please click here to view dainikshiksha website

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রতিশ্রুতি ও হতাশা

বাঁধন আরেং | ডিসেম্বর ২৮, ২০১৫ - ৪:০২ অপরাহ্ণ
dainikshiksha print

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষার বিষয়ে গত কয়েক বছর ধরেই দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। নীতিনির্ধারকদের অনেকেই বেশ আশা জাগানিয়া কথা বলেছেন। দেশে একজন মাত্র অন্য ভাষার শিশু থাকলেও তার নিজস্ব ভাষায় পড়ালেখা শেখার সরকারিভাবে ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছিল। মহান জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যদের দ্বারা অনুমোদিত হয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ ঘোষিত হয়েছে, এই শিক্ষানীতিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের নিজস্ব ভাষায় পড়ালেখা শেখার সরকারিভাবে ব্যবস্থা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে উল্লেখ করে বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী (২০১৩)। তাছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এনসিটিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও কর্মসূচি বাস্তবায়নের পক্ষে কথা বলেছিলেন। সরকারি কর্মকর্তা ও পাঁচটি ভাষাগোষ্ঠীর বিশিষ্টজনদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি কোর কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে সত্য হল, প্রথম থেকেই কার্যক্রমের প্রতি সরকারের সংশ্লিষ্টদের অনেকের মধ্যে গুরুত্বহীন দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা গিয়েছিল। ২০১৪ সালে ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাজেট না থাকার বিষয় উল্লেখ করেছিলেন। এমনই বাস্তবতায় এনজিগুলোর সহায়তায় সংশ্লিষ্ট ভাষার লেখকদের নিয়ে চলতি বছর (২০১৫) দেশের পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষায় শিক্ষা উপকরণ তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ঢাকায় আগত লেখকদের মনে আশা ও উদ্দীপনা জেগেছিল। ছেলেমেয়েরা ২০১৬ সালে নিজস্ব ভাষার নতুন বই হাতে পাবে এই বিশ্বাস তাদের সবার মনে জেগেছিল। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত অনেক উচ্ছ্বাস নিয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লেখকরা উপকরণ তৈরির কাজে অংশ নিয়েছিলেন। ন্যাশনাল কারিকুলাম অ্যান্ড টেক্সটবুক বোর্ডের আহ্বানে এমএলই ফোরামের সহযোগিতায় প্রতিটি ভাষার ছয়-সাতজন করে নির্বাচিত লেখক নিরলসভাবে কাজ করেছিলেন। ৩ দফায় মোট ১৬ দিনের কর্মশালায় আদিবাসী ছাড়াও এমএলই ফোরামের প্রতিনিধিরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ২০১৪ জানুয়ারি থেকে অন্তত ৫টি আদিবাসী ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর কথা থাকলেও অজানা কোনো কারণে শুরু করা হয়নি। ২০১৫ সালে শুরু করার কথা বলা হলেও হল না।

