please click here to view dainikshiksha website

নীতিহীন ক্ষমতাচর্চা : আমিরুল আলম খান

আমিরুল আলম খান | জানুয়ারি ৬, ২০১৬ - ১০:২৩ অপরাহ্ণ
dainikshiksha print

শিক্ষকদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রাস্তায়ই থাকল। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সবাই এখন রাস্তায়। সিলেকশন গ্রেড বহাল ও বেতন গ্রেডের সমস্যা নিরসনের দাবিতে গত রোববার থেকে কালো ব্যাজ পরতে শুরু করেছেন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা।

এই কর্মসূচি ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। দাবি না মানলে ১১ জানুয়ারি থেকে তাঁরা লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করবেন। আর অর্থমন্ত্রী আবারও বলেছেন, এসব দাবি মানার কোন সুযোগই নেই।

আন্দোলনে নেমেছেন ২৬ ক্যাডারের সদস্যরা, নন-ক্যাডার সদস্যরা। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মচারীরা ক্ষুব্ধ। অসন্তোষ বিচার বিভাগে। অষ্টম বেতন স্কেল ঘোষণার এই হল পরিণতি।

শিক্ষকরা বেতন বৈষম্য এবং পদাবনতির শিকার। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল মতের শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন। পদত্যাগ দাবি করেছেন স্বয়ং অর্থমন্ত্রীর। নিন্দা জানিয়েছেন বেতন কশিমন চেয়ারম্যান জনাব ফরাসউদ্দীনের। বাংলাদেশে এ এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি।

২০০৯ সালে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই শিক্ষামন্ত্রী বলে আসছিলেন, তিনি শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিত করবেন, তাদের আলাদা বেতন স্কেল দেবেন। এখন আলাদা বেতন স্কেল দূরে থাক, আগে যে সম্মান ও বেতন স্কেল সুবিধা ছিল তা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য এখনও বলে চলেছেন, তিনি শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন বৈষম্য দূর করতে তার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এ বিষয়ে তিনি অর্থ সচিবের সাথে কথাও বলেছেন।

আমাদের দেশে আধুনিক শিক্ষা প্রচলিত হয় বিদেশি শাসকদের প্রয়োজনে ও তত্ত্বাবধানে। অনেকটা ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাঁচে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসন তারা মেনে নেয়েছিল, আর কিছু অজি১ত হয়েছিল। অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী লিখেছেন, “দেশটা পরাধীন হলেও বিছুটু বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার প্রতি শ্রদ্ধাবশত এবং কিছুটা বোধকরি এদেশের শিক্ষিত সমাজের প্রতি শ্রদ্ধাবশত, স্বায়ত্বশাসনের মূল বস্তুটি অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা দিতে তাদের বাঁধেনি। আমার এই শেষ কথাটির উপর আমি জোর দিতে চাই। শিক্ষিত সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা। ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিন পয১ন্ত অখণ্ড ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় এদেশীয় যারা সাথে যুক্ত ছিলেন, সামাজিক অবস্থানে ও ব্যক্তিগত গুণাবলির বিচারে তাঁরা ছিলেন সম্মানীয়” (জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, সূচিপত্র, ২০০২, ঢাকা, পৃ. ২৩১)।

স্বাধীন বাংলাদেশে এখন আমরা উল্টো চিত্র দেখি। শিক্ষকরা এখন অশ্রদ্ধার পাত্র! এখন শিক্ষকদের সম্পকে ক্ষমতাবানদের কথাবাতা উচ্চারণ অযোগ্য।

গত কয়েক বছরে আমলা ও পুলিশ দেশে অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে প্রশাসন ক্যাডারের পদোন্নয়ন ঘটিয়ে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। শিক্ষকসহ সব ক্যাডারের কর্মকর্তাকে করা হয়েছে প্রশাসন ক্যাডারের অধঃস্তন। ফলে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম অবিশ্বাস, হতাশা ও বিশৃঙ্খলা।

শিক্ষকরা যাতে মর্যাদা এবং বেতন বৈষম্যের শিকার না হন এবং সে ধরনের কিছু থাকলে তা নিরসনের জন্য অর্থমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে একটি কমিটি করে দিয়েছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। দিয়েছিলেন সুস্পষ্ট নির্দেশনাও। সে কমিটি মিটিঙে বসে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাতে শিক্ষক নেতারা আশ্বস্ত হয়েছিলেন। মন্ত্রিসভাও নাকি সেভাবেই সব অনুমোদন করেছিল। কিন্তু বিজয় দিবসের প্রাক্কালে ১৫ ডিসেম্বর বেতন স্কেলের গেজেট প্রকাশিত হলে দেখা গেল সেই সমঝোতার কোন প্রতিফলনই গেজেটে নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণ অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার অভিযোগ’ করেছেন।

অবাক ব্যাপার, আইন মন্ত্রণালয়ের সাথে অর্থমন্ত্রী এক ধরনের বিবাদে জড়িয়ে পড়লেন। তিনি আইন মন্ত্রণালয়কে রীতিমত ধমক দিয়েছেন। সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে আমরা এসব জেনেছি।

এ ধরনের ঘটনা সংসদীয় গণতন্ত্রে নজিরবিহীন। অর্থ মন্ত্রণালয় মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বদলিয়েছে, এ অভিযোগ গুরুতর। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা অর্থমন্ত্রীকে স্বেচ্ছাচারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অসংযত মন্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য বলে তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন।

গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ক্ষেত্রে আমরা ভারতের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করতে পারি। ভারতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন রাতারাতি ইংরেজির পরিবর্তে হিন্দি ও আঞ্চলিক ভাষাকে রাষ্ট্রের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে চালুর উদ্যোগ নেন তখন মন্ত্রীসভায় এম সি চাগলা তার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি আশংকা প্রকাশ করেছিলেন যে, এই উদ্যোগ ভারতের সংহতি বিনষ্ট করতে পারে (…লাইকলি টু থ্রিয়েটেন, ইফ নট আনডারমাইন, দি ইউনিটি অব ইন্ডিয়া…)। মন্ত্রিসভায় মিঃ চাগলার বিরোধিতা সত্বেও এই প্রস্তাব অন্য সকলের সমর্থনে পাস হয়। মত পার্থক্যের কারণে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র পেশ করেন।

এক দীর্ঘ পত্রে তিনি তার পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে লেখেন, গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। কিন্তু তিনি নিজ বিশ্বাসকে বিসর্জন দিতে পারেন না। আর যা তিনি নিজে বিশ্বাস করেন না, তা জনগণকে তিনি বলতেও পারেন না। কাজেই মন্ত্রিসভার সদস্য থাকাকে তিনি ‘অনৈতিক’ বলে বিবেচনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে অনুরোধ করেছিলেন। মিঃ চাগলা তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং পদত্যাগপত্রটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশের অনুমতি চান। অবশেষে ইন্দিরা গান্ধী সে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। মিঃ চাগলা তার আত্মজীবনী ‘রোজেস ইন ডিসেম্বর’ গ্রন্থে নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতার বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।

মিঃ চাগলা ছিলেন বিচারপতি। পরে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে প্রথমে শিক্ষা ও পরে বিদেশ মন্ত্রী হন। ভাষা প্রশ্নে তিনি মন্ত্রীত্ব এবং নীতির মধ্যে নীতিবোধকে বেশি মূল্যবান জ্ঞান করেছিলেন। মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে তিনি ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একজন ‘সৎ ও ন্যায়পরায়ণ’ ব্যক্তিত্ব হিসেবে অমর হয়ে আছেন। হতে পারে, বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী জনাব মুহিত শিক্ষক ও অন্যান্য ক্যাডার সদস্যদের মর্যাদাহানী ও বেতন বৈষম্যের অভিযোগ সত্য নয় বলেই বিশ্বাস করেন। মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে একের প্রতি অন্যের অবিশ্বাসের প্রকাশ্য রূপ নেয়া বিপজ্জনক। সততার খাতিরে তার উচিত ছিল পদত্যাগ করে তা প্রতিষ্ঠা করা।

এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, বাংলাদেশে কোন কিছুই আলোচনার টেবিলে ফয়সালা হয় না। শাসন ক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত থাকেন তারা দেশপ্রেম এবং জ্ঞানের একচ্ছত্র মালিক বনে যান। তাদের চোখে অন্য সকলেই নির্বোধ, দেশপ্রেমহীন এবং চক্রান্তকারী! একটি গণতান্ত্রিক দেশে এই মনোভাব একেবারেই অগ্রহণযোগ্য, অপ্রত্যাশিত।

আলোচনা ও সমঝোতার রাজনীতির বিপরীতে এই অনড় অবস্থান বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যতকে ক্রমেই আরো বেশি সংকটাপন্ন করে তুলছে। অথচ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এক রত্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, ৩০ লক্ষ মানুষ শহিদ হয়েছেন, যার লক্ষ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সাথে সকলের সম্মান ও আর্থিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা।

এবারের বেতন কমিশন রিপোর্ট দেশের শাসন ব্যবস্থায় চরম বিভাজন সৃষ্টি করেছে। সৃষ্টি করেছে পারস্পারিক অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধাবোধ। কমিশন যতটা করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করেছে সচিব কমিটি। শিক্ষা সম্পর্কে সরকারের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেছে। তার কলকাঠি নেড়েছে সচিবরা।

সচিব কমিটি কেন গঠিত হল তার কোন ব্যাখ্যা নেই। তারপরও সচিব কমিটির কাজ ছিল মন্ত্রিসভায় কমিশনের রিপোর্ট যথাযথভাবে উপস্থাপন করা। কিন্তু সচিব কমিটি নাকি কমিশন রিপোর্টে কিছু কিছু পরিবর্তন করেছে। তার ফলেই নাকি এই সংকট। এ অভিযোগ করেছেন বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান জনাব ফরাসউদ্দীন স্বয়ং। এই অভিযোগ গুরুতর এবং তা আমলে নিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু তেমন উদ্যোগ দৃশ্যগোচর নয়, বরং সচিবদের দিকেই সরকারের পক্ষপাত। সেটি আরও স্পষ্ট হয়, যখন সমস্যা নিরসনে আবারও তিন সচিবের এরকটি কমিটি গঠন করা হল। এতে সমস্যার সমাধান হবে, না কি আরও জটিল হবে তা এখনই বলা কঠিন।

দেখা যাচ্ছে, সচিব কমিটি সারা দেশে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্টভাবে দেখা দিয়েছে ।

শিক্ষামন্ত্রী, আইনমন্ত্রী তাদের ভিন্নমতের কথা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীও শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি পূরণের পক্ষে বলেই তিনি সমস্যা সমাধানে কমিটি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রী সচিব কমিটিকে সমর্থন করে যাচ্ছেন। প্রাচীন গ্রিসে কোন কিছুর মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি বিপজ্জনক বলে গণ্য হত।

আমাদের দেশেও বহুল প্রচলিত লোককথা হল, ‘বেশি বাড়লে ঝড়ে ভাঙে’।

দেশের ২৬টি ক্যাডারকে বঞ্চিত করে, অধঃস্তন করে, অপমান করে সচিব কমিটি দেশের কোন মঙ্গল সাধন করতে চায় তা রীতিমত দুর্বোধ্য। আরো দুর্বোধ্য, অর্থ মন্ত্রণালয়ে এমন কে বা কারা আছেন যিনি/যারা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করার ক্ষমতা রাখেন।

অর্থমন্ত্রী একজন সাবেক আমলা। আমলারা যদি তার প্রশ্রয়ে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের মালিক মোক্তারে পরিণত হন, তবে তা দেশ ও জাতির জন্য তা অবশ্যই শংকার কারণ।

আইন ও নীতিহীন এই ক্ষমতাচর্চা স্বাধীনতার মৌলিক ধারণারই পরিপন্থী।

লেখক : আমিরুল আলম খান, শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান যশোর শিক্ষাবোর্ড

[email protected]


সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন