গল্পের ‘একতাই বল’ ও একত্রে স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৬ - ২:১২ অপরাহ্ণ
dainikshiksha print

অনেকে নিশ্চয় সেই বৃদ্ধ কৃষকের গল্প জানেন, যে কী-না অতি কৌশলে নিজের ছেলেদের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা ও অনৈক্যের দুর্দশার বিষয়টি শিক্ষা দিয়েছিল। সে থেকে ঐক্য নিয়ে কথা উঠলেই বৃদ্ধ চাষীর কাল্পনিক প্রতিচ্ছবি সকলের মানসপটে জেগে ওঠে। কঞ্চির আঁটি বেঁধে আবার কঞ্চিগুলো আলাদা করে উভয় ক্ষেত্রে ভাঙ্গতে দিয়ে চাষী ঐক্যের ও অনৈক্যের বিষয়ে যে চিরন্তন শিক্ষা তার ছেলেদের দিয়ে গেছে, সে আজ এক সার্বজনীন শিক্ষা বটে।

আমাদের শিক্ষায় গল্প ও কেচ্ছা-কাহিনীর ভিন্ন তাৎপর্য। প্রতিটি গল্পের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষণীয় দিক থেকে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব। তাই আমাদের পাঠক্রম ও সিলেবাসে গল্প বলা, গল্প লেখা ও গল্প শেখার অনুশীলন বিদ্যমান।

শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের গল্প পড়ান ও পড়বার জন্য উৎসাহিত করেন। এর শিক্ষণীয় দিক বা অন্তর্নিহিত বিষয়ের প্রতি সর্বাধিক আলোকপাত ও করেন। ছোটবেলায় আমরা আমাদের English for today এবং Grammar, Translation & Composition বইয়ে story writing অংশে ‘Unity is strength’/The farmer & his three sons এবং বাংলা ব্যাকরণ ও রচনা বইয়ের ভাবসম্প্রসারণ অংশে ‘একতাই বল’ শিরোনামের ভাব সম্প্রসারণটি কতো বার পড়েছি! পরীক্ষায় story writing কিংবা ভাব সম্প্রসারণে এটি সকলের কাছে খুব important ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে একত্রে স্কুল-কলেজ জাতীয়করণের দাবীটি দিনে দিনে যেমন উত্তাল হচ্ছে, তেমনি এর অপরিহার্যতা দিনে দিনে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠছে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এটিই আজ সবচেয়ে বেশী মানুষের সমন্বিত প্রাণের দাবী। দিনে দিনে তা গণদাবীতে পরিণত হতে চলেছে। দাবীটি আদায় করে ঘরে তুলবার এখনই অনুকূল পরিবেশ ও উপযুক্ত সময়। আমাদের জাতির জনকের তনয়া ও জাতির আশা আকাংখার মূর্ত প্রতীক জননেত্রি শেখ হাসিনা এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। তাঁর নেতৃত্বে উন্নয়নের মহা সড়কে প্রিয় বাংলাদেশ। দূর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের স্বদেশ। এ যাত্রা আমাদের ছিটকে পড়ার আশংকা কেবল এ জন্য যে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো জাতীয়করণের বাইরে। অনেকে মনে করেন , জাতীয়করণ কেবল শিক্ষক-কর্মচারীর স্বার্থে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে ধারণাটি এ রকম নয়। জনৈক মনীষি বলেছেন-‘শিক্ষা এমন এক হাতিয়ার, যা সারা বিশ্বকে বদলে দিতে পারে।’ তাই,টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষার পরিস্ফুটন ও বিকাশ সর্বাগ্রে অপরিহার্য। আর এ জন্য শিক্ষার জাতীয়করণ। জাতীয়করণ ছাড়া শিক্ষা পরিপূর্ণ ভাবে বিকশিত হবার সুযোগ পায় না। শিক্ষা যদি প্রকৃত অর্থে পরিস্ফুটিত ও বিকশিত না হয়, তাহলে এর কোন অর্থ থাকে না। তাই শিক্ষা জাতীয়করণ মূলতঃ শিক্ষার জন্যই। আর শিক্ষা সর্বাবস্থায় জাতিকে প্রাণ সঞ্চার করে ।’সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা’ কিংবা ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা’ যেটির কথাই বলিনা কেন- সে এ জাতিকে দেখিয়েছেন আমাদের বঙ্গবন্ধু তনয়া। বঙ্গবন্ধু এ জাতিকে কেবল স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাননি , স্বাধীনতা এনে ও দিয়ে গেছেন। জননেত্রি শেখ হাসিনা আমাদের উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যাবার যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সে একদিন কেবল তার হাত ধরেই বাস্তব রূপ লাভ করবে। আর এ ক্ষেত্রে শিক্ষাই হবে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কিন্তু, আমাদের এখন শিক্ষার যে দৈন্য দশা -তা দিয়ে লক্ষ্য অর্জন কঠিন। উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছতে হলে উন্নত দেশের আদলে আমাদের শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। আর এ জন্য শিক্ষা জাতীয়করণের বিকল্প নেই।

শিক্ষার জন্য শিক্ষক, না শিক্ষকের জন্য শিক্ষা? প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার জন্য শিক্ষক। শিক্ষক ছাড়া শিক্ষা অসাড়, অসার ও চলৎ শক্তিহীন। শিক্ষকের মাধ্যমে শিক্ষা যুগ যুগান্তরে প্রসারিত হয়। কিন্তু,শিক্ষকের সে প্রাণশক্তি বা গতিশক্তি যদি একান্ত না থাকে?

আমাদের শিক্ষকরা বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকগণ নিজেরা ‘একতাই বল’ নীতি বাক্যটি শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে থাকেন। কিন্তু নিজেদের মাঝে একতার অনুশীলন কতটুকু করেন-সে প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তারা একই মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের অধীনে কাজ করেন। তাদের একই কারিকুলাম ও সিলেবাস। তাদের সুখ-দুঃখ, অভাব-অভিযোগ, চাওয়া-পাওয়া সবই অভিন্ন। সঙ্গত কারণে তাদের মধ্যে একতা সৃষ্ঠির অবারিত সুযোগ। তবু হায়! তাদের মধ্যে ঐক্যের বড়ই অভাব। বানের পানিতে দু’ চিরশত্রু সাপ আর নেউল ভেসে যেতে যেতে যদি নিজেদের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন রচনা করতে পারে, তাহলে সারা দেশের বেসরকারি শিক্ষকগণ এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে তাদের দুঃখ-দুর্দশা ও শিক্ষার দৈন্যতার কথা জাতিকে জানাতে পারেন না কেন?

বেসরকারি শিক্ষকদের মোট কতটি সংগঠন, কে জানে? কতো নেতা তাদের! ঢাল নেই, তলোয়ার নেই -নিধি রাম সর্দার! গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়ল! এ সব পরিহার করে সবাইকে এক কাতারে এসে দাঁড়াতে হবে। বৃদ্ধ চাষীর সে গল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাইকে ঐক্যের বন্ধন সুদৃঢ় করতে হবে। শিক্ষাকে বাঁচাবার জন্য জাতীয়করণের এক দফা-এক দাবী নিয়ে সোচ্চার হতে হবে। সময় এখনই। বহু সমিতি, বহু সংগঠন আর অনেক নেতা-এ কারো কাম্য নয়। দাবী এক ও অভিন্ন। তাই, সকলকে এক সারিতে দাঁড়িয়ে জাতীয়করণের সম্মিলিত স্লোগান ধরতে হবে। শিক্ষকদের মধ্যে কোনরুপ বিভাজন জাতি দেখতে চায় না। শিক্ষা ও শিক্ষকদের দুর্দশা জাতির কাম্য নয়। জাতীয়করণের পথে এ মুহুর্তে এই একটিই বাঁধা। এ বাঁধা শিক্ষকদের পেরুতে হবেই।

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী: চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট।

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন