কোথায় তেমন শিক্ষক! - মতামত - Dainikshiksha

কোথায় তেমন শিক্ষক!

বিমল সরকার |

শিক্ষকতা আর পাঁচ-দশটির মতো সাধারণ কোনো পেশা নয়। এটি একটি মহান ব্রত। শিক্ষকতার সঙ্গে অন্য কোনো পেশার তুলনাই চলে না। শিক্ষাদান, জ্ঞানচর্চা-গবেষণা-সাধনা; কী আশ্চর্য এক অনুভূতি! ভাবলেও যে কারও মনে নির্মল আনন্দ ও পরম স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করার কথা।অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, নানা কারণে ও নানাভাবে আজ বিতর্কিত ও আলোচিত-সমালোচিত হয়ে উঠেছে এই মহান পেশাটি। এখন আর এ পেশার সোনালি অতীত ও গৌরবোজ্জ্বল পরম্পরার কথাও আমাদের মনে খুব একটা রেখাপাত করে না।

খানিকটা চোখ মেলে তাকালেই সহজে বোঝা যায় এ পেশাটি দিনে দিনে কীভাবে কোন স্তরে এসে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকের আদর্শ কী আর বাস্তবে আমরা অবস্থান বা বিচরণ করছি কোথায়? ত্যাগ, সাধনা ও নিষ্ঠা তো কখনও স্বার্থ, লোভ আর লালসার সমার্থক হতে পারে না।শ্রেণীকক্ষই কেবল একজন শিক্ষকের বিচরণক্ষেত্র নয়। সর্বত্রই তার বিচরণক্ষেত্র। নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে কাজ বা দায়িত্ব পালন করাকে আর যাই হোক শিক্ষকতা বলে না। একজন শিক্ষকের অনেক কাজ, অনেক দায়িত্ব। একেকবার মনে হবে সারা জগৎ-সংসারই তার কাঁধের ওপর ভর করে রয়েছে। এমন একজন পেশাজীবীকে নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের অবকাশ কোথায়? আগে শিক্ষক, অন্যকিছু পরে। কিন্তু বাস্তবে?

রাজনৈতিক দল কিংবা অন্য কোনো সংগঠন বা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অজুহাত দেখিয়ে কোনো শিক্ষকের নিজের নির্দিষ্ট কর্মে গরহাজির থাকার বিষয়টি কখনও কাম্য নয়। অথচ বড় আর ছোট সবার মাঝেই আজ যেন একই প্রবণতা। একটু ছুতা পেলেই হল।শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, কলেজের অধ্যক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি- কাকে আলাদা করা যাবে? প্রক্টর-রেক্টর, ডিন-রেজিস্ট্রার, ট্রেজারার-কন্ট্রোলার সবার বেলায় ওই, বলতে গেলে একই কথা। বলা বাহুল্য, এসবকিছু দেখে সাধারণ শিক্ষকসহ সচেতন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। দেখা দেয় হতাশা।

কারণ একটাই, তা হল লোভ-লালসা ও তোয়াজ-তোষামোদ। দৃষ্টি আকর্ষণ করা। কৃপাদৃষ্টি লাভ করা। খ্যাতির পেছনে ছুটে চলা। ফাঁকি-ফুঁকির ব্যাপারটি তো রয়েছেই। তাদের হিসাব- আকর্ষণীয় কোনো পদ পেতে হলে কিংবা কোনোরকমে পাওয়া পদটি রক্ষা করতে হলে এসবই দরকার। বক্তৃতা-বিবৃতি প্রদান। উদ্বোধন করা ও অভিনন্দন-বিদায় জানানো। ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে সময়মতো গিয়ে উপস্থিত হতে হবে ‘টকশো’র আসরে। কাজের কি আর শেষ আছে?‘মহান পেশা শিক্ষকতা’- চুলোয় যাক। শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়ে কী ভাবছে ভাবুক। অভিভাবকরাই বা কী ভাবছেন ভাবতে থাকুন। গোচরে-অগোচরে আলোচনা-সমালোচনা, কানাকানি-ফিসফিসানি, তাতে কী? হোক না। প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি, শিক্ষার বারোটা, সভ্যতার সংকট এসব আজ উদ্ভট ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের কাছে। 

