please click here to view dainikshiksha website

প্রচলিত পরীক্ষায় কি শিক্ষার্থীর প্রকৃত মূল্যায়ন হয়

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ | আগস্ট ১১, ২০১৭ - ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলকে উপলক্ষ করে লেখা হলেও অভিজ্ঞতার আলোকে এবং আমাদের প্রচলিত পরীক্ষা বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞানের প্রকৃত মূল্যায়ন কতটুকু হয় তা নিয়ে অপ্রিয় কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করতেই আজ কলম ধরতে প্রয়াসী হয়েছি। পরীক্ষার ফল নিয়ে সরকার ও শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিশিষ্টজনদের বক্তব্যের অভিমত এবং বিভিন্ন স্তর ও পর্যায়ের প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোকপাত করতে মূলত আজকের এ লেখা। উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে ব্যাপক সংখ্যক পরীক্ষার্থী খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করায় শিক্ষা বোর্ডগুলোকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এরই মধ্যে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অবহেলার অভিযোগে কয়েকজন পরীক্ষককে কারণ দর্শাতে চিঠি দিয়েছে। অন্যদিকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফল নিয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ও শিক্ষা নিয়ে ভাবিত বিশিষ্টজনদের নিজ নিজ অবস্থান ও দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে মতামত প্রদান এখনও অব্যাহত রয়েছে।

শিক্ষার্থী-পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষায় পাস প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী

২৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে শিক্ষামন্ত্রী ১০টি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের রেজাল্ট দিতে গেলে প্রধানমন্ত্রী সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন যার মধ্যে তার নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের গড়ে তোলার সুযোগ পায় সেজন্য সরকার শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কত পার্সেন্ট পাস করল, কত পার্সেন্ট পাস করল না; সেটি বিবেচ্য বিষয় নয়। মানুষ হওয়াটাই মুখ্য, পাসের হার নয়।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য, ভিন্ন মত ও ‘ফেল করলেই ভর্তি’

একই দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এইচএসসির ফল প্রকাশকালে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, এখন পরীক্ষায় শৃঙ্খলা এসেছে। ৬০ দিনের মধ্যে ফলাফল দেয়া হচ্ছে। পরীক্ষার খাতা আগে সঠিকভাবে মূল্যায়ন হতো না বলে অভিযোগ ছিল। এতে ভালো ছাত্র খারাপ আর খারাপ ছাত্র ভালো ফল করতো। এজন্য পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট গঠন করা হয়েছে। তারা পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক ঠিক মতো খাতা দেখছে কি-না খতিয়ে দেখছে। প্রশ্নপত্র রক্ষা করা কঠিন কাজ। প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে এ কাজ সম্ভব হয়েছে। যারা ফেল করেছে তাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। একটি পরীক্ষায় পাস না করলে জীবনের সব কিছু পাল্টে যায় না। আগামীতে আরও পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ আসবে। ভেঙে পড়লে চলবে না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক, অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন খাতা মূল্যায়ন সংক্রান্ত শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। তার মতে এ ধরনের ব্যবস্থার কোন নজির নেই।

অন্যদিকে বিষয়টি কাকতালীয় হলেও একটি সংবাদপত্র ‘ফেল করলেই ভর্তি হওয়া যাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে’ শিরোনামে যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথ কলেজে ম্যাসাচুয়েটস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগে অকৃতকার্যদের ভর্তির বিচিত্র সংবাদ ছেপেছে। স্মিথ কলেজের এ বিশেষ কোর্সের নাম ফেলিং বেল। কোর্সটা শুধু তাদের জন্যই যারা জীবনের কোন এক পদক্ষেপে অসফল হয়েছেন। ভবিষ্যতে কী করবেন তা নিয়ে চিন্তিত। জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। এই কোর্সে তাদের শেখানো হয় ফেল করার কিছু লাভও আছে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রছাত্রীকে ফেল হওয়ার সার্টিফিকেট দেয়া হয়। তারপর থেকে উৎসাহিত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অবাক করা বিষয়, দিন দিন এ কলেজে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

পাবলিক পরীক্ষার নিয়ে ৫ জিজ্ঞাসা

প্রচলিত পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের নিজেদের নানা অভিমত রয়েছে : ১. শিক্ষকের মাধ্যমে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীকে যা পড়ানো হয়, প্রচলিত পরীক্ষায় তার যথাযথ মূল্যায়ন হয় কি-না? ২. শিক্ষার্থীকে যা পড়ানো হয় এবং সে যতটুকু অনুধাবন ও আত্মস্থ করতে পারে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কি তার ওপর ভিত্তি করে হয়, না সে যা বুঝতে সক্ষম হয় না তার ওপর ভিত্তি করেও হয়? ৩. নিয়মিত শ্রেণীকক্ষে পাঠ গ্রহণকারী শিক্ষার্থী পরীক্ষায় খারাপ করে কিভাবে ও কেন? তার দায় পাঠদানকারী শিক্ষকের উপর কতটুকু বর্তায়? ৪. প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়নে যে শিক্ষার্থী ভালো ফল করে পাবলিক পরীক্ষায় তার ফল খারাপ হয় কিভাবে? তার জন্য কে দায়ী- সে নিজে, না তার প্রতিষ্ঠান, না প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থা? ৫. এসব পরীক্ষা কি শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের মূল্যায়নে সহায়ক?

পরীক্ষা ও শিক্ষক : অতীত থেকে বর্তমান

প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে পরীক্ষা পদ্ধতি যুক্ত। সেকালে সহজ-সরল শিক্ষা ব্যবস্থা ও অতি সহজ-সরল পরীক্ষা প্রচলিত ছিল। একজন শিক্ষক স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করে, অধীত বিষয়াদিতে তাদের পারদর্শী করে তোলার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতেন। শিক্ষাদান, মূল্যায়ন, সনদ প্রদান ইত্যাদি সবকিছুই একা নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীত বলেই সমাজ গ্রহণ করে নিত। ক্রমে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিপুলভাবে বাড়তে থাকে এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার স্থলে উদ্ভুত হয় সম্প্রসারিত আনুষ্ঠানিক শিক্ষা। এক শিক্ষককের স্থান গ্রহণ করে বহু শিক্ষক সমবায়ে সংগঠিত বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরূপ ব্যাপক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য আগে উল্লিখিত মূল্যায়ন পদ্ধতি অত্যন্ত অনুপযোগী বিবেচনায় ভিন্নতর ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। সম্প্রসারণের এই স্তরেই প্রবর্তিত হয় লিখিত পরীক্ষা ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আন্তঃপরীক্ষা ছাড়াও চালু হয় জাতীয়ভিত্তিক বা বিরাট অঞ্চালভিত্তিক সাধারণ বহিঃপরীক্ষাÑ পাবলিক এগজামিনেশন। এ ধরনের পরীক্ষা বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণের কারণে এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত হয় স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়। পাবলিক এগজামিনেশন বা পরীক্ষার প্রাধান্যের আরেকটি কারণ হলো অন্তঃপরীক্ষায় ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে জনসাধারণের মনে আস্থার অভাব। আপাতদৃষ্টিতে সমস্যাটি শিক্ষকের নিরপেক্ষতার সঙ্গে জড়িত মনে হলেও তা বস্তুত একটি সামাজিক সমস্যা। বর্তমানে সামাজিক পরিবেশ শিক্ষকের যে সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা নির্ধারণ করে তা শিক্ষকের দায়িত্ব পালনে বিশেষ করে ক্ষমতাধরদের চাপের মুখে, সহায়ক নয়। (মফিজ উদ্দিন শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট : ‘পরীক্ষা ও মূল্যায়ন’)।

অন্তঃ ও বহিঃপরীক্ষা প্রসঙ্গে কুদরাত-এ-খুদা রিপোর্ট

উল্লেখ্য, ১৯৭৪-এর কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে সে জন্যই সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়, অন্তঃপরীক্ষার গুণাগুণ সম্বন্ধে পূর্ণ জ্ঞানের অভাববশত আমাদের দেশে শিক্ষার কোন কোন স্তরে এমন পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছে যে, সেখানে পরীক্ষার্থীর আপন শিক্ষককের প্রত্যক্ষ কোন ভূমিকা নেই। শুধু বিষয়ভিত্তিক বহিঃপরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা আজীবন চিহ্নিত থেকে যায়। পরীক্ষক, পরীক্ষা পরিচালনা সংস্থা, সময়, পরিবেশ, পরীক্ষা কেন্দ্রে অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ ইত্যাদির দরুন বহিঃপরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা ও উদ্দেশ্যনিষ্ঠা বহুলাংশে হ্রাস পায়…।

ইউএনডিপি, বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন ও ড. হান্নানের সুপারিশ

১৯৯৮ সালে ইউএনডিপির এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেকেলে এবং অনুপযোগী শিখন পদ্ধতি বিশেষত শ্রেণীকক্ষে শিক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের অবকাশ থাকে না। সেজন্য এবং একটি মাত্র সমাপনী বহিঃপরীক্ষার ফলে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির হার বৃদ্ধি পায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইউএনডিপি সুপারিশ করে, শুধু বহিঃপরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়নে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। শিক্ষকরাই সে দায়িত্ব নিতে পারবেন। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ এডুকেশন সেক্টর রিভিউ ভিশন ২০২০-এ উপস্থাপিত বক্তব্যও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক : মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার অপিহার্য। কেননা, প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হয় মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে। পাঠদান অধিকতর প্রাসঙ্গিক করতে হবে এর সংস্কারের বিকল্প নেই। বর্তমানে প্রচলিত সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেটের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট/নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সার্টিফিকেট প্রবর্তন করা দরকার। গুরুত্ব না দেয়া উচিত উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেটকে। থাইল্যান্ডে মাধ্যমিক পর্যায়ে এবং মালয়েশিয়ায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষা নেই এ কথা উল্লেখ করে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতির ইতিহাস’ গ্রন্থে ড. মো. হান্নানও- বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ৮০ থেকে ৮৫ ভাগে হওয়ার পর প্রথমে মাধ্যমিক পর্যায়ে এবং পরের ধাপে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষা তুলে দেয়ার জন্য সুপারিশ করেছেন।

পরীক্ষায় শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন

এ প্রেক্ষাপটে, শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের মূল্যায়নে আমাদের দেশে যে পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, তা ইতোমধ্যেই অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে কি-না বা কতটা কার্যকর, তা নিরূপণের সময় এসেছে। সমস্যাটিকে খন্ডিত ও বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সামগ্রিক বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার। দেশে-বিদেশের উদাহরণ, ব্রিটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে, সব স্তর ও পর্যায় বিশেষ করে তৃণমূলের শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিজ্ঞতার পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রচলিত পাবলিক পরীক্ষার আদৌ উপযোগিতা আছে কি-না। বা কতটুকু আছে তা যাচাই করে একটি যুগোপযোগী জাতীয় পরীক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের পরীক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষাবিষয়ক গবেষণা পরিচালনা ও কর্মসূচি গ্রহণ, অভ্যন্তরীণ ও পাবলিক উভয় পরীক্ষার দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের পর্যায় ও পালাক্রমিক প্রশিক্ষণ প্রদানের কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। সেই সঙ্গে বোর্ডভিত্তিক না করে জেলা ও উপজেলা ভিত্তিতে আঞ্চলিকভাবে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা যায় কি-না ভেবে দেখা যেতে পারে। এসবের জন্য জাতীয় পর্যায়ের একজন শিক্ষক-বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে বিভিন্ন স্তরের অভিজ্ঞ শিক্ষক, আগ্রহী অভিভাবক ও শিক্ষা পরিচালনায় অভিজ্ঞদের নিয়ে অবিলম্বে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এ টাস্কফোর্সে সরকার থেকে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা আবশ্যক হবে।

প্রায় তিন দশক ধরে মিডিয়ার মাধ্যমে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিত আবেদন করে আমি প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং একটি যুগোপযোগী জাতীয় পরীক্ষা নীতি প্রণয়নের কথা বলে আসছি। বাংলাদেশে শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে সরকারি বেসরকারি শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন ১৯৯৯ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেক বরাবর পেশাগত ১৫ দফা দাবির সঙ্গে পরীক্ষা সংস্কারের ৭টি প্রস্তাব উপস্থাপন করে। তদনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়। পাবলিক পরীক্ষার জন্য যাতে স্কুল-কলেজে ক্লাস ব্যাহত না হয়, সেজন্য আঞ্চলিকভাবে পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপন, প্রশ্নপত্রের ধারা পরিবর্তন, নকল প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ইত্যাদি তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ছিল। তবে পরীক্ষা ব্যবস্থায় কলেবর সম্প্রসারণ, ক্ষমতার পালাবদল, শিক্ষাকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরে অবস্থানকারীদের অক্ষমতা, পরীক্ষা কেন্দ্রে দলীয় ব্যক্তিদের অবাধ প্রবেশ, পাবলিক পরীক্ষার দিনে হরতালের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রদান, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সংগঠিত উদ্যোগের অনুপস্থিতি ইত্যাদি আনুসঙ্গিক কারণে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি।

কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব

বর্তমান প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে এসএসসি ও এইচএসসির মতো দুটো বড় পাবলিক পরীক্ষা সংস্কার ও যতদূর সম্ভব ত্রুটিমুক্তভাবে গ্রহণ করা যেমন অপরিহার্য, একইভাবে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষা, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, সরকারি ব্যাংকসমূহের নিয়োগ পরীক্ষা, সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি পরীক্ষা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভর্তি পরীক্ষা এর সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। ষাটের দশকে আমাদের সময় ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা একদিনে একাধিক বিষয়ে বা দুই পেপারে পরীক্ষা হতো। স্কুলের শরীর চর্চা ও ছবি অঙ্কন/ড্রয়িংয়ের মতো বিষয় পাবলিক পরীক্ষার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণভাবে মূল্যায়িত হতো এবং বার্ষিক পরীক্ষার মার্কশিটে তার উল্লেখ থাকত। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষা ইউনিট সে লক্ষ্যে কিছু কাজ করছে। এর ব্যাপ্তি ও গতি দুটোই বাড়ানো দরকার। সে লক্ষ্যে সুদূরপ্রসারী ও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে জাতীয় পরীক্ষানীতি প্রণয়নের মতো যুগোপযোগী পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হওয়া দরকার। প্রচলিত ব্যবস্থাপনার বিকেন্দ্রায়ন ও অসদুপায় রোধে ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। সেজন্য বিভিন্ন সরকারের আমলে শিক্ষা নিয়ে বিশিষ্টজনদের সব গবেষণা ও উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব বিশেষ করে ১৯৭৪ সালে কুদরাত-ই-খুদা রিপোর্ট এবং সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর ওপর সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এ লেখায় উপস্থাপিত বক্তব্য ও প্রস্তাব নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার উন্নয়নে আগ্রহী সবার মতামত লেখাটিকে সমৃদ্ধ করবে বলে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি।

[লেখক : জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য, প্রবীণ শিক্ষক নেতা]

সংবাদটি শেয়ার করুন:


পাঠকের মন্তব্যঃ ১টি

  1. হুমায়ুন কবির says:

    যুগোপযুগী এমন একটি সুন্দর লেখার জন্যে স্যারকে আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন। আসলে তথাকথিত সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিই আমাদের বর্তমান শিক্ষাকে ধংস করছে এতে আর কোনোই সন্দেহ নেই। সৃজনশীলের নামে জ্ঞান মূলক-অনুধাবন-প্রয়োগ-উচ্চতর দক্ষতা এসব প্রশ্নের ধরণই শিক্ষার্থীর কাছে পরীক্ষাকে দুর্বোধ্য করে তুলেছে। ফল স্বরূপ- শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় বিমূখ-শিক্ষক বিমূখ- সর্বোপরি, পাঠ বিমূখ হয়ে পড়ছে। সরকার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন Dream School এর। আর শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখছে স্কুল ফাঁকি দিয়ে পার্কে বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে সময় কাটিয়ে আর সারাক্ষণ ফেসবুকে ডুব দিয়ে! অচিরেই যদি পাঠদান-প্রশ্ন-পরীক্ষা পদ্ধতিকে সহজ করা না হয় তাহলে আমরা একটি জ্ঞানপঙ্গু-জ্ঞানপ্রতিবন্ধী প্রজন্ম উপহার পাবো এতেও কোনোই সন্দেহ নেই!

আপনার মন্তব্য দিন