ছোটদের কাছে বড়দের বহু শেখার আছে - মতামত - Dainikshiksha

ছোটদের কাছে বড়দের বহু শেখার আছে

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

কোমলমতি শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের আজ ক'দিনের আন্দোলন দেখে বুকটা সত্যি আনন্দে  ভরে গেছে । এতদিনে আমাদের রাজনীতি ও রাজনীতিকদের প্রতি সাধারণের যে নেগেটিভ আইডিয়া জন্মেছিল তার থেকে একটি পজিটিভ ধারণা সৃষ্টি হওয়ার ক্ষেত্র অন্ততঃ এরা সৃষ্টি করতে পেরেছে । আমার কেন জানি বার বার মনে হয়  এরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হৃদ্যিক চেতনায়  উজ্জীবিত । যে চেতনায় বঙ্গবন্ধুর ডাকে গোটা জাতি স্বাধীনতার জন্য মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ওঠেছিল । যে প্রেরণায় বাঙ্গালী নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভাবতে শিখেছিল। 

এ প্রজন্মের ছেলেপিলেরা কেউই বঙ্গবন্ধুকে দেখেনি । কেবল বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস তারা বইয়ে পুস্তকে পড়েছে। আমাদের প্রজন্মের অনেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছে। বঙ্গবন্ধুর সাথে চলাফেরা ও ওঠাবসা করেছে । কিন্তু, তাকে অনেকে ভালবাসতে পারেনি । ভালবাসতে শেখেনি । খোন্দকার মোশতাক তো সারা জীবন জাতির জনকের পিছে ঘুর ঘুর করে কাটিয়েছে । ইতিহাসে আজ তার স্থান কোথায় ?  আজকের কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীরা মুজিব আদর্শে উজ্জীবিত এজন্যে বলি - তারা নির্দ্ধিধায় পুলিশকে বলেছে  'আমাদের কপালে গুলি করো, বুকে গুলি করো না । আমাদের বুকে বঙ্গবন্ধু মুজিব।' কত না দৃপ্ত উচ্চারণ !  বঙ্গবন্ধুর প্রেমিক না হলে মুখ দিয়ে এমন কথা আসে কী করে ?

আমাদের দেশে ছাত্র রাজনীতির যে গৌরবময় ইতিহাস সেটি বোধ হয় দুনিয়ার আর কোন দেশে নেই । আমাদের সোনার ছেলেরা বায়ান্নতে মাতৃভাষা বাঁচিয়েছে । একাত্তরে মাতৃভুমি রক্ষা করেছে । নব্বইয়ে  দেশে স্বৈরাচারের কবর এরাই দিয়েছে । জাতির কঠিন দুঃসময়ে এরা অতন্ত্র প্রহরি । জাতির দুর্দিনে সব সময় তারাই গেয়ে ওঠেছে  ' আমরা যদি না জাগি মা , কেমনে সকাল হবে ? ' এদের নিয়ে ভিন্ন চিন্তা মোটে ও ঠিক নয় । এরা নমস্য সত্যি, এদের স্যালুট না জানিয়ে পারা যায় না । এদের নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলতেই পারে । কারো মুখে তো কুলুপ এঁটে দেয়া যায় না।  এরা তাদের প্রিয় সহপাঠী হারানোর ব্যথা-বেদনায় জর্জরিত । এরা সোনালী আগামীর স্বপ্ন রচনায়  স্বপ্নাতুর । জরাজীর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এরা সোচ্চার । বঙ্গবন্ধু বাইশ পরিবারের বিরুদ্ধে যে লড়াই সংগ্রাম শুরু করেছিলেন আজ ও তার শেষ নেই । 

বাইশ পরিবারের জায়গায় আজ বাইশ হাজার পরিবার । এদের থাবা অনেক বড় । বহু শক্তিশালী । তবু এদের রুখতে হবে । কে দেবে নেতৃত্ব  ?  শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের হঠাৎ এ স্পিরিট এলো কোথা থেকে ? সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি আমাদের দেশে নিত্য দিনের ঘটনা। প্রতিদিন সড়কে কত মানুষের প্রাণ যায় , কত মানুষ পঙ্গু হয় সে খবর আমরা কতটুকু জানি ?  প্রতিদিনের খবরের কাগজের প্রতিটি পৃষ্ঠায় কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর থাকে । কত মায়ের বুক খালি হয় । কত মানুষ স্বজন হারানোর ব্যথা বুকে নিয়ে বাকিটা জীবন বেঁচে থাকে । এ বাঁচাটা বড় কষ্টের । 

