নৈতিকতার পাদপীঠ কত দূরে? - মতামত - Dainikshiksha

নৈতিকতার পাদপীঠ কত দূরে?

গোলাম কবির |

মানব সভ্যতার জ্ঞাত ইতিহাস বলছে, সমাজজীবন সুশৃঙ্খল রাখার জন্য প্রবৃত্তির দাস মানুষকে গোড়া থেকেই নানাভাবে নৈতিকতা শেখানোর প্রবর্তন করা হয়েছে। কখনো ঐশী বাণীরূপে, কখনো নীতিবাদী সংস্কারকের কাম্য চেতনায়।

যুগে যুগে মুরব্বিরা সেখান থেকে আমজনতাকে উপদেশ খয়রাত করেছেন। কথায় ও কাজে মিলহীন মুরব্বিদের বাণী শুনে অলক্ষ্যে অন্তর্যামী হেসেছেন চিরকাল।
বিবেক মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি। যা দিয়ে মানুষ ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ ও হিতাহিতের পার্থক্য উপলব্ধি করে অশুভকে প্রতিহত করে। মানব প্রবৃত্তির কাছে অনেক সময় বিবেকের পরাজয় ঘটে। এ পরাজয়ের প্রথম কারণ দুর্বলচিত্ততা এবং অপর কারণ সামাজিক বৈষম্য। সাধারণভাবে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে সমাজ ও জীবনে নৈতিকতার দেখা মিলতে পারে।

মানুষের নৈতিকতার সঙ্গে পরিচয় ঘটে নানাভাবে। দেখে, শুনে ও পাঠের মাধ্যমে মানুষ আংশিক নীতিজ্ঞ হয়ে ওঠে।

ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সব প্রাণীই পারিপার্শ্বিক থেকে দেখে চলার ছন্দ শেখে। মানবসন্তানের দেখে শিখতে সময় লাগলেও যা দেখে তাই অনুকরণ করে। গৃহের পরিবেশে জনক-জননী আত্মীয়স্বজনের পাশে থেকে দেখে শেখার মূল্যবান অংশ নৈতিকতার শিক্ষা। এ কারণে সদাচারী পরিবারের সন্তান নীতিভ্রষ্ট হয় না বললেই চলে। ব্যতিক্রম ছাড়া, অনাচারী পরিবারের সন্তান নীতিবান হতে দেখা যায় না। যদি হয়, তবে তাকে বলা হয়ে থাকে ‘গোবরে পদ্মফুল’। সন্তানরা বড় হয়, তার অবচেতনে থেকে যায় গৃহকোণের নৈতিকতা কিংবা অনৈতিকতার ছাপ। সেই ছাপ মুছে ফেলা কঠিন। সুতরাং নৈতিকতা শেখার প্রথম স্থান গৃহকোণ। দুখের বিষয় সেই স্নিগ্ধ গৃহকোণ প্রায় অপসৃত। লেখাপড়ার সাহায্যে মানুষ যখন থেকে সভ্যতার পথে অগ্রসর হয়েছে, তখন থেকেই ন্যায়বোধ বা নীতি-নৈতিকতার পাঠ শুরু। লেখা বাহুল্য, এ জন্য মানবশিশুকে যেতে হয় পাঠশালায়। তারপর ধীরে ধীরে উচ্চতর বিদ্যাপীঠে। ঘরের পর বাইরে নৈতিকতা শেখার বা অনুভবের অন্যতম স্থান বিদ্যালয়। মনে রাখা দরকার, বিদ্যালয় একটি আধার মাত্র, তার প্রাণ বা আধেয় যথাযথ শিক্ষক।

এই শিক্ষক সুস্বাস্থ্যের মতো, যা বিধিনিষেধ মেনে অর্জন করতে হয়। এদের অনুসরণ করে যথার্থ মানুষ হওয়ার পথে অগ্রসর হওয়া যায়। একদা ওই সব নীতিবান শিক্ষকের নামেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খ্যাত হতো। আজকের দিনে আমরা বেশির ভাগ শিক্ষকই সংক্রামক ব্যাধির মতো। ফলে আমাদের সাহচর্যে এসে শিক্ষার্থীরা সুনীতি না শিখে দুর্নীতির প্রতি ধাবিত হচ্ছে। দেশ নিয়ে যাঁরা ভাবছেন, তাঁদের উচিত নৈতিকতা শিক্ষার জন্য নীতিবান মেধাবীদের বেছে নেওয়া। কাজটা দুরূহ। তবুও এই দুরূহ কাজে কঠিন পরিচয় দিতে হবে। তা না হলে দেশ এবং সমাজের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে পারে।

কথায় বলে, আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাও। আমাদের শিক্ষা পরিচালনার মুরব্বিরা উপদেশ দিচ্ছেন শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা শেখানোর জন্য। নিজের মধ্যে গলদ রেখে অন্যকে উপদেশ বিতরণ করলে তা কখনো কার্যকর হয় না। এমনকি ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত উপদেশাবলিও অনেক সময় নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কাজেই উপদেশ দেবেন ওই সব শিক্ষক, যাঁরা নিজের জীবন ও কর্মে নীতি-আদর্শকে সামনে রেখে পথ চলেছেন। দুখের বিষয়, শিক্ষায় ব্যভিচারের মাধ্যমে তাত্ক্ষণিক সুবিধা প্রদানকারী অনেক শিক্ষক জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে। শিক্ষাহীন ভুয়া ব্যক্তি, তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটার হোন কিংবা প্রভাবশালীর সন্তান হোন নির্মমভাবে শিক্ষাঙ্গন থেকে অপসারণ করতে হবে। গত শতকের শেষের দিকে দেখা গেছে অনেকে সরকারি কলেজে চাকরির জন্য পিএসসিতে যাঁরা আবেদন করতে পারতেন না, তাঁরাই মুক্তিযুদ্ধের ভুয়া সনদ জোগাড় করে শিক্ষা ও নৈতিকতাকে কলুষিত করেছে। এখনো তাঁদের অনেকে শিক্ষার্থীদের উপদেশ নিয়ে ফেরি করছে, ভূতের মুখে রাম নামের মতো। দোষ বোধ করি এদের নয়, বরং এদের যারা শিক্ষক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন, তাঁদের ভেবে দেখতে হবে// শিক্ষা ও নৈতিকতাকে অধঃপাতে নিয়ে যাওয়ার কারিগররা নৈতিকতা শেখাতে পারে কি না।

আমাদের ভাবিকালের কর্ণধারদের জাতি পরিচালনার জন্য অবশ্যই সুশিক্ষিত ও নীতিবান হওয়া দরকার। বিষয়টি সামনে রেখে আমাদের সমাজসেবক মুরব্বিরা শিক্ষার্থীদের নৈতিক আদর্শে উজ্জীবিত হওয়ার পরামর্শ দেন। নিজে না করে যদি পরামর্শ দেওয়া হয়, সেটি অনেক সময় পরিহাসের মতো শোনায়। এটা এক ধরনের অপরাধও বটে। দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষক ও আত্মসেবী সমাজ নায়কদের প্রত্যক্ষ করে আমাদের অবোধ তরুণরা ন্যায়-অন্যায় বোধের মাপকাঠি হারিয়ে ফেলছে। কাজেই বলার আগে নিজের আচরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে কেমন করে নীতিবান হওয়া যায়।

সমাজ যখন মাৎস্যন্যায় হয়ে ওঠে, তখন বেড়ায় খেত খাবে সেটাই স্বাভাবিক। এমতাবস্থায় নীতির নামে হোক কিংবা ধর্মগ্রন্থের দোহাই দিয়ে হোক সমাজের অনাকাঙ্ক্ষিত জঞ্জাল দূর করা সহজ নয়। অন্যায়কারী ও অন্যায়ের প্রশ্রয় দানকারী উভয়েই ক্ষমার অযোগ্য। রাষ্ট্রকে এ ভার নিতে হবে অত্যন্ত কঠোরভাবে যেন যথাযোগ্য ব্যক্তি বঞ্চিত না হয়। যার যতটুকু পাওনা, যদি হাতে-কলমে বুঝে পায় তবে তরুণরা ধীরে ধীরে সুশীল হয়ে উঠবে। তখন কষ্ট করে উপদেশ খয়রাত করার প্রয়োজন পড়বে না হয়তো। যদি যথাযোগ্য ব্যক্তিকে যথাস্থানে নিয়োগ করা না যায়, তবে মানব আচরণের দৃশ্যপট পরিবর্তন সুদূর পরাহত।

আমাদের সবার জানা, মানুষের বিবেক পরাভূত হয় প্রবৃত্তির কাছে। প্রবৃত্তি হলো রিপু বা শত্রুর নামান্তর। যোগ্যতা অনুসারে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে প্রবৃত্তির প্রাধান্য কমে আসবে। আমরা সেই সুদিনের প্রত্যাশায় বিশ্বাসী হতে চাই। সেই সুদিন দেখতে না পেরে আমাদের উত্তরসুরিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হয়তো ভাববে, নৈতিকতার পাদপীঠ কত দূরে!

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

 

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

জারির অপেক্ষায় অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ যোগ্যতার সংশোধনী - dainik shiksha জারির অপেক্ষায় অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ যোগ্যতার সংশোধনী প্রাথমিকে সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড প্রার্থীদের ২০ শতাংশ কোটা - dainik shiksha প্রাথমিকে সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড প্রার্থীদের ২০ শতাংশ কোটা ১৮২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু - dainik shiksha ১৮২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার অপেক্ষায় চাকরিতে প্রবেশের বয়স: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার অপেক্ষায় চাকরিতে প্রবেশের বয়স: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আরও ৯২ প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় - dainik shiksha আরও ৯২ প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকতা ছেড়ে উপজেলা নির্বাচনে শিক্ষক - dainik shiksha শিক্ষকতা ছেড়ে উপজেলা নির্বাচনে শিক্ষক প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সুপারিশপ্রাপ্তদের করণীয় - dainik shiksha প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সুপারিশপ্রাপ্তদের করণীয় প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ - dainik shiksha প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website