ছোট্ট ইনক্রিমেন্টটি ফেরত চাই - মতামত - Dainikshiksha

ছোট্ট ইনক্রিমেন্টটি ফেরত চাই

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

বেসরকারি শিক্ষকদের সঙ্গে যেমন আচরণ করা হয় তা দুনিয়ায় আর কোথাও মনে হয় কেউ কারো সাথে করে না। কুড়ি-পঁচিশ কিংবা একশ' দু'শ হলে কথা ছিল না। পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী সাথে অন্যায় আচরণ! পাঁচ লাখ শিক্ষকের পাঁচ লাখ পরিবার।

পাঁচ লাখ পরিবারে কম করে বিশ লাখ মানুষ। সবার মনে একই ব্যথা। একই কষ্ট। স্বাধীন সার্বভৌম দেশে স্বাধীনতার অর্ধ শতক পরেও শিক্ষকরা এতটুকু পীড়িত হবেন সে কখনো কেউ কোনওদিন ভেবেছেন বলে মনে হয় না। দেশ, জাতি ও স্বাধীনতার জন্যে এ এক বড় লজ্জা। এ লজ্জা লুকোবার জায়গা নেই। স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু মুজিবের স্বপ্নের বাংলাদেশে শিক্ষকদের এ অপমান মেনে নেয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।      

বঙ্গবন্ধু আজন্ম এক বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন লালন করে গেছেন। পাকিস্তানি শাসকদের বরফের নির্জন কুঠুরিতে সীমাহীন কষ্টও তাকে শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের চিন্তা থেকে একটুও বিরত রাখতে পারেনি। তিনি কি সেদিন ভেবেছিলেন তার হাতে গড়া প্রিয় স্বাধীন দেশে স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা এমন বৈষম্যের শিকার হবেন? ন্যূনতম মান-মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য পথে পথে ঘুরবেন?    

কুড়ি পঁচিশ টাকা বেতন দিয়ে বেসরকারি শিক্ষকগণ পেশা শুরু করেছিলেন। এর পর থেকে সংগ্রামে সংগ্রামে তাদের পথ চলা। এক পাই এক আনা পেতেও তাদের আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে। আন্দোলন সংগ্রাম করে করে আজ শত ভাগ স্কেলে বেতন জুটেছে বটে। কিন্তু আজও তবু ন্যায্য অনেক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত।

বদলি নেই। প্রমোশন নেই। বাড়ি ভাড়া সাকূল্যে হাজার টাকা যেটি দিয়ে উঠোন ভাড়া পাওয়াই কঠিন। চিকিৎসা ভাতা পাঁচশ' টাকা। যে টাকায় আজকাল ডাক্তারের ফিও হয় না। টেস্ট কিংবা ওষুধ দূরে থাক। একটা তাবিজ, একটা ফুঁক কিংবা একটু তেলপড়া নিলেও পাঁচশ' টাকা হাদিয়া না দিলে হুজুরদের মন ওঠে না। ঈদে বোনাস মূল স্কেলের পঁচিশ শতাংশ মাত্র। আস্ত গরু দূরে থাক, আস্ত একটা খাসিও কোরবানি দিতে পারেন না অনেকে।                                 

এক সময় বেসরকারি শিক্ষকরা ছাতা-লাঠি নিয়ে পেনশনে যেতেন। শিক্ষার্থীরা ভালবেসে স্যারদের ছাতা-লাঠি আর পাজামা পাঞ্জাবির কাপড় উপহার দিত। সেটুকুতেই তাদের অনেক তৃপ্তি ছিল। এখন অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের নাম করে বছরের পর বছর ঘুরিয়ে মারা হয়। মরার পর টাকা হাতে এসে কী লাভ? ছয় মাসের মধ্যে সব টাকা দিতে না পারলে মরার পর দিয়ে লাভ নেই। এর চেয়ে ছাতা-লাঠির অনেক মর্যাদা ছিল।

আত্মতুষ্টি লাভ করা যেত। বেসরকারি শিক্ষকদের একটা ছোট্ট ইনক্রিমেন্ট ছিল। সারাজীবনে একবার হলেও একটা টাইম স্কেল তাদের ছিল। এখন এ দু'টোও তাদের নেই। কেন নেই, সে উত্তরটা কেউ বলতে পারেন না। অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল দিয়ে সে দু'টো জিনিস কেড়ে নেয়া হয়েছে। হরণ করা হয়েছে বেসরকারি শিক্ষকদের দু'টো ন্যায্য অধিকার। যারা এগুলো হরণ করেছে তাদের কী এতটুকু লজ্জাশরম নেই? 

এ প্রসঙ্গে ছোটবেলায় পড়া কবিতার একটি লাইন খুব বেশি মনে পড়ছে। সেটি হচ্ছে, ‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’ পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট না দিয়ে বেসরকারি শিক্ষকদের ছোট্ট একটা পঙ্গুর মতো অচল ইনক্রিমেন্ট ও সারা জীবনের একটি মাত্র টাইমস্কেল উঠিয়ে নিতে যাদের এতটুকু বাধেনি, তারা যেমন শিক্ষা ও শিক্ষকবান্ধব নয়, তেমনি সরকারের ও শুভাকাঙ্ক্ষী নয়। এদের কারণেই সরকার নানা সমালোচনার মুখে পড়ে। সরকারের বদনাম হয়। কাজ করে আমলারা। বদনাম হয় সরকারের।

আমলাদের কারবার বোঝা মুশকিল। 'আমলাতান্ত্রিক জটিলতা'। সরকার সচেতন না হলে সমুহ বিপদের আশংকা থেকে যায়। কিন্তু সরকার যায়, সরকার আসে। আমলারা ঘুরে ফিরে তাদের জায়গাতেই থেকে যান। রাজনীতি বিজ্ঞানে আমলাতন্ত্র সম্পর্কে পড়েছিলাম- Minister may come and minister may go but the officials remain in the office. 
আমলাদের খুঁটির জোর অনেক। খুঁটির জোরে তারা যা ইচ্ছে, তাই করে । মন্ত্রী-মিনিস্টারও অনেক সময় তাদের কাছে জিম্মি। না হলে মন্ত্র 'এই দেব, সেই দেব' করে করে কিছুই দিতে পারেন না কেন? শিক্ষকদের জন্যে পৃথক বেতন কাঠামোর কথা অনেক শুনেছিলাম ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে। জানলাম, সরকারি কলেজের শিক্ষকরা বিরোধিতা করেছেন। কারণ, এতে তাদের শিক্ষকগোত্রের মধ্যে ঠেলে দেয়া হবে। তাদের ক্যাডার পরিচয়টা মুছে হবে, তাই তারা বিরোধিতা করে শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতনস্কেল ঠেকিয়ে রেখেছেন বলে শোনা যায়।

শিক্ষকদের বেতন লাখ টাকা হবে-সে তো কম শুনিনি। শিক্ষকদের জন্য এক গুচ্ছ সুখবরের খবরটিও বাস্তবায়ন হতে বিরোধিতা করছেন কেউ কেউ। এ দেশে শিক্ষকরা বড় সহজ-সরল মানুষ। নিজেদের দাবিদাওয়া আদায়ে তারা এক মত হতে পারেন না। শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। সে তারা শিক্ষক বলে। তাদের পেশা আর দশ পেশার মত নয়। তারা জাতির বিবেক। বিবেকের তাড়নায় অনেক কিছু চাইলেই করা যায় না। এ তাদের কোনো দুর্বলতা নয়। এটি তাদের মহৎ এক গুণ। এই গুণের নাম আত্মসংযম। সুনাগরিকের তিনটি মাত্র গুণের এটি একটি। আমলারা তাদের ইনক্রিমেন্ট, নববর্ষ ভাতা ও ঈদ বোনাস শত ভাগ দিয়ে দেবার আশ্বাস দিয়েও দেয় না। তারপরও তারা নরম শরম কর্মসুচি দিয়ে তাদের মনের কথা জানান দিয়ে থাকেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? শিক্ষকদের কথা শোনার মত মানুষ দেশে নেই বুঝি!

আমলারা  স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তারপর আমলা হয় । তাদের শিক্ষকদের কষ্টের কথা তারা না জানার কথা নয় । তবু, তারা একবারও ফিরে দেখেন না। শিক্ষক যেন তাদের কেউ নন। একজন শিক্ষক তার ছাত্রকে পরম এক মমতায় বড় করে থাকেন। সে ছাত্রটি যখন স্যারকে একদম ভুলে যায়, তখন স্যার কাকে দোষ দেবেন? নিজের কপালকে দোষ দেয়া ছাড়া আর কাউকে দোষ দেবার সুযোগ খুঁজে পান না । আসলে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে পরম সত্য এই যে, এ দেশে শিক্ষকদের আপন বলতে কেউ নেই।           

পরিশেষে সকলের উদ্দেশে বলি, অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের নীতিমালা অনুসারে বেসরকারি শিক্ষকদের পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিতে না পারলে তাদের আগের সে ছোট্ট ইনক্রিমেন্টটি দয়া করে ফিরিয়ে দিন। তাদের সারা জীবনের টাইমস্কেলটি ও ফিরিয়ে দেয়া সমীচীন হবে। সরকারের শেষ সময়ে এসে এটুকু বলা ছাড়া কার কী করার আছে?                                       

লেখক: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট ও দৈনিক শিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক।

৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে - dainik shiksha ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে মাস্টার্সের সমমর্যাদা পেল দাওয়ারে হাদিস - dainik shiksha মাস্টার্সের সমমর্যাদা পেল দাওয়ারে হাদিস এইচএসসি প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনের বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha এইচএসসি প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনের বিজ্ঞপ্তি এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর তেরো এগারোর বাদপড়া শিক্ষকদের হইচই (ভিডিও) - dainik shiksha তেরো এগারোর বাদপড়া শিক্ষকদের হইচই (ভিডিও) দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website