পুরনো পেনশনারদের প্রতি সুবিচারের প্রত্যাশা - মতামত - Dainikshiksha

পুরনো পেনশনারদের প্রতি সুবিচারের প্রত্যাশা

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

রোজার শেষের দিকে পাবনার গ্রামের বাড়িতে এসে চারদিকে শুধু বালিশ কাহিনী শুনতে পাচ্ছি। ছেলেবুড়ো, আবালবনিতা সবার মুখেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বালিশ দুর্নীতির কথা শোনা যাচ্ছে। আমার গ্রামের বাড়িটির অবস্থান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার পূর্বদিকে। যদিও সারা দেশেই এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠছে; কিন্তু আমার বাড়ির আশপাশে সে ঝড়টা একটু বেশি! যাক সে কথা। আজ যে বিষয়টি নিয়ে লিখব ভেবেছি সে প্রসঙ্গে ফিরে আসি। শনিবার (১ জুন) যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানা যায়। নিবন্ধটি লিখেছেন মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন।

এখানে এসে আমি সকাল-সন্ধ্যায় রাস্তাঘাটে বের হয়ে হাঁটাহাঁটির চেষ্টা করি। এ অবস্থায় প্রায় প্রতিদিনই একজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি, যার বর্তমান বয়স প্রায় ৯০ বছর, তাকে হাঁটাচলা করতে দেখি এবং রাস্তায় দেখা হলে তার কুশল জিজ্ঞেস করি। আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে একজন তৃতীয় শ্রেণীর সরকারি কর্মচারী হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেছেন এবং সে সুবাদে চাকরির পেনশনই তার একমাত্র উপায় ও অবলম্বন। তো তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম তিনি সে সময়ে অত্যন্ত কম বেতনে রিটায়ার করায় বর্তমানে তার মাসিক পেনশনের পরিমাণ চার হাজার টাকার কিছু উপরে। আর এই টাকার ওপরই তারা স্বামী-স্ত্রী দু’জন নির্ভরশীল। বাপের আমলের একটি টিনের ঘরে তারা স্বামী-স্ত্রী বসবাস করেন। অসুস্থ অবস্থায় স্ত্রী প্রায় শয্যাশায়ী। এ অবস্থায় তার এবং তার স্ত্রীর চিকিৎসা ও ওষুধপত্র বাবদ অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। পেনশনের বাদবাকি টাকা দিয়ে কোনোমতেই তাদের সংসার চলে না। এদিকে তার সন্তানরাও কেউ এমন অবস্থায় নেই যে, পিতা-মাতাকে আর্থিক সাহায্য করতে পারে। একমাত্র কন্যা মাঝেমধ্যে এসে কিছু কেনাকাটা করে দিয়ে যায়।

বাকিটা ওই পেনশনের ওপরই তাদের ভরসা করতে হয়। ইদানীং সরকার মাঝেমধ্যে পেনশনের জন্য যে ইনক্রিমেন্ট দিয়েছে, তার পেনশনের ক্ষেত্রে তা নিতান্তই মামুলি। কারণ চার হাজার টাকা মাসিক পেনশনের ওপর বছরে পাঁচ পার্সেন্ট ইনক্রিমেন্ট দিলে তার ক্ষেত্রে বছরে মাত্র দু’শ টাকা বর্ধিত হয়। আর এ টাকা দিয়ে বর্তমান বাজারে তার চলাফেরা খুবই কষ্টের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাড়া-পড়শী মুরুব্বি হিসেবে তাকে চাচা ডাকি এবং ভক্তি-শ্রদ্ধা করি। আগে রাস্তাঘাটে দেখা হলে শুধু সালাম দিয়েই ভক্তি-শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটাতাম। কিন্তু এখন দেখা হলে সালাম দেয়ার সঙ্গে ওয়ালেটে হাত দিয়ে কিছু টাকা বের করে তার হাতে দেই। তিনিও তা সাদরে গ্রহণ করেন। তাকে টাকাটা দেই, কারণ বুঝতে পারি যে, ওই শ্রেণীর মানুষ নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে থাকলেও কারও কাছে হাত পাতেন না। প্রথম প্রথম আমার কাছ থেকে টাকা নিতেও সংকোচবোধ করতেন। কিন্তু এখন নিঃসংকোচেই তা গ্রহণ করেন। আর আমিও তার হাতে কিছু টাকা দিতে পেরে খুশি হই।

বেশ কিছুকাল এভাবে চলে এলেও এবার মনে হল, এই শ্রেণীর মানুষের জন্য কিছু একটা করা দরকার। আর মোল্লার দৌড় যেহেতু মসজিদ পর্যন্ত, তাই হাতে কলম তুলে নেয়াই শ্রেয় মনে করলাম। মনে করলাম এবারের লেখাটিতে এই শ্রেণীর মানুষের কথা লিখে ফেলি। সদাশয় সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অনেক কিছু করেছে এবং করছে। এমনকি পনেরো বছর আগে যারা নিজেদের সম্পূর্ণ পেনশন বিক্রি করে টাকা নগদায়ন করে পেনশনের সম্পূর্ণ টাকা এককালীন তুলে নিয়েছিলেন, তাদেরও আবার নতুন করে পেনশন দেয়া শুরু করেছে। অর্থাৎ এক অর্থে তারা ডাবল পেনশন পাচ্ছেন। কিন্তু যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের পেনশনের সম্পূর্ণ টাকা নগদায়ন না করে তা এককালীন তুলে না নিয়ে মাসে মাসে ভোগ করার অপশনে গিয়েছিলেন, তাদের ভাগ্যে ডাবল পেনশন দূরের কথা, পনেরো-বিশ বছর আগের সেই অল্প টাকার মূল বেতনের ওপর ধার্য করা মাসিক পেনশনের ওপর পাঁচ পার্সেন্ট ইনক্রিমেন্ট হিসেবে তারা দু-চারশ’ টাকার বেশি বর্ধিত পেনশন পাচ্ছেন না। কারণ পনেরো বছর আগেও যারা পেনশনে গিয়েছেন, সে সময়ে তাদের মূল বেতন ছিল যৎসামান্য। বেতন যা বেড়েছে তা গত দশ-বারো বছরে। এবং বলা চলে যে, গত দশ-বারো বছরে লাফিয়ে লাফিয়ে দু-তিন দফায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়েছে। কারণ বাজারদরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকারকে বেতন বাড়াতে হয়েছে। অতীতে যেহেতু সরকারের এতটা আর্থিক সঙ্গতি ছিল না, তাই সে সময়ে সরকারি কর্মচারীদের বেতনও তলানিতে পড়ে ছিল। আর সে অবস্থায় গত পনেরো-বিশ বছর বা তারও আগে যারা পেনশনে গিয়েছেন, তাদের মাসিক পেনশনের পরিমাণও তলানিতে ছিল।

একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। পনেরো বছর আগে একজন উপসচিব পদমর্যাদার কোনো ব্যক্তির মাসিক প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ৯৫০০ টাকা। সে ক্ষেত্রে ওই পদমর্যাদার একজন চাকরিজীবী সে সময়ে অবসরে গেলে তার মূল বেতন পনেরো-ষোলো হাজার টাকা হলেও তার ধার্যকৃত মাসিক পেনশন দশ-বারো হাজার টাকার উপরে ওঠেনি। আবার সে সময়ের পাঁচ-সাত হাজার টাকা মূল বেতনের একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর ক্ষেত্রে কারও মাসিক পেনশনই পাঁচ-ছয় হাজার টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। আর যারা বিশ-পঁচিশ বছর বা তারও আগে পেনশনে গিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে এখনও যারা জীবিত থেকে পেনশন পাচ্ছেন তাদের অবস্থা যে অত্যন্ত করুণ সে কথা বোধহয় বলাই বাহুল্য। কারণ সে সময়ে ওইসব কর্মচারীর কারও মূল বেতনই হাজারের অঙ্কে ছিল না।

তাদের সবাই শতকের অঙ্কের মাসিক বেতনে পেনশনে যাওয়ায় তাদের মাসিক পেনশনও শতকের ঘরেই ধার্য করা হয়েছিল। গত বিশ-পঁচিশ বছরে বাড়তে বাড়তে যা হয়তো হাজারের অঙ্কে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় দেখা যাচ্ছে যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে যা বেড়েছে, তা গত দশ-বারো বছরে। তাই পনেরো বছর আগেও যারা পেনশনে গিয়েছেন, তাদের পেনশনের পরিমাণ এত কম যে, বর্তমানে তা দিয়ে তাদের জীবন চালানো মুশকিল হয়ে পড়েছে। তাছাড়া একই পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী চৌদ্দ-পনেরো বছর আগে অবসরে গিয়ে যে পরিমাণ পেনশন পাচ্ছেন, একই ক্ষেত্রে ওই একই পদমর্যাদার চাকরিজীবী, যারা আট-দশ বছর আগে পেনশনে গিয়েছেন, তাদের সঙ্গে পেনশনের অর্থের পরিমাণে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ দু-চার বছর আগে অবসরে যাওয়াদের সঙ্গে দু-চার বছর পর অবসরে যাওয়া পেনশনারদের অর্থের পরিমাণে বিরাট পার্থক্য দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় চৌদ্দ-পনেরো বছর আগে একজন উপসচিবের মাসিক পেনশনের চেয়ে বর্তমানে অবসরে যাওয়া একজন তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীও অধিক হারে মাসিক পেনশন পাচ্ছেন। আর এ বিষয়টি বাজেট প্রণেতা কর্তাব্যক্তিদের নেক নজরে আনার জন্যই আজকের লেখাটির অবতারণা। আশা করি, বিষয়টি তারা বুঝতে পারবেন এবং পুরনো পেনশনভোগীদের প্রতি সুবিচার করতে সক্ষম হবেন। আর আমাদেরও তেমনটিই প্রত্যাশা।

 

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

শিক্ষা আইন যেন শুধু শিক্ষকদের শাসন করার জন্য না হয় - dainik shiksha শিক্ষা আইন যেন শুধু শিক্ষকদের শাসন করার জন্য না হয় হঠাৎ রাজধানীর ৩ স্কুলে প্রতিমন্ত্রী, ৫ শিক্ষককে শোকজ - dainik shiksha হঠাৎ রাজধানীর ৩ স্কুলে প্রতিমন্ত্রী, ৫ শিক্ষককে শোকজ ১৩ অক্টোবরের মধ্যে দাবি আদায় না হলে কর্মবিরতির হুমকি প্রাথমিক শিক্ষকদের - dainik shiksha ১৩ অক্টোবরের মধ্যে দাবি আদায় না হলে কর্মবিরতির হুমকি প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী নিয়োগের নীতিমালা প্রকাশ - dainik shiksha প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী নিয়োগের নীতিমালা প্রকাশ এইচএসসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ - dainik shiksha এইচএসসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website