গ্রীষ্মের তাপদাহ ও প্রাথমিকের অবকাশ - মতামত - Dainikshiksha

গ্রীষ্মের তাপদাহ ও প্রাথমিকের অবকাশ

মো. সিদ্দিকুর রহমান |

শিক্ষার্থীদের স্বস্তি, আনন্দ-বিনোদন ও বিভিন্ন পর্ব উপভোগ ও উদযাপনের নিমিত্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকা প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। কেবল ব্যক্তিগত বা কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যতিরেকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটির তালিকা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রণয়ন করে থাকে। পাকিস্তান আমল থেকে প্রাথমিকে ৭৫ দিন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ৮৫ দিন ছুটি আজও নির্ধারণ হয়ে আসছে। রোজা, ঈদ, বিভিন্ন ধর্মের পর্ব, জাতীয় ও বিশেষ দিবস, গ্রীষ্ম বা শীতকালীন অবকাশ ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে।

জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তনে গ্রীষ্মের তাপদাহ বেড়েই চলেছে। এই গরমের যন্ত্রণা গরীব মানুষই সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করে। ধনী শ্রেণির মানুষের বাড়ি, গাড়ি, অফিস, ব্যবসা বাণিজ্য সর্বত্রই এসি লাগানো। গরমের ভয়াবহতা তাদের কাছে ঘেষতে পারে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গরীব মানুষের সন্তানরা লেখাপড়া করে। তারা বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করে রোদের প্রচণ্ড তাপের মধ্যে। বিদ্যালয়ে সিলিং ফ্যান থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী এক সাথে অবস্থান করে বিধায় তাপের তীব্রতা বেশি অনুভূত হয়। পাকিস্তান আমল থেকে গরমের সময় বিদ্যালয়ের সময়সূচি সকাল ৭টা থেকে শুরু ও খানিকটা সংক্ষিপ্ত করা হতো। এ ছাড়াও গ্রীষ্মের ছুটি ১৫ দিনের বেশি রাখা হতো।

সে বাস্তবসম্মত নিয়মগুলো বিগত কয়েক বছর ধরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নামে মাত্র গ্রীষ্মের ছুটি দেয়া হয় ৪/৫ দিন। গ্রীষ্ম অবকাশের ছুটি কম থাকায় শুধু যে যন্ত্রণা শিক্ষার্থীর একার তা নয়, ভুক্তভোগী হন শিক্ষকরাও। এতে শিক্ষকদেরও অধিকার হরণ করা হচ্ছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও গ্রীষ্ম অবকাশের ছুটিসহ ছুটির তালিকায় নানা অসংগতি ছিল। তা সংশোধনের জন্য ২০ জানুয়ারি ২০১৯ মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয় বরাবর আবেদন করা হয়। যা প্রিন্ট মিডিয়া, অনলাইন ও ফেসবুকে ব্যাপক প্রচার হয়। কিন্তু বিষয়টি মাননীয় প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অধিকার তথা মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের আবেদনখানার প্রতি সংশ্লিষ্টদের নিষ্ঠুর মানসিকতা প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দেখা দিয়েছে। ভাবখানা এমন, এদেশের শিশু ও শিক্ষকদের প্রতি তাদের কোনো দায় নেই। মহাপরিচালকের দায় সচিব বা মন্ত্রীর কাছে। এভাবে সব দায় যেন সর্বশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া ছোটখাটো সমস্যাগুলোতেও যেন কারো কিছু করার নেই। যার ফলে বর্তমানে শ্রান্তি ও বিনোদনের ভাতা সরকারি বিধি মোতাবেক ৩ বছর পর পর প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সারাদেশের শিক্ষকেরা।

এ প্রসঙ্গে দিনাজপুর জেলা শিক্ষক নেতা সেতারা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, আমরা তো উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো ৮৫ দিন ছুটি দাবি করছি না। ৭৫ দিন ছুটির মধ্যে ১৫ দিন গ্রীষ্মকালীন অবকাশ রেখে শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা ৩ বছর পর পর প্রাপ্তির নিশ্চয়তা চেয়েছিলাম। প্রাথমিক শিক্ষকদের দীর্ঘ কয়েক বছরের যৌক্তিক আবেদনের প্রতি ‘অবহেলা দুঃখজনক’।

