কোটা ইস্যুতে উসকানিমূলক কোনো কিছুই কাম্য নয় - মতামত - Dainikshiksha

কোটা ইস্যুতে উসকানিমূলক কোনো কিছুই কাম্য নয়

ড. সুলতান মাহমুদ রানা |

কোটা সংস্কার ইস্যুতে ছাত্রদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু সহিংস ঘটনাও লক্ষ করা গেছে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছাত্রদের মধ্যেই এখন বিভক্তির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যারা কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল, তাদেরই কেউ কেউ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রীর কোটা বাতিলের ঘোষণার আগ পর্যন্ত কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সঙ্গে বহু ছাত্রলীগের নেতাকর্মী যুক্ত ছিল। সরকার-সমর্থকদেরও অনেকেই এখনো আন্দোলনে যেমন যুক্ত আছেন, তেমনি নেতৃত্বেও আছেন। বহু ছাত্রলীগ নেতাকে সংস্কারের পক্ষে কথা বলতে শুনেছি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। অনেকেই আছে, যারা কোটা সংস্কার কিংবা বাতিল নয় বরং এই আন্দোলনকে পুঁজি করতে চায়। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুকলেই দেখা যায় কোটা সংস্কারের পক্ষ-বিপক্ষ দলের বক্তব্য-বিবৃতি। বিশেষ করে গত কয়েক দিনে যেভাবে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য-বিবৃতি আসা শুরু হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে ষড়যন্ত্রকারীদের উসকানিও বাড়তে শুরু হয়েছে। বর্তমানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা একদিকে এবং সরকার সমর্থক কিংবা কিছু কোটাধারী অবস্থান নিয়েছে অন্যদিকে ।

এটা খুব স্বাভাবিক যে সরকারবিরোধী মানসিকতার ছাত্রদের এই আন্দোলনে শক্ত অবস্থান রয়েছে। তারা যেকোনো মূল্যে কোটা সংস্কার কিংবা বাতিলের চেয়ে সরকারের পতনের চিত্রটিও দেখতে চায়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা যুক্ত থাকলেও প্রধানমন্ত্রী সংসদে কোটা বাতিল করার ঘোষণা করার পর নৈতিকভাবে তারা আর এই আন্দোলনে থাকতে পারে না। কারণ তাদের নেতা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, তখন তারা মনে করে যে কিছুটা ধৈর্য ধারণ করেই এই দাবিটির সফলতা হাতে নিতে হবে। কারণ এ থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও যে সুবিধা পাবে—তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ ছাত্রলীগ করলে তো ‘কোটা’ পাওয়া যায় না। সাধারণ ছাত্রদের মতোই তারাও এই সংস্কারের সুবিধা ভোগ করবে এমনটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু পরিবশে ও পরিস্থিতি কোটা সংস্কারের এই আন্দোলনকে কোনো কোনো মহল ঘোলা করার চেষ্টা করেছে এবং ছাত্রলীগকে ঢালাওভাবে সম্প্রতি সংঘটিত সহিংসতার দায় দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমরা লক্ষ করেছি যে কোটা সংস্কার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কিছু গ্রুপ রয়েছে। ওই সব গ্রুপের সদস্যদের অনেকেই সরকারবিরোধী মানসিকতার। তাদের দেওয়া অনেক উসকানিমূলক ও কুরুচিপূর্ণ পোস্ট দেখে বলতে ইচ্ছা করে, সরকার যেন কোনোভাবেই কোটা সংস্কার কিংবা বাতিল না করে। বিশেষ করে জামায়াত-বিএনপির সমর্থকদের যেভাবে আনন্দিত হতে দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয়েছে যে কোটা সংস্কারের দাবি বাস্তবায়ন মানেই হলো এই সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানের একটা বিজয়। আবার কোনো কোনো সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের দেওয়া উসকানিমূলক বক্তব্য দেখে পরিষ্কার মনে হচ্ছে যে তারা কোটা সংস্কার কিংবা বাতিল চায় না, বরং তারা চায় আন্দোলন চালিয়ে যেতে। তা না হলে সরকার যেখানে পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনো একই ইস্যুতে তাদের কর্মসূচি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয়েছে।

এ কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি যে যারা কোটা সংস্কারের পক্ষে মাঠে নেমেছে তাদের বেশির ভাগই বর্তমান সরকারের কার্যক্রমকে ইতিবাচকভাবেই দেখে। কিন্তু কোনো কোনো প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে যে এই আন্দোলনের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আছে। বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত নেপথ্যে থেকে এই আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছে। কিছুদিন আগে গণমাধ্যম সূত্রে আমরা শুনেছি, বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকের কথোপকথন। যেখানে পরিষ্কারভাবে আন্দোলনকে চাঙ্গা করার ইঙ্গিত পরিলক্ষিত হয়েছে। এই আন্দোলনের আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার একটি সুপ্ত বাসনা পোষণ করেছে এবং তা যেকোনোভাবেই বাস্তবায়নও করতে চেয়েছে। বিশেষ করে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠনগুলো রাজনীতির মাঠে কিছুটা সক্রিয় থাকার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কোটা সংস্কার আন্দোলনে তৎপর রয়েছে। সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা, সংস্কার বা বাতিলে সরকার গঠিত সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি এরই মধ্যে কাজ শুরু করছে। তার পরও যারা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচিতে থাকছে, তাহলে তাদের উদ্দেশ্য কী?

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও কোটা সংস্কার নিয়ে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠিত হওয়ার ধীরগতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। দাপ্তরিক কাজে দায়িত্বশীলদেরই এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত যুক্তিসংগত ছিল। তারা যদি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করত, তাহলে আন্দোলনকারীদের সর্বশেষ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। তবে বাস্তবতা হলো, প্রধানমন্ত্রী অনেকটা ক্ষোভ নিয়ে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিলেও আমি মনে করি, দেশের উন্নয়ন কিংবা প্রাসঙ্গিক কিছু ন্যায্যতার প্রশ্নে কোটা থাকার প্রয়োজন রয়েছে যথেষ্ট। বিশ্বেও অনেক উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থায়ই কোটার প্রচলন রয়েছে। কাজেই কোটা বাতিল নয়, বরং সংস্কারের মাধ্যমেই এ ব্যবস্থাকে আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত করা যেতে পারে।

রাজনীতি যেদিকেই যাক না কেন, সরকারকে ষড়যন্ত্রকারীদের বিষয়টি বিশেষ নজরে রাখতে হবে। কারণ জাতীয় নির্বাচনের বেশিদিন বাকি নেই। এখন যেকোনো ঘোষণা, যেকোনো কর্মকাণ্ড, যেকোনো সিদ্ধান্তই সন্দেহাতীতভাবে নির্বাচনে প্রভাব ফেলার সুযোগ তৈরি করবে। সাধারণ মানুষ পুরনো সব অর্জনের কথা ভুলে যায় বর্তমানের অর্জন কিংবা ব্যর্থতায়। এর আগে হাজারো ভালো কাজ সরকার করে থাকলেও এখন যদি কোনো স্পর্শকাতর ইস্যু জনগণের সামনে আসে সেটির প্রভাব পড়বে জাতীয় রাজনীতিতে। কাজেই জনগণের ভুল-বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে ইতিবাচক মাত্রায় আনতে পারে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এমসিকিউ বাতিল - dainik shiksha প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এমসিকিউ বাতিল এইচএসসির টেস্ট পরীক্ষার ফল ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকাশের নির্দেশ - dainik shiksha এইচএসসির টেস্ট পরীক্ষার ফল ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকাশের নির্দেশ স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী - dainik shiksha স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী ২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বিক্রি করতেন তারা - dainik shiksha ২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বিক্রি করতেন তারা অকৃতকার্য ছাত্রীকে ফের পরীক্ষায় বসতে দেয়ার নির্দেশ - dainik shiksha অকৃতকার্য ছাত্রীকে ফের পরীক্ষায় বসতে দেয়ার নির্দেশ আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি ফরম বিতরণ শুরু - dainik shiksha আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি ফরম বিতরণ শুরু নির্বাচনের সঙ্গে পেছাল সরকারি স্কুলের ভর্তি - dainik shiksha নির্বাচনের সঙ্গে পেছাল সরকারি স্কুলের ভর্তি দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website