পৃথিবীর সব দেশে সড়ক দুর্ঘটনা আছে । কিন্তু আমাদের মত এত দুর্ঘটনা মনে হয় আর কোথাও নেই । এ দায় কার ?  কেন এত দুর্ঘটনা ?  এ থেকে মুক্তির কি কোন পথ কারো জানা নেই ?  সে পথটি আজ শিশু কিশোর শিক্ষার্থীরা খুঁজতে বেরিয়েছে । যে কাজটি বড়দের করার কথা সেটি আজ ছোটরাই করতে শুরু করেছে ।  এদের থেকে বড়দের অনেক শেখার আছে । ছোট বলে তাদের কাছে শেখতে নেই এ কথা তো কেউ কোনদিন বলেনি । ওরা আমাদের ক্ষতগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে । সময়ের শ্রেষ্ঠ কাজে এরা হাত দিয়েছে । কবির সে আক্ষেপটি এরা ঘুচিয়ে দিতে চায়- ' আমাদের দেশে সেই ছেলে হবে কবে ?  কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে । ' কবির সেই কল্পিত সন্তান এরা । এরা কথায় নয় কাজে বড় হবার প্রমাণ দিতে চায় । 

শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন নিয়ে নানা মুনির নানা মত । থাকতেই পারে । থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয় । কিন্তু কেবল একটা মত থাকলেই তো আর হলো না । যুক্তি থাকতে হবে না ?  লক্ষর ঝক্ষর মার্কা একটা গাড়ি নিয়ে যে কেউ সড়কে উঠে গেলেই হলো ?  রাস্তায় গাড়ি চালাতে নেশা করবে , ট্রাফিক আইন মানবে না , চব্বিশ ঘন্টা কানে মোবাইল রেখে গাড়ি চালাবে  - এসব আর কত মেনে নেয়া যায় ? রাস্তাঘাট ভাঙ্গাচুরা । গাড়ি ঘোড়ার শেষ নেই । প্রতিদিন সড়কে কেবলি গাড়ির বহর । একদিন থেকে আরেকদিন বেশি । দেশে বড় লোকের সংখ্যা যেমন দিনে দিনে  বাড়ছে তেমনি গাড়ি ঘোড়া ও বেড়ে চলেছে । আর পিঁপড়ের মতো রাস্তা ঘাটে নিত্যদিন মরে চলেছে সাধারণ মানুষ । এ জন্য কারো মাথা ব্যথা নেই । দিনে দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত মানুষের মিছিলটা কেবল লম্বা হয়ে যাচ্ছে । এর কী কোন জবাবদিহিতা নেই ? জবাবদিহিতার কী কোন প্রয়োজন নেই?  গত শতকের আশির দশকের পর দেশ কোন নিঃস্বার্থ স্বচ্ছ আন্দোলন দেখেনি ।

দেখেছে  কেবল জ্বালাও পোড়াও মার্কা আন্দোলন । পেট্রোল ঢেলে মানুষ পুড়িয়ে মারার আন্দোলন । শিক্ষার্থীদের আজকের আন্দোলন গতানুগতিক জ্বালাও পোড়াও কিংবা ভাঙ্গচুর করার কোন আন্দোলন নয় । চোখে আঙ্গুল দিয়ে অনিয়ম ও অনাচার দেখিয়ে দেবার লড়াই। এ থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখিয়ে দেবার উত্তম কৌশল ।  নিয়ম মেনে ঠান্ডা মাথায় ভুল ধরিয়ে দিয়ে তা শুধরানোর পথ দেখিয়ে দেবার অনন্য এক অসাধারণ কর্ম প্রয়াস । এরা ওসব শেখল কোথায় ? কার কাছে  শেখল? আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে এ শিখন তাদের । মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে বলে চিৎকার করে আমরা গলা ফাটাই। কিন্তু সত্যিকারের চেতনা আমাদের এসব ক্ষুদে শিক্ষার্থীরাই ধারণ করেছে । মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এরা বাংলাদেশের স্বপন দেখে । এরা শোসন নিপীড়ন ও অনিয়ম অনাচারমুক্ত এক সুন্দর সোনার বাংলাদেশ চায় ।

যে বাংলাদেশটি চেয়েছিলেন আমাদের জাতির জনক । হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি সন্তান শেখ মুজিব । এরা শেখ মুজিবের আসল উত্তরসুরি । এদের জয় অনিবার্য । এরা হারতে শেখেনি।  এরা জয়ী হতে শেখেছে । কী চমৎকার এদের কর্ম কৌশল ! কী সুন্দর তাদের আন্দোলনের রুপরেখা !  তারা ট্রাফিক রুলস প্রয়োগ করতে চায় । যুগোপযোগি ট্রাফিক আইন চায় ।  ট্রাফিক আইনের যথার্থ বাস্তবায়ন চায় । বড়লোক আর ক্ষমতাসীনদের অনিয়মটা সাধারণের চোখে ধরিয়ে দিতে চায়।  তারা চায় ফিটনেস নিয়ে রাস্তায় গাড়ি চলুক । দক্ষতা নিয়ে ড্রাইভার গাড়ি চালাক । এ চাওয়া খুব বড় কোন চাওয়া নয় । এ এক মামুলি চাওয়া । এ চাওয়া মানুষ বাঁচানোর এক উত্তম চাওয়া। এ চাওয়া তাদের একার নয় । এ চাওয়া দেশের ষোল কোটি মানুষের ।                                             

