পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু | ডিসেম্বর ২৩, ২০১৬ - ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

গত ১৮ ডিসেম্বর দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রভাষক নিয়োগে পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেছে। ওইদিন টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে, আটটি বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রভাষক নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এ পদে নিয়োগে তিন লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। ‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগ: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক ওই গবেষণা  প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগের আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম শুরু হয়। নিয়োগ বোর্ড গঠন, সুবিধামতো যোগ্যতা পরিবর্তন বা শিথিল করা, জবাবদিহি না থাকার মাধ্যমে এই অনিয়মের শুরুটা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাব ঘটানোর সুযোগ বিদ্যমান ছিল। নিয়োগের আগেই আরো যেভাবে অনিয়ম শুরু হয়, তারও কিছু চিত্র তুলে ধরা হয় ওই প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো কোনো শিক্ষক পছন্দের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরীক্ষার ফল প্রভাবিত করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া বাজার করাসহ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে আগে থেকেই একাডেমিক পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। ক্ষেত্রবিশেষে নারী শিক্ষার্থীর  একাডেমিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া, পরীক্ষার পূর্বে প্রশ্ন জানানো ও পরবর্তী সময়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া উচিত। যেমন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত ১৪ অক্টোবর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩২তম সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। নতুন প্রক্রিয়ায় লিখিত, মৌখিক পরীক্ষাসহ মোট তিনটি ধাপের মাধ্যমে শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। তাছাড়া কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রেও ওই একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। এ সিদ্ধান্ত  সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসার পাশাপাশি যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবেন বলে আশা করা যায়। অবশ্য এর আগে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনুরোধ জানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে একটি নির্দেশনাও রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও কি শিক্ষামন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির এ নির্দেশনা এবং অনুরোধ মেনে চলবে? কারণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা নেওয়া এবং ঠিকানা ও তথ্য যাচাই (পুলিশ ভেরিফিকেশন) করাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধ নিয়ে ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আর এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ ওঠাসহ অপেক্ষাকৃত যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীকে বাদ দিয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠতে দেখা যায়। তাছাড়া নিজেদের দল ভারি করতে বিজ্ঞাপিত পদের অতিরিক্ত নিয়োগ দেওয়ার মতোও ঘটনা ঘটে—যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ঘাটতির অন্যতম প্রধান মূল কারণ। মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ-প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়নি এমন অভিযোগ তুলে আদালতে মামলা দায়ের করার মতোও ঘটনা ঘটে। যেমন: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রতি বছরগুলোতে বিভিন্ন বিভাগে ২০০ পদের বিপরীতে শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। আর এ ধরনের চিত্র যে শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালেই খুঁজে পাওয়া যাবে তা নয়, বরং শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের অসংখ্য চিত্র দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালেও খুঁজে পাওয়া যাবে। এ কথা সত্য যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হলে এবং সেখানে রাজনৈতিক ‘রং’ না থাকার কারণে অপেক্ষাকৃত মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীরা নিয়োগ বঞ্চিত হন। আর এ ধরনের নিয়োগের ফলে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও নিয়োগদাতারা লাভবান হলেও এ ধরনের নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতিকে দিনে দিনে মেধাশূন্য ও পঙ্গু করে দেয়। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষক নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন স্বচ্ছতা আসবে তেমনি অপরদিকে যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবেন বলে আশা করা যায়। তাই দেশ-জাতি ও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর স্বার্থেই দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত হবে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া। আর এ ধরনের পরীক্ষা গ্রহণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজগুলো যে অবশ্যই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন