, দৈনিক শিক্ষাডটকম। 

আরও পড়ুন: 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা সদৃশ কেক!

জাতীয় পতাকার আদলে কেক: অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবী

বিদেশ ঘোরেন দীপু মনি

শিক্ষামন্ত্রীর বগুড়াকাণ্ডে বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী

‘ক্ষমতাবান’ এক অধ্যক্ষের গল্প

জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের - dainik shiksha জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি - dainik shiksha জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website