ঘোষণা দেয়া হল, ২০১৬ সালে বছরের শুরুতেই স্ব-স্ব ভাষার নতুন বই শিশুদের হাতে তুলে দেয়ার। এ লক্ষ্যে কাজের একটি রূপরেখাও মোটামুটিভাবে ঠিক করা হয়েছিল। কথা ছিল উপকরণ চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট ভাষার বিশিষ্টজনদের মতামত গ্রহণ করা হবে। এর পরই স্ব-স্ব ভাষার লেখকরা নিজেদের প্রস্তুতকৃত সব উপকরণ সম্পাদনা করে চূড়ান্ত করার কথা ছিল। বছর শেষ হল কিন্তু এসবের কিছুই হল না। বলা যায়, এবারও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রতিশ্র“তি হতাশা হয়ে দেখা দিল। এনসিটিবি’র বিশিষ্ট একজন কর্মকর্তা পাঁচটি ভাষার শিক্ষা উপকরণ প্রস্তুত হয়ে গেলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে উদ্বোধন করার কথাও বলেছিলেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দলিলে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর স্ব-স্ব ভাষায় শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয় বলা হয়। পিআরএসপি ও ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার বিষয় উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদিবাসী এবং ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়সহ তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার জন্য জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) Indigenous and Traibal Populations Convention (107) এবং সংশোধিত সংস্করণ (১৬৯) দুটি ঈড়হাবহঃরড়হ গ্রহণ ও ঘোষণা করে। কনভেনশন নং ১০৭-এর ২৩ নং অনুচ্ছেদে আদিবাসী শিশুদের স্ব-স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার বিষয় বিশেষভাবে বলা আছে। ১০৭ নং ওখঙ কনভেনশনে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ অনুস্বাক্ষর করে। ১৬৯ কনভেশনের ২৮ অনুচ্ছেদে মাতৃভাষায় পড়া ও লেখা শিক্ষাদানের বিষয় বলা আছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কার্যক্রম গ্রহণের উদ্দেশ্যে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণের উল্লেখ রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের (২০০৭) ১৪ অনুচ্ছেদে আদিবাসী শিশুদের নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা প্রদানে তাদের সাংস্কৃতিক রীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পাঠদান ও শিক্ষা পদ্ধতি অনুসারে শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সে সবের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের অধিকার, বৈষম্যহীনভাবে রাষ্ট্র প্রদত্ত সর্বস্তরের ও সব ধরনের শিক্ষা লাভের অধিকার ও সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। শিশু অধিকার সনদের ৩০ অনুচ্ছেদেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের নিজের মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। প্রতি বছর ঢাকা শহরে ঘটা করে শিশু অধিকার দিবস পালন করে হয়ে থাকে। শিশুদের প্রতি বৈষম্যহীন দৃষ্টিভঙ্গির বিষয় জোরেশোরে বলা হয়। তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের অধিকারের অন্য যা কিছুই থাক না কেন মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ প্রদান সবার ওপরে হওয়া উচিত বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করেন। স্ব-স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের ব্যবস্থা দেশের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এমন ভাবনা থেকে গণসাক্ষরতা অভিযানের উদ্যোগে ২০১০ সালে দেশের সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুর স্ব-স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের অধিকার সুনিশ্চিত করা ও কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ন্যাশনাল এমএলই ফোরাম নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে। মাতৃভাষায় শিক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম সরকারিভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংগঠনের প্রতিনিধিরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও এসসিটিবির সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠানগুলো যোগাযোগ, অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা, আর্থিক অনুদান, লোকবল তৈরির প্রয়োজনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ গ্রহণ, ভাষা কমিটি গঠন, নিজস্ব শিক্ষা উপকরণ তৈরি ও সংস্কৃতিবিষয়ক কাজে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

অনানুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮০ থেকেই সীমিত পরিসরে হলেও দেশের বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসমাজ নিজ নিজ ভাষায় শিশুদের শিক্ষাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছিল। এদের মধ্যে গারো, হাজং, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, খাসি, মণিপুরি, মাহলে, সাদরি ইত্যাদি ভাষায় শিক্ষার বিষয় উল্লেখ করা যায়। বিশ্বব্যাপী শিশুদের স্ব-স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা নিয়ে ভাবা হয়। আমাদের দেশেও বাংলা ও ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি আদিবাসী জনসমাজের শিশু শিক্ষার্থীদের ভাষাগত সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ সরকারিভাবে ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়ে আসছিল। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ ‘আদিবাসী শিশু’দের নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের সুযোগ সরকারিভাবে ব্যবস্থা করার সুস্পষ্ট ঘোষণা সংশ্লিষ্ট জনসমাজে আশা জাগিয়েছিল। কাজে ও চিন্তায় অনেকখানি গতি বেড়েছিল। দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক চেতনার মূল জায়গায় সম্পর্শ করেছে এমন ভাবনা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের বক্তব্যে প্রকাশ ঘটেছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সরকারি নীতিনির্ধারক এবং আমলাদের শুনতে ভালো লাগা আশা জাগানিয়া প্রতিশ্রুতির বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো হতাশ। এমন হতাশা এবং কথা না রাখার গল্প শোনার অভিজ্ঞতা অবশ্য এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর এটাই প্রথম নয়।

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান মাতৃভাষার নিজস্ব শিক্ষা উপকরণ তৈরির কাজ সফলভাবে করতে সক্ষম হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব, জেলা প্রশাসক, উপজেলা কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদেরও মাঝে মধ্যে এসব কার্যক্রমে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিক্ষা কর্মীদের নিঃস্বার্থভাবে পরিশ্রম করে শিশুদের ছড়া, গল্প, কবিতা, গণিত শেখার উপকরণ এবং সাংস্কৃতিক বাদ্যযন্ত্র, পশুপাখির প্রতিকৃতি ইত্যাদি তৈরি করতে দেখা গেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় সংশ্লিষ্ট ভাষার নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাকর্মীদের মনে হতাশা প্রকাশ পায়।

বাঁধন আরেং : গবেষক

[email protected]


সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন