নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন ও বাস্তবতা - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

গত ৮ সেপ্টেম্বর ছিল আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও দিবসটি পালিত হয়েছে। সাক্ষরতা দিবস লেখা গেঞ্জি-জামা গায়ে ঝুলিয়ে শোভাযাত্রা হয়েছে। দু-চারটি জায়গায় আলোচনা হয়েছে সাক্ষরতার দুরবস্থা নিয়ে। ওই পর্যন্তই। অনেকটাই আমলাতান্ত্রিক এবং দায়সারা গোছের আয়োজন আর কী। অর্থবহ, সচেতনতা উদ্দীপক এবং তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সর্বব্যাপী কোনো কর্মসূচি ছিল না। অথচ দরকার ছিল এটিই। অর্থাৎ সমাজের সবাইকে সম্পৃক্ত করে নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে এক যুদ্ধের ডাক দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। তা হয়নি। শুক্রবার (২৯ নভেম্বর) কালের কণ্ঠ পত্রিকায়  প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানা যায়।  

 

নিবন্ধে আরও জানা যায়, হয়তো নীতিনির্ধারকরা সেভাবে দেখছেন না বিষয়টিকে। তা-ই যদি না হবে, তাহলে স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও দেশের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি (২৬.১ শতাংশ) মানুষ সাক্ষরহীন থাকত না। এটি সরকারি হিসাবের আলোকে বলছি। সরকারি হিসাবে দেশে সাক্ষরতার হার নাকি বর্তমানে ৭৩.৯ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, ২০১৯ সালে আমাদের দেশে ৫০ থেকে ৬৭—এই বয়স গ্রুপের মানুষের সাক্ষরতার হার দাঁড়িয়েছে ৭৩.৩ শতাংশে, আর ০৭ থেকে ১৫ বয়স গ্রুপের ৭৩.২ শতাংশ এবং গড় সাক্ষরতার হার এ বছরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩.৯ শতাংশে।

এ পরিসংখ্যান নিয়ে সুধী মহলে রয়েছে গভীর সন্দেহ ও বিভ্রান্তি। কারণ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সংজ্ঞায় শুধু নাম সই করতে পারলেই তাকে সাক্ষর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অথচ বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে এ হার ৫১.৩ থেকে ৫৭.০ শতাংশ বলা হচ্ছে। সংজ্ঞাগত পার্থক্যের কারণে এমনটি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ বেসরকারি হিসাবে একজন মানুষ লিখতে ও পড়তে পারলে তাকে সাক্ষর বলা হয়েছে। সরকার শুধু নাম সই করতে পারাকেই সাক্ষর ধরছে। অতএব, হার তো বেশি হবেই। অন্যদিকে বিরোধীরা লিখতে, পড়তে, বলতে এবং মৌলিক অঙ্ক পারাকে বলছে সাক্ষর।

অতএব এ ক্ষেত্রে হারটা তো কম হবে। আমার কথা হচ্ছে যে কমবেশির এ বিভ্রান্তি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের বাস্তব চিত্র বিবেচনায় নিয়ে এগোতে হবে। আমরা কি জানি না সাক্ষর কাদের বলা উচিত? জানি, অথচ স্বীকার করতে রাজি নই। নিজের স্বার্থে, দলীয় স্বার্থে। স্বার্থই যদি বিবেচনায় নিতে হয়, তবে তা হবে দেশের বা সমগ্র সমাজের স্বার্থ। এটি সবারই জানার কথা যে আন্তর্জাতিকভাবে সাক্ষর বলা হয় ওই ব্যক্তিকে যিনি লিখতে, পড়তে, গণনা করতে পারেন ও যোগাযোগ স্থাপন করার সক্ষমতার অধিকারী। অন্যদিকে ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের শিক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী ফাংশনাল শিক্ষার অধিকারী ব্যক্তিকে বলা হয়েছে সাক্ষর।

অর্থাৎ শুধু লিখতে-পড়তে পারলেই হবে না, পত্র ও আবেদনপত্র লেখার যোগ্যতাও থাকতে হবে। এ সংজ্ঞাগুলোর আলোকে সাক্ষরের হার নির্ধারণ করলে তা কত হবে। আমার বিশ্বাস ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের বেশি কিছুতেই হবে না। কারণ ইদানীং খবর বেরিয়েছে যে পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণদেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নাকি লিখতে-পড়তে, গণনা করতে জানে না, নাম সই করতে পারে না। যোগাযোগের জন্য পত্র বা আবেদনপত্র লেখা তো দূরের কথা।

অনেকটা কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের আলোকে রচিত ২০১০ সালের শিক্ষা কমিশনের (কবীর চৌধুরী কমিশন) রিপোর্টে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে প্রাথমিক শিক্ষা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এটিই হবে ফাংশনাল সাক্ষর শিক্ষা। তার মানে অষ্টম শ্রেণি শেষ করলে একজন মানুষ লিখতে, পড়তে, অনুধাবন ও গণনা করতে এবং পত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করতে এবং নিজেদের দরকারে আবেদনপত্র লিখতে পারবে। বাকশাল কর্মসূচিতে বঙ্গবন্ধুর সরকার কৃষির আধুনিকায়ন (সমবায়ীকরণ) ও আমদানি বিকল্প শিল্পায়নের মতো শিক্ষাক্ষেত্রে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে তিনি তা করে যেতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু-উত্তর সামরিক-বেসামরিক স্বৈরাচারী সরকারগুলো তাঁর সরকার সূচিত সুদূরপ্রসারী নীতিগুলো বাতিল করে দেয়। শিক্ষাক্ষেত্রে তারা নতুন করে অনেক কমিশন করলেও সেগুলোর রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। অত্যন্ত বিশৃঙ্খলভাবে চলতে থাকে শিক্ষাব্যবস্থা। অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয় মাদরাসা শিক্ষার প্রসারে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে আবার শিক্ষা কমিশন (শামসুল হক কমিশন) করে।

নানা অসংগতি ও অসামঞ্জস্যতার কারণে এ কমিশনের রিপোর্টও আলোর মুখ দেখেনি। বাস্তবায়ন তো দূরের কথা। এ সময়ে এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১০ সালের মধ্যে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করার সংকল্প ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন করা আর হয়ে ওঠেনি। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া এসে সব কিছু তছনছ করে দেন। এমনকি সাক্ষরতার বিষয়টি এ সময়ে ডিকশনারি থেকে একবারেই হারিয়ে যায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার আবার ক্ষমতায় এসে একটি শিক্ষা কমিশন (কবীর চৌধুরী কমিশন) গঠন করে।

এ কমিশন ২০১০ সালে রিপোর্ট দেয় এবং তা সরকার প্রকাশ করে। পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা থেকে শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নের কাজে হাত দেয় সরকার। এ শিক্ষানীতিতে শতভাগ সাক্ষরতা এবং কারিগরি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়। নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে অবশ্যই সফলতা আছে। তবে আমার মতে, সফলতার চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী। সরকার অনেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করেছে, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট করেছে, করেছে কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। স্কুল-কলেজগুলোতে আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম করেছে।

পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আধুনিকায়নসহ আরো বেশ কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। যার ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজ অনেকটাই এগিয়েছে বলা যায়। কিন্তু সরকার অদ্যাবধি দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করতে পারেনি। এটি সত্যিই লজ্জার। বহুবার সরকারের নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। এ প্রক্রিয়ায় সর্বশেষ প্রতিশ্রুতি ছিল ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার।

এ প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। বলা হচ্ছে যে অর্থায়নের উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না যে এ রকম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে কেন অর্থের উৎস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে যে এ ব্যাপারে সরকারের পরিকল্পনায় কোথাও ঘাটতি আছে। পদ্মা সেতুর মতো বিশাল প্রকল্প নিজস্ব অর্থে বাস্তবায়িত হতে পারলে নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার মহৎ কাজে কেন অর্থের ও উদ্যোগের অভাব হবে?

২০৩০ সালে এসডিজির (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) মেয়াদ শেষ হবে। বাকি আর মাত্র ১১ বছর। আমরা কি এই ১১ বছরে পারব দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করতে? বর্তমানের গতিতে চললে পারব বলে মনে হয় না। উল্লেখ্য যে বর্তমানে বার্ষিক ০.৭ শতাংশ হারে (গণসাক্ষরতা অভিযান ২০১৬) নিরক্ষরতা হ্রাস পাচ্ছে। এ হিসাবে নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আরো প্রায় ৩৮ (৩৭.২৯) বছর লাগবে সরকারি তথ্য মতে (৭৩.৯ শতাংশ সাক্ষরতার হার ধরে)।

আর বেসরকারি হিসাবে লাগবে প্রায় ৬২ বছর (সাক্ষরতার হার ৫৭ শতাংশ ধরে)। এত বছর অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য কি আমাদের কারো আছে? নেই। কারণ আমাদের দেশ এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে এবং ২০২৩ সাল নাগাদ তা টেকসই হবে বলে আমরা ধরে নিচ্ছি। এ মর্যাদার সঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক নিরক্ষর আদমসন্তানের উপস্থিতি আদৌ মানানসই নয়।

তার ওপরে রয়েছে সরকারের আরেক রূপকল্প বাস্তবায়নের স্বপ্ন : ২০৪১ সালের মধ্যে আমাদের দেশকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা তথা উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরিত করা। তিন কোটি থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি ঠায় মূর্খ মানুষ নিয়ে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি এ স্বপ্ন, নাকি তা কল্পনাই থেকে যাবে?

লেখক : ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান, অধ্যাপক ও সাবেক সভাপতি, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram - dainik shiksha Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website