খালেদার সাথে গোপন বৈঠক : সেই শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারাও শিক্ষা ভবনে - বিবিধ - দৈনিকশিক্ষা

খালেদার সাথে গোপন বৈঠক : সেই শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারাও শিক্ষা ভবনে

নিজস্ব প্রতিবেদক |

২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাস। আওয়ামী লীগ সরকারকে অস্থিতিশীল করতে বিএনপি-জামাতের নেতৃত্বে সারাদেশে চলছে আগুন আর বোমা সন্ত্রাস। এরই মধ্যে মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) অনুষ্ঠিত হয় বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন। ২২ আগস্ট ঘোষিত ফলে দেখা যায় বিএনপি নেতা তরিকুলের শ্যালিকা নাছরিন বেগমের প্যানেলের বিপুল বিজয়। নতুন কমিটির ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ৭ সেপ্টেম্বর (শনিবার) কমিটির প্রথম সভা ডাকা হয়। কিন্তু রাজধানীর মেহেরবা প্লাজার সমিতির অফিসে সন্ধ্যা বেলায় উপস্থিত শুধু নব নির্বাচিত মহাসচিব [মূলধারা থেকে নির্বাচিত] অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকারসহ দুই-তিন জন। বাদবাকীদের কেউ নেই। মহাসচিব জানতে পারলেন- নব নির্বাচিত সভাপতি ও বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলামের শ্যালিকা অধ্যাপক নাছরিন বেগমের নেতৃত্বে শিক্ষা ক্যাডারের দেড় শতাধিক কর্মকর্তা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গেছেন। শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাসে নজিরবিহীন ওই ঘটনায় হতবাক সমিতির সাধারণ সদস্যরা। ঠিক এমন সময়ে পরের জাতীয় নির্বাচনে [দশম সংসদ] সরকার পরিবর্তন হলে কে কোথায় পালাবেন আর কার সঙ্গে লিয়াজোঁ করলে ভালো থাকা যাবে তা নিয়ে চিন্তিত বাড়ৈ সিন্ডিকেট সদস্যরা।

পাঠক, এতক্ষণ শুনছিলেন ছয় বছর আগের কথা। এবার শুনুন বর্তমান পরিস্থিতি। গত শনিবার (২৩ আগস্ট) দৈনিক শিক্ষার পক্ষ থেকে খালেদার সঙ্গে গোপন বৈঠক নিয়ে সাংগঠনিক টানাপোড়েন ও পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় ওই সময়কার মহাসচিব ও বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকারের কাছে। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘নতুন কমিটির মহাসচিব আমি। প্রথম সভায় যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে দেখতে পাই- শুধু আমিসহ দুই-তিন জনকে। বাকীরা কোথায়? কেউ জানেন না। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা। সভাপতিসহ অন্যান্য নির্বাচিত নেতাদের মোবাইলে কল দেই। কিন্তু কেউ রিসিভ করেন না।’

‘অন্য মারফতে জানতে পারি- নির্বাচিতরা প্রায় সবাই তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক অফিসে। এটা সমিতির ইতিহাসে নজিরবিহীন। সমিতির সিদ্ধান্ত ছাড়া এমন বৈঠক আগে কোনোদিন হয়নি,’ যোগ করেন তিনি।

‘হ্যাঁ, সমিতির প্রায়োজনে যাবোই যদি.. তবে তা ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির কাছে। বিরোধীদলীয় নেত্রীর কাছে কেন। সমিতিকে দেয়ার মতো বিরোধী নেত্রীর কাছে কী থাকতে পারে?,’ বলেন সেলিম খোন্দকার।

মহাসচিব আরও জানান, ওইদিন গভীর রাত অব্দি অপেক্ষা করেও নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। খালেদার সঙ্গে সমিতির নেতাদের সেই গোপন বৈঠকের খবর প্রথমে ৮ সেপ্টেম্বর পাই শুধু দৈনিকশিক্ষা ডটকমে। তার একদিন পর ৯ প্টেম্বর দৈনিক প্রথম আলোতে।    

গোপন বৈঠকের প্রতিক্রিয়ায় সমিতিগতভাবে আপনি কী করলেন? দৈনিক শিক্ষার এমন প্রশ্নের জবাবে সেলিম খোন্দকার বলেন, ‘দৈনিক শিক্ষায় গোপন বৈঠকের প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর সারাদেশে জানাজানি হয়। সমিতির সদস্যরা টেলিফোনে জানতে চান- কেন এমনটা করা হলো? আমি সবাইকে সাফ বলে দিলাম সমিতির সিদ্ধান্ত ছাড়াই তারা ওই বৈঠক করেছেন। কেন করেছে তা পরের বৈঠকে জানতে চেয়েছি; কিন্তু সন্তোষজনক জবাব পাইনি।’ 

উল্লেখ্য, ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ওই নির্বাচনে বিএনপি-জামাত প্যানেলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মূলধারা প্যানেল থেকে শুধু সেলিম খোন্দকার ও আবদুল কুদ্দুছ শিকদার ছাড়া উল্লেখযোগ্য কেউ জিততে পারেনি। আর প্রায় জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে বাড়ৈ সিন্ডিকেট প্যানেল প্রার্থীদের। বাড়ৈ সিন্ডিকেটের সভাপতি শফিকুল এখন অবসরে, আর মহাসচিব প্রার্থী অধ্যাপক মো: শাহেদুল খবীর চৈৗধুরী এখন শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক পদে। ওই নির্বাচনে বিপুল বিজয় হয় জামাত-বিএনপিপন্থীদের।   

সমিতির নিয়ম ও প্রথা ভেঙ্গে খালেদার সঙ্গে গোপন বৈঠক করা সমিতির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে কি-না তা জানতে চাওয়া হয়েছিলো তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের এপিএস মন্মথ রঞ্জন বাড়ৈর কাছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকা বোর্ডে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে বৈঠকের পর জানাবেন। কিন্তু কয়েকদিন পর বাড়ৈ সাংবাদিকদের যা জানান তার সারমর্ম এমন- “আসছে জাতীয় নির্বাচন [দশম জাতীয় নির্বাচন], কারা ক্ষমতায় আসে তা-তো বলা যায় না। তারা [নাছরিন গংরা] ভুল করেছেন, তারা সিনিয়র। বিষয়টি চেপে যাওয়াই বোধ হয় ভালো।  প্রসঙ্গত: কোনো ছুটি ছাড়াই সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়া বাড়ৈর প্রধান পরামর্শকদের একজন এখন শিক্ষা ভবনে আর একজন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত।

সেদিন খালেদার সঙ্গে গোপন বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন- বিএনপি-জামাত আমলের শিক্ষামন্ত্রী ও যুদ্ধাপরাধের আসামী বিদেশে পলাতক ড. এম ওসমান ফারুক। নির্বাচনে অংশ নেননি; কিন্তু জামাত-বিএনপির সমর্থক এমন অনেক কর্মকর্তাও ‍ওই বৈঠকে অংশ নেন। দৈনিক শিক্ষার অনুসন্ধানে জানা যায়, ‍মূলত আওয়ামী বিরোধী শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা ধরেই নিয়েছিলেন দশম নির্বাচনে [২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত] বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসবে। আর নাছরিনদের সেই কমিটি মহাপরিচালকসহ শিক্ষা প্রশাসনের কে কোন পদে আসবেন তাও ঠিক করে ফেলেছিলেন।  

খালেদার সঙ্গে গোপন বৈঠকের ছয় বছর পর অনুসন্ধান চালায়  দৈনিক শিক্ষা। জানা যায়, খালেদার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেয়া কমপক্ষে ডজনখানেক কর্মকর্তা শিক্ষা ভবনসহ শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন।

তরিকুলের শ্যালিকা ও সেই সময়কার সভাপতি নাছরিন বেগম অবসরে রয়েছেন। সহ-সভাপতি এ এইচ এম ফজলে রাব্বী রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ কলেজে। আর তৃতীয় প্রধান নেতা মো: জাকির হোসেন জামাল দাউদকান্দি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ। তাকে প্রায়ই দেখা যায় শিক্ষা অধিদপ্তরের দুইজন পরিচালকের কক্ষে। যুগ্মমহাসচিব মাসুদ রানা রয়েছেন ঢাকা আলিয়া মাদরাসায়।

নওশের আলী, মাহবুবা ইসলাম, আসাদুজ্জামান আসাদ ও আসাদুজ্জামান খান মজলিশ শিক্ষা অধিদপ্তরেই আছেন। নুরুল হক রয়েছেন হেকেপ প্রকল্পে। শাহজাহান রয়েছেন সরকারি বিজ্ঞান কলেজে। ঢাকা বিভাগের সহ-সভাপতি মো: আবদুল হান্নান খন্দকার রয়েছেন মুন্সিগঞ্জের সরকারি হরগঙ্গা কলেজে। ময়মনসিংহ বিভাগের সহ-সভাপতি  অধ্যাপক এস এম ওয়াহিদুজ্জামান রয়েছেন সিরাজগঞ্জ আকবর আলী খান কলেজের অধ্যক্ষ পদে। অধ্যাপক সোহরাওয়ার্দী রয়েছেন যশোর সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে।

গোপন বৈঠকে অংশ নেয়া অপর নেতাদের মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মো: শাহ আলমগীর, আর রাজশাহীর ড. মো. বেলাল।

Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram - dainik shiksha Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram নবম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন শুরু ১৬ আগস্ট - dainik shiksha নবম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন শুরু ১৬ আগস্ট করোনায় আরও ৩৯ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২ হাজার ৯৭৭ - dainik shiksha করোনায় আরও ৩৯ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২ হাজার ৯৭৭ এমপিও না দেয়ার শর্তে আরও ৩ কলেজ স্থাপনের অনুমতি - dainik shiksha এমপিও না দেয়ার শর্তে আরও ৩ কলেজ স্থাপনের অনুমতি মৃত শিক্ষকদের নামে এমপিওর টাকা, অবশেষে শিক্ষা অধিদপ্তরের কড়া নির্দেশ - dainik shiksha মৃত শিক্ষকদের নামে এমপিওর টাকা, অবশেষে শিক্ষা অধিদপ্তরের কড়া নির্দেশ জাল সনদে ৯ বছর চাকরি: প্রভাষকের বিরুদ্ধে মামলা - dainik shiksha জাল সনদে ৯ বছর চাকরি: প্রভাষকের বিরুদ্ধে মামলা করোনা ভাইরাস : বুঝবেন কীভাবে, যাবেন কোথায়? - dainik shiksha করোনা ভাইরাস : বুঝবেন কীভাবে, যাবেন কোথায়? please click here to view dainikshiksha website