জ্ঞান প্রাপ্তিকে কুক্ষিগত করে রাখার দিন শেষ - মতামত - Dainikshiksha

জ্ঞান প্রাপ্তিকে কুক্ষিগত করে রাখার দিন শেষ

আবু আহমেদ |

এখন শিক্ষার ধরন বদলে গেছে। আমাদের সময়ে পাঠ্যপুস্তক ছিল জ্ঞান আহরণের প্রাথমিক উৎস। আমরা পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও কিছু বই পড়তাম। সেগুলো হতো সাধারণ বিজ্ঞানের, স্বাস্থ্যবিষয়ক, গল্প-উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী ইত্যাদি। প্রতিটি স্কুল-কলেজে ভালো মানের লাইব্রেরি থাকত। লাইব্রেরিতে ছাত্রছাত্রীদের বসার জন্য ভালো ব্যবস্থা থাকত। ক্যাটালগ ঘেঁটে বইয়ের নাম, লেখকের নাম দিলে লাইব্রেরিয়ান আমাদের সামনে বই এনে দিতেন। ঘণ্টা বাজলে আবার ক্লাসের দিকে দৌড়াতে হতো। যাওয়ার আগে বইটা আবার লাইব্রেরিয়ানের হাতে তুলে দিয়ে যেতাম। অথবা পড়ার টেবিলে ফেলে গেলেও চলত। প্রতি বছর লাইব্রেরির জন্য নতুন বই কেনা হতো। বিজ্ঞান-অংক-সমাজবিষয়ক বই প্রাধান্য পেত। প্রতি স্তর পেরিয়ে ওপরের স্তরে গেলে আরও কঠিন বিষয়ের বই পড়তে হতো। ইংরেজি শিক্ষায় অনেক গুরুত্ব দেয়া হতো। ইংরেজিতে রচনা লিখতে দিয়ে শিক্ষক ক্লাসে বসেই কোথায় ভুল করেছি সেটা জানিয়ে দিতেন। ইংলিশ ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হতো : শব্দের চয়ন, শব্দের ব্যবহার এবং কালভেদে শব্দের কাঠামোগত পরিবর্তন। প্রত্যেক ছাত্রই তার পড়ার টেবিলে মোটাসোটা একটা ডিকশনারি বা শব্দকোষ রাখত। আমাদের সময়ে গ্রামার বা ব্যাকরণ ছিল আবশ্যিক বিষয়। গ্রামার জানা ছাড়া ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ বা এ ভাষায় শব্দের সঠিক প্রয়োগ আমাদের কাছে ছিল অকল্পনীয়। ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ জানা এবং শুদ্ধ করে লেখার জন্য ক্রিয়াবাচক শব্দের বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও অতীতকালের ব্যবহার যত্নসহকারে শেখানো হতো।

ইংলিশ মিডিয়াম তখনও ছিল। তবে মাত্র অল্প কয়েকটি স্কুলে। ইংরেজি মাধ্যমে যারা পড়ে আসত, তাদের ইংরেজি ভাষার ওপর দখলটা অনেক মজবুত হতো। তারা শব্দ সংখ্যার অর্থ যেমন বেশি জানত, তেমনি ভাব প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কোন শব্দ কোথায় ব্যবহার হবে সেটাও ভালো জানত। তবে গ্রামবাংলার অন্যসব হাইস্কুলে বাংলা মাধ্যমে পড়া ইংরেজির শিক্ষকরাই ক্লাসে ইংরেজি পড়াতেন। এতে আমরা যে খারাপ ইংরেজি জেনেছি তা নয়। তখনকার শিক্ষকরা নিজেদের পড়ানোর বিষয়গুলো জানতেন- যতটা আমরা হাইস্কুলে জেনেছি, পরে কলেজে এসে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করার পর ইংরেজির বিষয়ভিত্তিক প্রয়োগও জেনেছি। অর্থনীতিতে এক ধরনের ইংরেজি ব্যবহার হয়, আবার ইতিহাসে অন্য ধরনের। সত্য হল, ওপরের স্তরে প্রত্যেক বিষয়ের জন্য যেন আলাদা আলাদা ইংরেজি ল্যাঙ্গুয়েজ সৃষ্টি হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। শব্দকোষের সংকলনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। সব শব্দ একই ডিকশনারি বা শব্দকোষের বইতে পাওয়া যাবে না। সেজন্য এখন বিষয়ভিত্তিক শব্দকোষ ভাণ্ডারের বই বের হয়েছে। আর কম্পিউটার, ইন্টারনেট এসব তখন ছিল না। এগুলোর আবিষ্কার তখনও হয়নি।