আখেরটি গোছাতে হবে- এই ধারণা পেয়ে বসেছে। এ যেন সবার উপরে ‘নিজের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সত্য’ তাহার উপরে নাই।খুবই গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করি যে, ছাত্রজীবনে আমি বেশ ক’জন আদর্শবান শিক্ষকের সান্নিধ্য পাই। এমনই একজন হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. এজেডএম ইফতিখার উল আওয়াল। আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ইফতিখার স্যার। বর্তমানে তিনি বিভাগে ‘সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক’ হিসেবে কর্মরত।দিনটি ছিল শনিবার (২ এপ্রিল, ২০১৮)। বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনও যাওয়া হলে এবং হাতে সময় থাকলে আমি বিভাগে গিয়ে উঁকিঝুঁকি মারি। নস্টালজিয়া বলে কথা। 

অফিসের শিক্ষানবিশ-সহকারী শৈশব-এর (শৈশব দে) সঙ্গে গিয়ে স্যারের কাছে নিজের পরিচয় দিই।অনেকদিন আগের কথা (১৯৮০-৮১), মনে করতে পারছিলেন না। কক্ষটিতে এ সময় তিনি একাই বসা এবং গভীর মনোযোগের সঙ্গে কী একটা নোট অথবা তেমন কিছু একটা দেখছিলেন। স্যার আমাদের পড়াতেন, পড়িয়েছেন এমন কোর্সটির কথা উল্লেখ করতেই তার সে কী আনন্দ ও উৎসাহ! কী কৌতূহল! খানিকটা পরিচয় পেয়ে এরই মাঝে আমার সঙ্গে বেশকিছু কথা এবং অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটালেন। ফাঁকে ফাঁকে ওটাতেও মনোযোগ।ইন্দিরা রোডে স্যারের ভাড়া বাড়িটিতেও (আগের) আমি গিয়েছি জেনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। এরই মাঝে জানা গেল আমার কর্মক্ষেত্র বাজিতপুর উপজেলার লাগোয়া পূবদিকে অষ্টগ্রাম ও দক্ষিণে কুলিয়ারচর উপজেলায় যথাক্রমে স্যারের নানা ও বড়বোনের বাড়ি। দুটি বাড়ি খুবই সুপরিচিত এবং এলাকায় বেশ 

প্রসিদ্ধ। ক্ষণিকের জন্য হলেও স্মৃতিময় ও বেশ উপভোগ্য আলাপে আমরা মগ্ন হলাম। এরই মাঝে আবিষ্কার করলাম স্যারের মাঝে খানিকটা অস্বস্তি ও চাঞ্চল্য।এমন পরিস্থিতিতে নিজেও কিছুটা অপ্রস্তুতই হয়ে পড়লাম। সুপরিসর কক্ষটিতে এ সময় আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। অস্বস্তি ও কিছুটা লজ্জার ভঙ্গিমায় কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে ব্যাগের ভেতরে রাখলেন এবং আসন থেকে উঠতে উঠতে আমতা আমতা করে স্যার জানালেন, ‘তুমি সময় করে পরে এসো, অনেক কথা বলা যাবে। আমার ক্লাসের সময় হয়ে গেছে।’ আমি দাঁড়িয়ে বিদায় নিতে নিতে তিনি মোবাইল নম্বরসহ একটি কার্ড হাতে দিয়ে আবারও বললেন, মনে কিছু করো না, আমার ক্লাসটি লেকচার থিয়েটারে।

