দুই শিক্ষামন্ত্রীর জন্য পুষ্পার্ঘ্য - মতামত - Dainikshiksha

দুই শিক্ষামন্ত্রীর জন্য পুষ্পার্ঘ্য

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

বাষট্টি'র শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা নুরুল ইসলাম নাহিদ একটানা দশ বছর শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন শেষে মন্ত্রণালয় থেকে সদ্য বিদায় নিয়েছেন। মনে হয় একটানা দশ বছর দেশে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব এর আগে আর কেউ পালন করেননি। পাকিস্তান আমল থেকে দেশে শিক্ষা সংস্কারে যতগুলো আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছে তার প্রতিটিতে নাহিদ সাহেবের গৌরবময় অংশগ্রহণ দেশের মানুষকে বার বার উচ্ছ্বসিত করেছে। 

আজ থেকে দশ বছর আগে তিনি যেদিন প্রথম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সেদিন সর্বস্তরের শিক্ষক সমাজ কেবল আশান্বিত হননি, উজ্জীবিতও হয়েছিলেন। তার হাত ধরে শিক্ষায় শ্রেষ্ঠ একটি বিপ্লব সাধিত হবে সে বিশ্বাস সাধারণ মানুষের মনেও গ্রথিত হয়েছিল। তিনি কতটুকু সফল কিংবা ব্যর্থ হয়েছেন সেটি ভবিতব্য বলে দেবে। তবে একথাটি কেউ অস্বীকার করবে না যে, সরকারের গত দু'টি মেয়াদে তিনি বহুল আলোচিত একজন মন্ত্রী ছিলেন। দেশে বিদেশে যেমন নন্দিত হয়েছেন তেমন নিন্দিতও হয়েছেন। আমাদের শিক্ষায় তার হাত ধরে যে অর্জনগুলো এসেছে তা সরকারের সাফল্য হিসেবে গণ্য হলেও মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কৃতিত্বকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।

বছরের প্রথম দিনে কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থীর হাতে কয়েক কোটি নতুন বই তুলে দেয়া সহজ কোনো কাজ ছিলো না। প্রতি বছরের ১ জানুয়ারি সারা দেশ নতুন বইয়ের মৌ মৌ গন্ধে ভরে যায়। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক ও উপবৃত্তি দেবার কারণে ঝরে পড়ার হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এ ধারাটি যতদিন বহাল থাকবে ততদিন নুরুল ইসলাম নাহিদের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হবে। ভুলে গেলে সেটি অকৃতজ্ঞতার পরাকাষ্ঠা হবে। দেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলো সময়মত শুরু করে তা শেষ করা এবং যথাসময়ে ফল প্রকাশের যে উদাহরণ তিনি তৈরি করে দিয়ে গেছেন তা তাকে  শিক্ষার ইতিহাসে অমর করে রাখবে। এ কারণে সেশনজট নামের যন্ত্রণা থেকে কেবল আমাদের তরুণ প্রজন্মই রেহাই পায়নি জাতি হিসেবেও আমরা কলংক মুক্ত হতে পেরেছি। 

জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন করে জাতিকে শিক্ষার যে নির্দেশনা দিয়ে গেছেন তা নিঃসন্দেহে অসাধারণ। দুঃখ হয় এজন্য যে, নাহিদ সাহেব জাতীয় শিক্ষানীতিটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। অর্ধেকটা করে যেতে পারলেও জাতি অনেক উপকৃত হতো। তবু শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নুরুল ইসলাম নাহিদ বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। আন্তর্জাতিক মানের অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ইউনেস্কোর সহ সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে বার বার নন্দিত হয়েছেন তিনি।                        

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে শিক্ষক সমাজের বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের যে প্রত্যাশা ছিলো সেটি  কতটুকু পুরণ করতে পেরেছেন তা আজ বিরাট এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকদের মন্ত্রী হয়েও তিনি শিক্ষকদের নানা সময়ে নাক ছিঁটকাতেন বলে তার দুর্নাম রয়েছে। শিক্ষকদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলতেন। সামান্য কিছু হলেই শিক্ষকদের দোষারোপ করতেন। তাদের দাবি দাওয়ার বিষয়ে তেমন আন্তরিক ছিলেন না। বেসরকারি শিক্ষকদের পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ও বোশেখি ভাতা পাবার বিষয়ে তার কোনো ভুমিকা লক্ষ্য করা যায়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেদিন গণভবনে শিক্ষকদের হাতে ইনক্রিমেন্ট ও বোশেখি ভাতা তুলে দেন, সেদিনও তিনি সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন। নন এমপিও শিক্ষকরা কেঁদে কেটেও তার কাছ থেকে দু' আনা দু'পয়সা আদায় করতে পারেননি। দু' মেয়াদের পুরো দশ বছরে তিনি হাতে গোনা কয়েকশ' মাত্র নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দিতে পেরেছিলেন।

