please click here to view dainikshiksha website

পাঠক্রমের ইংরেজি লিসেনিং ও স্পিকিং নিয়ে কিছু কথা

মাছুম বিল্লাহ | জানুয়ারি ৬, ২০১৬ - ৯:৪০ অপরাহ্ণ
dainikshiksha print

MASUM BILLAযে কোন ভাষায় সাধারন কথোপকথনের সামর্থ্য অর্জনের জন্য ভাষা শিক্ষকের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে কমবেশী ২০০ যোগাযোগ ঘন্টা অতিবাহিত করলে একটি ভাষা শিখে ফেলার কথা। কিন্তু আমরা প্রাথমিক থেকে উচচ মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রায় হাজার ঘন্টা ইংরেজি শেখা সত্ত্বেও স্বত:স্ফূর্তভাবে ইংরেজি বলতে পারিনা। অন্যের ইংরেজি শুনে বুঝতে পারিনা। তাহলে গলদ কোথায়?

আমরা ভাষার চারটি দক্ষতার কথা সচরাচর শুনতে পাই , দক্ষতাগুলো হচেছ—লিসেনিং, স্পিকিং, রিডিং ও রাইটিং। এই দক্ষতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ আমরা   করে থাকি শ্রবণের অর্থাৎ লিসেনিং-এর মাধ্যমে। বিউরলি- অ্যালেনের গবেষণায় দেখা গেছে আমরা ৪০ শতাংশ যোগাযোগ বা কমিউনিকশেন করে থাকে এই লিসেনিংএর মাধ্যমে, ৩৫ শতাংশ করে থাকি কথা বলা বা স্পোকেনের মাধ্যমে।১৬শতাংশ করে থাকি পড়ার মাধ্যমে আর মাত্র ৯ শতাংশ করে থাকি লেখার মাধ্যমে।অর্থাৎ আমাদের মাত্র ২৫ শতাংশ কমিউনিকেশন আমরা করে থাকি পড়া ও লেখার মাধ্যমে। বাস্তব জীবনেও তাই দেখি। পৃথিবীর অনেক মানুষ লিখতে পারেন না, পড়তেও পারেননা অথচ তারা জীবনে সফল ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। তাদের শ্রবণ ও কথা বলার দক্ষতা আছে। এ দুটো মূল দক্ষতার বলেই তারা কাজ চালিয়ে যান। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, আমাদের যোগাযোগের ৭৫ ( লিসেনিং ৪০, স্পিকিং ৩৫) শতাংশই আমরা করে থাকি প্রথম দুটো স্কীলের মাধ্যমে। এর বাস্তব কারণও আমরা দেখতে পাই যে, আমরা যখন কথা বলি তখনও অন্যের কথা শুনি, যখন পড়ি তখনও শুনি, এমনকি গভীর ঘুমে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা চারদিকের কথা শুনতে পাই। দ্বিতীয়ত, স্পিকিংএর দ্বারা আমরা উত্তপ্ত পরিবেশকে ঠান্ডা করি, শত্রুকে মিত্র করি, কারুর ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাই, শিক্ষক-ছাত্র, মালিক শ্রমিক, প্রতিবেশী সকলের সাথে সম্পর্ক তৈরি করি এই কথা বলার মাধ্যমে। যিনি সুন্দর করে কথা বলতে পারেন তাকে অনেকেই পছন্দ করেন। যিনি গুছিয়ে কথা বলতে পারেন তিনি সহজেই মানুষের সাথে ভাব জমাতে পারেন, প্রেম করতে পারেন, সহজে কাজ হাসিল করতে পারেন। আমরা ইংরেজি ভাষাটা শিখছি কিন্তু এই কাজগুলো করার জন্যই । অথচ এই ৭৫শতাংশ দক্ষতার কোন ছিটেফোটাও ছিলনা বা নেই আমাদের ইংরেজি পাঠ্যক্রমে। আমরা শুধুমাত্র ১৬শতাংশ রিডিং এবং ৯ শতাংশ রাইটিং নিয়ে ইংরেজি ভাষা জানার বিষয়টি বিবেচনা করে থাকি। আমরা গ্রেডিং দিচিছ একজন শিক্ষার্থীকে যে, তুমি ইংরেজিতে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৮০ কিংবা ৮৫ এমনকি ৯০ নম্বর পেয়েছে। অথচ একবার চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, আমরা আসলে কি করছি। ঐ শিক্ষার্থীর লিসেনিংএবং স্পিকিংএর কি অবস্থা তা আমরা কেউ হিসেবেই নিচিছ না। একটি ভাষা জানা মানে তার মূল দুটো স্কীল সহ অন্যান্য স্কীলগুলোও আয়ত্ত্ব করা। ইংরেজির ক্ষেত্রে আমরা যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করি তাহলে ব্যাপারটি হাস্যকর মনে হবেনা?

