দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কোন পথে - মতামত - Dainikshiksha

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কোন পথে

এমাজউদ্দীন আহমদ |

খ্যাতিমান দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের (Bertrand Russell) মতে, এ যুগে যেকোনো জনপদে শিক্ষার লক্ষ্য বা দর্শন সম্পর্কে তিনটি ভিন্ন মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। প্রথম মতবাদে বলা হয়, শিক্ষার লক্ষ্য হলো ব্যক্তির শ্রীবৃদ্ধির জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা এবং এ জন্য ব্যক্তির পথের সব বাধা-প্রতিবন্ধকতার অপসারণ করা। দ্বিতীয় মতবাদে বলা হয়, শিক্ষার লক্ষ্য হলো ব্যক্তিকে সংস্কৃতিবান ও রুচিশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তৃতীয় মতবাদে বলা হয়, শিক্ষাকে ব্যক্তিগত সৌকর্য বৃদ্ধি নয়, বরং সার্বিকভাবে সমগ্র সমাজে, শ্রীবৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত, যে শিক্ষার মাধ্যমে জনসমষ্টি যোগ্য ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে (Russell 1967)। এই মতবাদের মধ্যে প্রথমটি হলো সর্বাধুনিক এবং তৃতীয়টি পুরনো। তাঁর মতে, কোনো জনপদে শিক্ষাব্যবস্থা সুবিন্যস্ত করার জন্য এই তিনটির কোনো একটি স্বতন্ত্রভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বরং তিনটি থেকে বাছাই করা মূল্যবান উপাদানগুলোর সুচিন্তিত সুসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থাই হলো শিক্ষা বা সুশিক্ষার লক্ষ্য।

ব্যক্তির শ্রীবৃদ্ধি না ঘটলে সামাজিক অগ্রগতির পথ সুগম হবে কিভাবে? জ্ঞানের মর্যাদা ও পরিশ্রমের মূল্য দিতে না শিখলে অর্জন আসবে কিভাবে? অশ্বকে যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত করতে হলে যেমন প্রয়োজন হয় চাবুক, শিশু-কিশোরদের শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের জন্য তেমনি প্রয়োজন আকর্ষণীয় সুশিক্ষার আবেদন। সুখ ও আনন্দের মধ্য দিয়ে তারা যেন শিক্ষা গ্রহণ করতে আকৃষ্ট হয়। মানবজীবনকে সহজ-সরল, সুন্দর, স্বাভাবিক ও আনন্দময় করে তুলতে হলে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে বুদ্ধি, আবেগ ও ইচ্ছার সুষমতা এবং বাহ্যিক ক্ষেত্রে অন্যদের আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছার সুষমতা। শিক্ষা বা সুশিক্ষার লক্ষ্য হলো এটিই। রাসেলের এই বক্তব্যের সঙ্গে আমার শুধু ছোট্ট একটা সংযোজন রয়েছে। বুদ্ধি, আবেগ ও ইচ্ছার সঙ্গে মানবতাবোধের সংযোজন ঘটিয়ে এবং তার সঙ্গে সততা ও উদারতার আলোয় আমাদের তরুণ-তরুণীর মনকে আলোকিত করার আদর্শিক অঙ্গীকারের আবেশ মাখিয়ে দিলে যেকোনো জনপদে শিক্ষা যে শুধু অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে তা-ই নয়, ব্যক্তিকে ব্যক্তিত্বের ঊর্ধ্বে তুলে সমাজ ও জাতিসত্তা, এমনকি তারও ঊর্ধ্বে সামগ্রিকভাবে বিশ্বমানবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। এভাবেই সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি মানুষ চূড়ান্ত পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়।

শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে এমন চিন্তাভাবনা তো স্বপ্ন। এর বাস্তবায়ন আপনা-আপনি ঘটবে না। মানবসভ্যতার প্রভাতকাল থেকেই এ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা হচ্ছে। এই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সর্বজনগ্রাহ্য শিক্ষাব্যবস্থা এখনো রয়েছে স্বপ্নে।

শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের সংবিধানে যা লিপিবদ্ধ রয়েছে, তা-ও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে লিখিত রয়েছে : ‘রাষ্ট্র (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ এদিকে তাকিয়েও আমরা পরিপূর্ণ শিক্ষার কথা ভাবতে পারি। তার আগে কিন্তু পরিপূর্ণ জীবনের দিকেও তাকাতে পারি। বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা ভালো অবস্থায় নেই। এটি না সনাতন, না আধুনিক। বাংলাদেশের শিক্ষায় না আছে ব্যক্তিত্ব গঠনের সূত্র, নেই জাতি গঠনের চিত্তশক্তিও। বিভিন্ন কালের সংগৃহীত উপাদানগুলোর আলগা সংযোজনে গড়ে ওঠা এক অদ্ভুত ব্যবস্থা এটি। হিন্দু ভারতের টোল-চতুষ্পাঠির সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে মুসলিম ভারতের মক্তব-মাদরাসা। এর সঙ্গে আলগাভাবে জড়িত হয়েছে ব্রিটিশ ভারতের সাধারণ শিক্ষা। এই শিক্ষা সবাইকে এক সূত্রে গ্রথিত করে না। সবার জন্য মিলনের ক্ষেত্রও রচে না। বরং সবাই যেন ভিন্ন অবস্থানে অনড় থাকে তার ব্যবস্থা পাকা করেছে। ব্রিটিশ ভারতের সাধারণ শিক্ষার প্রবর্তক লর্ড মেকলে প্রচলিত ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের অন্যান্য ধারা বর্জন করে এই ব্যবস্থার সূত্রপাত করেন ১৮৩৫ সালে। মেকলের (Macauley) নিজের কথায়, ‘এই মুহূর্তে এমন এক শ্রেণি সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে, যে শ্রেণি আমাদের এবং লাখ লাখ শাসিতের মধ্যে ব্যাখ্যাকারীর ভূমিকা পালন করবে। এই শ্রেণি এমন এক শ্রেণি হবে, যারা রক্তে ও বর্ণে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, অভিমত, নীতিবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে ইংরেজ।’ তখন থেকেই এ দেশে আসে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি শব্দ। ইংরেজির মাধ্যমে লেখাপড়া শিখে সরকারি চাকরি লাভ, ব্যবসা-বাণিজ্যে অগ্রগতি অর্জন প্রভৃতি ক্ষেত্রে আকৃষ্ট হয় ছাত্র-ছাত্রীরা। পরবর্তীকালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি এবং আধুনিকতার আলোয় স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারার চর্চা শুরু হয় বটে, কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ততার অভাবে সাধারণ স্থবিরতা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

বর্তমান শতকে কিন্তু প্রতিযোগিতা হবে মেধার, পেশির নয়। প্রতিযোগিতা হবে মননের, সৃজনশীলতার, বাচালতার নয়। এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে হলে প্রয়োজন হবে সৃষ্টিশীল মস্তিষ্কের, বিরাট বপুর নয়। প্রয়োজন হবে উদার অন্তঃকরণের, বুকভরা হিংসা-প্রতিহিংসার নয়। আমার মনে হয়, দেশে যে শিক্ষা চালু রয়েছে, বর্তমানের জন্য আংশিকভাবে তা ফলপ্রসূ হলেও ভবিষ্যতের জন্য, বিশেষ করে এই শতকের মহাসমারোহে মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকার জন্য তা উপযোগী নয়। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে নির্দিষ্ট পাঠক্রম সাধারণ চিন্তাভাবনার দুর্গে প্রবেশ করার উপযোগী হলেও যে দুর্গ আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তার দুর্ভেদ্য কেন্দ্ররূপে চিহ্নিত, সেখানে প্রবেশাধিকার দান করবে না।

শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার অপরিহার্য হলেও এ সম্পর্কে সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রণয়ন কিন্তু এখন পর্যন্ত যথেষ্ট নয়। এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমনই যে ক্ষমতাসীন দল শুধু দলীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমেই শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে নীতি প্রণয়ন করে থাকে। এমনকি শিক্ষক বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দলীয় ব্যক্তিদের পছন্দ করে থাকে। অন্যান্য দেশে এই দায়িত্ব দেওয়া হয় বিশেষজ্ঞদের ওপর এবং শিক্ষক হিসেবে বাছাই করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র-ছাত্রীদের। এ ছাড়া বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে যে দৈন্য দেখা যায় তার প্রধান কারণ হলো, বিগত ৪৭ বছরে কোনো সরকার শিক্ষা কার্যক্রমকে কোনো সময়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকাররূপে (top priority) গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ সব সময় হয়েছে অতি অল্প। কয়েক বছর থেকে তা একটু বেড়েছে বটে, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য যা প্রয়োজন তার ধারে-কাছে কোনো দিন এই বিনিয়োগ আসেনি। যে উচ্চশিক্ষা সমগ্র শিক্ষাক্ষেত্রটিকে প্রণোদিত করে থাকে, সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগ একেবারে অপ্রতুল। এ ছাড়া যখনই দেশে কোনো আন্দোলনের সূচনা হয়, তখন সেই আন্দোলনের প্রথম শিকার হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন এ ক্ষেত্রে সংযম প্রদর্শন করেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের মতো চলতে দেয়নি।

শিক্ষার প্রকৃতি কিন্তু সম্মুখাভিমুখী। গতানুগতিকতা এ ক্ষেত্রে পরিহার করতে হবে। ব্রিটেনের খ্যাতিমান কবি W B Yeats বলেছেন, Education is not like filling of a pail but lighting a fire. (শিক্ষা শূন্য বালতি ভর্তি করার মতো কোনো প্রক্রিয়া নয়, বরং শিক্ষার্থীর মনে অনুসন্ধিৎসার আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো প্রক্রিয়া।) তাই শিক্ষক হবেন যেমন তীক্ষ ধীর, তেমনি হবেন স্বাধীনচেতা।

একটা সময় পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানের প্রকাশ, সংরক্ষণ ও জ্ঞান সৃষ্টির স্থান হিসেবেই সুনির্দিষ্ট ছিল। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বিভিন্ন কলাকৌশল সম্পর্কেই চিন্তাভাবনা করেছে, গবেষণা করেছে। এটি জরুরি বটে এবং শিক্ষাকে নিশ্চয়ই সৃজনমূলক, ফলপ্রসূ, সমাধানমুখী হতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশের মতো দ্রুতগতিতে অগ্রসরমাণ জনপদে বুদ্ধিবৃত্তিক তীক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধে যেন শিক্ষার্থীরা সমৃদ্ধ হয় তা-ও অপরিহার্য। দক্ষতা, বিশেষজ্ঞতা যেমন মূল্যবান, তেমনি মূল্যবান সততা, দায়িত্বশীলতা। উন্নত জীবনের জন্য যেমন জ্ঞান কাম্য, তেমনি কাঙ্ক্ষিত পরিশীলিত মন ও নৈতিকতার আবহ। নীতি-নৈতিকতা, সততা ও দায়িত্বশীলতা ছাড়া জ্ঞানের সৃষ্টি সমাজকে করে তোলে দাম্ভিক, নির্মম, সংকীর্ণ, অহিতাচারী। আমাদের সন্তানদের মধ্যে আমরা দেখতে চাই একদিকে যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব, অন্যদিকে তেমনি নৈতিক ক্ষেত্রেও উন্নত মস্তক। বিশ্বায়নের এই কালে শিক্ষাক্ষেত্রে এই দুই স্রোতের মিলন ঘটাতে ব্যর্থ হলে সমাজ হবে বিভক্ত। সমাজ হবে অসুস্থ। আমাদের গড়ে তুলতে হবে এমন এক প্রজন্ম, যারা হবে দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী, অগ্রবর্তী ভাবনায় উদ্দীপ্ত, গতিশীল। সঙ্গে সঙ্গে তারা হবে সৎ, ন্যায়পরায়ণ, নীতিবোধে সমৃদ্ধ ও সবার ওপরে দেশপ্রেমিক।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জারির অপেক্ষায় অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ যোগ্যতার সংশোধনী - dainik shiksha জারির অপেক্ষায় অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ যোগ্যতার সংশোধনী প্রাথমিকে সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড প্রার্থীদের ২০ শতাংশ কোটা - dainik shiksha প্রাথমিকে সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড প্রার্থীদের ২০ শতাংশ কোটা ১৮২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু - dainik shiksha ১৮২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার অপেক্ষায় চাকরিতে প্রবেশের বয়স: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার অপেক্ষায় চাকরিতে প্রবেশের বয়স: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আরও ৯২ প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় - dainik shiksha আরও ৯২ প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকতা ছেড়ে উপজেলা নির্বাচনে শিক্ষক - dainik shiksha শিক্ষকতা ছেড়ে উপজেলা নির্বাচনে শিক্ষক প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সুপারিশপ্রাপ্তদের করণীয় - dainik shiksha প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সুপারিশপ্রাপ্তদের করণীয় প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ - dainik shiksha প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website