প্রশ্নফাঁস রোধে তার গৃহীত পদক্ষেপগুলো তেমন সুফল এনে দিতে পারেনি। বরং বলা যায়, বিগত বছরগুলোতে কখনো কখনো প্রশ্নফাঁসের মহোৎসব চলেছে। প্রাথমিক সমাপনী থেকে বিসিএস পর্যন্ত কোনো পরীক্ষাই প্রশ্নফাঁসের অপবাদ থেকে রেহাই পায়নি। 

বেসরকারি শিক্ষকদের প্রাণের দাবি সরকারিকরণের আন্দোলনটি চাইলে তিনি সফল রুপায়ন করে দিয়ে যেতে পারতেন। জাতির ও শিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে সব স্কুল-কলেজ সরকারিকরণের একটা মোক্ষম সময় এখন যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলে তা বাস্তবায়ন করে নিজের নামটি ইতিহাসের পাতায় সোনার হরফে লিখিয়ে নিতে পারতেন। সে সুযোগটি তিনি কাজে লাগাননি। তার সময়ে দেশে পাসের হার বেড়েছে বটে কিন্তু শিক্ষার মান একটুও বাড়েনি। সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করে কেবল পাসের হার শতভাগের কাছাকাছি টেনে নেয়া হয়েছে। জাতি সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির আর তেমন কোনো সুফল পায়নি।

অবশ্য এ কারণে নকলের দুর্নাম থেকে আমরা বেঁচে যেতে পেরেছি। তবু তার বিদায়ক্ষণে শিক্ষকরা তাদের বেদনার বিষয়গুলো মন থেকে মুছে নিয়েছেন। বিদায়ের এ শুভক্ষণে দেশের শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে তাকে পুষ্পার্ঘ্য দিয়েই গুডবাই জানাতে চাই। সদ্য সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের জন্য সর্বস্তরের শিক্ষদের অফুরান শুভ কামনাই থাকবে। মন্ত্রী হয়েও তিনি যা করতে পারেননি মন্ত্রী না থেকেও তিনি চাইলে তা করতে সহায়তা করতে পারবেন সে বিশ্বাস আর কেউ না করলেও শিক্ষকরা করে থাকেন। কেননা সরকারি দল আওয়ামী লীগে নুরুল ইসলাম নাহিদ একদম গুরুত্বহীন কোন মানুষ নন। দল থেকে তার গুরুত্ব কোনদিন কমে যাবেনা।  ডা: দীপুমনি নতুন সরকারের নতুন শিক্ষামন্ত্রী। তিনিই দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী শিক্ষামন্ত্রী। তার আরেকটা রেকর্ড আছে। সেটি এই-তিনি দেশের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বটে। পরম সৌভাগ্যবান এক নারী রাজনীতিবিদ। নারী রাজনীতির ইতিহাসে দীপু মনির নাম চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

আমার জানা মতে, তিনিই উপমহাদেশের একমাত্র নারী রাজনীতিক যিনি একই দেশে পররাষ্ট্র ও শিক্ষার মতো দু'টো গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয়ে পর পর মন্ত্রীর আসন অলংকৃত করেছেন। শুধু উপমহাদেশ বলি কেন, বিশ্বের আর কোনো দেশে একজন নারী রাজনীতিকের এমন কৃতিত্বের রেকর্ড আছে বলে জানা নেই। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবার চতুর্থবারের মত টানা তৃতীয়বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। ভারত উপমহাদেশে আর কোন রাজনৈতিক দলের এমন অর্জন আছে বলে জানা নেই। এমন ঐতিহ্যবাহী একটি দলের সরকারে দু' দু'বারে দু'টি গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা ক'জনের থাকে ? 