গত এক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনটি চলে আসছে। তেমন বিশেষ কেউ তাদের পাশে এসে দাঁড়াতে দেখিনি । নিসচা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন অনেক দেরিতে মুখ খুলেছেন । বলেছেন শুরুতে এলে কেউ না কেউ বলতো তিনি শিশু শিক্ষার্থীদের উসকে দিয়েছেন । আসলে এতে উসকে দেবার কী আছে ?  আন্দোলনটি তো তার নিজেরই । পঁচিশ বছর আগে নিজের স্ত্রী ও সন্তান হারিয়ে তিনি যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন , শিক্ষার্থীরা কেবল সে আন্দোলনটিতে প্রাণের সঞ্চার করেছে । ইলিয়াস কাঞ্চন কী কেবল নিজের স্ত্রী ও সন্তানের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুতে পীড়িত হয়ে এ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন  ? শহিদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টঃ কলেজের দু' শিক্ষার্থীর সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টি কী তাকে এতটুকু মর্মাহত করেনি ?  

আমাদের দেশে রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকের অভাব নেই । তারা যার যার ভাবে এ আন্দোলনের ফসল ঘরে উঠাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেছে । সরকার এ আন্দোলনে জামাত বিএনপি'র সংশ্লিষ্টতা খুঁজছে । বিএনপি ও জামাত সরকারের দোষ বের করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে । এটি শুভনীয় কিংবা কাম্য কোনটিই হতে পারে না । এর ফসল ঘরে তুলার জন্য যারা উঠে পড়ে লেগেছে তাদের সবিনয়ে বলি , শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা যে সুন্দর আন্দোলনের সূচনা করেছে তার সফল পরিসমাপ্তির জন্য সহযোগিতা করুণ । ফসল এলে তা যে যেভাবে পারেন ঘরে তুলবেন । এখন সবে জমি চাষ দেয়া শুরু হয়েছে । ফসল ঘরে তুলার ধান্ধা বাদ দিয়ে এদের পাশে দাঁড়ান ।

নতুবা এর জন্য আপনাদের একদিন চরম ও কঠোর মুল্য পরিশোধ করতে হবে ।  মাননীয় নৌ পরিবহন মন্ত্রী সড়ক পরিবহনের নেতা ও বটে । হেসে হেসে শিক্ষার্থীদের বুকে আগুন জ্বালিয়েছেন । পরিবহন ধর্মঘটের নামে দেশের মানুষের অন্তরে আগুন জ্বালিয়ে কোন লাভ হবে না । মানুষের মনে একবার আগুন জ্বলে ওঠলে সেটি আর সহজে নেবে না । প্লিজ , উদার মনে সমস্যার সমাধান করুণ । আসুন , আমরা সকলে মিলে শিশু শিক্ষার্থীদের আরেকবার স্যালুট করি । পুলিশ ভাইদের ও এদের কাছে শেখার অনেক কিছু আছে । বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশের । পুলিশের ও সড়ক দুর্ঘটনার দায় এড়াবার সুযোগ একেবারে কম ।                       

লেখক: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট,  সিলেট ও দৈনিক শিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক।

মহাপরিচালকের চিকিৎসায় মানবিক সাহায্যের আবেদন - dainik shiksha মহাপরিচালকের চিকিৎসায় মানবিক সাহায্যের আবেদন সরকারি সুবিধা চান ৫৯ অতিক্রান্ত কলেজ শিক্ষকরা - dainik shiksha সরকারি সুবিধা চান ৫৯ অতিক্রান্ত কলেজ শিক্ষকরা সদ্য সরকারিকৃত ২৯৮ কলেজে সমন্বিত পদ সৃজনের সিদ্ধান্ত - dainik shiksha সদ্য সরকারিকৃত ২৯৮ কলেজে সমন্বিত পদ সৃজনের সিদ্ধান্ত বড় নিয়োগ আসছে প্রাক প্রাথমিকে - dainik shiksha বড় নিয়োগ আসছে প্রাক প্রাথমিকে একীভূত শিক্ষাব্যবস্থা: ৬৪ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তালিকা - dainik shiksha একীভূত শিক্ষাব্যবস্থা: ৬৪ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তালিকা একাডেমিক স্বীকৃতি পেল ৩০ প্রতিষ্ঠান - dainik shiksha একাডেমিক স্বীকৃতি পেল ৩০ প্রতিষ্ঠান পাঠ্যসূচিতে ট্রাফিক আইন থাকা উচিত: মুহম্মদ জাফর ইকবাল - dainik shiksha পাঠ্যসূচিতে ট্রাফিক আইন থাকা উচিত: মুহম্মদ জাফর ইকবাল চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষকদের পদোন্নতি শিগগিরই - dainik shiksha চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষকদের পদোন্নতি শিগগিরই দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website