ওখানে যেতে আমার দু’মিনিট সময় লাগবে। বলতে বলতে আমার কাঁধে ধরে একটি ঝাঁকুনি দিয়ে শুভকামনা করে ইফতিখার স্যার দ্রুত হাঁটতে শুরু করলেন। বাঁ হাতের কব্জি ঘুরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখি ১১টা ৫৮। ১২টা বাজতে মাত্র দু’মিনিট বাকি।নিষ্ঠা ও সময়ানুবর্তিতার প্রশ্নে গত তিন-চার দশকে আমাদের ইফতিখার স্যারের একটুও ব্যত্যয় ঘটেনি, নতুন করে হৃদয়ঙ্গম করলাম। কেবল তিনি নন, সংখ্যায় নিতান্ত কম হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্যারের মতো অনেকেই এখনও শিক্ষকতা পেশাটিকে অনেক উপরে তুলে ধরে রয়েছেন।

আমি বিশ্বাস করি, আমার সমসাময়িক এবং জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ সৌভাগ্যবান অনেকেই জীবনের কোনো না কোনো সময় এমন দু-একজন হলেও আদর্শ শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। ওইসব শিক্ষকের বিপরীতে নিজেদের নিয়ে যদি ভাবি, কল্পনা করি তাহলে আমাদের ব্যর্থতা, গ্লানি ও লজ্জার পরিধিটিই কেবল বাড়তে থাকে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ বা বিভাগে অনেক শিক্ষকের নানা অজুহাতে ক্লাস নিতে অনীহার বিষয়টি নিয়ে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন পাঠকপ্রিয় ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকায় সাংবাদিক কৈলাস সরকারের লেখা একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। মূলত এর ওপর ভিত্তি করে একই পত্রিকার ‘মুক্ত আলোচনা’ পাতায় ‘পুরনো কথা নতুন করে আর কতকাল শুনতে হবে’ শিরোনামে আমার একটি লেখা ছাপানো হয়।

লেখাটিতে প্রসঙ্গক্রমে আমার ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে কয়েকজন ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শবান শিক্ষক হিসেবে ইতিহাস বিভাগের ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ড. জাহেদা আহমদ, ড. এএফ সালাহউদ্দিন আহমেদ, এবিএম মাহমুদ, ড. ইফতিখার-উল-আওয়াল প্রমুখ স্যারের নানা স্মৃতির কথা উল্লেখ করি।পরবর্তী সময়ে একদিন বিভাগে জাহেদা ম্যাডামের কক্ষে গিয়ে দেখা করলে তিনি বেশ গর্বভরে বলেন, তিনি নিজে সেটি পড়েছেন এবং অন্য দু-একজনকেও পড়তে দিয়ে বলেছেন- দেখুন, ছাত্ররা আমাদের নিয়ে আজকাল কীসব ভাবছে। ম্যাডাম গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন।আদর্শবান শিক্ষকরা বেঁচে থাকুন সুদীর্ঘকাল। তাদের অনুসরণীয় আদর্শ ফল্গুধারার মতোই বয়ে চলুক সর্বত্র, সবার মাঝে, অবিরত।

বিমল সরকার : সহকারী অধ্যাপক, বাজিতপুর কলেজ, কিশোরগঞ্জ 

সূত্র: যুগান্তর

প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ির জনবল কাঠামো নীতিমালা - dainik shiksha প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ির জনবল কাঠামো নীতিমালা আলিমের নম্বর বণ্টন প্রকাশ - dainik shiksha আলিমের নম্বর বণ্টন প্রকাশ এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ৯০৯ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ৯০৯ শিক্ষক সরকারি হল আরও ৪৩ প্রতিষ্ঠান - dainik shiksha সরকারি হল আরও ৪৩ প্রতিষ্ঠান পদোন্নতি পাচ্ছেন সরকারি হাইস্কুলের সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষক - dainik shiksha পদোন্নতি পাচ্ছেন সরকারি হাইস্কুলের সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষক বিশেষ মঞ্জুরীর টাকার আবেদন করা যাবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত - dainik shiksha বিশেষ মঞ্জুরীর টাকার আবেদন করা যাবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত টেস্টে ফেল করলে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না - dainik shiksha টেস্টে ফেল করলে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না শূন্যপদের চাহিদা পাঠানোর সময় ফের বাড়ল - dainik shiksha শূন্যপদের চাহিদা পাঠানোর সময় ফের বাড়ল দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website