গ্রীষ্ম অবকাশ নিয়ে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী বরাবর আবেদনে উল্লেখ ছিল, “প্রাথমিক শিক্ষকেরা সাপ্তাহিক ছুটি শনিবার কর্মরত থাকায়, তাদের ছুটি সরকারি কর্মচারীদের চেয়ে কম। সকল সরকারি কর্মচারী শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা ১ মাসের মূল বেতনের সাথে ১৫ দিনের বাড়তি ছুটি পান। শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা প্রাপ্তির জন্য প্রাথমিক শিক্ষকদের ভ্যাকেশনাল বিভাগের কর্মচারী দেখিয়ে ১৫ দিন ছুটি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সে কারণে প্রাথমিক শিক্ষকদের যে কোনো অবকাশে ১৫ দিন ছুটি দেখাতে হয়। বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও আলাদা গ্রীষ্ম অবকাশ বা অন্য কোনো অবকাশে ১৫ দিন ছুটি রাখা হয়নি। বিগত বছরগুলোতে রমজান মাস থেকে ১৫ দিন শ্রান্তি-বিনোদনের জন্য ছুটি দেখিয়ে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার দপ্তর থেকে বিল দাবি করানো হয়। হিজরি বছর ৩৫৫ দিন হওয়ায় ৩ বছর রমজানের ছুটি ৩০ দিন এগিয়ে আসে। বিধায় প্রাথমিক শিক্ষকেরা ৪/৫ বছর পর শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা পেয়ে আসছে। তাই রমজানের মাস ছাড়া গ্রীষ্মের ছুটি বা অন্য অবকাশে ১৫ দিন ছুটি নির্ধারণ করার সবিনয় নিবেদন জানানো হয়। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ও বিশেষ দিবসগুলো বিদ্যালয় খোলা রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অর্থবহ করার কথা উল্লেখ করা হয়। উক্ত ছুটি গ্রীষ্মের অবকাশের সঙ্গে যোগ করে ১৫ দিন ছুটি রাখার আবেদন জানানো হয়। এতে প্রাথমিক শিক্ষকদের শ্রান্তি বিনোদন ভাতা সরকারি কর্মচারীদের মতো ৩ বছর পর পর প্রাপ্তি নিশ্চিত হতো।

দিনাজপুর সদরসহ বাংলাদেশের বহু স্থানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অনেক প্রাথমিক শিক্ষক গ্রীষ্মের ছুটি ১৫ দিন নির্ধারণ না করার কারণে শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। শিক্ষার্থীর স্বস্তি, আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণসহ শিক্ষকদের অধিকার প্রাপ্তি থেকে দীর্ঘ সময় বঞ্চিত করার দায় কেন জবাবদিহীতার আওতায় আসবে না?

শিক্ষকদের সময়ানুবর্তিতা, পাঠদানে অবহেলা নিয়েই কি শুধু জবাবদিহীতা সীমাবদ্ধ থাকবে? তাদের অধিকার প্রাপ্তি নিয়ে উদাসীনতা কোনো অবস্থায় মেনে নেওয়া কাম্য নয়। চরম বৈষম্য অবস্থায় আজ প্রাথমিক শিক্ষা জর্জরিত। শুধু সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড ও প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড নয়। গ্রীষ্মের গরমে শিশু শিক্ষার্থীদের কষ্ট দেয়া, শিক্ষকদের শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা যথাসময়ে প্রাপ্তির নিশ্চয়তাসহ সকল শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিন্ন কর্মঘণ্টা, পাঠ্যবই, মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবস্থার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নিরবতা স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষাবান্ধব সরকারের আমলে মেনে নিতে কষ্ট হয়।

প্রতিমন্ত্রী, সচিব, মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে স্বীয় দায়িত্ব অবহেলা বা উদাসীনতা পরিহার করে দ্রুত সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবেন। যাতে শিক্ষকদের নানা কর্মকাণ্ডের আদেশ না দিলে আপনাদের কর্ম নিয়ে সমালোচনা মুখর হতে না হয়। গ্রীষ্মের তাপদাহের তীব্রতা ও সকল বৈষম্য নিরসনের উপলব্ধিবোধ সকলের মাঝে আসুক। দূর হোক প্রাথমিকের সকল বৈষম্য। 

লেখক: আহ্বায়ক, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ এবং প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম; সম্পাদকীয় উপদেষ্টা, দৈনিক শিক্ষা।

শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কঠোর হচ্ছে নীতিমালা - dainik shiksha শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কঠোর হচ্ছে নীতিমালা প্রাথমিকে ৬১ হাজার শিক্ষকের পদ সৃষ্টি হবে - dainik shiksha প্রাথমিকে ৬১ হাজার শিক্ষকের পদ সৃষ্টি হবে দৈনিকশিক্ষার প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীরকে ওএসডি - dainik shiksha দৈনিকশিক্ষার প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীরকে ওএসডি প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার রুটিন - dainik shiksha প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার রুটিন ভিকারুননিসায় ৪৪৩ অতিরিক্ত ভর্তি, সাবেক অধ্যক্ষকে শোকজ - dainik shiksha ভিকারুননিসায় ৪৪৩ অতিরিক্ত ভর্তি, সাবেক অধ্যক্ষকে শোকজ তিন শর্তে অস্থায়ী এমপিও পাচ্ছে ১৭৬৩ প্রতিষ্ঠান, আলাদা পরিপত্র - dainik shiksha তিন শর্তে অস্থায়ী এমপিও পাচ্ছে ১৭৬৩ প্রতিষ্ঠান, আলাদা পরিপত্র প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি করতে হবে চর এলাকায়, আসছে চর ভাতা - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি করতে হবে চর এলাকায়, আসছে চর ভাতা বিএড ৩য়-৫ম সেমিস্টারের ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৫ আগস্ট থেকে - dainik shiksha বিএড ৩য়-৫ম সেমিস্টারের ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৫ আগস্ট থেকে সাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তির আবেদন শুরু ১০ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha সাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তির আবেদন শুরু ১০ সেপ্টেম্বর এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর - dainik shiksha এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website