ডা: দীপুমনি সে যোগ্যতার অধিকারী বলেই তিনি আজ বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার সরকারে শিক্ষামন্ত্রীর আসন অলংকৃত করতে পেরেছেন। নুরুল ইসলাম নাহিদকে দিয়ে শেখ হাসিনা শিক্ষায় যে বিপ্লবের সুচনা করেছিলেন, দীপুমনিকে দিয়ে তার সফল পরিসমাপ্তি টানার জন্য এক শিক্ষক পরিবারের সন্তানকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরু দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। তার মা শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষক মায়ের সন্তান দীপু মনি শিক্ষামন্ত্রী হবার কারণে এবার আসল জায়গায় মন্ত্রণালয়টি এসে পড়েছে বলে শিক্ষক সমাজ মনে করছেন। দেশের শিক্ষক সমাজ এ কারণে গর্বিত আজ। একজন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে শিক্ষকরা যথোপযুক্ত সম্মান ও মুল্যায়ন পাবার আশা করছেন। একজন ডাক্তার হিসেবে এবং একজন আইনজীবী হিসেবে তার কাছ থেকে ন্যায়ত ও মানবিক সব ধরণের সমর্থন পাবেন বলে সকলের বিশ্বাস। একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাকে সারা দুনিয়া চষে বেড়াতে দেখেছি। সদা হাস্যোজ্জল একেবারে সাদাসিদে একজন মানুষ তিনি। তার নির্বাচনী এলাকা চাঁদপুরের মানুষ তাকে বার বার ভালবেসে নির্বাচিত করেছে। তার পারফরম্যান্সের কারণে সারা দেশে তার আলাদা এক ইমেজ আছে। শিক্ষামন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় তার সে ইমেজ আরো বেড়েছে। এর আগে তাকে আমরা শিক্ষাগত যোগ্যতায় কেবল একজন ডাক্তার হিসেবে জেনেছি। এবার শিক্ষামন্ত্রী হওয়ায় দেশের মানুষ তার আরো নানা দিক জেনেছে। তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একজন আইনজীবী সে কথাটি  অনেকেই জানতেন না। খুব সম্ভব নবগঠিত মন্ত্রিপরিষদে তিনিই সর্বোচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি। 

হাই প্রোফাইলের মানুষ নতুন শিক্ষামন্ত্রীর কারণে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলের আকাঙ্খা অনেক বেড়ে গিয়েছে। তার মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ যেন আগামী দু' বছরের মধ্যে শত ভাগ বাস্তবায়িত হয়। পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতির প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন সবাই চায়। অন্ততঃ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যেন কোনো ঘুষ-দুর্নীতি না থাকে। আর যাই হউক দেশের মানুষ বিচার বিভাগ ও শিক্ষায় কোনো দুর্নীতি দেখতে চায় না। এ দু' জায়গায় তারা কোনো অন্যায় অনিয়ম সহ্য করতে পারে না। আমাদের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে সারা দুনিয়া জুড়ে নানা কথা। শিক্ষার গুণগত মানের চ্যালেঞ্জটি সর্বাগ্রে গ্রহণ করতে হবে। নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিও দিতে আর বিলম্ব করা সমীচিন হবে না। সকল স্কুল-কলেজ এক সাথে সরকারিকরণ করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। আগামী দু'বছরের মধ্যে এ কাজটি করতে না পারলে জাতি হিসেবে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা অনেক পিছিয়ে থাকবো। এখন আমাদের পিছিয়ে থাকার কথা নয়। এগিয়ে যাবার পালা। 

মন্ত্রিপরিষদে নব নিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রীর জন্যে এক গুচ্ছ রজনীগন্ধার পুষ্পমালা দিয়ে ওয়েলকাম জানাই। স্বাগতম মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, দীপুমনি। জয়তু বাংলাদেশ।  
                                        
লেখক: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট ও দৈনিক শিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক।

শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলী সম্পর্কেও শিক্ষা দিতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলী সম্পর্কেও শিক্ষা দিতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী বেশি চাপ নয়, শিক্ষার্থীদের নিজের পথ বেছে নিতে দিন: শিক্ষা উপমন্ত্রী - dainik shiksha বেশি চাপ নয়, শিক্ষার্থীদের নিজের পথ বেছে নিতে দিন: শিক্ষা উপমন্ত্রী নীতিমালা মেনে ভর্তি ফি আদায়ের নির্দেশ - dainik shiksha নীতিমালা মেনে ভর্তি ফি আদায়ের নির্দেশ এমপিও কমিটির সভা ২০ জানুয়ারি - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ২০ জানুয়ারি ২৬ জানুয়ারি স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচন - dainik shiksha ২৬ জানুয়ারি স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচন ৩৫ উত্তীর্ণ ইনডেক্সধারী কর্মচারীরা শিক্ষক পদে নিয়োগ পাবেন না - dainik shiksha ৩৫ উত্তীর্ণ ইনডেক্সধারী কর্মচারীরা শিক্ষক পদে নিয়োগ পাবেন না উপবৃত্তি : ডাচ-বাংলার অদক্ষতায় গাইবান্ধায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি - dainik shiksha উপবৃত্তি : ডাচ-বাংলার অদক্ষতায় গাইবান্ধায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ শুরু - dainik shiksha প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ শুরু ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া শিক্ষার খবর সবার আগে পেতে ‘দৈনিক শিক্ষা ব্রেকিং নিউজ’ ফেসবুক পেজে লাইক দিন - dainik shiksha শিক্ষার খবর সবার আগে পেতে ‘দৈনিক শিক্ষা ব্রেকিং নিউজ’ ফেসবুক পেজে লাইক দিন please click here to view dainikshiksha website