পাঠ্যবইয়ে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর মায়ের নামও বিকৃত: বিতর্কিতরাই তদন্ত কমিটিতে!

নিজস্ব প্রতিবেদক | জানুয়ারি ১১, ২০১৭ - ১১:৫৯ অপরাহ্ণ

পাঠ্যবইয়ে শুধুমাত্র বানান ভুল ও সাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন ঘটেনি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তার মায়ের নামও বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বানান লিখতেও ভুল করা হয়েছে। এছাড়া প্রাথমিক স্তরের সব বইয়ের পেছনের কভার পৃষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর ছবি থাকলেও প্রাথমিক সমমানের মাদ্রাসার এবতেদায়ির কোন পাঠ্যপুস্তকেই প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেয়া হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘পাঠ্যপুস্তকের কারিকুলাম (পাঠ্যক্রম) ওলটপালট ও অপ্রাসঙ্গিকভাবে ধর্মীয় বিষয়বস্তু ছাপতে বাধ্য করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দু’জন অতিরিক্ত সচিব। তাদের একজন একটি পর্যটন জেলার ডিসি ছিলেন এবং আরেকজনের গ্রামের বাড়ি সিলেট। এই দুই কর্মকর্তাই পাঠ্যক্রম তৈরি থেকে বই মুদ্রণ পর্যন্ত যাবতীয় কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন।’

তৃতীয় শ্রেণীর ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের দশম অধ্যায়ে ‘আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ও সংগ্রামী জীবন’ এ বঙ্গবন্ধুর মায়ের নাম লেখা হয়েছে, ‘সায়েরা বেগম’, যা সঠিক নয়। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইয়ের ৮ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু তার মায়ের নাম লিখেছেন, ‘সায়েরা খাতুন’।

প্রাথমিক বইয়ের দায়িত্বে আছেন এনসিটিবির সদস্য (প্রাইমারি) প্রফেসর ড. সরকার আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মায়ের সঠিক নাম হলো- সায়েরা খাতুন। এটা কীভাবে বইয়ে ভুল হলো বুঝতে পারছি না।’

চতুর্থ শ্রেণীর ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বইয়ের ৭৮ পাতায় ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ’ লেখায় মুক্তিযুদ্ধ শব্দটি কখনো ‘মুক্তিযুদ্ধ’ অথবা কখনো ‘মুকতিযুদ্ধ’ লেখা হয়েছে। এছাড়া ওই বইয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ বানানটি ভেঙে ঙ-গ আলাদা করে লেখা রয়েছে।

কেউই রেহাই পাবে না : ২০১৭ সালের পাঠ্যবইয়ে ভুল-ত্রুটির জন্য যারা দায়ী তাদের কেউ রেহাই পাবে না-এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘পাঠ্যবইয়ে ভুলের জন্য আমি প্রশ্নের মুখে পড়ছি। যাদের জন্য এই ভুল তাদের কেউ রেহাই পাওয়ার যোগ্য নয়। এনসিটিবির তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদন দেখে বড় দুটি ভুলের জন্য দু’জনকে চিহ্নিত করে ওএসডি করা হয়েছে; এটা প্রাথমিক শাস্তি। দোষ প্রমাণিত হলে তাদের পরিপূর্ণ শাস্তি হবে।’

অনেক ভুল-ক্রটি, সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার পরও বছরের প্রথম দিন বই বিতরণকে বিশাল কর্মযজ্ঞ আখ্যায়িত করে মন্ত্রী বলেন, ‘সবাইকে আমরা বুঝিয়ে দিচ্ছি, যারা এই ভুল করেছেন তারা রেহাই পাওয়ার যোগ্য না। আগেই তাদের ওএসডি করেছি, তদন্ত করে আরও কারা কারা আছেন, কার ভুল, কোন ভুলের জন্য কে কতটুকু দায়ী সে অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

পাঠ্যপুস্তকে ভুল-ত্রুটির ঘটনায় করা দুটি তদন্ত কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে নুরুল ইসলাম নাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অবস্থা বুঝে কী করা যায় সে ধরনের ব্যবস্থা নেব। আমি আশা করি, এতে আমাদের শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমি এ রকম ভুল আশা করি নাই। এখানে পরিপূর্ণ সব বিষয়ে আলাপ করব না। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি বা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছি, ভুলের জন্য আমাদের বিচার হওয়া উচিত, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু ছেলেমেয়েদের উৎসাহিত করার নৈতিক দায়িত্ব সবার। যেটা তাদের ওপর নেগেটিভ প্রভাব ফেলে আমি মনে করি সেটা করা উচিত না। কারণ মানুষের ভুল-ত্রুটি হতেই পারে, ভবিষ্যতেও হবে। আমাদের বেশি হতে পারে, বেশিই হয়তো হচ্ছে, কিন্তু এগুলোই শেষ কথা নয়।’

ভুল সংশোধনের বিষয়ে নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘কিছু ভুল থাকতে পারে ছাপার ভুল, যেগুলো আমরা সংশোধনী দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিতে পারি। কিছু ভুল থাকতে পারে বড় ধরনের ভুল, যেটা সংশোধন করতে গেলে ওই জায়গাটা রিপ্লেস করতে পারি। আবার কিছু ভুল থাকতে পারে যেগুলো থাকা উচিত ছিল না, সেগুলো ওমিট (বাদ দেয়া) করার জন্য সরকারের নির্দেশ পাঠিয়ে দেব, ওই পাতাগুলো আমরা ছিঁড়ে নেব বা বস্নক করে দেব। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে এভাবে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেব।’

প্রাথমিকে থাকলেও এবতেদায়ির বইয়ে প্রধানমন্ত্রীর ছবি নেই : এবার প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের সব বইয়ের পেছনের পৃষ্ঠায় ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বই বিতরণ করছেন’-এমন একটি ছবি ছাপানো হয়েছে। কিন্তু এবতেদায়ি স্তরের কোন বইয়ের পেছনেই প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছাপানো হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবির একাধিক সদস্য বলেন, ‘শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলাদের অনীহা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আপত্তির কারণেই এবতেদায়ির বইয়ে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছাপানো হয়নি।’

তবে এ ব্যাপারে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান একেএম ছায়েফ উল্লাহ বলেন, ‘এনসিটিবির কর্মকর্তারাই এবতেদায়ির বইয়ে প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেয়নি। এখানে আমাদের কোন আপত্তি ছিল না।’

বিতর্কিত ব্যক্তিরা তদন্ত কমিটিতে : পাঠ্যপুস্তকে ভুল-ত্রুটি নির্ণয় ও দায়ীদের চিহ্নিত করতে ৯ জানুয়ারি অতিরিক্ত সচিব রুহী রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই কমিটির সদস্যদের মধ্যে একজন শিক্ষা প্রশাসনে জামায়াত সমর্থক হিসেবে পরিচিত, যিনি যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের জানাজায় গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরের পাঠ্যবই পরিমার্জন করে অধিকতর পাঠযোগ্য, আকর্ষণীয় ও সহজ করতে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে দুটি কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই কমিটির সমন্বয়ের দায়িত্বেও আছেন একজন অতিরিক্ত সচিব, যিনি এবারের পাঠ্যবইয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ধর্মীয় বিষয়বস্তু সংযোজন করতে ভূমিকা রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রাথমিকের বই ছাপাখানায় পাঠাতে বিলম্ব : এনসিটিবি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান। বইয়ের পা-ুলিপি তৈরির পর তা সম্পাদনা ও মানোন্নয়ন করা এনসিটিবির দায়িত্ব। বিশেষজ্ঞ শিক্ষকরা এর সঙ্গে জড়িত থাকেন। এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক চূড়ান্তভাবে সই না করলে বই ছাপা হয় না বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের কিছু শর্তের কারণে প্রাথমিকের বই ছাপাখানায় পাঠাতে দেরি হয়েছে। অল্প সময়ে অতিদ্রুত বইগুলো সম্পাদনার কাজটি শেষ করা হয়েছে। সম্পাদনার জন্য যথেষ্ট সময় ছিল না।’

প্রথম শ্রেণীর বইয়ে ছাগলের যে ছবি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে সে সম্পর্কে মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ছাগল গাছে উঠে আম খাচ্ছে ফটোশপে তৈরি এমন কিছু ছবি গণমাধ্যমে এসেছে। ওই ছবি পত্রিকায় ছাপা ঠিক হয়েছে কি না- সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার। তবে ছাগল গাছে উঠছে- এই জাতীয় ছবি বইয়ে দেয়ার কারণ খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান মন্ত্রী।

হিন্দু শিক্ষা বইয়ে হার্ট বানানে ভুলের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘যিনি সম্পাদনা করেছেন তার এটা দেখা উচিত ছিল, এই বিষয়টাকে আমরা ক্ষমা করতে পারি না। শব্দ ও বানান ভুল হতেই পারে, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আদর্শ ছেলে কবিতায় যে ভুল হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’

প্রথম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে ‘ও- তে ওড়না’ নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নানা মত থাকতেই পারে, আমরা সবগুলো মতামত ওয়েলকাম করি। কিছু ভুল পেয়েছি, যা হওয়া উচিত না।’

এবার পাঠ্যবইয়ের কিছু বিষয়বস্তুর পরিবর্তনের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘দেশ, জাতি, মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, আমাদের চিন্তা সব কিছু বিবেচনায় রেখেই বইয়ের কনটেন্ট তৈরি করতে হয়। তাতে কোন সময় পাল্লা এদিক-ওদিক হতেই পারে, সমালোচনা থাকতে পারে, আমরা সেগুলোও বিবেচনায় নেই।’

হেফাজতে ইসলামের ১৭ দফা দাবি অনুযায়ী পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে কারও আন্দোলনকে প্রাধান্য দেয়ার সুযোগ নেই, তা করাও হয়নি। আমরা সবার মতামত নিয়েই নতুন বইয়ের বিষয়বস্তু তৈরি করি।’