ননএমপিও শিক্ষকদের আন্দোলন - মতামত - Dainikshiksha

ননএমপিও শিক্ষকদের আন্দোলন

ড. নিয়াজ আহম্মেদ |

গত বছরের ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত টানা আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা আন্দোলন থেকে সরে আসেন। তারা আশা করেছিলেন, বর্তমান অর্থবছরে এমপিওভুক্তির সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসবে। কিন্তু বাজেটে কোনো নিদের্শনা না আসায় তারা এখন আন্দোলনের মাঠে। সরকার বলছে, ঘোষণা বড় বিষয় নয়; এমপিওভুক্তি হবে। ইতিমধ্যে সরকার এমপিওভুক্ত করার জন্য 'বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮' জারি করেছে, যেখানে সুনির্দিষ্ট কতগুলো শর্ত ও যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ আছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, এমপিওভুক্তির কাজ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, এ কাজ দ্রুত হবে। তারপরও আন্দোলন কেন! এতদিন শিক্ষকরা ভেবেছিলেন, কোনো রকম নীতিমালা ছাড়াই ঢালাওভাবে এমপিওভুক্তি হবে। আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নীতিমালায় যেসব শর্ত ও যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, তা মানানসই এবং এর মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো একটি মানে চলে আসবে। এমপিওভুক্তিকরণের এ সংক্রান্ত বিভিন্ন উপকমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। কিন্তু তাতে শিক্ষকরা সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। কেননা, বিদ্যমান নীতিমালায় বর্তমানে নন-এমপিওভুক্ত পাঁচ হাজার ২৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি হয়তো সম্ভব হবে না। সব প্রতিষ্ঠান নীতিমালার শর্ত ও যোগ্যতা পূরণ করতে পারবে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে কাজ করার পরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি বেতনের অংশ থেকে বঞ্চিত রয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই এখন বেশি।

এ কথা সত্য যে, অতীতে ঢালাওভাবে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কোনো কোনো বিভাগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অন্য বিভাগের তুলনায় অনেক বেশি। অনেক জায়গায় কাছাকাছি প্রতিষ্ঠান আবার কোনো জায়গায় একেবারেই নেই। ফলে কোথাও শিক্ষার্থী সংকট আবার কোথাও শিক্ষার্থী সামাল দেওয়া কঠিন। বর্তমান সরকার দ্বিতীয়বার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০১০ সালে ১০ হাজারেরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করে। এমন ঢালাও এমপিওভুক্তিকরণের কোনো সুফল পাওয়া যায় না। অতীতে এমপিওভুক্তিকরণের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় এর অপব্যবহার হয়েছে। প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় শূন্য পাসের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম নয়। এ ছাড়াও রয়েছে নামমাত্র পাসের সংখ্যার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে এমপিও ও নন-এমপিও উভয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠান এমপিও ও নন-এমপিও, যে ধরনেরই হোক না কেন, আমাদের কথা হলো, একজন শিক্ষার্থীও পাস করবে না- তা কেমন করে হয়! এমন হলে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকার কেন লাখ লাখ টাকা ব্যয় করবে এবং এমন ব্যয়ের যৌক্তিকতা কতটুকু- এ প্রশ্ন শিক্ষকদের কাছে রাখতে চাই।

বর্তমানে যে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, তার আলোকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হলে শিক্ষকদের মধ্যে জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা উভয়ই তৈরি হবে। কেননা, এমপিও পেতে হলে শিক্ষার্থীদের পাস করাতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী থাকার দরকার হবে। এ কথা সত্য যে, শিক্ষকরা সরকার কর্তৃক প্রণীত শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা অনুসরণ করেই শিক্ষক হয়েছেন। প্রচলিত এমপিওভুক্তি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেতে হলে নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু নন-এমপিওভুক্তিদের নিবন্ধন সনদ না থাকাই স্বাভাবিক। কারও কারও নিবন্ধন সনদ থাকতে পারে; তবে সরকার যদি এখন নিবন্ধনের শর্ত জুড়ে দেয়, তাহলে শিক্ষকরা আরও বেকায়দায় পড়বেন। সরকার হয়তো সেদিকে যাবে না; কিন্তু যে নীতিমালার আলোকে এমপিওভুক্তির কথা বলা হয়েছে, তা মেনে নেওয়া উচিত। সরকারের পক্ষ থেকে হয়তো একটু সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। এমন একটি নীতিমালা প্রণয়নের জন্য দীর্ঘ সময় নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হয়নি। আগামীতে যেসব নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করবে, তাদের জন্য সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যে শিক্ষকরা দীর্ঘদিন একটি প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে কাজ করে আসছেন, তাদেরকে হঠাৎ এমন নীতিমালার আওতায় আনা এবং তাদের মেনে নেওয়া একটু কঠিন, যখন শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন এবং তাদেরকে এমপিওভুক্তির আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষকতা একটি মহান ব্রত- এমনটি আমরা বহুকাল থেকে শুনে আসছি। কিন্তু এমন ধারণার মধ্যে যেন চিড় ধরেছে। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে যেমন ব্রতকে ব্রত মনে না করার চেষ্টা চলে আসছে; তেমনি সরকারের পক্ষ থেকে পদে পদে শিক্ষকদের বিষয়ে সিদ্ধান্তের দীর্ঘসূত্রতা, অবহেলা ও গুরুত্বহীনতার পরিচয় পাওয়া যায়। তাদেরকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো নিদের্শনা পাওয়া যায় না। সরকার ইচ্ছা করলে তাদের এমপিও দিয়ে আবার তা বাতিলও করতে পারে। অতীতেও কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান পাস না করার জন্য এমপিও স্থগিত কিংবা বাতিল করা হয়েছে। বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণে শিক্ষক ও সরকারের দায়িত্বশীল আচরণ আমরা জোরালোভাবে আশা করি। প্রথমত, সরকারকে এমপিওভুক্তিকরণ প্রক্রিয়া অপেক্ষাকৃত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। আমার কাছে মনে হয়, সরকার তা করছে। দ্বিতীয়ত, যেসব শর্ত ও যোগ্যতার কথা এখানে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে প্রথমবারের মতো শর্ত কিছুটা শিথিল করে হলেও অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওর অধীনে আনা উচিত। শিক্ষকদের শর্তের আওতায় যে কোনোভাবেই আনতে হবে। অতীতের উদাহরণ দিয়ে এখন আর লাভ নেই। আবার এমনও হতে পারে, প্রতিষ্ঠান যে যখন শর্ত পূরণ করবে, সে তখন এমপিওভুক্তি পাবে। কারও হয়তো ছয় মাস লাগতে পারে, আবার কারও এক বছর কিংবা আরও বেশি। শুধু তাই নয়, বর্তমানে যেহেতু নিবন্ধন সনদ এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের অন্যতম শর্ত, এদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তাতে সব শিক্ষকের যোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার এমপিও বাতিল বলে গণ্য হবে। এমন শর্ত কঠিন হতে পারে; তবে শিক্ষকদের জবাবদিহির মধ্যে আনতে হলে শর্ত প্রযোজ্য। আমাদের শিক্ষকরা অতীতে অনেক আন্দোলন করেছেন। আর তাদেরকে আন্দোলনে থাকতে দেওয়া ঠিক নয়। আমরা জানি, সরকারের সক্ষমতা রয়েছে এবং সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষকদের এমপিও দেবে।

অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান  ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সমকাল

শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলী সম্পর্কেও শিক্ষা দিতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলী সম্পর্কেও শিক্ষা দিতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী বেশি চাপ নয়, শিক্ষার্থীদের নিজের পথ বেছে নিতে দিন: শিক্ষা উপমন্ত্রী - dainik shiksha বেশি চাপ নয়, শিক্ষার্থীদের নিজের পথ বেছে নিতে দিন: শিক্ষা উপমন্ত্রী নীতিমালা মেনে ভর্তি ফি আদায়ের নির্দেশ - dainik shiksha নীতিমালা মেনে ভর্তি ফি আদায়ের নির্দেশ এমপিও কমিটির সভা ২০ জানুয়ারি - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ২০ জানুয়ারি ২৬ জানুয়ারি স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচন - dainik shiksha ২৬ জানুয়ারি স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচন ৩৫ উত্তীর্ণ ইনডেক্সধারী কর্মচারীরা শিক্ষক পদে নিয়োগ পাবেন না - dainik shiksha ৩৫ উত্তীর্ণ ইনডেক্সধারী কর্মচারীরা শিক্ষক পদে নিয়োগ পাবেন না উপবৃত্তি : ডাচ-বাংলার অদক্ষতায় গাইবান্ধায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি - dainik shiksha উপবৃত্তি : ডাচ-বাংলার অদক্ষতায় গাইবান্ধায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ শুরু - dainik shiksha প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ শুরু ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া শিক্ষার খবর সবার আগে পেতে ‘দৈনিক শিক্ষা ব্রেকিং নিউজ’ ফেসবুক পেজে লাইক দিন - dainik shiksha শিক্ষার খবর সবার আগে পেতে ‘দৈনিক শিক্ষা ব্রেকিং নিউজ’ ফেসবুক পেজে লাইক দিন please click here to view dainikshiksha website