জাতীয় চরিত্র গঠনে নকলমুক্ত পরীক্ষার গুরুত্ব - মতামত - Dainikshiksha

জাতীয় চরিত্র গঠনে নকলমুক্ত পরীক্ষার গুরুত্ব

হোসনে আরা বেগম |

একথা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে, লেখাপড়ার বিস্তার ঘটেছে অনেক। সুখের বিষয় হলো, আজ ঘরে ঘরে পড়াশুনার আলো ছড়িয়ে পড়ছে। সরকার থেকে বিনামূল্যে বই বিতরণ, অবৈতনিক পড়াশোনার সুযোগ, বৃত্তি প্রদান ইত্যাদি কারণে নিম্ন-আয়ের অভিভাবকেরাও তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারছেন। কিন্তু এই খুশির আমেজটুকু আমরা শান্তিমতো উপভোগ করতে পারছি না। চারদিক থেকে রব উঠছে, শিক্ষার মান গেল—একইসঙ্গে দেশও যে ডুবল! এর অন্যতম প্রধান কারণ প্রশ্নপত্র ফাঁস।  নকল হচ্ছে দেদারসে। এসব কারণে সরকারের ভাবমূর্তি পর্যন্ত ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

আশার কথা হলো, নকল করাকে অনেকেই ঘৃণা করে। তবে একথা ঠিক, আজ যেভাবে নকলপ্রবণতা বেড়ে চলছে, সেভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে নকলের প্রভাবমুক্ত ছাত্রছাত্রী পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠবে। তাই নকল প্রতিরোধ করার জন্যে সময় থাকতে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, এটা আমাদের আর্থ-সামাজিক সমস্যা। কোনো গোষ্ঠী বা কোনো দলের একক সমস্যাও যেমন নয়, তেমন সমাধানের পথ খুঁজে বের করাও একক বিষয় নয়।

পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, কোনো কোনো থানা বা এলাকায় নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এই যে মানুষের মধ্যে সচেতনতা দেখা যাচ্ছে, তাকে বিস্তৃত করে দিতে হবে। ‘সদা সত্য কথা বলিব’—এ নীতিবাক্যটি ছোট সময়ে যদি বাচ্চাদের রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তাদের মিথ্যা বলায় আড়ষ্টতা থাকবেই। তেমনিভাবে নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষার বিষয়টিও শিক্ষার্থীদের অভ্যস্ত করাতে হবে। এ ব্যাপারে পরিবার এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে মা-বাবাকে মাথায় রাখতে হবে, নকল করে পরীক্ষা দিয়ে পাস করলে তাদের সন্তান কোনো না কোনো পর্যায়ে ধরা পড়ে জীবন বরবাদ হয়ে যেতে পারে।

সেদিন এক অভিভাবক কথাপ্রসঙ্গে বলছিলেন, অভিভাবকদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের প্রয়োজনমতো কোন শিক্ষক প্রশ্ন করবেন, কে খাতা দেখবেন, কে পরীক্ষার হলে ডিউটি করবেন, তা খুঁজে বেড়ান এবং এভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে কলুষিত করতেও পিছপা হন না। স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু উদাত্তকণ্ঠে আহ্বান করেছিলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’। আজ আবার নতুন করে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার সময় এসেছে। আজ উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা মাদক ধরছে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। মাদক শুধু মাদকসেবীকে ধ্বংস করে না—একটা সুন্দর সংসারের সুখ-আহ্লাদ-আনন্দ নষ্ট করে দেয়। একইভাবে সন্ত্রাস আপন-পর চেনে না। মাদক সেবন আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে চিহ্নিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কোনো কোনো মা-বাবাও তাদের মাদকসেবী, সন্ত্রাসী সন্তানকে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন। একইভাবে মা-বাবাকে সচেতন থাকতে হবে, নিজেরাতো সন্তানের নকল করার ব্যাপারে কোনো সহায়তা করবেনই না, বরং সন্তানও যেন নকল করার সাহস না পায়, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। নকল করে পাস করলে তাদের সন্তান কোনোদিনই প্রকৃত সাহসী হতে পারবে না। নকল করা যেহেতু অসত্ কাজ—নকল করে পাস করা সন্তান অসত্ই থেকে যাবে। একটা দেশে যদি নকল করে অসত্ লোকের সংখ্যা বেড়েই চলে, তাহলে সেই দেশকে নিয়ে কোনোক্রমেই এগিয়ে যাওয়া যাবে না। জাতীয় চরিত্র গঠনে নকলমুক্ত পরীক্ষার গুরুত্ব যে কি—সেটা সবাইকে অনুধাবন করতে হবে।

সৃষ্টির শুরু থেকে যেমন পাপ-পুণ্য একইসঙ্গে চলে আসছে, তেমনি পরীক্ষায় নকল করাও শুরু থেকেই চলে আসছে। তবে ন্যায়-অন্যায় বুঝে অন্যায়কে পরিহার করার মধ্যেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। নকল করা যে একটা অন্যায় কাজ, এটা শিক্ষার্থীদের বুঝতে দিতে হবে। নকল করার জন্যে শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাহলে গণহারে নকল করার প্রভাব কমবে। আগে নকল ধরা পড়লে কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো—এমন কি ‘রাসটিকেট’ দেওয়ার বিধানও ছিল। বর্তমান প্রজন্মের কাছে ‘রাসটিকেট’ কি জানতে চাইলে তারা খুব একটা সদুত্তর দিতে পারবে না। নকল করার অপরাধে শুধু শিক্ষার্থীকে এককভাবে শাস্তি দিলে হবে না, যে পরিদর্শকের রুমে দেদারসে নকল হয়, সে পরিদর্শকেরও তিরস্কারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষার্থীরা নকল করলে তাদের মা-বাবাকেও সতর্কতামূলক চিঠি দিয়ে এই অপকর্ম থেকে ছেলে-মেয়েদের বিরত রাখার সদুপদেশ দেওয়ার পরামর্শ দিতে হবে।

নকল করার প্রবণতা আরো বেড়ে যাওয়ার আগেই ঘরে-বাইরে সমভাবে সচেষ্ট হতে হবে। জাতীয় চরিত্র গঠনে নকলমুক্ত পরীক্ষার গুরুত্বকে একেবারে হেলায়-ফেলায় রাখা যাবে না। প্রকৃত দেশপ্রেমিক যেমন চায় মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ; তেমন চাইবে নকলমুক্ত বাংলাদেশও।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সাবেক অধ্যক্ষ, আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ

 

আসছে তৃতীয় চক্রে শিক্ষক নিয়োগ - dainik shiksha আসছে তৃতীয় চক্রে শিক্ষক নিয়োগ এমপিওভুক্ত হচ্ছে ২৭৬৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করবেন কাল - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছে ২৭৬৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করবেন কাল মহাসমাবেশে যোগ দিতে পারছেন না প্রাথমিক শিক্ষকরা - dainik shiksha মহাসমাবেশে যোগ দিতে পারছেন না প্রাথমিক শিক্ষকরা এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত বেতন বঞ্চিত শিক্ষকদের মানববন্ধন - dainik shiksha এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত বেতন বঞ্চিত শিক্ষকদের মানববন্ধন ডিগ্রি ১ম বর্ষ পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত - dainik shiksha ডিগ্রি ১ম বর্ষ পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষার ফল আজ - dainik shiksha ১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষার ফল আজ শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website