আমরা কম্পিউটার নামের যন্ত্র প্রথম দেখেছি ১৯৭১ সালে। শিক্ষক নিয়ে গেলেন কম্পিউটার এবং এর ব্যবহার দেখাতে। গিয়ে দেখলাম পুরো রুম ভর্তি একটি কম্পিউটার। আরও কয়েক বছর ধরে শুনলাম হার্ডওয়্যার-সফটওয়্যারের কথা। তারপর শুনলাম ল্যাঙ্গুয়েজ। সফটওয়্যারের কয়েকটি ল্যাঙ্গুয়েজ আমাকেও পড়তে হয়েছে। তার মধ্যে একটি ছিল বেসিক। কম্পিউটার বিজ্ঞান যারা পড়ত, তাদের হাতে কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজের অনেক বই দেখতাম। বোধ করি ১৯৭০-এর দশক ছিল কম্পিউটারভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি উন্নতির প্রথম দশক। আর ১৯৮০-এর দশকে কম্পিউটার যন্ত্রটি অনেক ছোট হয়ে গেছে। ছোট তবে অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন। আমি মানবিক বিভাগের ছাত্র ছিলাম। প্রয়োজনে অঙ্ক শিখতে হয়েছিল। তার আগে পরিসংখ্যান ও কম্পিউটার সম্বন্ধে অতি সাধারণ জ্ঞান। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শিক্ষার্থী ব্যবহারকারীদের কাছে কম্পিউটার অনেকটা সহজ পণ্য হয়ে এসে গেছে। তখনও পিসি বা পারসোনাল কম্পিউটার এসে গেছে কিনা এখন আর স্মরণে নেই। তবে বোধ করি পিসি আর ল্যাপটপ একসঙ্গেই মানুষের কাছে এসে গিয়েছিল ’৯০-এর দশকের প্রথমদিকে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি একটা প্রোগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে চার সপ্তাহ ধরে ওই দেশ ভ্রমণ করে অনেক কিছু দেখা ও জানার সুযোগ হয়েছিল। সময়টা ছিল ১৯৯৩ সাল। ট্যুর অপারেটর নিয়ে গেল সিয়াটলের মাইক্রোসফ্টের হেড কোয়ার্টার্সে। তখন অপারেটিং সিস্টেম উইনডোজের কয়েক ভার্সন বের হয়ে গেছে। যারা এই সিস্টেম ডেভেলপ করছে, তাদের প্রশ্ন করে অনেক কিছু জানলাম। তবে আমার অভিজ্ঞতা হল, পুরো কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমার জ্ঞান অনেক কম ছিল। অন্য একই প্রোগ্রামে অন্য দেশের যারা এসেছিল, তারা আমার থেকে অনেক বেশি জানত। তাদের প্রশ্নের ধরন দেখেই আমি তাদের এ বিষয়ে জ্ঞানের স্তর বুঝতে পারছিলাম। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ইন্টারনেটের পুরো ব্যবহার শুরু হয়নি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তখন এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, বিশ্ব আগামীতে ইনফরমেশন সুপার হাইওয়েতে উঠতে যাচ্ছে। তখন তার কথার অর্থ বুঝিনি। আজকে যখন দেখি অতি সাধারণ শিক্ষিত লোকরাও ইন্টারনেট ব্যবহার করছে দেদারসে, তাদের নিজ নিজ প্রয়োজনে, তখন মনে হল বিল ক্লিনটন তো ঠিকই বলেছিলেন। এ এক অবিশ্বাস্য আবিষ্কার! মানুষ এত সহজে এত কিছু জানবে, মানুষ এত সহজে একে অপরের কাছে আসবে- এমনটি ’৯০-এর দশকের আগে কল্পনাতেও আসেনি। আজকে প্রশ্ন জাগে, এই অসম্ভব সম্ভব হল কী করে?

প্রথমে মনে হতো কম্পিউটার শুধু গণনা আর হিসাবের জন্যই ব্যবহার হবে। এ যন্ত্র ব্যবহার করে গবেষকরা অতি দ্রুত ও সঠিকভাবে তাদের সংগৃহীত উপাত্তগুলোকে পরিমাপ করে সাজাতে পারবে। কিন্তু না, কম্পিউটার টেকনোলজি ব্যবহার করে এখন মানুষ সবকিছুই সঠিকভাবে ও দ্রুতগতিতে সমাধান করে ফেলছে। উৎপাদন-বণ্টন-বিপণনের কাজেও এখন ইন্টারনেটের সাহায্য নেয়া হচ্ছে। আগেকার দিনের ডিকশনারি এখন শুধু আলমিরাতেই পড়ে থাকে। মানুষ ব্যবহার করছে ইন্টারনেটভিত্তিক ডিকশনারি। আগে তথ্য-উপাত্ত পুরনো হয়ে গেলে কয়েক বছর সংরক্ষণ করার পর তা ফেলে দিতে হতো। এখন কম্পিউটার মেমোরিতে অনেক দিন তথ্য রাখা যায়। অনেক বিতরণ-বিপণনের কাজ হচ্ছে ইন্টারনেট অ্যাপ্স ব্যবহার করে। এখন বাংলাদেশেও অনেক মানুষ অ্যাপসভিত্তিক কোম্পানির ট্রান্সপোর্ট বা যানবাহন ব্যবহার করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাচ্ছে। ট্যাক্সির জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। যেসব লোক স্কুল-কলেজে ভর্তি হয়ে কোনো শিক্ষাগত ডিগ্রি বা সনদ অর্জন করেনি, তারাও শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক কিছু জানে। এই জানাটা তাদের ক্ষেত্রেই অনেক বেশি হবে, যারা যত বেশি প্রয়োজনে তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারবে। তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবার প্রয়োজন সমান নয়।

ইন্টারনেট সবার চাহিদাই পূরণ করছে। এখন বহু বিখ্যাত বই সার্চ ইঞ্জিন গুগলে পাওয়া যায়। ডাক্তার সাহেব কী ওষুধ দিলেন তার আদ্যোপান্ত ইন্টারনেটে আছে। আমি নিজেই যখন ডাক্তার সাহেবকে বললাম, আমাকে এই ওষুধটা দেবেন না, তখন ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কিভাবে বুঝলেন এই ওষুধ আপনার জন্য উপযুক্ত নয়। বললাম, আমি ইন্টারনেটে দেখেছি এই ওষুধটা আমার জন্য ভালো হবে না। ডাক্তার বললেন, হয়তো আপনিই ঠিক। তবে এই ওষুধটাই আমরা অধিকাংশ রোগীকে দিচ্ছি। ডাক্তারও বুঝলেন কোন কোন ক্ষেত্রে রোগীর জ্ঞান এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে অনেক এগিয়ে আছে। আগে পণ্যের নমুনা নিয়ে বিদেশে ছুটতে হতো, অথবা ডাকের বস্তায় পাঠাতে হতো। আর আজ নমুনা পাঠাতে কাউকে কোথাও যেতে হয় না। এখন গ্রাহক-বিক্রেতা চাইলে নিজেদের মধ্যে কথাও বলে নিতে পারে। চিঠি আজও লেখা হয়। তবে ডাকের মাধ্যমে নয়, ই-মেইলে। তৎক্ষণাৎ চিঠি গিয়ে হাজির প্রাপকের কাছে। অবশ্য প্রাপককেই ই-মেইলটা খুলে দেখতে হবে। এখন ব্যাংকে না গিয়েও ব্যাংকিং সেবা নেয়া যায়। অর্থ উঠালে বা জমা হলে তাৎক্ষণিকভাবে মেসেজ চলে আসছে মোবাইলে।

স্মার্টফোন সেট এক জাদুকরী যন্ত্র। আমার ধারণা এটি হল কম্পিউটারের ছোট সংস্করণ- যা কিছুদিন আগেকার ল্যাপটপে-আইফোনে ছিল- সবই যেন আছে স্মার্টফোনে। অথচ আমি যখন ১৯৯৭ সালে গ্রামীণফোনের একটি সিম নিই তখন গ্রামীণের এজেন্ট বলেছিলেন, টেলিফোন সেটটি অন্য জায়গা থেকে কিনে নিতে হবে। আমি তাকেই বলেছিলাম একটা সেট দেয়ার জন্য। তিনি একদিন পর একটা সেট নিয়ে এলেন, যা এখনকার তুলনায় অনেক নিন্মমানের। কিন্তু তখনও মনে হতো মোবাইল ফোন নামের যন্ত্রটি এবং মোবাইল ফোনকে চালানোর কাজে ব্যবহৃত প্রযুক্তিটি অসাধারণ! আগে লোককে খুঁজতে তার ঘরের টেলিফোনে ফোন করতে হতো। সে ঘরে না থাকলে তাকে পাওয়া যেত না। মোবাইল প্রযুক্তি আসার কারণে সারাক্ষণ লোকটার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায়। তারপর শুরু হল টেক্সট ও ভয়েস মেসেজ বা এসএমএস প্রযুক্তি। এটিকেও অতি প্রয়োজনীয় একটা সেবা মনে হতো। আর গত দশ বছরে তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে সবকিছুতেই যেন একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। জ্ঞানের রাজ্যে কেউ কারও থেকে কম নয়। জ্ঞান প্রাপ্তিকে কিছু লোকের জন্য কুক্ষিগত করে রাখা এখন আর সম্ভব নয়। এখন সবাই যেন সবকিছু জানে। তবে ডিজিটাল ডিভাইড (উরমরঃধষ উরারফব) বলে একটা কথা আজও চালু আছে। সরকার যেহেতু নিয়ন্ত্রক এবং যেহেতু তার সবার স্বার্থ সমানভাবে দেখার কথা, সেহেতু এই বিভাজন যাতে দূর হয় সেটা অবশ্যই সরকার দেখবে আশা করি।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

 

সৌজন্যে: যুগান্তর

ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় ঠেকাতে ১০ কমিটি - dainik shiksha ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় ঠেকাতে ১০ কমিটি এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ১১২৪ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ১১২৪ শিক্ষক নভেম্বরের এমপিওতেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি - dainik shiksha নভেম্বরের এমপিওতেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি মিলাদুন্নবী উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওয়াজ মাহফিল আয়োজনের নির্দেশ - dainik shiksha মিলাদুন্নবী উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওয়াজ মাহফিল আয়োজনের নির্দেশ ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর - dainik shiksha ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ - dainik shiksha শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার ২০৭ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার ২০৭ শিক্ষক বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ - dainik shiksha বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ ২৮৮ তৃতীয় শিক্ষককে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত - dainik shiksha ২৮৮ তৃতীয় শিক্ষককে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website