আমরা গরীব দেশ বলে ইংরেজির মতো একটি আন্তর্জাতিক ভাষাকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে আমাদের পাঠক্রমের অন্তুর্ভুক্ত করা হয়েছে কারন এটি আমরা বাণিজ্যিকভাবে শিখব যাতে দেশে-বিদেশে আমরা এটি ভালভাবে কার্যক্ষেত্রে ব্যবহার করে ভাল উপার্জন করতে পারি। কিন্তু একটি ভুল মেসেজ বিরাজ করছে আমাদের মাঝে , আর সেটি হচেছ আমরা প্রথমেই ইংরেজির গ্রামার শিখছি। ইংরেজির গ্রামার নিয়ে সারা জীবন পার করে দিচিছ কিন্তু ইংরেজির ব্যবহার বাস্তব জীবনে করতে পারছিনা হাতেগোনা কিছু শ্ক্ষিার্থী ছাড়া। কোন অফিসে বা সংস্থায় আমাকে জিজ্ঞেস করবে না কমপ্লেক্্রস বাক্য কোনটি বা ইনট্রানজিটিভ ভার্ব কাকে বলে। তারা দেখবে আমরা কাস্টমারদের সাথে সুন্দর ইংরেজি বলতে পারছি কিনা।কাস্টমার বা স্টেকহোল্ডারগন যা বলছেন তা আমরা বুঝে সে অনুযায়ী সাড়া দিচিছ কিনা।এই ধারণাগুলো দূর কারার জন্য অন্যান্য অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও চালু করা হলো ’ কমিউনিকেটিভ ইংলিশ’। তাতেও ভুল মেসেজটি দূর করা গেলনা বরং কমিউনিকেটিভ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি ছড়ানো হলো। সঠিকভাবে এর প্রচলন করা গেলনা। পাঠ্যপুস্তক যদিও কিছুট কমিউনিকেটিভের আদলে করা হলো পরীক্ষা হচিছলো ট্রাডিশনাল পদ্ধতিতে ফলে সিএলটি মার খেল। এখন ইংরেজি পড়ানোর ক্ষেত্রে যা চলছে তা অনেকটই হ-য-ব-র-ল। যে যেভাবে পারছেনইংরেজি পড়াচেছন।কেউ শিক্ষার্থীদের বলছেন ডিকশনারী মুখস্থ করে ফেলতে, কেউ বলছেন সব গ্রামারের নিয়মগুলো ভাল করে মুখস্থ করতে ও জানতে, কেউ বলছেন ইংরেজির বাংলাটা ভালভাবে বুঝতে হবে আর তাই বাজারে প্রচলিত বইগুলোতে ইংরেজির পাশাপাশি সব বাংলা করে দেওয়া আছে যাতে শিক্ষার্থীদের কোন কষ্ট না হয় ইংরেজি প্যাসেজ বুঝতে। আসলে ব্যপারটি যে কত ক্ষতিকর তা কেই ভেবে দেখছি না। সরকারী -বেসরকারী প্রশিক্ষণে যদিও এ বিষয়গুলো নিয়ে অনেক কথা হয়, আলোচনা হয়, অ্যাক্টিভিটি করানো হয় কিন্তু আসল ক্লাসরুমে এগুঅের প্রতিফলন হয়না । ফলে ইংরেজি পড়ানো এবং শেখা ব্যাপারটিতে তালেগোলে পাকিয়ে গেছে।

ইংরেজি পড়ানো এবং শেখানোকে বাস্তবমূখী করার নিমিত্তে ২০১০ সালে আমাদের জাতীয় শিক্ষাক্রমে   ১০ নম্বরের লিসেনিং ও ১০ নম্বরের স্পিকিং টেস্ট যোগ করা হয়েছে। এটি একটি ভাল উদ্যোগ।এই সুযোগটিকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। তবে, আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে এগুলো ব্যবহ্রত হচেছনা এখনও। তার একটি কারন হচেছ পাবলিক পরীক্ষায় এই ২০ নম্বরের কোন পরীক্ষা হবেনা। আর আমাদের পড়ালেখা যেহেতু এখনও পরীক্ষাকেন্দ্রিক তাই লিসেনিং ও স্পিকিং বিষয়দুটোকে কেই পাত্তাই দিচেছনা। তার কারণও আছে, পাবলিক পরীক্ষায় চালু হলেই বর্তমানে প্রচলিত প্রাকটিক্যাল পরীক্ষার নম্বরের মতো অনেকটাই অযথা নম্বর দেওয়ার হিরিক পরে যাবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের বিদ্যালয়, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট শর্তগুলো এখনও লিসেনিং ও স্পিকিং পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে পুরোপুরি প্রস্তত নয়। পুরো ব্যবস্থা কবে প্রস্তুত হবে আর সেদিন আমরা ইংরেজি জানা শুরু করব। ততদিনে পৃথিবী বহুদুর এগিয়ে যাবে। আমরা কি পেছনে পড়ে থাকবো? না, আমরা পেছনে পরে থাকতে চাইনা। এই সুযোগটুকুই আমাদের কাজে লাগাতে হবে।

ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ৩৫টি , সপ্তম শ্রেণির জন্য ৩২টি, অ®টম শ্রেণির জন্য ৩৩টি ও নবম-দশম শ্রেণির জন্য ২৫টি লিসেনিং এক্্রারসাইজ এন সি টিবির ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। ’ইংলিশ ইন অ্যাকশন’ নামের প্রজেক্ট এই চমৎকার কাজটি করে দিয়েছে।এই লিসেনিং কম্প্রিহেনশনগুলো ব্যবহার করেই ক্লাসে একজন শিক্ষক স্পিকিং প্রাকটিস করাতে পারেন।এ ছাড়াও বইয়ের বা বইয়ের বাইরের যে কোন সোর্স থেকে প্যাসেজ নিয়ে লিসেনিং ও স্পিকিং প্রাকটিস করাতে পারেন। স্কুলে ৮০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হবে, বাকী ২০ নম্বর হবে লিসেনিং ১০ ও স্পিকিংএ ১০।এই বিশ নম্বর শিক্ষক নিজে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে লিসেনিং ও স্পিকিং অ্যাক্টিভিটি করিয়ে খাতায় নম্বরগুলো লিখে রাখতে পারেন।একাধিক বা বেশি পরীক্ষা নিলেও সব নম্বর ২০এ কনভার্ট করতে হবে, পরে লিখিত ৮০ নম্বরের সাথে সমন্বয় করে পরীক্ষার রেজাল্ট তৈরি করা হবে। এনসিটিবির নির্দেশ এ রকমই।প্রতিটি মডেল প্রশ্নের সাথে একটি করে লিসেনিং বা স্পিকিং থাকার প্রয়োজন নেই, আর তাতে একদিকে লিসেনিং স্পিকিংএর মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে থাকা হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে যে, লিসেনিং ও ¯িপকিং হচেছ ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্ট অর্থাৎ শিক্ষার্থীর ক্রমাগত পরিবর্তন লক্ষ করে করে তাকে মূল্যায়ণ করা আর ৮০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হচেছ সামেটিভ অ্যাসেসমেন্ট অর্থাৎ শিক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যা শিখেছে তা দুই থেকে তিন ঘন্টার একটি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করা যা সবসময় সঠিক রিডিং বা তথ্য নাও দিতে পারে।

এনসিটিবির এই লিসেনিংএর ১০ ও স্পিকিংএর ১০ নম্বর নিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিচেছ এবং সে অনুযায়ী সাহায্যকারী বই বের করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরে আবারো অনেকটা অনিশ্চয়তা, ভয় ও কনফিউশনের মধ্যে ফেলে দিচেচ। এ অবস্থা হলে লিসেনিং ও স্পিকিং চালুর আসল উদ্দেশ্য থেকে আমরা আবারও বিচ্যুত হবো, আমাদের শিক্ষার্থী তথা তরুণ প্রজন্ম এই আন্তর্জাতিক ভাষাটি জানা থেকে বঞ্চিত হবে। পিছিয়ে যাব আমরা দেশ হিসেবে। এটি আমরা কেউ চাইনা। তাই, জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে ,শিক্ষাবোর্ডসমূহ এবং সর্বোপরি ইংরেজি শিক্ষকদের অত্যন্ত উদারতা ও একাগ্রতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। শ্রেণিকক্ষেই তাদের লিসেনিং ও স্পিকিং করাতে হবে, শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে হবে কেন তাদের এই দুটো বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। বাস্তব উদাহরণ দিতে হবে তাদের সামনে। শিক্ষকদের নিজেদেরও এই ুদটো স্কীলে দক্ষ হতে হবে।তাহইলেই ব্যাপারটি স্বার্থকতার মুখ দেখবে।

লেখক: মাছুম বিল্লাহ

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক (বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত)

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন