ঢাবি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হোমিও কলেজের নামে প্রতারণার অভিযোগ - কলেজ - দৈনিকশিক্ষা

ঢাবি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হোমিও কলেজের নামে প্রতারণার অভিযোগ

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দিয়েছেন ডিপ্লোমা ও গ্র্যাজুয়েশন কোর্স সার্টিফিকেটের। আর ডাক্তারদের দেখিয়েছেন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের স্বপ্ন। আবার অনেককে দিয়েছেন কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য বানানোর আশ্বাস। এভাবে অসংখ্য ব্যক্তিকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা। এসব অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার আবদুর রাজ্জাক তালুকদারের বিরুদ্ধে।  

তবে আবদুর রাজ্জাক তালুকদারের দাবি, কুচক্রীমহল তার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়ে এসব মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছেও এসব অভিযোগ করা হয়েছিল। সেখানে কোনো অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি। এখন তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য-শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে অভিযোগ দিয়েছে। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন মসিউর রহমান খান।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তরা অবশ্য বলছেন, সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করতে ডা. রাজ্জাক শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ই ব্যবহার করেননি; শুরুতে তিনি ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির অধীনে হোমিওপ্যাথি ফ্যাকাল্টি খুলে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করিয়েছেন এবং হাজিরা খাতায় সই নিয়েছেন। ভর্তি ফি সংগ্রহ করেছেন। মাসিক বেতনও নিয়েছেন। পাশাপাশি কমপক্ষে ৩৫ জনের কাছ থেকে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নিয়েছেন শিক্ষক নিয়োগ দিতে। মন্ত্রী, এমপি ও শিক্ষাবিদদের পরিচয় ব্যবহার করে একাধিক সেমিনার করেছেন। এসব সেমিনারের জন্যও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দফায় দফায় চাঁদা নিয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হোমিওপ্যাথি পেশাজীবী পরিষদের ব্যানারে মন্ত্রী-এমপিদের নিয়ে আসলেই এসব সেমিনার করা হয়েছিল। এসব সেমিনারের আড়ালে তিনি 'হোপেস হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল' খোলার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। একপর্যায়ে সরকারি নিবন্ধন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে হোমিওপ্যাথি বোর্ডের কাছে আবেদন করেন। বোর্ডের সুপারিশসহ সে আবেদন পাঠানো হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপসচিব (চিকিৎসা শিক্ষা-২) বদরুন নাহার বলেন, হোপেস কলেজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের আবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা আছে। নিবন্ধন পাওয়ার আগেই তাদের বিষয়ে কিছু অনিয়মেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেসব খতিয়ে দেখতে তিনি সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন। নিবন্ধনের যোগ্যতা আছে কিনা এবং অনিয়ম হয়েছে কিনা- সেসব বিষয়ে তিনি একটি প্রতিবেদন তৈরি করছেন। শিগগিরই তা তিনি সচিবের কাছে জমা দেবেন। এর আগে এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি নন।

কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় জমি, ভবন, শিক্ষার্থী বা শিক্ষক- কোনো শর্তই এ ক্ষেত্রে পূরণ করা হয়নি। আগে কাঁটাবনে কলেজের ক্যাম্পাস থাকলেও এখন মৌচাকে একটি ভাড়া বাড়ির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু নিজস্ব জমি ছাড়া কলেজের নিবন্ধন পাওয়ার সুযোগ নেই। ডা. রাজ্জাকের স্ত্রী রোকেয়া খাতুনকে বর্তমানে হোপেস কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির অধীনে হোমিওপ্যাথি ফ্যাকাল্টির বিএইচএমএস কোর্সের এক নম্বর শিক্ষার্থী হিসেবে হাজিরা খাতায় তার নাম রয়েছে। অভিযোগ, ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী রোকেয়া খাতুনের অধ্যক্ষ হওয়ার যোগ্যতা নেই।

বর্তমানে নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য চেষ্টা চালানোর কথা জানান ডা. রাজ্জাক। শুরুতে যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি নিবন্ধন পাওয়া গেলে ডিপ্লোমা কোর্সের শিক্ষার্থীদের সেখানে সার্টিফিকেট পাওয়ার সুযোগ হবে। তা ছাড়া গ্র্যাজুয়েশন কোর্সের জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে অনুমোদন পাওয়া গেলেই বাকি শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট দেওয়ার সুযোগ মিলবে। তবে শিক্ষক নিয়োগের জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেন তিনি।

ক্ষতিগ্রস্তদের একজন শাকিলা খানম গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভের পাশাপাশি শিক্ষকতা করবেন- এমন প্রলোভনে তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছেন। কিন্তু দু'দফায় টাকা দেওয়ার পরেই তার মনে হয়েছে, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেখে তিনি সেখানে গিয়ে এই বিপদে পড়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার এনায়েতুর রহমান ভূঞা এক লিখিত আবেদনে দাবি করেন, তাদের কয়েকজনের কাছ থেকে ডা. রাজ্জাক হোমিওপ্যাথি বোর্ডে নিবন্ধনের জন্য ডোনেশন বাবদ ১০ লাখ টাকা এবং মন্ত্রণালয়ে ডোনেশন দেওয়ার কথা বলে আরও ১০ লাখ টাকা নেওয়া

হয়েছে। পরে তারা জানতে পারেন, বোর্ডে অনুমতির জন্য কোনো টাকা লাগেনি।

লিখিত অভিযোগে তিনি আরও জানান, শিক্ষক নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ জনের কাছ থেকে পাঁচ লাখ করে টাকা নিয়েছেন কলেজের নামে জমি কিনতে। কিন্তু জমির নিবন্ধন করা হয় ডা. রাজ্জাক, তার স্ত্রী রোকেয়া খাতুন ও ডা. আমানুল্লাহ জিকুর নামে। পরে বোর্ডের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলে তারা কলেজের নামে জমি নিবন্ধনে বাধ্য হন।

বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, হোপেসের নামে বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজনের ফি তাদের কাছ থেকে আদায় করা হতো। তারা ভর্তি রসিদ ও হাজিরা শিটের ফটোকপি দেখিয়ে বলছেন, ভর্তির টাকা নেওয়া হয়েছে হোপেসের নামে। আবার হাজিরা খাতায় সই নেওয়ার সময় ওই শিটের ওপরে লেখা ছিল- ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির হোমিওপ্যাথি ফ্যাকাল্টি।

এদিকে ডা. আবদুর রাজ্জাকের দাবি, শুরুতে ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল' নামে প্রতিষ্ঠান খোলার উদ্দেশ্যে বৈঠক হয়। কিন্তু পরে তারা জানতে পারেন, বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহারে ট্রাস্টের অনুমতি নিতে হবে। এর পর তারা ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির অধীনে হোমিওপ্যাথি বিভাগ খোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কোনো কলেজ অধিভুক্ত হওয়ার সুযোগ না থাকায় এখন তারা সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে কলেজ নিবন্ধনের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

এর সঙ্গে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে ভিসি অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী বলেন, 'হোপেস' অর্থ হোমিওপ্যাথি পেশাজীবী সমিতি। এই সংগঠনের ব্যানারে তিনি সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। অনেক মন্ত্রী-এমপিও অংশ নিয়েছেন। এতে তার কোনো দায় নেই। সর্বশেষ চট্টগ্রামের এমপি মরহুম মইনউদ্দীন খান বাদলের আমন্ত্রণে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। এরপর ওই সংগঠনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোর্স খুলতে ইউজিসির অনুমতি প্রয়োজন। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে সেখানে এমন কোনো আবেদনই করা হয়নি।

বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. দিলীপ রায় বলেন, হোপেস কলেজের জন্য ডা. আবদুর রাজ্জাক তালুকদারের আবেদন তারা সুপারিশসহকারে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কলেজ খুলতে যেসব শর্ত পূরণ করতে হবে, তা মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখবে। তারপর অনুমোদন দিতে পারে। এই প্রতিষ্ঠানের নামে জমি রয়েছে কেরানীগঞ্জে। কিন্তু ঢাকায় তাদের নিজস্ব কোনো ক্যাম্পাস নেই।

দিলীপ রায় বলেন, কলেজের জন্য আবেদনে শুধু ডিপ্লোমা কোর্সের সুযোগ রয়েছে। এখানে ডিগ্রির কোনো সুযোগ নেই। এই কলেজ অনুমোদন পেলে এর আয়-ব্যয় পুরোপুরি সরকারের কাছে চলে যাবে। ব্যক্তিগতভাবে কারও আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। কার কাছ থেকে তিনি কত টাকা নিয়েছেন, সেটা রাজ্জাক তালুকদারই ভালো বলতে পারবেন।

ডা. রাজ্জাক বলেন, হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাই তার উদ্দেশ্যে। তিনি নিজের আয়ের টাকা খরচ করেই কলেজের নামে অর্ধকোটি টাকার জমি কিনেছেন। কেরানীগঞ্জে কলেজের নামে ৩০ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। এ ছাড়া কাঁটাবন মোড়ে ভবন ভাড়া নেওয়া হয়েছিল ক্লাস শুরুর জন্য। এখন মৌচাকে ক্যাম্পাসের ভাড়ার টাকাও তিনি পকেট থেকে দিচ্ছেন। তবে তিনি কলেজে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকের সঠিক সংখ্যা বলতে পারেননি।

ডিপিএড শিক্ষকদের বেতন জটিলতার সমাধান শিগগিরই - dainik shiksha ডিপিএড শিক্ষকদের বেতন জটিলতার সমাধান শিগগিরই স্কুলছাত্রী নীলা হত্যার প্রধান আসামী মিজান গ্রেফতার - dainik shiksha স্কুলছাত্রী নীলা হত্যার প্রধান আসামী মিজান গ্রেফতার উচ্চতর গ্রেড পাওয়া এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কমবে না - dainik shiksha উচ্চতর গ্রেড পাওয়া এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কমবে না ১ অক্টোবর পর্যন্ত সংসদ টিভিতে মাধ্যমিকের ক্লাস রুটিন - dainik shiksha ১ অক্টোবর পর্যন্ত সংসদ টিভিতে মাধ্যমিকের ক্লাস রুটিন এমফিল-পিএইচডি জালিয়াতিতে এগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা - dainik shiksha এমফিল-পিএইচডি জালিয়াতিতে এগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ফাজিল ও কামিল মাদরাসার গভর্নিং বডির মেয়াদ বৃদ্ধি - dainik shiksha ফাজিল ও কামিল মাদরাসার গভর্নিং বডির মেয়াদ বৃদ্ধি অফিস সময়ে কর্মকর্তাদের বাইরে ঘোরাঘুরিতে বিরক্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় - dainik shiksha অফিস সময়ে কর্মকর্তাদের বাইরে ঘোরাঘুরিতে বিরক্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় please click here to view dainikshiksha website