জিপিএ-৫ এর পরিবর্তে জিপিএ-৪, একটি পর্যালোচনা - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

জিপিএ-৫ এর পরিবর্তে জিপিএ-৪, একটি পর্যালোচনা

মাছুম বিল্লাহ |

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পরীক্ষার ফলের মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের দেশের পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছিল গত জুনে। বিষয়টি নিয়ে ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯  শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয় এবং আশাবাদ ব্যক্ত করা হয় যে, আগামী বছর থেকেই কোন একটি পাবলিক পরীক্ষার ফলের মানদণ্ড জিপিএ-৫ এর পরিবর্তে জিপিএ-৪ করা হবে।

মূলত বহির্বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থায় জিপিএ-৫ এর প্রচলন না থাকায় এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও জিপিএ-৪ মানদণ্ডে ফল প্রকাশ করায় বিদেশে পড়াশুনা এবং চাকরির বাজারে উদ্ভূত সমস্যা নিরসনের জন্যই গ্রেড পয়েন্ট কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ ছাড়াও শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে পাবলিক পরীক্ষার কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পরীক্ষার ফলের মানদণ্ড জিপিএ-৫ থেকে ৪ এ নামিয়ে আনা হচ্ছে। পাবলিক পরীক্ষার বিভিন্ন বিষয় পরিবর্তনের জন্য ইতোমধ্যেই প্রস্তাব তৈরি করেছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সাব-কমিটি। জেএসসি, এসএসসি এবং এইচএসসি ও সমমানের পাবলিক পরীক্ষাগুলোর ফলাফলে বিদ্যমান গ্রেড পয়েন্ট এভারেজের (জিপিএ) পরিবর্তে কিউমুলেটিভ গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ (সিজিপিএ) পদ্ধতি চালুর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছিলো। শিক্ষা বোর্ডগুলোর এই চিন্তার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ও নীতিগতভাবে একমত।

সিজিপিএতে ফলের সর্বোচ্চ সূচক ৪, যা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চালু আছে। আর জিপিএতে ফলের সর্বোচ্চ সূচক ৫, যা পাবলিক পরীক্ষায় চালু আছে। কিছু পরীক্ষায় গ্রেড ৫ আবার কিছু পরীক্ষায় গ্রেড ৪। এর ফলে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, ফল তৈরি ও চাকরিতে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সেই দিক থেকে সিদ্ধান্তটিকে যৌক্তিক বলা যায়। কিন্তু শিক্ষার মানের যে অবনতি হয়েছে সেটি থেকে উদ্ধারের পথ কি?

১২জুন শিক্ষামন্ত্রীর সাথে বোর্ড চেয়ারম্যানদের সভায় নীতিগতভাবে এই সিদ্ধান্ত হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার জন্য পাবলিক পরীক্ষার ফল জিপিএ-৫ এর পরিবর্তে সিজিপিএ-৪ নিয়ে আসার কথা বলা হচ্ছিলো। কথা হচ্ছিলো যে, আগামী জেএসসি পরীক্ষা থেকেই এটি হবে, কিন্তু সমাপণী ও জেএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে; তাই বোর্ড সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তবে এ জাতীয় পরিবর্তন আনা হলে সামঞ্জস্য রাখার জন্য তা পাবলিক পরীক্ষার সব স্তরে একই রকম হওয়া উচিত। জিপিএ-৫ এর পরিবর্তে জিপিএ-৪ এর মাধ্যমে ফল প্রকাশে নীতি নির্ধারকগণ সবাই ঐকমত্য পোষণ করলেও এ ব্যাপারে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বৈঠক করা হবে বলে ঢাকা বোর্ড চেয়ারম্যান জানিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় ৮ সেপ্টেম্বরের কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হলো।

বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিজিপিএ-৪ এর মাধ্যমে ফল প্রকাশ করা হয়। এ কারণে এসএসসি ও এইচএসসির ফলের সঙ্গে উচ্চতর শিক্ষার ফলের সমন্বয় করতে গিয়ে দেশের চাকরি দাতারা সমস্যায় পড়েন। আর বিদেশে পড়ালেখা ও চাকরির ক্ষেত্রে পড়তে হয় আরও বড় সমস্যায়। কারণ প্রতিনিয়তই বাংলাদেশ থেকে  শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়তে যাচ্ছে। তাদের এসএসসি ও এইচএসসি ফলের  সমতা করে তারপর বিদেশে যেতে হয়। এতে অনেকের বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে  সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। 
বাংলাদেশে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে গ্রেড পদ্ধতি চালু হয়। সেখানে ৮০ থেকে ১০০ নম্বর  প্রাপ্তদের গ্রেড পয়েন্ট ৫, লেটার গ্রেড এ প্লাস। এটিই সর্বোচ্চ গ্রেড। এপর ৭০-৭৯ নম্বর প্রাপ্তদের গ্রেড পয়েন্ট ৪, লেটার গ্রেড এ । ৬০-৬৯ নম্বর প্রাপ্তদের গ্রেড পযেন্ট ৩.৫, লেটার গ্রেড এ মাইনাস। ৫০ থেকে ৫৯ প্রাপ্তদের গ্রেড পয়েন্ট ৩ এবং লেটার গ্রেড বি। ৪০ থেকে ৪৯ নম্বর প্রাপ্তদের গ্রেড পয়েন্ট ২, লেটার গ্রেড সি। ৩৩ থেকে ৩৯ নম্বর প্রাপ্তদের গ্রেড পয়েন্ট এক, লেটার গ্রেড ডি। আর শূন্য থেকে ৩২ পাওয়াদের গ্রেড পয়েন্ট জিরো। লেটার গ্রেড এফ।

জিপিএ-১ অর্জন করলেই তাকে উত্তীর্ণ ধরা হয়। কোন বিষয়ে এফ গ্রেড না পেলে চতুর্থ বিষয় বাদে সব বিষয়ের প্রাপ্ত গ্রেড পয়েন্টকে গড় করে একজন শিক্ষার্থীর লেটার গ্রেড নির্ণয় করা হয়। এখানে একটি টেকনিক্যাল বিষয় আছে। আর সেটি হচ্ছে- সেমিস্টার পদ্ধতি না হলে একটিমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমে রেজাল্ট দেয়া হলে কিউমুলেটিভ জিপিএ তে ফল প্রকাশ করা কতটা ঠিক হবে তা নিয়ে কথা উঠেছিল। 
বিশ্ববিদ্যালয়ে সবগুলো বছরের জিপিএ থেকে সিজিপিএ হিসেব করা হয়ে থাকে। পাবলিক পরীক্ষায় সেটি কীভাবে করা হবে প্রশ্ন ছিল। মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাসিক, বাৎসরিক পরীক্ষার ভিত্তিতে না করলে ‘কিউমুলেটিভ’ কীভাবে হবে- সেটি একটি কঠিন বিষয় ছিল। তাই সরাসরি জিপিএ-৫ এর পরিবর্তে জিপিএ-৪ করা হবে। 

বর্তমানে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গড়ে সব বিষয়ে ৮০ বা তার উপর নম্বর পেলে সিজিপিএ-৪ এবং লেটার গ্রেড এ প্লাস ধরা হয়। তারপর ৭৫ থেকে ৮০ এর মধ্যে নম্বর পেলে সিজিপিএ ৩.৭৫ ও লেটার গ্রেড ‘এ’, ৭০ থেকে ৭৫ এর মধ্যে পেলে গ্রেড পয়েন্ট ৩.৫০ ও লেটার গ্রেড এ মাইনাস ধরা হয়। ৬৫ থেকে ৭০ এর মধ্যে পেলে গ্রেড পয়েন্ট ৩.২৫ ধরা হয় এবং লেটার গ্রেড বি প্লাস। ৬০ থেকে ৬৫ এর মধ্যে পেলে গ্রেড পয়েন্ট ৩, লেটার গ্রেড বি। ৫৫ থেকে ৬০ এর মধ্যে পেলে গ্রেড পয়েন্ট ২.৭৫ ও লেটার গ্রেড বি মাইনাস। ৫০ থেকে ৫৫ এর মধ্যে পেলে গ্রেড পয়েন্ট ২.৫০, লেটার গ্রেড সি প্লাস, ৪৫ থেকে ৫০ এর মধ্যে পেলে ২.২৫, লেটার গ্রেড সি, ৪০ থেকে ৪৫ এর মধ্যে নম্বর পেলে পয়েন্ট ২, লেটার গ্রেড ডি, ৪০ এর কম নম্বর পেলে ফেল ও লেটার গ্রেড এফ ধরা হয়; এতে কোনো পয়েন্ট নেই।

শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে অতীতে অনেক কিছুই করা হয়েছে। পরীক্ষা বা শিক্ষার্থীর মূল্যায়ণ পদ্ধতিতেও অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। ডিভিশনের পরিবর্তে জিপিএ করা হয়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে জিপিএর পরিবর্তে সিজিপিএ করা হবে। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ বিষয়টিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এজন্য যে, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের মূল্যায়ণ পদ্ধতিতে কিছুটা হলেও সামঞ্জস্য  থাকবে। 

মুল্যায়ণের ক্ষেত্রে আর একটি পরিবর্তন নিয়ে আসা হচ্ছে। সেটি হচ্ছে প্রচলিত পাস নম্বর ৩৩ এর পরিবর্তে ৪০ করা। দেশে শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি শিক্ষার মান বাড়ানোর যে তাগিদ রয়েছে তা অবশ্যই যৌক্তিক। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নানারকমের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বায়নের এ যুগে শিক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সমতা নিশ্চিত করার বিষয়েও মনোযোগী হওয়ার আবশ্যকতা অস্বীকার করা যাবে না। সেই প্রেক্ষাপটেই পাবলিক পরীক্ষার পাস নম্বর নির্ধারণের তাগিদ অনুভূত হয়। 
পাবলিক পরীক্ষায় পূর্ণমান ১০০ এর বিপরীতে পাস নম্বর ৩৩; যা বহু বছর যাবত প্রচলিত আছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে অন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে এই মান গ্রহনযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। তাই এই সিদ্ধান্তটিও যৌক্তিক। তবে ৩৩ যাতে ৪০ না হয় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

৮ সেপ্টেম্বরের কর্মশালায় শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষার ফলের মানদণ্ড জিপিএ-৪ থাকায় আমরা চেষ্টা করছি পাবলিক পরীক্ষার গ্রেডিং সিস্টেমটা জিপিএ-৪ এ নিয়ে যাওয়ার। শুধুমাত্র গ্রেডিং সিস্টেম নয় আমাদের পুরো মার্কিং সিস্টেমকেও স্ট্যান্ডার্ড করার একটি প্রক্রিয়া আছে। সে প্রক্রিয়াকে যদি আমরা এ বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ত করতে পারি, তাহলে এ পরিবর্তন অর্থবহ হবে।’ আমরাও আশা করছি আমাদের মুল্যায়ণ পদ্ধতিটি প্রকৃত অর্থেই অর্থবহ হবে। 

লেখক: ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের ফল দেখুন - dainik shiksha প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের ফল দেখুন মাদরাসা শিক্ষকদের নতুন এমপিওভুক্তির কার্যক্রম স্থগিত - dainik shiksha মাদরাসা শিক্ষকদের নতুন এমপিওভুক্তির কার্যক্রম স্থগিত প্রাথমিকের বেতন বৈষম্য : প্রধানমন্ত্রীই একমাত্র ভরসা - dainik shiksha প্রাথমিকের বেতন বৈষম্য : প্রধানমন্ত্রীই একমাত্র ভরসা বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা ১৪ অক্টোবর - dainik shiksha বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা ১৪ অক্টোবর এইচএসসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ - dainik shiksha এইচএসসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website